জল যখন গরল../নিশান চ্যাটার্জী

জীবনের গভীরে বিজ্ঞান- ১১

জল যখন গরল..

নিশান চ্যাটার্জী

গত পর্বে গ্রিনহাউস এফেক্ট নিয়ে আলোচনার সময় উল্লেখ করেছিলাম দূষণ শুধু বায়ুমণ্ডলে সীমাবদ্ধ নেই তার লেলিহান শিখা জলভাগেও সমান ভাবে বিস্তৃত। আজ সেই দিকেই আলোকপাত করা যাক। বর্তমানে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে একফোঁটা বৃষ্টির জলও বিশেষত প্রথম বর্ষণের সময়, বিশুদ্ধ নয়,তার মধ্যে বহু ধূলিকণিকা জমে রয়েছে। ১৯৮৫ সালে গঙ্গার দূষণ রোধ করার জন্য সৃষ্টি হয় সেন্ট্রাল গঙ্গা অথারিটি (C.G.A)।   শুধু দূষণ নয়, তার সাথে বাড়তি সমস্যা হল পলি পড়া। 

আর এই জলদূষণের প্রত্যক্ষ প্রভাব যেমন জলজ প্রাণীর ওপরে পড়ছে তেমনি মানুষেরও রেহাই নেই। গঙ্গার এক একটি জায়গায় গভীরতা এতোটাই কমে গেছে যে সমুদ্র থেকে যেসব মাছ নদীতে ডিম পাড়তে আসে তারা আসতে পারছে না। আবার গঙ্গার কোনো কোনো জায়গার জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি মিলিলিটারে কমে  হয়েছে ৪ মিলিগ্রাম এর কাছাকাছি, যা কিন্তু ৬ মিলিগ্রামের কম হওয়া কখনোই উচিত নয়। দেশের প্রধান প্রধান নদী গুলির গুনগত মান কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ১৯৯০ সালে পরিমাপ করে , সেই রিপোর্ট অনুযায়ী গঙ্গা, বৈতরণী, গোদাবরী, যমুনা প্রভৃতি নদী গুলিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাচ্ছে ও কলিফর্ম নামক ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়ার পরিমাণ বাড়ছে। ১৯৮০ সালের আগে ধারনাই ছিলনা, যে নলকূপের জল দূষিত হতে পারে। 

2020 সালের অক্টোবরে "টাইমস অফ ইন্ডিয়া" প্রকাশিত আর্টিকেল এ উল্লেখ করা হয় যে, তেল ভর্তি জাহাজ থেকে তেল পড়ে যে দূষণ হয়, তার ফলে প্রায় ৮০০০ কচ্ছপ ও স্তন্যপায়ী মারা পড়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের তলদেশে কোরাল দ্বীপও (Coral) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।  WHO এর মতে আর্সেনিকের পরিমাণ প্রতি লিটার জলে ০.০১ মিলিগ্রাম থাকা উচিত। কিন্তু এর পরিমাণ ০.০৫ মিলিগ্রামের বেশি হলে ওই জল চাষবাস সহ পানীয় হিসেবে ব্যবহারের অযোগ্য বলে ধরে নেওয়া হয়। তাই পুরসভার কলের জলসহ পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি নলকূপের জল বছর বছর আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা দরকার এবং সর্বসাধারণের কাছে তা প্রকাশ করা দরকার। ভারতের অনান্য অঞ্চলেও  কৃষি ও শিল্পের জন্য ভূ গর্ভের জল বিপুল পরিমাণে তোলার জন্য সেখনেও নানা দূষিত পদার্থ  নলকূপের জলের সাথে উঠে আসছে, পশ্চিম ভারতে ফ্লোরাইড, দক্ষিণ ও মধ্য ভারতে ক্লোরাইড ইত্যাদি। যতটুকু জল ভূ গর্ভে জমা পড়ছে তার বেশি জল তুলে নেওয়া হচ্ছে, যা প্রধান সমস্যা রুপে দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে বাড়িতে বাড়িতে যেভাবে সাবমার্সেবলের  ব্যবহার বাড়ছে সে বিষয়ে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ উভয়েরই সচেতন থাকা উচিত। ভেবে দেখবেন বাড়িতে দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সত্যি কি সাবমার্সেবেলের প্রয়োজন আছে। কেবলমাত্র নিজেদের সম্ভ্রান্ত প্রমাণ করার তাগিদে আমরা নিজেরাই কিন্তু আমাদের বিপর্যয় ডেকে আনছি। এবার আসি জলজ প্রাণীদের কথায়, ভালো ফসলের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত পেস্টিসাইডের যথেচ্ছ ব্যবহার বর্তমানে জলজ প্রাণীদের ব্যপক ক্ষতি করছে।

 একই সাথে সঠিক মাত্রায় এর ব্যবহার না হওয়ার জন্য, কীট পতঙ্গরাও এইসব পেস্টিসাইডের বিরুদ্ধে শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। আমি আমার একটি রিভিউ আর্টিকেল এ উল্লেখ করেছিলাম  Organophosphate জাতীয় পেস্টিসাইডের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে তা যখন বৃষ্টির সাথে জলভাগে গিয়ে মিশেছে তা মাছেদের ওপরে ক্ষতিকারক প্রভাব বিস্তার করেছে। ২০১৪ সালে বিজ্ঞানী জয়কুমার তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন "ট্রাইজোফোস" নামক বহুল ব্যবহৃত পেস্টিসাইড কই মাছের ফুলকাতে ক্যান্সারের জন্য দায়ী। ২০১৬ সালে একজন বিজ্ঞানী তার গবেষণা পত্রে উল্লেখ করেছিলেন  "নুভান" নামে আলু চাষে ব্যবহৃত পেস্টিসাইড  যদি নির্দিষ্ট মাত্রায় মাছের শরীরে যায় তাহলে ২১দিনের মাথায় মাছের কলাতন্ত্র ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। আমার রিভিউ আর্টিকেল এ (২০২০, Effect of organophosphate compound on Fish...) উল্লেখ করেছিলাম যে আমাদের দেহের বার্তা পরিবহনে আ্যসিটাইল কোলিন নামক যে রাসায়নিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তার কাজে বাধা সৃষ্টি করে এই সকল পেস্টিসাইড। ফলে মাছ জলে ঠিকভাবে সাঁতার কাটতে পারেনা।তার চলাফেরা অসংলগ্ন হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালে আমার অপর রিভিউ আর্টিকেল এ( Dwindling of Amphibian population...) উল্লেখ করেছিলাম যে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যাঙের প্রজাতি বিলুপ্তির পথে, কারণ দূষণ তাদের বাসস্থান কে পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলেছে। এরা এদের ত্বকের মাধ্যমে দূষিত পদার্থ শোষণ করে জলের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পারে। কিন্তু আজ এরাই ক্ষতিগ্রস্ত। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন বায়োলজিক্যাল সায়েন্স (IJARBS) এ ২০১৬ সালে প্রকাশিত আমার গবেষণাপত্রে(Acute toxic effect of mancozeb to fish....and their behaviour) উল্লেখ করেছিলাম যে এইসব বহুল ব্যবহৃত পেস্টিসাইড তেলাপিয়া মাছের সংস্পর্শে আশা মাত্র তাদের শরীরের থেকে অতিরিক্ত মিউকাস ক্ষরিত হতে শুরু করে এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ মাছ মারা যায়। এই মাছ আমাদের পরিবেশে মশার লার্ভা নিধনে সাহায্য করে একথা ভুলে গেলে চলবে না। তাহলে প্রশ্ন উপায় কি? আমরা যদি এই সব চলতি পেস্টিসাইডের সাথে সাথে নিয়মিত প্রাকৃতিক ভেষজ ঊষধ জলে মেশাতে থাকি তাহলে জলজ প্রাণীদের  সাথে জলের বৈশিষ্ট্যও অক্ষুন্ন থাকবে। 

এই বিষয়ে বিশদে আগামী পর্বে আলোচনার ইচ্ছে রইল। তবে মনে রাখতে হবে প্রকৃতির সুস্থতার চাবিকাঠি কিন্তু আমাদের প্রকৃতিতেই রয়েছে। প্রয়োজন তার সঠিক প্রয়োগ। বনাঞ্চলের গাছ বেড়ে ওঠার জন্য কোনো রাসায়নিক সার লাগেনা কারণ বনের মধ্যে পড়ে থাকা ঐ সকল গাছের পাতাই মাটিতে মিশে সারে পরিণত হয়।  যদি বনাঞ্চলের ঐ সকল পড়ে থাকা উপাদান সরিয়ে ফেলা হয় তাহলে সেখানকার উদ্ভিদ সমূহের বৃদ্ধি ও বাধাপ্রাপ্ত হবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই নিজেদের সৃষ্টি করা বিষয়ের থেকে প্রকৃতির ওপরে ভরসা করে এগিয়ে যাওয়াই একমাত্র পথ।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি