পৃথিবী যখন গ্রিনহাউস /নিশান চ্যাটার্জী

জীবনের গভীরে বিজ্ঞান- ১০

পৃথিবী যখন গ্রিনহাউস

নিশান চ্যাটার্জী


আধুনিক বিজ্ঞানের মজার ব্যাপার গুলো মানুষের দৃষ্টিগোচর করানো যেমন তৃপ্তিকর তেমনি আধুনিকতার কল্যাণে পরিবেশে কি ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে সেটা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাও প্রবন্ধ লেখার অন্যতম দায়িত্ব বলে বিশ্বাস করি, তাই কিছু উদাহরণ এবং পরিসংখ্যান দিয়ে পরিবেশের শরীরের অবস্থা সম্পর্কে আজ বিশ্লেষণ করা জরুরি একথা হয়তো সকলেই মেনে নেব। বর্তমানে সংবাদ পত্রের কল্যাণে একথা হয়তো সকলের জানা যে ব্রিটেনে তাপমাত্রার তীব্রতা এতোটাই বেশি যে রাস্তা সহ সিগন্যাল সিস্টেম, সেই তাপমাত্রাতে গলে যাচ্ছে। পৃথিবীর পরিবেশ সম্পর্কে যে সব অতি জটিল, অন্তহীন সুদূরপ্রসারী সমস্যা মানুষের হাতে সৃষ্টি হয়েছে, "গ্রিনহাউস এফেক্ট" তাদের মধ্যে অন্যতম।

প্রায় ১০০বছর আগে ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে সুইডিশ রাসায়নিক সভ্যানতে আরহেনিয়াস প্রথম আশঙ্কা প্রকাশ করেন ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে তার ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এক বিপর্যয় সীমায় পৌঁছতে পারে। ১৯৫৮ সালে  স্ক্রিপ্টস  ইনস্টিটিউট অফ ওসোনোগ্রাফি থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝামাঝি অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন বায়ুস্তরে কার্বন ডাইঅক্সাইড এর পরিমাপ করা হয়, সেখানেও কার্বন ডাই অক্সাইডের লক্ষণীয় বৃদ্ধি দেখা যায়। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব বৃদ্ধির অর্থই হলো তাপমাত্রা বৃদ্ধি। বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব শতকরা মাত্র ০.০৩৫ ভাগ বা ৩৫০ppm। মূলতঃ এই কার্বন ডাই অক্সাইড ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

১৮৮০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রাচীন উদ্ভিদসমূহ সালোকসংশ্লেষ বিক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড সংগ্রহ করে যে কয়লা স্তরের সৃষ্টি করেছিল। সেই লক্ষ লক্ষ বছরের সঞ্চয় মাত্র দুশো বছরের মধ্যে বাতাসে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য মূলত এই গ্রিনহাউস এফেক্ট সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী জীব মাইক্রোফোরামিনিফেরা কিন্তু অতীতে গ্রিনহাউস এফেক্ট প্রতিরোধে সাহায্য করেছিল। তারা বাতাসের অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড নিজেদের দেহের খোলসের মধ্যে আবদ্ধ করে এই কাজে সাহায্য করেছিল। কিন্তু আমাদের অবিমৃষ্যকারীতার জন্যে আজ তাদের সংখ্যাও হ্রাসপ্রাপ্ত। ফলে সেই সাহায্য থেকেও আমরা প্রায় বঞ্চিত। আমরা শুধু বায়ুমন্ডলের সর্বনাশ করেই থেমে থাকিনি সঙ্গে সঙ্গে জলভাগেও মিশিয়ে দিয়েছি লোভের গরল। যাই হোক আগামী পর্বে এই নিয়ে বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ বিদগ্ধ পাঠকদের কাছে তুলে ধরতে চেষ্টা করবো।  পরিবেশে আপতিত সূর্য রশ্মির অব্যবহৃত অংশ যখন, ফিরে না গিয়ে প্রকৃতির মধ্যে রয়ে যায় তখন পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই অতিরিক্ত রশ্মি ফিরে না যাওয়ায় সাহায্য করে কিছু উপাদান যার মধ্যে অন্যতম হল কার্বন ডাই অক্সাইড। শীত প্রধান দেশে উদ্ভিদ পালনের জন্য এই রকম ব্যবস্থা কে গ্রিনহাউস বলে এবং সেই নাম অনুসারে পরিবেশের এই সমস্যার নাম ও "গ্রিনহাউস এফেক্ট"।  আসুন গ্রিনহাউস এফেক্ট এর আরও কিছু প্রভাবের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। পৃথিবীর সকল পর্বতের বরফের স্তর যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় "গ্লেসিয়া", তা গলতে শুরু করেছে। বর্তমানে গঙ্গার উৎপত্তিস্থল রুপে চিহ্নিত গোমুখে আর তথাকথিত মহাদেবের জটা ( বিশেষ বরফের অংশ যা ঈশ্বর রুপে মানুষের কল্পনা প্রসূত) দেখা যায়না। গত পঞ্চাশ বছর ধরে গঙ্গোত্রী গ্লেসিয়ার ক্রমবর্ধমান হারে পিছু হটছে। এই গ্লেসিয়ার হিমালয়ের উদ্ভিদকূলকে বাঁচিয়ে রাখত। ফলে সেখানকার বৈশিষ্ট্যময় উদ্ভিদের বেঁচে থাকা খুবই কষ্টকর হচ্ছে। এই কারণে হিমালয়ের অন্যতম পুষ্প রডোডেন্ড্রন বর্তমানে endemic প্রজাতিতে  রুপান্তরিত হয়েছে। এছাড়াও গ্রিনহাউস এফেক্ট এর প্রভাবে গমের ফলন কমবে। গমের মতো ধান, বর্লি, সয়াবিন তুলা প্রভৃতি প্রায় সকল‌রকম ফসলের এবং ফলের  বৃক্ষ, অর্থাৎ C3 জাতীয় উদ্ভিদের ফলন কমবে।  এছাড়াও রোগপোকার আক্রমণ ও বাড়বে। বরফ গলনের ফলে যদি সমুদ্র পৃষ্ঠের গড় উচ্চতা দেড় ফুট বাড়ে তাহলে অধিকাংশ  সুন্দরবন ধ্বংস হবে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানিয়েছেন ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৩.৫ ডিগ্রি  সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে যা পরিবর্তন ঘটবে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন মানুষের দশ হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাসে আগে তা কখনো ঘটেনি। 

সবশেষে বলা যায় এই অবস্থাকে শেষের শুরু হিসেবে না দেখে তার প্রান্তীয় পর্যায় বলা চলে। তাই আশু সমাধান হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।  এই বিপর্যয় কে মাথায় রেখে প্যারিস, সিডনি, লন্ডন একটি উদ্যোগ নিয়েছে, তারা  মানুষকে সচেতন করতে একদিন একটানা একঘন্টা লন্ডন শহর অন্ধকার করে রেখেছিল। ২১ জুন ২০০৭ লন্ডন শহরে অন্ধকার ছিল। আলো না থাকার ফলে ৩৮০টন কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপাদন কম হয়েছে। তাই পৃথিবীর সর্বত্রই সুর উঠুক " খরচ হোক দরকারে"।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি