খর্জুর বীথির ধারে -৫ /মলয় সরকার

খর্জুর বীথির ধারে

মলয় সরকার

(৫ম পর্ব ) পঞ্চম পর্ব


ঘরে ফিরে এসে রাতের নিশ্চিন্ত ঘুম। পরদিন সকালে উঠে ‘ফ্রেস’ হয়ে পাশের দোকানে গেলাম স্লিপ নিয়ে, ওরা বলল, আধঘন্টা পরে আসুন। বুঝলাম, ওদের দোকান সবে খুলছে।সকালের হাওয়া হালকা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা, ভালই লাগছিল। একটু পরে আবার বাইরে বেরিয়ে দেখি, রায়েধ এসে গেছে তার রথ নিয়ে । শুধু তাই নয়, প্রাণ খুলে গল্প জুড়েছে হোটেল মালিকের সঙ্গে। বুঝলাম, হোটেল মালিক ওর যথেষ্ট পরিচিত এবং হয়ত আমাদের মত বহু যাত্রীকে আগে ও এখানে এনেছে, এবং তার ফলে একটা সখ্য তৈরী হয়েছে ওদের মধ্যে।
 আমাদের দেখে সে ‘গুড মর্ণিং’ জানিয়ে বলল, তাড়াহুড়ো নেই। আপনারা রেডি হোন, নিজেদের মত করে। তারপর আমরা যাব।

বেরোলাম একটু পরে। আজকের গন্তব্য, জর্ডনের সব চেয়ে বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র পেট্রা। এটি দেখার জন্য সারা পৃথিবী মুখিয়ে আছে।

রাস্তায় রায়েধ জিজ্ঞাসা করল। কেমন ছিল হোটেল? অসুবিধা হয় নি তো? বললাম, মোটামুটি। খুব ভাল নয় , ঐ চলে গেছে আর কি। ও বলছিল, এখানে খুব বড় হোটেল নেই তো, তবে এরা খুব বিশ্বাসী আর গেস্টদের খুব যত্ন করে । 

আমি প্রতিবাদ করলাম না, তবে বিশ্বাসও করলাম না যে, এখানে ভাল হোটেল নেই। পেট্রার মত জায়গা, যেখানে সারা পৃথিবীর লোক আসে, সেখানে ভাল হোটেল নেই। তা নিশ্চয়ই ঠিক নয়। আসলে আমি অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই সব টুর  গ্রুপ গুলো, পুরো টুরে সবগুলোই ভাল হোটেল দেয় না।একটা দুটো কম মানের হোটেল প্রায়ই দেয়, তাদের লাভ বাড়ানোর জন্য। তবু এখনও তো কয়েকদিন এর সঙ্গেই ঘুরতে হবে , এর সঙ্গে আর এ নিয়ে বাক বিতণ্ডা করে লাভ কি।যা করেছে , সে তো টুর কর্তারা করেই পাঠিয়েছে।ও তো কর্তব্য পালনের অধিকারী মাত্র।

আমি বললাম, কিন্তু খাবার জলের জগ বা যথেষ্ট খাবার জল ছিল না কেন? ও বলল, একটা কথা বোধ হয় আপনি জানেন না, সারা জর্ডনে কোথাও খাবার জল পাওয়া যায় না। এটা এখানে ভীষণই দুর্মূল্য। ‘ফ্রী’ কোথাও দেওয়া হয় না। তার কারণ জর্ডনকে অনেক দাম দিয়ে খাবার জল কিনতে হয় ইস্রায়েলের কাছ থেকে। কাজেই এর অপচয় পুরোপুরি বন্ধ।সে জন্য খাবার জল এখানে সব জায়গাতেই পয়সা দিয়ে কিনতে হয়। বর্তমানে সমুদ্রের থেকে নুন জল নিয়ে তার থেকে খাবার জল বানানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু সেও তো খুব খরচ সাপেক্ষ। জানি না কি হবে। 

ব্যাপারটা শুনে খুব আশ্চর্য লেগেছিল।একটা গোটা দেশে খাবার জল নেই, ভাবতেই পারি না। পরে জেনেছিলাম, কথাটা পুরোপুরি সত্যি। তথ্য বলছে, জর্ডন না কি সারা পৃথিবীর যত দেশে খাবার জলের কমতি আছে, তাদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।যেখানে একটা সুস্থ মানুষের বছরে ৫০০ ঘন মিটার এই জল লাগে, সেখানে জর্ডনের মানুষ পায় ১০০ ঘন মিটার জল।যত চাষবাস ও ইণ্ডাস্ট্রী বাড়ছে ততই চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। কাজেই বিভিন্ন জায়গায় এই জল চুরি এত হয় যে, সেটাকেও সামলানো যাচ্ছে না।সাধারণ মানুষের আয়ের বেশিরভাগটাই এই খাওয়ার জলের পিছনে ব্যয় করতে হয়।সেটা আরও পরে, কঠিন ভাবে বুঝেছিলাম, যখন জর্ডন ছেড়ে বাড়ির পথে রওনা দিই।সেখানে আমাদের জলের বোতল ফুরিয়ে যাওয়ায় আর প্লেনের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করার ফলে, আমাদের যে জলের প্রয়োজন হয়েছিল, তা খুঁজতে সারা জর্ডন এয়ারপোর্ট খুঁজে বুঝেছিলাম, এয়ারপোর্টে খাবার জলের কোন কল বা ব্যবস্থাই নেই। তাই জল কেনা ছাড়া কোন উপায় নেই। ফলে আমাকে একটি ছোট বোতল কিনতে হয়েছিল বাধ্য হয়েই, যার দাম নিয়েছিল ৩ দিনার অর্থাৎ এখানকার টাকায় প্রায়  ৩০০ টাকার মত।

চিন্তা করছিলাম। আবার এসে যাচ্ছে আপনা থেকেই আমার দেশের কথা, তার সঙ্গে তুলনা। একদিকে আমরা বিদেশী জল কিনে শখ করে খাই অনেক দাম দিয়ে- যাদের পয়সা আছে, আবার একদিকে সাধারণ মানুষের এবং সরকারের ঔদাসীন্যে  কোটি কোটি টাকার জল নর্দমা দিয়ে ভাঙ্গা কলের মুখ থেকে অনর্গল বয়ে চলেছে।আমরা এখনও পাচ্ছি বলে অবহেলায় নষ্ট করে চলেছি এই অমূল্য সম্পদ।  

আমরা এসে পড়লাম, পেট্রার দোরগোড়ায়।
এবারের ভ্রমণে আমার শুধু ইতিহাস আর ইতিহাস। ইতিহাসকে খুঁজতেই এসেছি এখানে।প্রকৃতি তো সাথেই থাকে। তবে তার চেয়েও বেশি ইতিহাস। যে ইতিহাস ভুগোল আমি পড়েছি বইএর পাতায়, তাকে এই বুড়ো বয়সে চাক্ষুষ যাচাই করতেই এসেছি। তার সাথে নতুন যোগ হয়েছে সারা পৃথিবীর মানুষ চেনা। কত রকমের পরিবেশে কত রকমের মানুষ দেখছি তা গাঁথা থাকছে মনের মণিকোঠায়। এগুলোই এবারের যাত্রার সম্পদ।

পেট্রার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। শুধু তাই নয়, এ এক বিস্ময়, প্রকৃতিরও বটে মানুষেরও বটে। অনেকের কাছেই হয়ত অজানা, যে, প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের কথা তো সবাই শুনেছেন, এ যুগের সপ্তম আশ্চর্যের কথা কি সবাই জানেন? সে যুগের আশ্চর্য গুলির মধ্যে আজ বেঁচে আছে শুধু একমাত্র ইজিপ্টের গিজার পিরামিড। বাকী সবই কালের গর্ভে বিলীন।আর একটির মাত্র (আর্টেমিসের মন্দির) শেষ বেঁচে যাওয়া একটি স্তম্ভ দেখে এসেছিলাম তুরস্কে। এ ছাড়া বাকী আর কিছুই নেই। 

আর এযুগের যে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য ,তার মধ্যে একটি হল এই পেট্রা। অবশ্য নতুন এই আশ্চর্য নিয়ে আমাদের দেশেরও কিছু গর্ব করার আছে বৈকি! তা হল, আমাদের দেশের তাজমহলও এই নব সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে একটি।অবশ্য একথা আমাদের দেশের কতজনই বা জানেন বা খোঁজ রাখেন! আর জানলেই বা কি! নিজের দেশের গর্বের জিনিসকে তো আর আমরা সারা পৃথিবীর কাছে তুলে ধরতে যাব না!

 প্রসঙ্গ যখন উঠলই, তখন , যদিও নিশ্চয়ই অনেকেই জানেন, তবুও বলেই রাখি, এটি সারা পৃথিবীর ভোটের মাধ্যমে স্থির করা হয়েছে, এবং এটি করেছে ২০০০ সালে  একটি সুইস সংস্থা। ২০০৭ সালে এটির ফলাফল জানানো হয়। এটিকে নাকচ এখনও পর্যন্ত কেউ করেন নি। এই নব আশ্চর্য গুলি হল ১)  চীনের প্রাচীর, ২)মেক্সিকোর চিচেন ইৎজা পিরামিড, ৩)জর্ডনের পেট্রা, ৪) পেরুর মাচু পিচু, ৫)ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর উঁচু জেসাসের মূর্তি, ৬) রোমের কলোসিয়াম, ৭) তাজমহল। তার মধ্যে তাজমহল আমাদের দেশের, এটা আমাদের সৌভাগ্য।

আমরা তো পেট্রায় পৌঁছালাম। সেখানে টিকিটের ব্যবস্থা আছে। রিয়াধ টিকিট কেটে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, আপনারা এবার স্বচ্ছন্দে এগোন। সারা দিন দেখুন। সমস্ত দেখা হলে, নিশ্চিন্ত মনে বেরিয়ে আসতে পারেন। পাশেই রয়েছে, ভাল খাবার দোকান , খেতে পারেন। তবে এখানে ঘুরবেন খুব আস্তে আস্তে, একদম তাড়াহুড়ো নয়। গাইডের, আশা করি, খুব দরকার হবে না। সব জায়গায় লেখা আছে, দেখেই বুঝবেন। রাস্তায় কোন দালাল বা কারোর সাথে কথা বলার বা খুব প্রয়োজন না হলে ঘোড়া বা গাড়ি বা গাধা নেবেন না।ওরা খুব ঠকায়।তাছাড়া নিজেরা হেঁটে দেখার আনন্দই আলাদা। এর ভিতরেও একটা দোকান আছে, সেখানে বসে রেস্ট নিয়ে চা , টিফিন খেতে পারেন। হয়ে গেলে বা বিশেষ প্রয়োজন পড়লে আমাকে ফোনে ডাকবেন, আমি চলে আসব। আজ সারাদিনের প্রোগ্রাম এখানেই আপনাদের, কিচ্ছু চিন্তা না করে আনন্দে ঘুরুন।

আমরা দুটিতে মহা আনন্দে এগোলাম, জীবনের একটা বড় আনন্দকে সযত্নে ধরে রাখার জন্য। তার আগে এখানকার কথা অল্প একটু বলে নিই।

এই পেট্রা একটি প্রাচীন বর্ধিষ্ণু জনপদ।এর আশপাশটাকে বলা হয় ওয়াদি মুসা (Wadi Musa অর্থ মুসা বা মোজেসের উপত্যকা। ওয়াদি কথার অর্থ উপত্যকা বা মরু উপত্যকা । এই ওয়াদি মুসাই হল পেট্রার প্রবেশ দ্বার।এখানে নাকি মোজেস পাথর থেকে জল বের করে ছিলেন। আমার মনে হয়, এই প্রবাদের মূল আমাদের রামায়ণের মতই। অনেকে বলেন,রামায়ণ নাকি আসলে বন্ধ্যা বা অকর্ষিত জমিতে চাষাবাদের পত্তনের গল্প। তার ফলেই সীতার জন্মের কথা বা অহল্যা ( যে জমি হল্যা বা কর্ষণ যোগ্য নয়, পাথরের) উদ্ধারের গল্পের অবতারণা।মোজেসও হয়ত এই অঞ্চলে চাষের পত্তন করেছিলেন। আজ ওয়াদি মুসাতে ভালই চাষবাস হয়।  এই পেট্রায় মানুষের বসতি ছিল প্রায় ৭০০০ খৃষ্ট পূর্বাব্দ থেকে। পরবর্তী কালে এই অঞ্চলে রাজত্ব করেছিল সেই প্রাচীন আরব উপজাতি নাবাতিয়ারা।এরা প্রায়  দ্বিতীয় খৃঃ পূঃ পর্যন্ত রাজত্ব করে।তারা এই অঞ্চলকে এক বিশাল ব্যবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত করে। এই পেট্রার মধ্য়ে দিয়ে তখন ব্যবসায়ীরা আম্মান , মিশর, সিরিয়া ইত্যাদিতে তাদের মালপত্র নিয়ে যাতায়াত করত। এই রাস্তাই ছিল তখন এর প্রধান যোগাযোগের পথ।আমাদের দেশের যে রেশম পথ আছে তার মতই অনেকটা। আমরা যে রাস্তা দিয়ে আম্মান থেকে এখানে এসে পৌঁছেছি সেই রাস্তাই ছিল সেই ঐতিহাসিক রাস্তা, যা সুদীর্ঘকাল ধরে মানুষ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ব্যবহার করে এসেছে।এই নাবাতিয়ারা এই মরুভূমির জীবনযাত্রায় ভীষণ ভাবে অভ্যস্ত ছিল।তারা এর মধ্যে ফসল ফলানো, অল্প বৃষ্টি হলেও সেই জলকে কাজে লাগানো এবং পাথর কাটায় দক্ষ ছিল।এখানে নাকি এক সময় ২০০০০ মানুষ বসবাস করত।এখানে নবম খ্রীঃ পূঃ থেকে ৪০ খ্রীঃ পর্যন্ত নাবাতিয়া রাজ চতুর্থ এরেতাসের(Aretas IV) রাজত্ব ছিল। 

নাবাতিয়ারা প্রথম দিকে স্বাধীনই ছিল। পরবর্তী কালে দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথম দিকে রোমের অধীনে আসে। ফলে এখানে রোমান স্থাপত্য ভীষণ ভাবে দেখতে পাওয়া যায়।অনেক বাইজান্টাইন স্থাপত্য ও চার্চও এখানে দেখা যায়।এই পেট্রার যে অংশটুকু সবাই দেখতে আসে বা আমরা দেখতে এসেছি, তা হল সম্পূর্ণ লাল রঙের পাহাড়ের পর পাহাড়কে কেটে কিভাবে একটা জনবসতি এতকাল থেকেছে, রাজত্ব করেছে , সেই সমস্ত অংশটুকু।পাথর কেটে বাস করতে এই সমস্ত অঞ্চলের মানুষ যে কত দক্ষ ছিল তার  প্রমাণ আমরা আগেই পেয়েছি তুরস্কের আনাচে কানাচে। 

এখানে সারা পৃথিবী থেকে এত মানুষ আসেন যে সংখ্যাটা শুনলে আশ্চর্য লাগবে। ২০১৯ সালে এর দর্শক সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়েছিল। তবে আমার নিজের মনে হয়েছিল ,সব দেখার পর, আমাদের দেশের অজন্তা বা ইলোরার কাজ , শৈল্পিক সৌন্দর্য এর চেয়েও শতগুণে ভাল। অথচ তার জন্য দর্শকই পাওয়া যায় না। জগতের কাছে তার তেমন পরিচয়ও নেই, ইতিহাসও তেমন করে প্রচারিত নয়।বারবার নিজের দুঃখের কথা বেরিয়ে এসে লেখাকে ভারাক্রান্ত করছে। কিন্তু নিজের মনকে  বাঁধ দিতেও পারছি না। যেখানেই যাই, নিজের দেশের সঙ্গে তুলনা সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় এসে যায়।

সঙ্গে থাকুন পেট্রার পথে। চলুন যাই দেখতে দেখতে।–

(ক্রমশঃ-)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. প্রতিটি লেখাই কৌতূহল বাড়াচ্ছে

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি