মাটিমাখা মহাপ্রাণ। ঊনত্রিশ /শুভঙ্কর দাস

মাটিমাখা মহাপ্রাণ। ঊনত্রিশ 

শুভঙ্কর দাস 

"সমুখে শান্তিপারাবার
ভাসাও তরণী হে কর্ণধার। 
তুমি হবে চিরসাথী 
লও লও হে ক্রোড় পাতি
অসীমের পথে জ্বলিবে 
জ্যোতি ধ্রুবতারকার...।"


আলিপুরের সেই বিখ্যাত বোম-মামলা শোনা আছে 
তো?

হ্যাঁ,তখন আমি কলকাতায় ছিলাম।

দেশব্যাপী বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রে মুরারিপুকুর বাগান থেকে ধরা হল বারীন ঘোষ,উল্লাসকর দত্ত,উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ ছাব্বিশ জন বিপ্লবী যুবককে, অরবিন্দ ঘোষকে ধরা হল গ্রে স্ট্রিট থেকে।

হ্যাঁ,সেই সময় নামগুলো শুনেছিলাম। যুগান্তর কাগজেও পড়েছিলাম,সেই মামলা লড়েছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ তাই তো?

হ্যাঁ,কিন্তু কী জানো কুমার,এই মামলা প্রথমে পেয়েছিলেন ব্যোমকেশ চক্রবর্তী। অরবিন্দ ঘোষের শ্বশুর তাঁকে যুক্ত করেন।কিন্তু সেই উকিলের এতো মোটা ফিজস যে,মামলা চালানোই দায় হল।কিছুদিন মামলা চালিয়ে ব্যোমকেশ চক্রবর্তী সরে গেলেন।

তারপর?

তখন এলেন চিত্তবাবু, ভাবতে পারো, তিনি এই মামলা লড়ার জন্য একটি টাকাও নেননি! 

বীরেনদা,যত শুনছি,চিত্তরঞ্জন দাশের প্রতি মাথা নত হয়ে যাচ্ছে, তারপর শুনলাম,চিত্তরঞ্জন সাহসের সঙ্গে লড়াই করে ইংরেজ বিচারক বিচক্রফটকে নাস্তানাবুদ করে দেন।জয়লাভও করেন।

আরে শোন, শোনো,এতো বাইরের ঘটনা মাত্র, আদালতে কাজ করার সুবিধার্থে আমি এবার তোমাকে ভেতরের কাহিনি শোনাচ্ছি... 

সেদিন অপরাহ্ন মেদিনীপুরের দুই দেশসেবক সন্তান বীরেন্দ্রনাথ ও কুমারচন্দ্র আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের পথরেখা খুঁজে নিচ্ছেন। 

সে এক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বলা যায়।একদিকে ইংরেজের দুঁদে উকিল, অন্যদিকে চিত্তরঞ্জন দাশ।চিত্তরঞ্জন একটার পর একটা ব্যাখ্যা এমনভাবে দিতে থাকেন যে,বাঘা বাঘা ইংরেজ উকিল সামনে টিকতে পারছেন না! তোমাকে কী বলব কুমার,সেই আদালতের বাকযুদ্ধ দেখার জন্য লোক একেবারে ভেঙে পড়ত।হঠাৎ ইংরেজ উকিল একটি চিঠি আবিষ্কার করে আদালতে পেশ করে।সেই চিঠিটি নাকি বারীন লিখেছিলেন দাদা অরবিন্দ ঘোষকে।চিঠিটির বয়ান এইরকম,

"Dear brother

Well must have sweets all over India, ready made for imergency. I wait for your answers.

Yours Barindra kr Ghosh 

এই চিঠিটি অরবিন্দ ঘোষকে জেলের ঘানি টানাতে পারবে বেশ কয়েক বছর।কারণ এই চিঠিতে Sweets শব্দটার আসল মানে করা হয়েছিল 'বোম।'অর্থাৎ ঐ চিঠির মাধ্যমে কোনো এক ভয়ানক কাণ্ড ঘটানোর ইঙ্গিত করা হয়েছে। 
সকলে বুঝলেন,যাঃ এই মামলা লড়াই করা কঠিন হয়ে গেল। ভেঙে পড়লেন সকলে।প্রায় সকলেই ধরে নিলেন জেলের হাত থেকে অরবিন্দকে কেউ বাঁচাতে পারবে না!
সেই সময় কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাশ অবিচল। তিনি চিঠিটি নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চালালেন পর্যবেক্ষণ, গবেষণা এবং যুক্তিবোধ।
পরেরদিন আদালতে মামলা চলাকালীন তাঁর মুখে মৃদু হাসি দেখা গেল।তিনি শুনানির সময় চিঠি নিয়ে যুক্তির বোমা ফাটালেন।
চিৎকার করে বললেন,এই চিঠিটি জাল এবং এটি পুলিশের কারসাজি। 
একথায় আদালতসহ সকলেই বিস্মিত। 

জালচিঠি!

পুলিশের এতো বড় ভুল হতে পারে? এইরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলায়! 
চিঠিটি যে জাল, তার প্রমাণ কোথায়?
তখন চিত্তরঞ্জন দৃঢ়চিত্তে এমন যুক্তি উপস্থাপন করলেন,যাতে ইংরেজরাজসরকারের আদালত পর্যন্ত চমকে উঠলেন, 

এক।চিঠির তারিখ অনুযায়ী অরবিন্দ ও বারীন্দ্র দু'জনেই সুরাটে ছিলেন,একই জায়গায়,তাহলে এই রকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুখোমুখি কথা না বলে চিঠি লিখলেন কেন?

দুই।বারীন্দ্র যে সেই সময় সুরাটে ছিলেন,এমন কোনো তথ্য সরকার পক্ষের উকিল দিতে পারেননি। 

তিন।বারীন্দ্র সবসময় অরবিন্দকে 'সেজদা' বলে সম্বোধন করেন,তাহলে চিঠিতে 'ডিয়ার ব্রাদার' বলে লিখলেন কেন?

চার।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই মারাত্মক চিঠি অরবিন্দ কেন বোকার মতো সঙ্গে রেখে দেবেন? পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য তিনি সুরাট,বোম্বাই এবং পরে কলকাতায় নিয়ে আসেন!একথা কেউ বিশ্বাস করবে!

পাঁচ। একথা আদালতে প্রমাণিত,বারীন্দ্র ঘোষ একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ।তিনি তাহলে এমারজেন্সির বানানে 'ই' না লিখে 'আই' লেখার মতো ভুল করবেন কেন? এটা নিশ্চিত কোনো অশিক্ষিত পুলিশ কর্মচারীর কীর্তি। 

এইসব যুক্তির পর সেদিন আদালতে চিত্তরঞ্জন এমন বক্তব্য রাখেন,যা সকলকে ছুঁয়ে যায়।সেইসব কথা আদালত ছাড়িয়ে বাইরে মানুষের অন্তরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তিনি কম্বুকণ্ঠে বলে ওঠেন,"If it is suggested that I preached that ideal of freedom to my Country Which is against law,I plead guilty to the charge"
যদি এখানে সেটাই আইন হয়, তাহলে স্বীকার করছি আমি দোষী। আদালত আমাকে শাস্তি দিক সেই অপরাধের জন্য। কিন্তু আমার প্রকৃতিবিরুদ্ধ কোনও অপরাধের বোঝা আমার ওপর চাপিয়ে আমাকে যেন ফাঁসানো না হয়।যদি স্বাধীনতার আদর্শ প্রচার করা অপরাধ হয়,তাহলে স্বীকার করছি আমি অপরাধী। "

