মনসার ঝাঁপান /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব -৩১

মনসার ঝাঁপান

ভাস্করব্রত পতি

“আরে গুণী ভাই, গুণ করো সাপ ধরে খেলো।
সাপের বিত্তান্ত কথা কিছু সভার মধ্যে বলো।। 
কোথায় জন্মিল সাপ, কেবা বাপ মা, 
কয়টি দশন সাপের কয়টি আছে পা।। 
এক চক্ষু কানা সাপের হইল কি কারণ?
কহ দেখি গুণী ভাই তাহার বিবরণ।। 
কোন দাঁড়ে বাঁচে জীব কোন দাঁড়ে মরে 
যদি না বলিতে পার ফিরে যাও ঘরে।। 
পথ না ছাড়িব মোরা দেবী পূজিবারে।।”

মনসার ঝাঁপানে গুণীন তথা ওঝাদের চাপান উতোর পর্ব চলে এভাবেই। ঝাঁপানের এক অন্যতম অঙ্গ এটি।

ঝাঁপানের সময় মনুষ্যবাহিত যানে (ঝাপান / ঝাঁপান) গুরুকে নিয়ে শিষ্যরা শোভাযাত্রা করেন। আর নানা প্রজাতির সাপ গলায় জড়িয়ে তাঁদের নাচাতেন ঐ গুরু। আর নানাবিধ কৃৎকৌশল এবং স্টান্টবাজি দেখিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন তিনি। সঙ্গে বাজে ঢাক, বাজনা, বাঁশি ইত্যাদি। কোথাও কোথাও দুই গুরুর মধ্যে চলে প্রশ্নোত্তর পর্ব। দুজনের গানে গানে চলে চাপানউতোর। এই গানকে বলে 'জাঁতগান'। একে 'মনসার জাঁত'ও বলে। চাঁদ সওদাগরের কাহিনী ও মর্ত্যে মনসা পূজার প্রচলনের কাহিনীই এই জাঁতগানের মূল উপজীব্য বিষয়। প্রতি পদের শেষে থাকে ধ্রুবপদ বা ধুয়া। তাকেই বলে 'জাঁত'। এ থেকেই এসেছে 'জাঁতগান'।

সংস্কৃত যাত্রা > প্রাকৃত জত্তা > বাংলা জাতা। 
'জাত' শব্দের অর্থ হল 'উৎসব'। 'চৈতন্য চরিতামৃত'-তে পাই 'ধুলা খেলা জাত'। ক্ষেমানন্দ দাসের 'মনসার ভাসান'-এ আছে 'লইয়া শতেক আইও জাত পাতাইল।' ঘনরাম চক্রবর্তীর 'ধর্মমঙ্গল' এ পাই—'কত পিঁড়া উঠানে মেয়ের পড়ে জাত'। রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র রায় লিখেছেন—'ভারত রচিল অন্নদার ত্রয়োজাত।'

মূলতঃ রোহিনের দিন (জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখে 'রোহিন' থেকেই সর্পপূজার সূচনা) থেকে আশ্বিনের সংক্রান্তি পর্যন্ত বিভিন্ন তিথিতে মনসাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। তবে শ্রাবণ সংক্রান্তি বা পয়লা ভাদ্র মনসার বিসর্জনের দিন ঝাঁপান গান হয়ে থাকে। কোথাও কোথাও আশ্বিনের সংক্রান্তিতে বা ডাক সংক্রান্তিতে ঝাঁপান উৎসব হয়। কিন্তু কেমন সেই উৎসব?

'মনসার ঝাঁপান’ বিষয়ে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি উল্লেখ করেছেন "মনসা তথা সর্বাধিষ্ঠাত্রী দেবীর প্রীত্যর্থে ঐন্দ্রজালিক ক্রীড়া। এই ক্রীড়া দুই পক্ষে হয়। এক পক্ষের গুনিন অন্য পক্ষের গুনিনকে ‘বাণ’ মারে। এই বাণে কখনও সাপ, কখনও ভিমরুল, কখনও বিছা প্রভৃতি আশ্চর্যজনক ব্যাপার জন্মে। (এখন নাকি বিদ্যাটি লোপ পাইয়াছে)। দশহরার দিন মনসার ঝাঁপান হয়"।

এই ঝাঁপান উৎসবের বর্ণনা মেলে ড. বরুণকুমার চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতিকোষ’এ। এখানে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে ”সাধারণত আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন অর্থাৎ বর্ষার সময় ঝাঁপান অনুষ্ঠিত হয়। বাড়িতে মনসা পূজার যেখানে প্রচলন আছে সেখানে সাধারণত মনসাগাছকে পূজা করা হয়। কিন্তু ঝাঁপানে মনসা মূর্তি তৈরি করা হয় এবং পূজার দিন রাত্রেই তার নিরঞ্জন করা হয় (যদিও বর্তমানে দু তিন দিন ধরে রাখা হয়)। ঝাঁপান উপলক্ষ্যে গ্রামের কোনো খোলামাঠে মেলা বসে। গ্রামীন মেলার সমস্ত উপকরণই এখানে থাকে। ঝাঁপানের উল্লেখযোগ্য ও আকর্ষণীয় দিক হল মনসা দেবীর সামনে বাঁশের মাচা করে তার উপর সাপ খেলানো। তিন চার ঘন্টা ধরে এই সাপ খেলানোর অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। পাঁঠাবলিও মনসা পূজার একটি স্বাভাবিক ঘটনা।” পূর্ব মেদিনীপুরের শূলনী গ্রামের মনসার ঝাঁপান খুব বিখ্যাত ছিল। কিন্তু পরিবেশবিদদের ওজর আপত্তিতে তা বেশ কয়েক বছর আগেই বন্ধ করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। শূলনি ছাড়াও এ রাজ্যে ঝাঁপান উৎসব অনুষ্ঠিত হয় মানতাকালি, বেলে বিষ্ণুপুর, খেদাইতলা, সীতাপুর, বলাগড় এবং পদ্মভিলাতে। ১৯৭২ এর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুসারে এই নিষ্ঠুর প্রর্দশনী বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইদানিং।

'বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতিকোষ' এ ‘ঝাঁপান' প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, —"এক বিশেষ লোক উৎসব। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সর্বত্র এই উৎসব চালু থাকলেও দক্ষিণবঙ্গে এর প্রচলন অধিক। দক্ষিণবঙ্গ বন জঙ্গল, অপরিচ্ছন্ন নদী খাল ইত্যাদিতে পূর্ণ অর্থাৎ সাপের বসবাসের উপযুক্ত ক্ষেত্র। সাপের হাত থেকে রক্ষা কল্পে দেবী মনসার পূজা উপলক্ষ্যে ঝাঁপান অনুষ্ঠিত হয়"। সুশীলকুমার মণ্ডলের বর্ণনাতেও মেলে ঝাঁপান উৎসবের স্থিরচিত্র। তিনি লিখেছেন ‘"বর্তমানে ঝাঁপান শব্দটি আছে, আছে গান, গুণীনের কলাকৌশল প্রদর্শন। কিন্তু মনুষ্যবাহিত যানটি নেই। এখন কোনও উচ্চভূমি বা গোরুর গাড়ীর উপর বসে গুণীন খেলা দেখান। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর রাজপরিবারের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে আজও ঝাঁপানের দিন 'লাগদর্শন > নাগ দর্শন' করার রীতি প্রচলিত। ঐদিন বহু স্থান থেকে গুণীন বা ওঝারা সাপ নিয়ে আসেন ও অর্থ দানসামগ্রী নিয়ে যান। রাঢ়বঙ্গের প্রায় সর্বত্রই ‘ঝাঁপান' প্রচলিত"।

ঝাঁপান' প্রসঙ্গ নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় (৭ই জুলাই, ২০১২) প্রকাশিত একটি লেখায় বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে – "পরবটা হয় শ্রাবণ সংক্রান্তির দিন। পাঁজি বা বাংলা ক্যালেণ্ডারে দেখবেন, ওটি মনসা পূজোর পুণ্য তিথি। পুরাণ বলে, শিবঠাকুরের এই মানসকন্যেটি বাপের ধাতটি পেয়েছেন। একটু খেপিয়েছে কি বাণ ছুঁড়বেন, সাপ লেলিয়ে দেবেন। তিনি যে তামাম সাপ দুনিয়ার লোকাল গার্জেন। তাই তাঁকে তুষ্ট করতে এই দিনে ঘটা করে মন্দিরে মন্দিরে পূজো হয়। এই দিন সাপেদের ধরা, তাঁদের মারা চলবে না। পাপ হয়। সাপুড়েরা চ্যালাচামুণ্ডা নিয়ে এসে মন্দিরের বাইরে একটা স্টেজ-এ চড়ে বসে। তারপর সাপ খেলা দেখায়। সেটাই ঝাঁপান পর্ব"।

আসলে মনসাপূজায় সাপখেলার উৎসবকেই বলে ‘ঝাঁপান'। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, "সাপুড়িয়াদিগের তন্ত্রমন্ত্র, প্রয়োগে গুণজ্ঞানপরীক্ষার্থী সর্পক্রীড়ায় পরস্পর প্রতিদ্বন্দিতা"। রাজশেখর বসু সংকলিত ‘চলন্তিকা'তেও মনসাপূজার উৎসবে সাপ খেলানোকে ‘ঝাঁপান' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি ‘বাঙ্গালা শব্দকোষ'তে ‘ঝাঁপান' অর্থে উল্লেখ করেছেন- "গাজনিয়া সন্ন্যাসীর কৃচ্ছ সাধন, অগ্নিলৌহাদি শলাকা প্রভৃতির উপর পতন (ঝাম্-ঝাঁপ-অগ্নি-সংস্কৃত ধ্মা ধাতু হইতে)"।

‘সংসদ বাঙ্গালা অভিধানে’ও ‘ঝাঁপান' অর্থে পাই মনসাপূজায় সাপখেলার উৎসব বিশেষ। এখানে পর্বতারোহনের ডুলিবিশেষকে ‘ঝাঁপান' বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকা বাংলা একাডেমীর ‘বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান' অনুসারে যিনি সাপের বিষের মন্ত্র জানেন তিনিই ঝাপান বা ঝাঁপান। বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতোর ‘ঝাড়খণ্ডি বাংলা শব্দকোষ'তে পাই ‘ঝাঁপান’ হল মনসাপূজার সময়ে মনুষ্যবাহিত যান বিশেষ (রাউতাড়া ঝাঁপান পরবে টাকা ঝলকে দেখায়)।

                    যাপ্যযান > ঝাঁপান
সুনীলকুমার মণ্ডল তাঁর 'রাঢ়ের শব্দ ও সংস্কৃতি অভিধান' বইতেও ঝাঁপান অর্থে মনুষ্যবাহিত যান বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন-“যাপ্যযান ঝাঁপান মনসা পূজার অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্পবিদ্যা বিশারদ গুণী বা ওঝাগণ ঝাঁপানের গান করেন। এঁরা সাপের বিষঝাড়া, মন্ত্রবলে সাপের মুখ বাঁধা, কড়ি চালা, পিঠে থালা বসিয়ে বিষ ঝাড়া ইত্যাদি বিদ্যা জানেন বলে সমাজে প্রচার করতেন পিঠে থালা বসিয়ে বিষ ঝাড়া ইত্যাদি বিদ্যা জানেন বলে সমাজে প্রচার করতেন ও সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতেন। সর্পভীত সমাজ এঁদের প্রাধান্য স্বীকার করে নিত। এ বিদ্যা গুরুমুখী, তাই শিষ্য পরম্পরায় চলত"।

'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ' এর ‘পদকল্পতরু'তে পাই ‘মনমথ চড়ই ঝাপানে'। ক্ষেমানন্দ দাস এর ‘মনসার ভাসান’এ পাওয়া যাবে -- "জ্যেষ্ঠ মাসে পূজা হব দশরা দিবসে। / আষাঢ়েতে হব নাগপঞ্চমীর পূজা।। / ঝাঁপান করিব যত ঝাঁপানিয়া ওঝা। / শ্রাবণ মাসেতে পূজা লবে খর তরা। / খই দধি দিয়া লোক পালিবেক চিরা। / ভাদ্র মাসেতে লোক পূজিব তোমারে। / হইব আরফা ব্রত পৃথিবী ভিতরে। / পান্ত ওদন দিয়া পূজিবেক তোমা। / আশ্বিনে অম্বিকা-পূজা দিতে নাহি সীমা। / কার্তিক মাসের পূজা কহনে না যায়। / সিজের সহিত বৃক্ষ পূজিব তোমায়। / আখণ্ড সিজের ডাল করিযা রোপনে। / নূতন সকল দ্রব্য দিয়া অগ্রহানে। / পৌষে পরমেশ্বরী পবিত্র আচরি। / মাঘ মাসে মহাপূজা লইবে কুমারী। / ফাল্গুন-চৈত্র মাসে এ চোদ্দ ভুবনে। / করিব তোমার পূজা সুর নর-গনে।।" আবার বিজয়গুপ্তর 'পদ্মাপুরাণ' এ পাই -- "এই ত আষাঢ় মাসে জগৎ হরষিত। / চৌদিকে মনসা পূজে গাইনে গাহে গীত।। / পাতিয়া বিচিত্র ঘট সমুখে গীত গায়ে। / কোন অপরাধে ঘট ঠেলে বাম পায়ে।। / চান্দোসদাগর বেটা চম্পকিয়া রাজা। / চম্পক নগরে বেটা মানা করে পূজা।। / এইত শ্রাবণ মাসে মনসা পঞ্চমী। / লুকাইয়া সনকা পূজে তথায় গেলাম আমি।।" 

 পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি