ছোটোবেলা ১৯৪
চিত্রগ্রাহক - কল্যাণ সাহা
সম্পাদকীয়,
ছোটবন্ধুরা, বসন্ত এসে গেছে। গাছে গাছে ফুলেরা দুলে দুলে হেসে খেলে আমাদের মন জয় করে নিচ্ছে। আর আমরা ফুলেদের আনন্দ দেখে নিজেরাও খুশিতে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিন্তু কল্যাণ আঙ্কেলের তোলা পদ্ম কুঁড়িটার সেই দেখে ভারি হিংসে হয়েছে। বলে কিনা কারো সাধ্য নেই বসন্তে আমাকে ফোটায়। বসন্ত গেলে গ্রীষ্ম আসবে তারপর বর্ষা তারপর শরৎ না আসা অব্ধি আমি ফুটব না। সেই কথা শুনে স্বপন আঙ্কেল গ্রীষ্ম আসার আগেই বৃষ্টি আসার ছড়া লিখে পাঠিয়েছেন। আর একটা পিঁপড়ে বৃষ্টির শব্দ পেয়ে হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেছে। সেই ছবিটা এঁকে পাঠিয়েছে শ্রীজা। সেই কথা শুনে রতনতনু জ্যেঠুর গল্পের দেবোপম স্যার আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন। বৃষ্টি হলে তো ক্রিকেট খেলা পন্ড। তখন গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেটম্যাচের দফারফা হবে যে। দুষ্টু পদ্ম কুঁড়ির মতো অনন্যার একটা দুষ্টু বন্ধু আছে। তার কথা অনন্যা ছড়ায় লিখেছে। আর তারকনাথ জ্যেঠু খুব খুব সুন্দর একটা পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখে পাঠিয়েছে। এসো ফুলেদের দেশে ঘুরে আসি সবাই মিলে। -- মৌসুমী ঘোষ।
বৃষ্টি এল
স্বপনকুমার বিজলী
এই এঁকেছি গাঁয়ের নদী
নৌকা বাঁধা আছে
এঁকে দিলাম দোয়েল শালিক
উড়ছে জলের কাছে।
কচিকাঁচা দিচ্ছে সাঁতার
এবার দিলাম এঁকে
দখিন বাতাস এসে গেছে
এসব ছবি দেখে।
দুটি পাড়ে অনেক রকম
গাছগাছালি আঁকি
ঝরা পাতা ঝলসানো ফুল
দেখে নীরব থাকি।
এই রোদে গাছ বাঁচবে বলে
মেঘ দিয়েছি ভরে
ওমা! দেখি ঝম্ ঝমা ঝম্
ধারাবাহিক উপন্যাস
গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ
পর্ব ১০
রতনতনু ঘাটী
ক্রিকেট কোচিংয়ের ফাঁকে দেবোপমস্যার মাঝে-মাঝে কেন যেন নীল আকাশটার দিকে তাকান। স্কুলের ছোটরা স্যারের এই আকাশ দেখার কোনও উত্তর খুঁজে পায়নি। রোরো একদিন ক্রিকেট কোচিংয়ের ফাঁকে দেবোপমস্যারকে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আপনি ক্রিকেট কোচিংয়ের ফাঁকে আকাশের দিকে তাকিয়ে কী খোঁজেন?’
দেবোপমস্যার খানিকটা উদাস হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ‘আমরা ছেলেবেলায় বেনারসের একটা খুব লম্বা সরু অন্ধকার গলির শেষ প্রান্তে থাকতাম। প্রায় অন্ধকার একটা ঘরে আমরা তিন ভাইবোন আর বাবা-মা থাকতাম। এখন সে গলিটার নাম মনে নেই। সে গলির নাম হয়তো ছিল... তখনকার দিনে বেনারসে ওরকম অনেক সরু, পুরনো এবং রহস্যমাখা গলিপথ ছিল। এখনও হয়তো আছে। তখন তার কোনওটার নাম ছিল মার্কাত নিবাস লেন, খুন কা রাস্তা, ভৈরব গলি। তোমরা শুনলে অবাক হয়ে যাবে, একটা গলির নাম ছিল ‘চোরদের গলি’। অন্ধকার ও আলো-আঁধারি মাখা ছিল সেসব গলি। যেমন তোমরা যদি কেউ ‘দি একেন’ সিনেমাটা দেখে থাকো, তবে সেই সিনেমায় ওরকম গলির ছবি তোমরা নিশ্চয়ই দেখেছ! আমি শৈশবে তেমন করে বড় আকাশ দেখতে পাইনি কখনও। তাই এখন সুযোগ পেলে একবার মস্ত বড়ো আকাশটাকে দেখি।’
🍂
রোরোর সঙ্গে অন্য ছেলেমেয়েরাও স্যারের কথা মন দিয়ে শুনছিল। ডি-সেকশানের রুচিকা গুপ্ত, সে গল্পের আস্ত পোকা। রুচিকা বায়না করল, ‘স্যার, আমরা আজ ক্রিকেট কোচিংয়ের পর স্কুলের চাতালে গিয়ে বসব। আপনি আমাদের অমন গা ছমছমে একটা গল্প শোনাবেন?’
স্যার বললেন, ‘ওসব গল্প একদিন শুধুমাত্র গল্পের পিরিয়ডে তোমাদের শোনাব, এই কথা দিলাম। ক্রিকেট কোচিংয়ের পর তোমাদের বাড়ি ফিরতে হবে না?’
এইমাত্র আকাশ দেখতে গিয়ে দেবপমস্যার ঠিক দেখতে পেয়ে গেলেন, রাস্তায় সাইকেল থেকে নামছেন মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি। সঙ্গে-সঙ্গে খেলা থামিয়ে দেবপমস্যার হাতছানি দিয়ে ডাকলেন ক্লাস এইট এ-সেকশনের রোরো মজুমদারকে। রোরো দাঁড়িয়েছিল দর্শকদের মধ্যে। স্যারের ডাকে সঙ্গে-সঙ্গে ছুটে এল। তখনই দেবোপমস্যার গলা তুলে বললেন, ‘রোরো, ওদিকে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, সাইকেল নিয়ে কে দাঁড়িয়ে আছেন? যাও, যাও! শিগগির ওঁকে মাঠে ডেকে নিয়ে এসো।’
তক্ষুনি রোরো ছুটল রাস্তার দিকে। ততক্ষণে দেবোপমস্যার গলা তুলে ঘন্টিদাদুকে ডাকলেন, ‘ঘন্টিদাদু, ও ঘন্টিদাদু! আপনি স্কুলের অফিস ঘর থেকে তাড়াতাড়ি একটা হাতলওলা বড় চেয়ার এনে হেডস্যারের চেয়ারের পাশে সেট করে দিন তো! দেখছেন না, হঠাৎই মুকুলকৃষ্ণবাবু আমাদের ক্রিকেট কোচিং দেখতে আসছেন।’
মুকুলকৃষ্ণবাবু দেবোপমস্যারকে দেখে বললেন, ‘দেখুন দেবোপম, আমি আপনাদের ক্রিকেট কোচিং দেখতে হঠাৎ চলে এলাম! আমি তো জানতুমই না, আপনি বিকেলে স্কুলের মাঠে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ক্রিকেট কোচিং শুরু করেছেন। এটা একটা খুব সুন্দর অভ্যাস। হঠাৎ এই একটু আগে নবনীতস্যারের সঙ্গে রাস্তায় আমার দেখা হয়ে গেল, তাই! ওঁর মুখ থেকেই তো শুনলাম ক্রিকেট কোচিংয়ের খবরটা। তাই আর না এসে পারলাম না দেবোপম। দাঁড়ান, আগে চেয়ারটায় ভাল করে জমিয়ে বসি। আপনি ফের এখন কোচিং শুরু করুন!’ বলে নতুন আনা চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। হাসতে-হাসতে খেলা শুরু করলেন দেবোপমস্যার।
ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়েছিল সি-সেকশানের জিতিন বসু। উলটো দিকে ক্রিজে দাঁড়িয়ে আছে রকি দেববর্মা। স্যার হাত তুলে বল করতে নির্দেশ দিলেন ডি-সেকশনের সাদিয়াকে। সাদিয়ার জোরে-বোলার হিসেবে নাম আছে। এ কথা ক্লাস এইটের সক্কলে জানে। এতদিনে ক্লাস নাইন-টেনও সাদিয়ার বোলিংয়ের কথা জেনে গেছে। অমন জোরেই বলটা করল সাদিয়া।-বলটা পেয়ে প্রথম বলটাই সপাটে মারল জিতিন। বলটা মেরেই রান নিতে ডাক দিল রকি দেববর্মাকে। নিজে উলটো ওদিকের উইকেটের দিকে দৌড়ল জিতিন। ওদিক থেকে ছুটে এদিকের উইকেট ছুঁয়ে ফের ওদিকে ছুটল রকি। সহজেই দুটো রান তুলে নিল জিতিনরা।
জিতিনকে দেখে মনে হচ্ছিল, আজ যেন অনেক রান তুলবে বলেই সে মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করে ক্রিজে নেমেছে।
ওকে খুব সহজে দুটো রান তুলে নিতে দেখে মুকুলকৃষ্ণবাবু বলে উঠলেন, ‘এরকম টুকটুক করে রান তুলতেন রাহূল দ্রাবিড়। অথছ, স্লো বাট স্টেডি! আমি একটা বই পড়েছিলাম, বইটার নাম ‘দ্য নাইস গাই হু ফিনিশড ফার্স্ট’। এই গল্পটি হল রাহুল দ্রাবিড়ের অসাধারণ গল্প।’
সাদিয়ার তিন ওভার বল শেষ হতে-হতে ততক্ষণে পঞ্চায়েত অফিসের কাজ সেরে মাঠে ফিরে এলেন হেডস্যার। মুকুলকৃষ্ণবাবুর পাশের চেয়ারটায় বসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মুকুলকৃষ্ণবাবু, কেমন দেখছেন দেবোপমের ক্রিকেট কোচিং?’
‘আগামী দিনে আপনার গগনজ্যোতি স্কুল থেকে টিম-ইন্ডিয়ার দু’-একজন ক্রিকেটার উঠে আসবে, এমন কথা এদের ক্রিকেটের প্র্যাকটিস দেখে আমি আজই বলে দিচ্ছি। এরা এত ভাল বল করে এবং এত চমৎকার ব্যাট করে, আমি নিজের চোখে দেখে অবাক হয়ে গেছি!’
মুকুলকৃষ্ণবাবু তাঁর চেয়ারটা হেডস্যারের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন সড়াৎ করে। এখন তাঁর গলায় বেশ উত্তেজনা ঝরে পড়ল। তিনি বলে উঠলেন, ‘জানেন হেডস্যার, তেমন হলে আমরা স্কুলের বাইরে স্কুল-ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু করে দিতে পারি। আপনি সায় দিলে আমি...’
হেডস্যার বললেন, ‘কাজটা বেশ কঠিন! যদিও আমরা আপনাকে ক্রিকেটের কাজে ফুলটাইম পেতে পারি।’
মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘আমি ক্রিকেটের ব্যাপারে অন্তহীন পরিশ্রম করতে রাজি আছি নবনীতস্যার। একদিন আমাদের জেলাশাসককের কাছে গিয়ে প্রস্তাবটা প্লেসও করতে পারি—যদি স্কুল লেভেল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু করা যায় আমাদের নবীনগঞ্জ জেলার স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। শুনেছি, আমাদের জেলাশাসক নাকি অনূর্ধ ১৪ ক্রিকেট দলে খেলেছেন?’
হেডস্যার বললেন, ‘আমি অবশ্য জেলাশাসকের খেলার খবর জানি না। তবে মুকুলকৃষ্ণবাবু একটা কথা বলি, স্কুল লেভেলের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট অ্যারেঞ্জ করার ঝক্কি আছে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ক্ষতি হতে পারে ভেবে অভিভাবকরা অমত করতেও পারেন। জানেনই তো, আজকাল পড়াশোনা কত টাফ হয়ে উঠছে দিনদিন? ওদিকে সি-বি-এস-সি এবং আই-সি-এস-সি বোর্ডের স্টুডেন্টরা কেমন চোখ ঝলমলে রেজাল্ট করছে খেয়াল করে দেখেছেন? তাদের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাদের ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ডের স্টুডেন্টদের আরও বেশি মন দিয়ে পড়তে হবে। এখন ওদের সামনে ক্রিকেট নামের লোভনীয় চকোলেট দৌড় ঝুলিয়ে রাখা ঠিক হবে না।’
‘দেখুন নবনীতস্যার, সচিন তেন্ডুলকর, বিরাট কোহলি, মহেন্দ্র সিং ধোনিদের পড়াশোনা কতদূর আর এগিয়েছিল জানেন কি? সচিন তেন্ডুলকরের কথাই বলি। তিনি প্রথমে বান্দ্রার ইন্ডিয়ান এডুকেশন সোসাইটির নিউ ইংলিশ স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। তারপর সচিনের দাদা অজিত তেন্ডুলকরের পরামর্শে মুম্বইয়ের দাদারের সারদাশ্রম বিদ্যামন্দির উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল সচিনকে। সচিন অবশ্য কিছুদিনের জন্য কীর্তি কলেজেও পড়াশোনা করেছেন। তাঁর লেখাপড়া তো ক্লাস টেন পর্যন্ত? তবু তো তিনি ক্রিকেটে আমাদের দেশকে উঁচু আসনে বসিয়েছেন?’ একটু থেমে মুকুলকৃষ্ণবাবু বললান, ‘আমাদের বিরাট কোহলির কথাই বলুন না! বিরাট কোহলি তো দিল্লির পশ্চিম বিহারের বিশাল ভারতী পাবলিক স্কুলে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর, ক্রিকেটে মন দেওয়ার জন্য তিনি পশ্চিম বিহারের সেভিয়র কনভেন্ট স্কুলে গিয়ে ভরতি হন। ওই স্কুল থেকেই হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেন।’ আর বেশি দূর তাঁর পড়াই হয়নি!’
হেডস্যার হঠাৎ হাততালি দিয়ে বলে উঠলেন, ‘বাঃ! জিতিন কীভাবে বলটা মারল দেখলেন? কেমন একটা গ্যালারি-ছক্কা মারল? যে ছক্কা গ্যালারির উপর দিয়ে গিয়ে মাঝ গ্যালারিতে পড়ে, তাকে আমি বলি ‘গ্যালারি ছক্কা’! হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, আপনি তো মশাই ক্রিকেটারদের বড়ো হয়ে ওঠার অনেক গল্প জানেন দেখছি! আপনাকে একদিন স্কুলে শুধুই ক্রিকেটের গল্প বলতে আমন্ত্রণ জানাব। আপনি ছেলেমেয়েদের মনে বড় হয়ে ওঠার বীজমন্ত্র রোপণ করে দেবেন।’
মুকুলকৃষ্ণবাবুর মুখে আত্মতৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ল। হাসতে-হাসতে বললেন, ‘আপনি সুরেশ রায়নার কথাই বলুন না। তিনি লখনউয়ের গুরু গোবিন্দ সিং স্পোর্টস কলেজ পড়াশোনা করেছেন। উত্তর প্রদেশের মুরাদনগরের বাসিন্দা ছিলেন সুরেশ। ক্রিকেট খেলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, এই ভেবে লখনউয়ের স্পোর্টস কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বোর্ডিং স্কুলে থেকে পড়াশোনা করেছেন। তবে তাঁর জীবন কি আটকে গিয়েছে? আপনাকে এমন অনেক উদাহরণ দেখাতে পারি।
আমাদের ভারতীয় ক্রিকেটের একগুচ্ছ ক্রিকেটারের নাম এক্ষুনি বলে দিতে পারি, তাঁরা ক্রিকেটের টানে তাঁদের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। সচিন তেন্ডুলকরের কথা তো আগেই বলেছি। হার্দিক পান্ডিয়া ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছেন। জাহির খান ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ড্রপআউট, রাহুল দ্রাবিড় এম বি এ কমপ্লিট করেননি। মহেন্দ্র সিংহ ধোনি স্নাতক পাশ করেননি।’ আনন্দে গদগদ কণ্ঠে মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘কেন আমাদের প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ এনে দেওয়া কপিলদেব নিখাঞ্জ তো ছিলেন কলেজের ড্রপআউট। কিন্তু তাতে কী? কপিলদেব তো আমাদের বিশ্বকাপের স্বাদ পেতে শিখিয়েছেন?’
হেডস্যার দু’ হাত তুলে মুকুলকৃষ্ণবাবুকে নমস্কার করে বললেন, ‘নাঃ! এখন দেখছি আপনি ক্রিকেট নিয়ে কলকাতার মাটি আঁকড়ে এমনি-এমনি পড়ে থাকেননি! সত্যিই ক্রিকেট ছিল আপনার ধ্যানজ্ঞান!’
ওদিকে বিকেল গড়িয়ে আসছিল আকাশে। দেবোপমস্যার এগিয়ে এসে হেডস্যারের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘স্যার, এবার ক্রিকেট কোচিংয়ে ছুটি দিয়ে দিই? সন্ধে নামতে তো আর বেশি দেরি নেই?’
হেডস্যার আকাশের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফিরবে তো?’ তারপর দেবোপমস্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের জিতিনকে কি সাদিয়া আউট করতে পারল? জিতিনের রান উঠল কত?’
দেবোপমস্যার বললেন, ‘জিতিন আজ নট আউট থেকে গেল স্যার। জিতিন রান করেছে সতেরো।’
মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘তবে জিতিন ছেলেটার স্ট্রাইক রেট ভাল।’
দেবোপমস্যার কোচিংয়ে ছুটি ঘোষণা করে দিলেন। এমন সময় হেডস্যার ঘন্টিদাদুকে ডেকে বললেন, ‘আমরা মুকুলকৃষ্ণস্যারকে নিয়ে স্কুলের অফিসে বসছি! তুমি সব গোছগাছ করে আমাদের এককাপ করে চা খাইয়ে দিও!’
দেবোপমস্যার ক্রিকেট বলের ব্যাগটা নিয়ে দোলাতে দোলাতে হেডস্যারের পিছন-পিছন স্কুলের অফিসের দিকে চললেন। ততক্ষণে আকাশ জুড়ে মস্ত বড়ো গোল চাঁদ উঠে পড়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মুকুলকৃষ্ণবাবু বলে উঠলেন, ‘পূর্ণিমার আর দেরি নেই। দেখুন নবনীতস্যার, কত বড়ো চাঁদ উঠেছে কর্পূর গাছের মাথা ছাড়িয়ে?’
মিনিট খানেকের জন্যে হেডস্যার থমকে গেলেন আকাশের দিকে তাকিয়ে। অন্য স্যার এবং ম্যামরা সকলে বাড়ির পথ ধরলেন। হেডস্যার সকলের উদ্দেশে পিছন থেকে বললেন, ‘আপনারা বাড়ি রওনা হয়ে যান, আপত্তি নেই! কিন্তু অমন চাঁদটাকে মিস করবেন না!’
(এর পর এগারো নম্বর পর্ব)
শ্রীজা মাইতি
দশম শ্রেণি, নারায়ণা স্কুল, হলদিয়া, পূর্ব মেদিনীপুর
পেট পাতলা মেয়ে
অনন্যা মন্ডল
ষষ্ঠ শ্রেণি, পিএমশ্রী জওহর নবোদয় বিদ্যালয়, পশ্চিম মেদিনীপুর
পেট পাতলা মেয়ে
নামটি তার মিষ্টু।
কাজে কর্ম - ভাল নয়
কথার ধরণ - ঠিক নয়।
কোনো কথা যদি আসে কানে তার
বিপদ হবে, তোমার আমার সব্বার;
কথা যাবে সাত সমুদ্দুর পার।
দেওয়ালেরও কান থাকে
তাতে বিপদ নেই তোমার, কিন্তু
সে শুনলে কথা
মুক্তি নেই আর।
বলি তাই সাবধান হও ভাই
কাছ হতে তার
মিষ্টু নামটি যার।
পাঠপ্রতিক্রিয়া
আলোচক - তারকনাথ মুখোপাধ্যায়
' জ্বলদর্চি ' পত্রিকার ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১৯৩-এ ঋপণ আর্য-র তোলা রঙ-বেরঙের আবিরের থালা হাতে ছোটো ছোটো মেয়েদের মিষ্টি ছবিখানা শুরুতেই মন কেড়ে নিল। ওদের চোখের ভাষাই বুঝিয়ে দিল, দোল এসে গেছে। পত্রিকার সম্পাদিকা মৌসুমী ঘোষের সম্পাদকীয় যেন তারই নান্দীপাঠ। রতনতনু ঘাটী-র ' দোলের মাস ' গদ্যে দেখলাম, দোয়েলকে ডেকে প্রজাপতি বলল --- ও দোয়েলদাদা শোনো, রঙ মাখাব তো আজকেই একথা জানতে নাকি? তাই শুনে লাফিয়ে উঠল দোয়েল, গাঁদা আর দোপাটিকে খবর পাঠাতে বলল। রঙ খেলা নিয়ে ফুল-পাখি-প্রজাপতিদের মধ্যে শুরু হল সাজোসাজো রব। তারই অনুরণন বেজে উঠল অনুরণনের আঁকা ছবিতে। লাল-হলুদ-সবুজ রঙের ছোঁয়া পেয়ে সবজিরা যেন জীবন্ত। প্রতাপ সিংহ-র ' বসন্ত এসে গেছে ' ছড়াতেও সেই রঙের ছোঁয়া :
বসন্ত এসে গেছে
বোলপুর যাচ্ছি,
পায়ে চলা পথটায়
লাল রং পাচ্ছি।
সারাটা পত্রিকা জুড়ে রঙের উৎসব।
তার মধ্যে একটু স্বাদবদল ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়া পার্থ মণ্ডল-এর লেখা ' বন্ধু আমার ' ছড়াখানা। পড়ে বেশ মজা লাগল। পাশাপাশি ভালো লাগল রতনতনু ঘাটী-র ধারাবাহিক উপন্যাস ' গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ ' ( পর্ব ৯ ) প'ড়ে। ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় দেবোপম স্যারের মহাভারত ( দ্রুপদের রাজসভায় অজুর্নের লক্ষ্যভেদ ) -এর অনুষঙ্গ টেনে আনা মন ছুঁয়ে গেল।
0 Comments