জ্বলদর্চি

কর্নেল ডাঃ ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায় (স্বাধীনতা সংগ্রামী, চিকিৎসক, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৯৯
কর্নেল ডাঃ ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায় (স্বাধীনতা সংগ্রামী, চিকিৎসক, তমলুক) 

ভাস্করব্রত পতি

বহু গুনের অধিকারী ডাঃ ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের ডাকনাম ছিল 'গুনা'। ছিলেন প্রোথিতযশা চিকিৎসক। শুধু পড়াশোনা নয়, খেলাধুলা, গানবাজনা, লেখালেখিতেও সমান পারদর্শী ছিলেন এই মানুষটি। অসাধারণ যন্ত্রসঙ্গীতশিল্পী ছিলেন তাম্রলিপ্তের ময়ূরধ্বজ রাজবংশের ৬২ তম সদস্য এই সুযোগ্য সন্তানটি। স্বাধীনোত্তর যুগে মেদিনীপুরের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কুশীলব ছিলেন তিনি। 

আসলে ভারতের বুকে শাসনকারী ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে এই পরিবারের ৫২ তম রাজমাতা রাণী কৃষ্ণপ্রিয়া যে কঠিন বীজমন্ত্র প্রোথিত করেছিলেন রাজপরিবারের সদস্যদের মধ্যে, তা ছিল চিরস্মরণীয়। সেই মন্ত্রে জারিত হয়েছিলেন রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ রায় এবং তাঁর উত্তরসুরীরা। ধীরে ধীরে ব্রিটিশবিরোধী মানসিকতা চারাগাছ থেকে মহীরূহে পরিনত হয়েছিল। ১৯৩০ সালে যে সুরেন্দ্রনারায়ণ রায় লবণ আইন অমান্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং কারাবরণ করেছিলেন, তাঁরই পুত্র ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায় পিতৃদেবের সান্নিধ্যে থেকে ছাত্রাবস্থাতেই মাত্র ১৪ বছর বয়সে স্বদেশী মেলায় অংশগ্রহণ করেন এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রচারে যুক্ত করেন নিজেকে। আর গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিলি করতে শুরু করেন শৃঙ্খলমুক্তির ভাবধারা সমৃদ্ধ প্রচার পুস্তিকা। আর নিজেকে পরিশীলিত করতে থাকেন একজন একনীষ্ঠ যোদ্ধা হিসেবে। 
তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ি

১৯১৪ সালের ১২ ই ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন এই মানুষটি। রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ রায় এবং রাণী দাক্ষায়ণী রায়ের স্নেহধন্য সন্তানটি যথার্থ অর্থেই ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ এক ব্যক্তি। প্রকৃতই মেদিনীপুরের মানুষ রতন। লেখক প্রবন্ধকার বলীন্দ্রনারায়ণ রায় এক লেখায় উল্লেখ করেছেন রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ রায় এবং তাঁর পরিবারের মহান কীর্তির কাহিনি -- "নিজের বসতবাটী সংলগ্ন অসম্পূর্ণ ইমারত বাটিটি সত্যাগ্রহ শিবিরের জন্য দিয়েছিলেন। এই কারণে ইংরেজরা বার বার চারবার তমলুক রাজবাটী তল্লাশী করেছিল। সেইসঙ্গে রাজবাটীর সমস্ত অস্ত্রগুলি বাজেয়াপ্ত করে দিয়েছিল। বড়ছেলে হরেন্দ্রনারায়ণ শুধু কিছুটা রক্ষা পেয়েছিলেন। মেজছেলে ষড়েন্দ্রনারায়ণ রায় অনারারী মেজিস্ট্রেট ছিলেন বলে পরিবারের লোকেরা কিছুটা রক্ষা পেয়েছিলেন। ঐ সময়ে ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায় শুধু বাবার সান্নিধ্য ছাড়াও সত্যাগ্রহ শিবিরে আসা তাবড় তাবড় স্বাধীনতা সংগ্রামীদেরও সান্নিধ্য পেয়েছিলেন বলে বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।"
🍂

১৯৩০ সালের ৬ই এপ্রিল তমলুক মহকুমার প্রথম লবন সত্যাগ্রহের স্থান হিসেবে নির্বাচিত করা হয় নরঘাটকে। লবন আইন অমান্য আন্দোলনের দিনটিতে আগত স্বেচ্ছাসেবক এবং অতিথিদের আপ্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাম্রলিপ্ত রাজপরিবারের দুই সহোদর ভাই বীরেন্দ্রনারায়ণ রায় ও ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়কে। অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়, সতীশচন্দ্র সামন্ত, কুঞ্জবিহারী মাইতি, ক্ষুদিরাম ডাকুয়া, রাখালচন্দ্র নায়ক, কুমার জানা, মহেন্দ্রনাথ মাইতি, বিধুভূষণ মাইতি, প্রতাপ গুহরায়দের সঙ্গে ছিলেন সত্যাগ্রহের বীর সেনানী বীরেন্দ্রনারায়ণ রায় এবং ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়। তাঁদের সঙ্গে পা মেলায় কয়েক হাজার নরনারী। মোট ১৫ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পিতা রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ রায় এবং নাবালক পুত্র রাজা ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়। মেধাবী ধীরেন্দ্রনারায়ণকে অবশ্য সেবার ছেড়ে দেওয়া হয়। 

কিভাবে তাঁদের মধ্যে এই লবন আইন অমান্য আন্দোলনের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল সে সম্পর্কে 'তাম্রলিপ্ত' পত্রিকার সম্পাদক জয়দেব মালাকারের বক্তব্য প্রণীধানযোগ্য। তিনি উল্লেখ করেছেন, "১৯৩০ এর ২৬ শে জানুয়ারী, গান্ধীজীর নেতৃত্বে দেশব্যাপী পূর্ণ স্বরাজের দাবীতে শপথ গ্রহণ সহ আইন অমান্য ও কর বন্ধের আন্দোলন করার কথা ঘোষিত হয়। আইন অমান্য আন্দোলন (Civil Disobedience movement) ঘোষণার পর, অবিভক্ত তমলুক মহকুমার জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সেনানীরা মহেন্দ্রনাথ মাইতি, সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী, সতীশচন্দ্র সামন্ত, অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়, সুশীল কুমার ধাড়া, হংসধ্বজ মাইতি প্রমুখের নেতৃত্বে এবং রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ীর গোপনস্থানে কয়েকশত স্বেচ্ছাসেবীর শিবির গড়ে ওঠে। এই শিবিরে লাঠিখেলা, অস্ত্র প্রশিক্ষণ, শরীরচর্চা হতো। এই শিবিরের সক্রিয় কর্মীরূপে পরিগণিত হন বীরেন্দ্রনারায়ণ রায় ও ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়।"

ব্রিটিশ বিরোধী বুলেটিন প্রচার, আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান এবং স্বদেশী বিপ্লবীদের কাজে সহযোগিতা করার অভিযোগে ১৯৩২ এ ফের গ্রেফতার হন ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়। এবার তাঁকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ টাকা জরিমানা দিতে হয়। অনাদায়ে আরও ছয় মাসের হাজতবাসের নিদান দেন সেই সময়কার তমলুক কোর্টের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট এইচ পি সরকার। 

সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী প্রথমে তমলুক সাব জেলে ছয় দিন রাখার পর ১০ ই এপ্রিল মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয়। এই মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে ১৪ই মে ফের স্থানান্তরিত করা হয় দমদম স্পেশাল জেলে। অবশেষে মেজদাদা ষড়েন্দ্রনারায়ণ রায় মুচলেকা দিয়ে নাবালক ভাই ধীরেন্দ্রনারায়ণকে জেল থেকে মুক্ত করেন। শর্তানুযায়ী তাঁকে নিজের বাড়িতেই নজরবন্দী থাকতে হয়। বাড়িতে থাকতে থাকতেই ১৯৩৪ সালে ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায় তমলুক হ্যামিল্টন হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করেন। 

আবারও পুলিশের হাতে ধরা পড়েন শাসকবিরোধী কাজের জন্য। ১৯৩৪ এর ১ লা নভেম্বর ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়কে গ্রেফতার করা হয় নিষিদ্ধ প্রচারপত্র রাখার জন্য। এবার তাঁর বিরুদ্ধে তমলুক থানায় Bengal Suppression of Terrorist Outrages Act-1932 এর ৩৬ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। বিচারে ছয় মাসের কারাবাসের আদেশ দেওয়া হয়। 

সংগ্রাম, আন্দোলন আর দেশভক্তির চূড়ান্ত নিদর্শন রাখা এই মেধাবী মানুষটি অবশেষে ১৯৩৬ সালে উত্তীর্ণ হন 'ইন্টার মিডিয়েট' পরীক্ষায়। সুযোগ পান চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করার। এজন্য ভর্তি হন কলকাতা মেডিকেল কলেজে। ১৯৪২ সালে ডাক্তারির ডিগ্রি অর্জন করেন এবং চিকিৎসক হিসেবে তৎক্ষণাৎ যোগ দেন রাঁচিতে 'ইন্ডিয়ান মিলিটারি সার্ভিস'-এ। লাভ করেন 'ক্যাপ্টেন' এর পদ। এখানে ১৯৪৭ পর্যন্ত চিকিৎসক রূপে থাকার পর চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে আরও গভীর এবং আধুনিক পাঠগ্রহণের উদ্দেশ্যে বিলেতযাত্রা করেন। 

ডাঃ ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায় ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ১৯৫৩ সালে ভারতে ফিরে আসেন সার্জারিতে বিশেষ দক্ষ হয়ে। এবার দিল্লিতে 'ইন্ডিয়ান মিলিটারী সার্ভিস'-এর ডাক্তার হয়ে 'কর্নেল' পদে যোগদান করেন। কলকাতার ভবানীপুরেও চেম্বার ছিল। দিল্লিতে মোট দুবছর ডাক্তারি করার পরেই চাকরি ছেড়ে দেন। ফিরে আসেন নিজের জন্মভূমি তমলুকে। এখানকার আর্ত মানুষের সেবায় নিয়োজিত হন। তাঁর সেবাকর্মে তমলুকের মানুষ আপ্লুত হয়ে ওঠে। চিকিৎসাশাস্ত্রের সবদিকে তিনি ছিলেন পারঙ্গদ। একজন দক্ষ সার্জেন হিসেবেও নাম করতে থাকেন এলাকায়। তাঁর সেবাকার্যের দরুন যেন স্বর্গের চাঁদ হাতে পেল তমলুকের সাধারণ মানুষ। 
রাজবাড়ির সবুজ গাছপালার ঘেরাটোপে কর্নেল ডাঃ ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের মূর্তি

তিনি WHOLE WORLD DOCTORS ASSOCIATION এর আজীবন সদস্য এবং কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন। ডাঃ ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের চিকিৎসক জীবনের বর্ণনা করতে গিয়ে অধ্যাপক প্রণব বাহুবলীন্দ্র এই 'ডাক্তার রাজা' সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, "চিকিৎসক হিসেবেও কৃতবিদ্য ছিলেন তিনি। কিন্তু প্রচারবিমুখ। পসার জমানোর দিকে কোন দৃকপাত নেই। অর্থলিপ্সা কোনওদিনই ছিল না। বরঞ্চ নিরূপায় যাঁরা, সঙ্গতিহীন, তাঁদের দিকেই যেন উজাড় করা দরদী দৃষ্টি। নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিশেষ কে বা ছিল তদানীন্তন তমলুকে। তার উপর সার্জারিতে নিপুন, অথচ পরিকাঠামো তেমন কিছু নয়। গ্রাম্য শহরে তারই মধ্যে আধুনিকতার ছাপ সুষ্পষ্ট। একদা প্রথম যৌবনেও বক্তৃতা দিতে গ্রাম গ্রামান্তরে, সুদূর পল্লীপ্রান্তেও সানুনয় আহ্বান আসত নিয়মিত। বাগ্মিতায় পারঙ্গম। অকুতোভয় স্বাধীনতা সংগ্রামী রূপে চিহ্নিত হয়েছিলেন সেই কাঁচা বয়স থেকেই। মর্যাদা আহরণ করেছেন অনায়াসে। বিলিতি আমদানি কোন জিনিস ছুঁয়েও দেখতেন না। বিদেশী চিনির চাইতে স্বদেশী গুড় তাঁর কাছে ছিল অমৃততুল্য। স্বরাজী ভাবধারার প্লাবনে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছেন সে সময়। পিতা সুরেন্দ্রনারায়ণের যোগ্যপুত্র তিনি।"

একজন আদর্শ চিকিৎসক ছাড়াও তাঁর নামের পাশে বসানো যায় আদ্যন্ত ক্রীড়াপ্রেমী, সাহিত্যসেবী, যন্ত্রসংগীতপ্রিয় অসাধারণ ব্যক্তিত্বের তকমা। তাঁর অসংখ্য লেখায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকা মুখরিত হয়ে ওঠে সেসময়। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'তমলুক রয়েল ফ্রেন্ডস ক্লাব'। তিনি অবশ্য এই সমাজের কাছে কোনও স্বীকৃতি পাননি। ১৯৭৭ এর ২৮ শে মে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর বহু পরে গত ২০১৪ এর ২৬ শে ডিসেম্বর তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ি এলাকাতেই তাঁর মর্মর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে কেবল। বর্তমানে জেলার কবি সাহিত্যিকদের বিশেষ অবদানের জন্য দেওয়া হয় 'স্বাধীনতা সংগ্রামী কর্নেল ডাঃ ধীরেন্দ্রনারায়ণ তাম্রলিপ্ত কবি সম্মান'। এই স্বাধীনচেতা মানুষটির জীবনসংগ্রাম আজও লোকচক্ষুর অন্তরালেই সীমাবদ্ধ।

Post a Comment

0 Comments