এতটা বলার পর বীরেন্দ্রনাথ বলে উঠলেন,বুঝলে কুমার, এটাই আমাদের লক্ষ্য স্বাধীনতার আদর্শ। শুধু দেশ স্বাধীন করলে হবে না,আমাদের এমন আদর্শ স্থাপন করতে যাতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশ ও দেশের মানুষ সঠিক পথে চালিত হতে পারে।

কুমারচন্দ্রের চোখ আলোয় ভরে গেল।
সত্যি তো! দেশ সত্যিকারের স্বাধীন করতে হবে,এমনভাবে স্বাধীন হবে যাতে দেশের মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে,সসম্মানে ও যোগ্যতায়।

আরও একটি কথা কুমার,দেশ স্বাধীন মানে কোনো নেতার স্বাধীনতা নয়,তাঁর হাতে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রক্ষমতা নয়, দেশ যে স্বাধীন হবে,তার জন্য অজপাড়াগাঁয়ের সবচেয়ে দরিদ্র ও অসহয় মানুষকে যুক্ত করতে হবে,তার জীবনে পরিবর্তন আনতে হবে।তুমি তো দেখেছ শহুরে নেতাদের মাটিতে খালি পায়ে চলতে ঘৃণা করে,সাধারণ মানুষকে মানুষ বলে জ্ঞান করে না,এদের পথ আমাদের নয়, আমরা সেই মানুষটার কাছে পৌঁছে যাবো,যে জানেই না,দেশ স্বাধীন মানে কী? বুঝেছো?

কুমারচন্দ্র মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

এবার বীরেন্দ্রনাথ এগিয়ে এসে কুমারচন্দ্রকে মেঝে থেকে তুলে একটা তক্তপোশের ওপর বসিয়ে দিলেন।নিজে বসলেন না।কুমারের কাঁধে হাত রেখে বললেন,তুমি জাতীয় বিদ্যালয় চালাতে গিয়ে কী পরিমাণ কৃচ্ছসাধন করছ,তা আমার কাছে সব খবর এসেছে। এটাই আসল কাজ কুমার। যতক্ষণ না দেশের ভবিষ্যৎ সত্যিকারের শিক্ষিত না হয়,ততক্ষণ এই স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই। 

আমি তো আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিন্তু কিছুতেই অভাব মেটাতে পারছি না! মুখ নিচু করে বললেন কুমারচন্দ্র।

টাকার জন্য এতো হন্যে হয়ে ছুটছ কেন? আমাকে তো বলতে পারতে? 

আজ্ঞে, আমার জীবনে আপনি এমন একজন মানুষ, যাঁর কাছে তুচ্ছ এই টাকাপয়সার কথা বলতে সংকোচ হয়।

বাহ্, আর ওদিকে বিদ্যালয়ের বাচ্চাদের অবস্থা অথৈ জলে ফেলে, তুমি কীভাবে নিঃসংকোচে কয়লার গাদায় বসে বসে মার খাচ্ছ? তোমার হাতে তো হীরেমানিক এসেছে, এইসব নতুন নতুন ছাত্রছাত্রী,এদের মানুষের মতো মানুষ করো,এটাই তো স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে পবিত্র কাজ।

সঠিক বলেছেন 

আচ্ছা, আমাকে প্রশ্নের উত্তর দাও,বলেই বীরেন্দ্রনাথ একটি চেয়ার টেনে কুমারচন্দ্রের মুখোমুখি বসলেন।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন,দেশের জন্য তুমি কী করতে চাও?

দেশকে স্বাধীন করা এবং দেশবাসীকে প্রাণমন দিয়ে সেবা করা।সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন কুমারচন্দ্র। 

বেশ,তাহলে এখন কীভাবে বাস্তবোচিত রূপ দিচ্ছ সেই ভাবনার?

অসহযোগ আন্দোলনের জন্য সুতাহাটা বাজারে হরতাল করেছি, বিলাতি কাপড়চোপড় পুড়িয়েছি,তারপর ঘরে ঘরে চরকা চালানোর জন্য অভিযান চালিয়েছি,শুধু জেলে বন্দী করল বলে,না হলে আরও হরতাল করতাম 

বেশ, কিন্তু একটা কথা খুব মন দিয়ে ভেবে দেখো কুমার, এই হরতাল,বিলাতি কাপড়পোড়ানো বা তোমার জেলে যাওয়া,এর কিন্তু আখেরে ক্ষতি আমাদেরই,অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি,তুমি যা করেছ,
ইংরেজ রাজসরকার বর্বরোচিত কাজের বিরুদ্ধে  সঠিক উত্তর, তারপরে ভেবে দেখো,যা হচ্ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত আমাদের ক্ষতি কি না! যে লোকটির দোকান হরতালে সারাদিন বন্ধ ছিল,তার দিনান্তের রোজগার, যাতে তার সংসারের প্রতিপালন হয়,তাদের কী হবে? তুমি যে জেলে বন্দী থাকলে,তার জন্য তোমার পরিবারের দায়িত্ব, তোমার বিদ্যালয়ের পড়াশোনা ও হাতের কাজ শেখানো এবং আমাদের সংগঠনের কাজ যেভাবে ব্যহত হল,তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? ইংরেজ পুলিশ? সমুদ্র পেরিয়ে আসা গোরার দল? জমিদারের দল? কেউ নয়,কেউ নয়। দিনের শেষে এই মাটি,এই দেশের হাতে পড়ে থাকবে শূন্য। 

কুমারচন্দ্র নীরব।অবাক চোখে তিনি বীরেন্দ্রনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।এইসব কথা তাঁকে আলোড়িত করে দিচ্ছে! 

বীরেন্দ্রনাথ আবার বললেন,হ্যাঁ,আমি মানছি,আমিও হরতাল করেছি,বিলাতি কাপড়চোপড় পুড়িয়েছি।কিন্তু এটা জেনো রেখো কুমার, যেদিন হরতাল করেছি, সেদিন সকল সমর্থনকারীর জন্য, তাদের পরিবারের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছি,আগুনে কাপড় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁতিদের দিয়ে যতটা সম্ভব সুতো কেটে দেশি কাপড় বানিয়েছি,এবং যতটা সম্ভব মানুষের ঘরে ঘরে দেশি কাপড় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।মনে রাখবে,এই দেশটা যে স্বাধীন করার চেষ্টা আমরা করছি,তা ইংল্যান্ডের জন্য নয়, কোনো একক নেতার জন্য নয়, অপর কোনো শাসকের জন্য নয়, আমরা আমাদের জন্য দেশ স্বাধীন করছি, কলকাতার ফুটপাতে যে লোকটি অর্ধোলঙ্গ হয়ে দিন কাটায় আবার মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গাঁয়ে যে চাষীটি মহাজনের কাছে সবকিছু খুইয়ে নিজের জমিতে হত্যে দিয়ে পড়ে আছে,তাদের জন্য এই দেশটা স্বাধীন করছি।

কুমারচন্দ্রের চোখের সামনে যেন একের পর এক পর্দা সরে যাচ্ছে...  তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তক্তপোশ থেকে উঠে বীরেন্দ্রনাথকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলে উঠলেন, আপনাকে গড় করি বীরেনদা, এবার বুঝেছি, আপনাকে কেন সবাই মুকুটহীন রাজা বলে!

না,কুমার,আমি রাজা হতে চাই না।আমি এই দেশমাতার অতি সাধারণ সেবক হতে চাই। চিত্তরঞ্জন দাশ কী বলেছেন জানো তো,যে দেশের মানুষের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করতে পারে,সেই প্রকৃত দেশপ্রেমিক। 

সর্বস্ব ত্যাগ!  আপন মনে উচ্চারণ করলেন কুমারচন্দ্র। 

হ্যাঁ,না হলে তুমি এই দেশের স্বাধীনতা আনতে পারবে না, পারবে না বুঝতে একটা পরাধীন দেশ কীভাবে স্বাধীনতার জন্য গঠন করতে হয়! 

অর্থাৎ বীরেনদা,একই সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলন চালাতে হবে,সেই সঙ্গে দেশের মানুষের জন্য সত্যিকারের সহযোগী হতে হবে।

হ্যাঁ,কিন্তু! 

কিন্তু?  প্রশ্ন করলেন কুমারচন্দ্র।

কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন বীরেন্দ্রনাথ। তারপর কুমারচন্দ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, আচ্ছা,কুমার, যদি অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়,তাহলে কী তুমি দেশসেবা বা দেশের জন্য সংগ্রাম বন্ধ করে দেবে?

মানে?

মানে এই,অসহযোগ আন্দোলন গান্ধিজি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

চমকে উঠলেন কুমারচন্দ্র। কেন?  হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত!  গত এক বছর ধরে যেভাবে এই আন্দোলনের আগুন সারাদেশে জ্বলে উঠেছে,তাতে ইংরেজ রাজসরকার বেশ প্যাঁচে পড়েছে,তা এই সময় এই সিদ্ধান্ত! কিন্তু কেন? 

চৌরিচৌরার ঘটনা। ১৯২২ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরের কাছে চৌরিচৌরায় এক ব্যাপক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে।ক্রুদ্ধ জনতা একটি থানা আক্রমণ করে তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়, কয়েকজন পুলিশকর্মচারীর প্রাণ যায়।এই আকস্মিক ঘটনায় গান্ধিজি আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়ে বললেন,দেশের মানুষ এখনও অহিংস অসহযোগের যোগ্য হয়নি!

একটি মাত্র বিক্ষিপ্ত ঘটনার জন্য সামগ্রিক প্রচেষ্টা বানচাল হয়ে গেল! এতো বছরের শ্রম,সাধনা,ত্যাগ সব জলাঞ্জলি!  বেশ হতাশ কণ্ঠে বলে উঠলেন কুমারচন্দ্র।

তাহলে? তুমি কী করবে এখন? তুমি বেকার দেশপ্রেমিক হয়ে গেলে?ভেবে দেখো,এতো উত্তেজনা, স্বার্থত্যাগ,যত ক্ষয়ক্ষতি, সব পণ্ডশ্রম হল।দেশের অধিকাংশ নেতারা হতাশায় নিমজ্জিত হল।স্বরাজ পাওয়ার আশা প্রায় অস্তমিত হল।কেউ কোনো টুঁ শব্দ করলেন না!একমাত্র চিত্তরঞ্জন দাশ প্রতিবাদে ফেটে পড়েন,গান্ধিজিকে বলেন,The proudest government did bend to you,but you mismanaged and bungled it"
তাহলে কুমার, এরপর তোমার হাতে কী থাকল?কী নিয়ে রাস্তায় নামবে?  কী করবে?

কী করব বীরেনদা? 

তাই তো বলছি, যে বিদ্যালয় গঠন আমরা করেছি,তাকে বাঁচাতে হবে, তার জন্য প্রাণপণ করতে হবে।কারণ দেশগঠনের চেয়ে বড় কাজ পরাধীন দেশে আর থাকতে পারে না! তুমি বিদ্যালয় বাঁচাতে যেভাবে মুখের রক্ত তুলছে,সেটাই দরকার।মনে রাখবে সবসময় দেশের মানুষই আমাদের আরাধ্য, আমাদের একমাত্র দেবতা, তাদের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে দিতে হবে।বিবেকানন্দ কী বলেছিলেন,কারও ওপর হুকুম চালাবার চেষ্টা করো না...যে অপরের সেবা করতে পারে,সেই যথার্থ সর্দার হতে পারে।"

তাই করব বীরেনদা,এর জন্য আমি নিজেকে উৎসর্গ করে দেবো,এই আপনার চরণ ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম। আমি জাতীয় বিদ্যালয় কিছুতেই মরতে দেবো না,আমি আজ আসছি,আপনি যে পথ দেখালেন,তা অক্ষরে অক্ষরে মনে রাখব।

উঠে দাঁড়ালেন কুমারচন্দ্র।

আরে আরে বসো বসো, যাচ্ছ কোথায়? তোমার জন্য আমি ব্যবস্থা করেছি,তোমাকে দ্বারে দ্বারে ছুটতে হবে না পয়সার জন্য 

অবাক হলেন কুমারচন্দ্র।

মানে?

আমি মোটা অঙ্কের টাকা তোমাকে দেবো,তুমি ব্যবসা করো।
তারপর টাকার অঙ্কটা বীরেন্দ্রনাথ শোনালেন।
তা শুনে কুমারচন্দ্র চমকে উঠলেন! 

এতো টাকা!

আরও লাগলে আমি আরও জোগাড় করে দিচ্ছি, তুমি কোনো চিন্তা করো না।

না,বীরেনদা, তা হয় না।এই টাকা আমি নিতে পারব না,কারণ এই টাকা যদি ডুবে যায়,তাহলে আমি আপনাকে মুখ দেখাতে পারব না! এইসব টাকা,ব্যবসার লাভক্ষতি, কয়লা, রোজগারের চেয়ে অনেক বড় আপনার আশীর্বাদ। তাই সর্বদা করুন।আমি ঠিক টাকা জোগাড় করে নেব।

শোনো, শোনো, এই টাকা আমি তোমাকে বিশ্বাস করে দিচ্ছি, এ-র কোনো শোধ করার দায় তোমার থাকবে না,তুমি যদি ব্যবসায় ডুবে যাও,আমি কোনো ক্লেইম করব না,নিশ্চিন্ত থাকো।

না,বীরেনদা, একদম নয়।এই যে বললেন,বিশ্বাস করেন এই সামান্য চাষার ব্যাটাকে, এটাই আমার কাছে কোটি টাকার অধিক।

বীরেন্দ্রনাথ এবার অবাক হলেন। তিনি কুমারের কাঁধে হাত রেখে বললেন,ভাই,তুমি মেদিনীপুরের খাঁটি মাটি দিয়ে গড়া,তোমাকে সংগ্রামী সঙ্গী পেয়ে গর্বিত।তোমাকে খালিহাতে যেতে দিতে পারি না! দাঁড়াও

বলেই বীরেন্দ্রনাথ কক্ষান্তরে গেলেন।ফিরে এসে একখানি দামি শাল কুমারচন্দ্রের হাতে দিয়ে বললেন,এটি তোমাকে দিতে খুব মন চাইল,অবশ্যই নাও।

কুমারচন্দ্র শালটি নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে আলোচক্ষুতে তাকিয়ে থাকলেন।
বীরেন্দ্রনাথ ভরাট কণ্ঠে বললেন,আমাদের উদ্দেশ্য কবিগুরু যেভাবে বলেছেন,তাই আমাদের সত্য করতে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কথা,প্রতিটি চরণ,এসো আমরা দুজন একসঙ্গে বলি,
"বাঙলার মাটি বাঙলার জল
বাঙলার হাওয়া বাঙলার ফল
পুণ্য হউক পুণ্য হউক
পুন্য হউক হে ভগবান।

বাঙলার ঘর বাঙলার মাঠ
বাঙলার বন বাঙলার হাট 
পূর্ণ হউক পূর্ণ হউক
পূর্ণ হউক হে ভগবান।"

কুমারচন্দ্র মৃদুস্বরে বলে উঠলেন,আমি আশা করছি, একদিন সত্যি বাঙালির স্বপ্ন পূরণ হবেই। 

তাই যেন হয় কুমার,মনে রেখো,আমাদের কাছে দেশ মানে সিংহাসন নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, পদের জন্য লোভী হওয়া নয়, আমাদের কাছে দেশ মানে মাটি,মানুষ এবং তাদের সার্বিক কল্যাণ।

ঠিকই বলেছেন।

তাই তো বলছি,পথপ্রদর্শকও যদি পথ ভুল করে,মাথায় রাখবে,পথ আমরা ছাড়ব না! কারণ আমরা পথ পেয়ে গেছি,দেশ স্বাধীন করার।

আপনি যেমন বলবেন, আমি তাই করতে প্রস্তুত।

শীঘ্রই একটা দল গঠিত হতে যাচ্ছে, সেই দলের উদগাতা চিত্তরঞ্জন দাশ। আমরা দেশের ও দেশের মানুষের জন্য আদর্শের পথ বেছে নেব,সেই জন্য প্রস্তুত থাকা দরকার। 

আমি প্রস্তুত।

ঠিক আছে, আমি তোমাকে ডেকে নেব,এখন বিদ্যালয়ের কাজটার সমস্যার স্থায়ী একটা সমাধান করো।

ঠিক আছে বীরেনদা। 

রাত অনেক হয়েছে। 
কলকাতার রাস্তা আস্তে আস্তে নিরিবিলি হচ্ছে। কুমারচন্দ্র একাকী বাসার দিকে হাঁটতে লাগলেন।মনে মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, 

" বাঙালির প্রাণ  বাঙালির মন
বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন
এক হউক এক হউক 
এক হউক হে ভগবান।"

সহসা কুমারচন্দ্র দেখতে পেলেন,একজন বৃদ্ধ ফুটপাতের ওপর শুয়ে আছে।গায়ের কাপড় বলে কিছু নেই, বোধহয় জ্বরাক্রান্ত। অল্প অল্প কাঁপছে।তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে।তার পাশে একটি মহিলা ভাঙা গাছের মতো বসে আছে।
মুখচোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে,অসংখ্য জায়গায় সহযোগিতার ব্যাপারে ব্যর্থ হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ভাগ্যের হাতে নিজেদের সঁপে দিয়ে অপেক্ষা করছে,এই অসহায়ত্বের চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে এখন স্থবিরতা, তা দেখে কুমারচন্দ্রের চোখে জল এসে গেল। 
বৃদ্ধ কাতর কণ্ঠে বলে উঠল,একটু জল! জল দাও
মহিলাটি হতভম্বের মতো রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে, তার চোখে ভয়ানক ভয়। এই রাতবিরেতে কোথায় যাবে জল আনতে।

কুমারচন্দ্র দৌড়ে গিয়ে কাছাকাছি একটা খোলা চায়ের দোকান পেল,তার কাছে একটা মাটির ভাঁড় কিনে একটা টিউবকল থেকে জল এনে দিল।
জল খেয়ে বৃদ্ধ একটু শান্ত হল।
কিন্তু তার কম্পন কিছুতেই থামল না!
তখন কুমারচন্দ্র সেই দামি শালটা তার গায়ে জড়িয়ে দিল।
তারপর পকেটে দুটি টাকা ছিল,তাই মহিলারটির সামনে রেখে শুধু বললেন,এই সামনে রাস্তাটা পার হলে একটি আশ্রম আছে,প্রবণানন্দজি মহারাজের,সেখানে চলে যান,রাত কাটানোর ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

মহিলাটি সব শুনল।টাকাটা তুলে হাতে রাখল।তারপর ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।
তখন কুমারচন্দ্র সেই বৃদ্ধকে কোলে তুলে রাস্তা পেরিয়ে সেই আশ্রমে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
কুমারচন্দ্র যখন চলে আসছেন,তখন সেই 
মহিলাটি জিজ্ঞেস করল,তুমি কে বাবা?

একজন সামান্য চাষা মা, যে জানে ক্ষুধা-তৃষ্ণা-অসুখে অসহায় হলে কতখানি কষ্ট হয়! 

তারপর সেই অন্ধকারে কুমারচন্দ্র হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে গেলেন...


ক্রমশ...

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি