দক্ষিণেশ্বর - আদতে শিবক্ষেত্র (বাণ রাজার স্থাপিত মন্দির)/ প্রসূন কাঞ্জিলাল

দক্ষিণেশ্বর - আদতে শিবক্ষেত্র (বাণ রাজার স্থাপিত মন্দির) 

প্রসূন কাঞ্জিলাল


সমগ্র বিশ্ববাসী দক্ষিণেশ্বরকে রানী রাসমনির মন্দির বা শ্রীরামকৃষ্ণের সিদ্ধপীঠ রূপেই চেনে। কিন্তু দক্ষিণেশ্বর নামটি ভবতারিণী মায়ের নামে নয়, এ নাম স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেবের। রাসমনির মন্দির স্থাপনার বহু আগে থেকেই দক্ষিণেশ্বর নামটি রয়েছে। 

নিগমকল্প পীঠমালা অনুসারে 'দক্ষিনেশ্বর থেকে বহুলা', এই দুই যোজন বিস্তৃত ধনুক আঁকা কালীক্ষেত্র।  ত্রিকোণাকৃতি ক্ষেত্র, তার এক কোণে মহাদেব দক্ষিণেশ্বর ও মধ্যস্থলে কালীঘাটের মহাকালী। এক যোজন বলতে বোঝায় 12 থেকে 14 কিলোমিটার। তাই দুই যোজন হল মোটামুটি 24-25 কিলোমিটার। আজকের বিচারে আমরা ভাবতে বসলে দেখি দক্ষিনেশ্বর থেকে বেহালা হলো ঠিক 23 কিলোমিটার অর্থাৎ নিগমকল্প পীঠমালা অনুসারে যে দু যোজন বলা আছে সেটি প্রায় হুবহু মিলে যায়। 

তাহলে একদিকে যদি দক্ষিণেশ্বর হলে অপরদিকে বহুলা হলো আজকের বেহালা।

   দক্ষিণেশ্বরে ছিল লোকবিশ্বাস অনুযায়ী বাণ রাজার স্থাপিত শিবলিঙ্গ। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটাই সত্যি। আজকের দক্ষিণেশ্বরের থেকে পায়ে হাটা সামান্য উত্তরে আড়িয়াদহ। এই আড়িয়াদহের অতীত নাম "দেউলপোতা"। দেউলপোতা পশ্চিমবঙ্গে আরো কয়েক জায়গায় রয়েছে। হলদিয়াতে, ডায়মন্ড হারবারে। এই দেউলপোতা নাম থেকে বোঝা যায় কোন অতীত দেউল মাটিতে পোঁতা ছিল। তেমনই একটি দেউল ছিল আড়িয়াদহ তে।

    1896 সালে সরকারি p.w.d. থেকে প্রকাশিত 'লিস্ট অফ এনসিয়েন্ট মনুমেন্টস অফ বেঙ্গল' গ্রন্থে এখানে এক প্রাচীন মন্দিরের কথা জানা যায়। এ বইটি প্রকাশিত হওয়ার প্রায় 200 বছর আগেই গঙ্গার তীরে এক জঙ্গলের মধ্যে ছিল এক ভগ্ন মন্দির।

 অন্যান্য শিব মন্দির-এর মতই এই মন্দিরের কাহিনিও ছিল, এক গাভী সেই জঙ্গলের মন্দিরে এসে দুগ্ধ ক্ষরণ করে যেত। 1700 সাল নাগাদ এক ব্রাহ্মণ স্বপ্নাদেশ পেলেন। গরিব ব্রাহ্মণ স্থানীয় জমিদার সুদ্ধরাম ঘোষালকে জানালেন তার স্বপ্নের কথা। জমিদারের নির্দেশে 1708 সালে তার ভাই দেওয়ান হরনাথ ঘোষাল এই বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করলেন। সে মন্দির ও পরবর্তীকালে সংস্কার করা হয়েছে।

   বর্তমানে আড়িয়াদহ লঞ্চ ঘাটের পাশেই রয়েছে সেই বাণ রাজার নামাঙ্কিত শিব মন্দিরটি। লোকে বলে "দক্ষিণেশ্বর বুড়োশিব"। 

বাণ রাজার কাহিনী ভারতবর্ষের বহু জায়গায় ছড়িয়ে। নিদেনপক্ষে দিনাজপুরে বাণ রাজার বাণগড়ের কথা প্রত্নতাত্ত্বিকেরা স্বীকার করে নিয়েছেন। সে রাজার রাজত্বের দক্ষিণ সীমানা সম্ভবত এই কালী ক্ষেত্র। 'দক্ষিণের ঈশ্বর' তাই নাম দক্ষিণেশ্বর। তান্ত্রিকরা কালীঘাটের কালী ক্ষেত্রের উত্তর সীমানা এই দক্ষিণেশ্বর মেনে নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণের কারণে দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী কালী মায়ের জন্য বিখ্যাত হয়ে যায়।  বাণ রাজার শিব মন্দির মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়।

  রয়ে গিয়েছে কেবল লোকবিশ্বাস। 1700 সালে পাওয়া জঙ্গলে ভগ্ন মন্দিরটি অন্তত কয়েক শো বছরের পুরানো তো বটেই ছিল। বাণ রাজা না হলেও এই শিবলিঙ্গ যে বহু প্রাচীন তা নিয়ে সন্দেহ নেই অবশ্য।।

।।  দক্ষিণেশ্বরী -- মা ভবতারিণী  ।। 

১৮৪৭ সালে রানি রাসমণির একবার বাসনা হয় বিশ্বেশ্বর-অন্নপূর্ণা দর্শনের জন্য কাশী যাবার। কিন্তু যাত্রার আগের দিন রাত্রে তিনি স্বপ্নে দেবীর কাছ থেকে কাশী যাত্রার নিষেধাজ্ঞা পেয়ে গঙ্গা তীরেই দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা ও অন্নভোগ দেবার নির্দেশ পান। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী রানি রাসমণি তাঁর কাশী যাত্রা স্থগিত রেখে গঙ্গার তীরে মা কালীর মন্দির নির্মাণ কার্যে অবতীর্ণ হন।

প্রথমে বারাণসী তুল্য গঙ্গার পশ্চিম তীরে মন্দির নির্মাণের জন্য উপযুক্ত স্থানের সন্ধানে উত্তরপাড়া এবং বালি প্রভৃতি অঞ্চলে জমি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই অঞ্চলের জমি না পাওয়াতে অগত্যা রানি রাসমণি গঙ্গার পূর্বতীর দক্ষিণেশ্বর গ্রামেই একটি বিশাল উদ্যানবাটি সহ জমি ক্রয় করেন। জমি ক্রয় থেকে শুরু করে মন্দির প্রতিষ্ঠার যাবতীয় কর্মে রানি রাসমণিকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছিলেন তাঁর তৃতীয় জামাতা মথুরামোহন বিশ্বাস। সকল কর্ম শেষ হবার পর রানি যখন উপযুক্ত দিনে মন্দির প্রতিষ্ঠা ও দেবীকে অন্নভোগ দিতে সচেষ্ট তখনই এল আর এক বাধা।

 রানি কৈবর্ত্য হওয়ায় সে সময়ের সমাজের প্রথা অনুযায়ী কোনও ব্রাহ্মণই এমনকি রানির নিজের গুরু বা পুরোহিতও এই মন্দির প্রতিষ্ঠা বা দেবীকে অন্নভোগ দিতে রাজি হলেন না। সে সময় বাধ্য হয়ে রানি রাসমণি বিভিন্ন চতুষ্পাঠীর পণ্ডিতদের কাছে এ বিষয়ে শাস্ত্র অনুযায়ী বিধান চাইলেন। তখন একমাত্র কলকাতার ঝামাপুকুর চতুষ্পাঠীর পণ্ডিত রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে বিধান এল যে প্রতিষ্ঠার আগে যদি কোনও ব্রাহ্মণকে ওই মন্দির দান করা যায় এবং সেই ব্রাহ্মণ যদি ওই মন্দিরে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করে অন্নভোগের ব্যবস্থা করেন তাহলে সে কাজ অশাস্ত্রীয় বলে গণ্য হবে না। এই উচ্চকোটি মাতৃসাধক রামকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। সেসময় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ তথা গদাধরও ঝামাপুকুরে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গে বাস করতেন।

রানি রাসমণি উদারমতালম্বী ব্রাহ্মণ পণ্ডিত রামকুমারকেই এই দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ জানালে বাইরের সমস্ত বাধা তুচ্ছজ্ঞান করে অন্তরের নির্দেশে রামকুমার এই কর্মে ব্রতী হয়ে কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীরামকৃষ্ণকে (সে সময়ের গদাধর) নিয়ে ঝামাপুকুর থেকে দক্ষিণেশ্বরে চলে এসে রানি রাসমণির ইচ্ছানুসারে ১৮৫৫ সালের ৩১শে মে (বাংলা ১২৬২ সালের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ), বৃহস্পতিবার স্নানযাত্রার পুণ্য দিনে মন্দির প্রতিষ্ঠার পুণ্য কাজ সমাধা করেন। প্রতিষ্ঠিত হল দক্ষিণেশ্বরের জগৎ বিখ্যাত কালীমন্দির যা 'মা ভবতারিণী মন্দির' রূপেই জগতে পরিচিত।

মন্দিরপ্রাঙ্গণের পশ্চিমদিকে বারোটা শিবমন্দির। প্রতিটি মন্দির পূর্বমুখী। প্রতিটি শিবলিঙ্গের আলাদা আলাদা নাম। গঙ্গার দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডানদিকে ছটি মন্দির, বাঁদিকে ছটি। একদিকে অবস্থান করছেন যোগেশ্বর, যত্নেশ্বর, জটিলেশ্বর, নকুলেশ্বর, নাকেশ্বর আর নির্জরেশ্বর। অন্যদিকে যজ্ঞেশ্বর, জলেশ্বর, নাগেশ্বর, নন্দীশ্বর, নরেশ্বর এবং জগদীশ্বরী কালীর ভৈরব জগদীশ্বর। এখানে নিত্যপূজার বন্দোবস্ত। নিত্য নৈবেদ্য নিবেদন। কিন্তু বছরে একদিনই লুচি নিবেদন করা হয় শিবশম্ভুকে স্নানযাত্রার তিথিতে অর্থাৎ মন্দির প্রতিষ্ঠার তিথিতে।

শিব আর শক্তির মন্দিরের পাশাপাশি রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের কথাও ভেবেছিলেন রানি। মন্দিরপ্রাঙ্গণের পশ্চিমদিকে বিষ্ণুমন্দির। সেখানে অধিষ্ঠিত রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। পশ্চিমমুখো এই মন্দিরের শ্রীকৃষ্ণর নাম রাধাকান্ত আর রাধারানির পরিচয় নিস্তারিণী নামে।

মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন কালীপূজার দায়িত্ব যেমন নিয়েছিলেন রামকুমার তেমনই রাধাকৃষ্ণ পূজার দায়িত্বে ছিলেন ক্ষেত্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। ইনি রানি রাসমণির কর্মচারী মহেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দাদা। পরবর্তীকালে এই রাধাগোবিন্দ মন্দিরের পুরোহিত হিসেবেই দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে পূজারী হিসেবে প্রথম কাজ পান শ্রীরামকৃষ্ণ। তখনও তিনি গদাধর।

দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দেবীর আসল নাম ‘জগদীশ্বরী’। রানি রাসমণির গুরু উমাচরণ ভট্টাচার্য্য ভবতারিণীর সাধনা করেছিলেন এবং তিনি তাঁর আরাধ্যা দেবীর নামে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরাধিষ্ঠাত্রী দেবীর নামকরণ করেছিলেন ‘ভবতারিণী’। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এই নামটি রক্ষা করেছিলেন।

কালো ধূসর আগ্নেয়শিলা ব্যাসল্ট পাথর দিয়ে তৈরি কালী। চতুর্ভুজা দেবীমূর্তির উচ্চতা তিন ফুটেরও কম, সাড়ে তেত্রিশ ইঞ্চি। প্রচলিত কালীমূর্তির মতোই দেবীর গলায় মুণ্ডমালা। কিন্তু কোমরে কাটা হাত গেঁথে তৈরি কটিবন্ধনী নেই। দেবী শায়িত শিবের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। শিবের মূর্তিটি সাদা মার্বেল পাথরের।

১৮৫৫ সালে রানি রাসমণির ইচ্ছায় কাটোয়ার দাঁইহাটের নবীন ভাস্কর দেবীর মূর্তি তৈরি করেছিলেন। কোলকাতায় গিয়ে মাসাধিকাল ধরে হবিষান্ন খেয়ে নিষ্ঠা সহকারে মূর্তি তৈরির কাজ শেষ হলে, রাণী রাসমণির মন হল দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের গর্ভ গৃহের মাপে মূর্তি বেমানান হচ্ছে। রাণী ফের নবীন ভাস্কর কে আর একটু বড়ো করে মূর্তি তৈরীর বরাত দেন।

নবীন ভাস্কর মোট তিনটি মায়ের মূর্তি তৈরী করেন। তিনি পুনর্বার যে মূর্তিটি তিনি তৈরী করেন, সেটি রাণীর খুবই পছন্দ হয়। সেটিই ভবতারিণী কালী বলে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে পূজিতা এবং জগৎ বিখ্যাত হন।

ভবতারিণীর দু'বোন কৃপাময়ী ও ব্রহ্মময়ী। একই কোষ্ঠীপাথর থেকে তৈরি হয়েছিল ভবতারিণী, কৃপাময়ী আর ব্রহ্মময়ীর বিগ্রহ। সর্বপ্রথম তৈরি হয় মা কৃপাময়ীর মূর্তি। এরপর তৈরি হয় মা ব্রহ্মময়ী ও মা ভবতারিণীর বিগ্রহ।

প্রসঙ্গত এখানে বড় ছোটর হিসাব করা হয় বিগ্রহের উচ্চতার বিচারে। সেই অনুযায়ী ভবতারিণীর মূর্তি সবথেকে বড়। তাই সে বড় বোন। মেজ হলেন মা কৃপাময়ী ও ছোট বোন ব্রহ্মময়ী। এই তিন দেবী মূর্তির এই নামকরণও করেন একই মানুষ। তিনি স্বয়ং ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব।
 
ভবতারিণী, কৃপাময়ী আর ব্রহ্মময়ী থাকেন বরাহনগরে। তিন বোনের বাড়িও একদম পাশাপাশি। ভবতারিণী আর কৃপাময়ীর বাস নদীর পারে। আর ব্রহ্মময়ী থাকেন কৃপাময়ীর থেকে ঠিক দশ মিনিট পায়ে হাঁটাপথ দূরে। ভবতারিণী হলেন দক্ষিণেশ্বরের কালী, কৃপাময়ী হলেন বরাহনগরের জয় নারায়ণ মিত্রর মন্দিরের কালী এবং ব্রহ্মময়ী হলেন কাশীপুরের প্রামানিক ঘাট রোডের কালী।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি