খর্জুর বীথির ধারে--৬/মলয় সরকার

খর্জুর বীথির ধারে

মলয় সরকার

(৬ষ্ঠ পর্ব ) ষষ্ঠ পর্ব


পেট্রার এই অঞ্চল দিয়েই গাজা উপকূল, বসরা, সিরিয়া, আকাবা, লোহিত সাগর, মিশর, মক্কা পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের যাতায়াতের পথ হওয়ায় ,ব্যবসায়ীদের উপর আধিপত্য ও ট্যাক্স আদায়ের সম্পূর্ণ সুযোগ এই অঞ্চলের অধিবাসীরা নিয়েছিল।এই পেট্রা জায়গাটি দীর্ঘ দিন লোকচক্ষুর আড়ালেই পড়েছিল শেষে ১৮১২ সালে এক সুইস অভিযাত্রীর (Johann Ludwig Burckhardt বা Sheikh Ibrahim Ibn Abdallah)চেষ্টায় এটি উদ্ধার হয় ও এর ইতিহাস খোঁজা শুরু হয়।এটিকে উপলক্ষ্য করেই ট্যুরিজম শুরু হয় জর্ডনে, যা আজ এর অর্থনৈতিক উন্নতির এক বড় স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এটিকে কেন্দ্র করে অনেক চলচ্চিত্রও তৈরী হয়েছে।তার মধ্যে Aladdin  (২০১৯), The Mummy Returns (২০০১),Samsara (২০১১) এইগুলি প্রধান।  এই পেট্রাকে Rose Red City বা  Pink City বলা হয় এর রঙের জন্য।
 
এখানে বড় বিচিত্র ভাবে কোন প্রাকৃতিক কারণে , সম্ভবতঃ টেক্টনিক প্লেটের কোনো সম্প্রসারণ বা প্রসারণের ফলে লাল বেলে পাথরের পাহাড় ফেটে দুভাগ হয়ে সুন্দর যাতায়াতের পথ তৈরী হয়ে গেছে (যেমনটি আমরা ব্রতকথায় বা জাদুগল্পের কথায় পড়েছি, পাহাড় ভাগ হয়ে পথ করে দেওয়ার ব্যাপার)।

আমরা এগোলাম। ঢোকার মুখেই কিছু মানুষ  দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়া, গাধা, গাড়ি নিয়ে ,তারা দর্শককে সেগুলো চড়িয়ে ঘোরাবে বলে। তবে সুখের কথা,এরা কোনো জোরাজুরি করে না। আর একটা কথা , দেখেই মনে হল, এরা সব দরিদ্র শ্রেণীর  মানুষ, এই করেই এদের জীবিকা চলে। আমরা সযতনে এদের এড়িয়ে চললাম। পাথরের রঙ দেখলাম টকটকে লাল। ঠিক যদি, খুব ভাল ইঁট পোড়ানো হয়, যেমন রঙ হবে, বা টেরাকোটার মন্দির ঘষামাজা করলে যেমন রঙ হবে তেমনই লাল। আবার কোন কোন জায়গায় রঙ ঠিক বেলে পাথরের বা বেলুড় মঠের মত।যেহেতু এগুলো সব বেলেপাথরের, কাজেই এই পাথর কেটে কিছু করা অনেক সুবিধাজনক। পাহাড়া ফাটা পথ , সরু এবং স্বাভাবিক ভাবেই বাঁকা চোরা, কোন জায়গায় উপরের দিকে একটা পাহাড় আর একটার উপর এতটাই ঝুঁকে এসেছে যে সেখানে রোদ ঢোকে না।এই জায়গাটাকে বলে ‘সিক’ (Siq) ।
ছোট বড় অসংখ্য বাঁক নিয়েছে রাস্তা। ভিতরটা কখনও ছায়া , কখনও রোদ ঢুকছে মাথার উপর থেকে বা তেরছা করে।  প্রতিটি বাঁকের আগে মনে হচ্ছে,সামনের বাঁকটা ঘুরলেই নিশ্চয়ই নতুন কিছু দেখব।একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, এই পাহাড়ের গায়ে দুদিকেই দেওয়ালের নীচের দিকে মাটি থেকে একটু উঁচু দিয়ে কাটা হয়েছে জল নিকাশের ড্রেন, যেটি বরাবর চলেছে পাহাড়ের গা ধরে।এ ছাড়া লক্ষ্য করছি অনেক জায়গাতেই দেওয়ালে কিছু খোদাই  করা ছিল, যা বর্তমানে প্রাকৃতিক কারণে নষ্ট হয়ে গেছে।কিছু কিছু জায়গায় রয়েছে ভাঙ্গা থামের অংশ, বা বসতি ঘরের অবশেষ। দেওয়াল গুলোতে জলে বা প্রাকৃতিক কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়ার চিহ্ন স্পষ্ট। একজায়গায় দেখলাম কয়েকজন মানুষের খালি পা বা ঊর্ধাংশের অল্প কিছু আছে আর বাকীটুকু অবলুপ্ত। মাঝে মাঝেই দেখছি পাহাড়ের মধ্যে মানুষের থাকার উপযুক্ত করে খোঁড়া বা ঘরের অংশ বিশেষ। আর একটি জায়গায় দেখলাম , একটু দ্বিতলের মত  উঁচু জায়গার উপরে চারটি ত্রিভুজাকৃতি স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে।এর নীচের অংশে , উপরেও দরজা মত করা আছে। এটি নাকি একটি সমাধি। এরকম সমাধি এখানে অনেক আছে। আজ সঠিক বোঝা মুস্কিল কোনটা সমাধি আর কোনটা থাকার ঘর ছিল। দেওয়ালে বহু জায়গাতেই রয়েছে অনেক কারুকাজ।

রাস্তার মাঝে মাঝে দেখছি অনেক প্রশস্ত, উপরটাও ফাঁকা , প্রচুর সূর্যালোক আসছে। আবার কোন জায়গা রাস্তা বেশ সরু, ছায়াবৃতা।সকালের এই ঝকঝকে আলোর মাঝে, উপরে যখন উন্মুক্ত গভীর নীলাকাশ, তখন যেন বেশ একটা আচ্ছন্ন হওয়ার মত পরিবেশ লাগছে। নিজেকে ভাবতে চেষ্টা করছি, সেই ঐতিহাসিক যুগেরই এক মানুষ। অনুভব করছি, সেই নাবাতিয়ারা ঘুরছে চারপাশে দৈনিক জীবনযাত্রায়, ব্যবসায়ীরা চলেছে উঠের পিঠে আর খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে তাদের সওদা নিয়ে বিরাট কাফেলা বা কারবাঁ নিয়ে দলে দল।হয়ত কোথাও উন্মুক্ত তরবারী নিয়ে পাহারা দিচ্ছে প্রহরীর দল।এক জায়গায় দেখা গেল সিঁড়ি কাটা রয়েছে পাহাড়ের পাথরে। উপরে উঠেই রয়েছে দরজা, ঘরে ঢোকার। কত আরব রমণী এখানে ঘরসংসার করেছে, শিশুরা খেলা করেছে, বড় হয়েছে, প্রেম, বিবাহ সংসার করেছে। আজ চারিদিকে তাদের সব হাসিকান্না গুলো ঝরে ঝরে পড়ছে এই সব পাথরের মধ্যে থেকে। বছরের পর বছর ‘ক্ষুধিত পাষাণে’র বুকে জমা হয়ে আছে কত গল্প , কত গাথা, কত ইতিহাস।যেগুলো হয়ত, উপযুক্ত মন নিয়ে শুনতে বসলে, পাথর আপনিই শোনাতে বসবে তার রূপকথার গল্প, উপুড় করে দেবে তার ঝুলি।
কোন কোন জায়গা দেখলাম, দরজা আকৃতির খোদাই করা ;কিন্তু ভিতরে যাওয়ার পথ আর খোঁড়া নেই। সেগুলো পরিত্যক্ত খোদাই কি না বোঝার উপায় নেই।

এরপর একজায়গায় দেখি পাথর এমন ভাবে ক্ষয়ে গেছে, দেহে মনে হচ্ছে দুটি হাতী মাথা উঁচু করে শুঁড় নামিয়ে বসে আছে পাশাপাশি। সেই ভাবেই ওগুলোর বর্ণনাও লেখা রয়েছে।হাতীর যেন চোখ গুলিও রয়েছে সঠিক জায়গায়।


হঠাৎ চোখে পড়ল দুই পাহাড়ের সরু ফাটলের মধ্যে দিয়ে ঊজ্বল রৌদ্রালোকে আলোকিত এক দ্বিতল প্রাসাদের সম্মুখাংশ। উন্মুখ হয়ে এগোলাম সামনে। এগিয়েই দেখি প্রশস্ত এক চত্বর চারিদিকে, যদিও পাহাড় ঘেরা, তবুও বেশ অনেকখানি জায়গা রৌদ্রালোকিত। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই স্থাপত্য, যার নাম এতদিন শুনে এসেছি, বা পেট্রার নাম করতেই যে স্থাপত্যের কথা বলা হয়, সেই আল-খাজানা, ট্রেজারী বা ( Al-khazneh)।

এর নীচের তলায় দুপাশে তিনটি তিনটি করে ছয়টি বেশ উঁচু থাম। থামের মাথায় রয়েছে কারুকার্য।মাঝে রয়েছে দরজা , ভিতরে ঢোকা যায়। কিন্তু বিপজ্জনক বা অন্য যে কোন কারণেই হোক তা বন্ধ করা আছে দর্শকদের জন্য। উপরেও রয়েছে ছটি থাম। তবে সেখানে কোন দরজা নেই তার বদলে প্রতি ফাঁকে রয়েছে নানা মূর্তি। আর একটা জিনিস দেখলাম, এই জিনিস আমি তুরস্কেও বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, তা হল, নীচে থেকে দোতলা পর্যন্ত খাড়া দেওয়াল বেয়ে উঠে গেছে সিঁড়ির মত পা রাখার জায়গা। কিন্তু সেই খাড়াই দেওয়ালে যারা উঠত , তাদের নিশ্চয়ই কিছু ধরে ওঠার ব্যবস্থা ছিল।তারা তো আর টিকটিকি ছিল না। কিন্তু কি যে ছিল, সেটা আজ আর বুঝতে পারলাম না। একই রকম দেখেছি কম্বোডিয়াতে। মন্দিরগুলোর  সিঁড়ি এত ছোট আর খাড়াই , সেগুলোতে ওঠাই দুষ্কর।এরকম সিঁড়ি যারা ব্যবহার করত, তারা কি করে করত, জানি না। 

এই খাজানার সামনে বসে আছে নানাভাবে সাজানো গোজানো অনেক উট এবং তাদের মালিকরা। উটের পিঠে ছবি তোলা বা ঘোরার জন্য, তারা এগুলো রেখেছে। এই খাজানাটা না কি কোনদিনই সত্যিকারের ট্রেজারী ছিল না। এটি সম্ভবতঃ, প্রথম শতাব্দীতে রাজত্ব করা রাজা চতুর্থ আরেতাসের সমাধি ছিল। তবে এখানে টাকা পয়সা লুকানো আছে মনে করে, এটি ভাঙ্গার জন্য নাকি এক সময় আরব দস্যুরা এর গায়ে অনেক বন্দুকের গুলি খরচ করেছিল। যার চিহ্ন এর গায়ে এখনও আছে।রটনা ছিল, কোন ইজিপ্টের ফারাও নাকি নিরাপদে টাকা পয়সা লুকিয়ে রাখার জন্য এটি তৈরী করেন। আবার অনেকে মনে করেন, এট আসলে ইহুদী ধর্মগুরু মোজেসের ভাই Harun বা  Aaron এর সমাধি। কেউ আবার অন্য আর একটি সমাধি দেখান, বলেন, সেইটিই আসলে মোজেসের ভাইয়ের সমাধি।

যাই হোক, এর গায়ে যে মূর্তিগুলো খোদাই ছিল সেগুলি অনেকই নষ্ট হয়ে গেছে।তবে ঐতিহাসিকরা বলেন, এখানে অনেক দেবদেবীর মূর্তি ছিল।এর ভিতরে নাকি অনেক জায়গা নিয়ে বেশ বড় বড় ঘর আছে।যার আয়তন প্রায় ২০০০ বর্গ মিটার।কিন্তু আমরা তো তা দেখতে পেলাম না , আমাদের জন্য শুধু দরজা বা সামনের অংশটুকুই দেখার অধিকার।

তবে এইটিই এখানে সবচেয়ে বড় দ্রষ্টব্য, আর প্রধান দ্রষ্টব্য। তাই এখানে সময় দিলাম একটু বেশি।
এখান থেকে আর মাথার উপর ঝুঁকে আসা পাহাড় নেই বা রাস্তাও অত সরু নয়। বেশ অনেকখানি চওড়া হয়ে গেছে, অর্থাৎ পাহাড় এখানে দুপাশে অনেক সরে গেছে। ফলে মাথার উপরে খোলা রোদ আর চকচকে রোদে সব যেন ঝলসাচ্ছে। বেলা এখনও খুব যে বেশি হয়েছে তা নয়, তবে, দেখে মনে হচ্ছে অনেক বেলা। এবার শুধু দু’ পাশেই দেখতে দেখতে পথ চলা। একটা বিশাল ঘরের মত রয়েছে ,তার দরজা কিন্তু দেখলাম খুব ছোট। দেখছি, এরা পাথর কাটায় এবং স্থাপত্যে যতই উন্নত থাক, সমস্ত ঘর বাড়িতেই যে শ্রী ছাঁদ আছে, তা নয়। মাপেরও কোন ঠিক ঠিকানা নেই। তার ফলে মনে হল, যাঁদের পয়সা ছিল , অর্থাৎ রাজা বাদশা ছাড়া কেউই উন্নত মানের কারিগর নিয়োগ করতে পারতেন না। সবাই নিজের মত অপটু হাতে যাহোক তাহোক একটা মাথা গোঁজার আস্তানা বানিয়ে নিত।তার ফলে ঘর গুলো যে পাশাপাশি রয়েছে, তাদের দরজার মাপ কোথাও নির্দিষ্ট নয়, রাস্তা ঘাটও মাপমত নয়। আমাদের শহরে বড় অট্টালিকার পাশেই দরিদ্র বস্তির অবস্থিতির মত আর কি!

এখানে একটি গাছও দেখলাম, যেটি বেশ যত্ন করে দর্শনীয় হিসাবে রাখা রয়েছে। এই পাথরের মধ্যে গাছ কি করে হয়েছে তা সত্যিই আশ্চর্য, এবং তা দর্শনীয়ই সেই জন্য। এখানে নাকি একটি গাছ আছে যা ৪০০ বছরের পুরানো। শোনা যায় নাবাতিয়ারা এখানে পাইন জাতীয় বা জুনিপার, ওক ইত্যাদি গাছ লাগাত।দূরে দূরে কিছু  বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু গাছ রয়েছে দেখলাম।
চলুন এগোই আরও ভিতর দিকে। সঙ্গে থাকুন-

ক্রমশঃ

 পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. বাঃ অতি চমৎকার বর্ণনা। খুব ভালো লাগলো।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি