বেড়া উৎসব /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব পর্ব -৩৩

বেড়া উৎসব

ভাস্করব্রত পতি

মুর্শিদাবাদের 'বেরা' বা 'বেড়া' উৎসব হল একটি আলোর উৎসব। 'খোজা খিজির' উৎসব নামেও পরিচিত। ভাগীরথী নদীতে বেড়া ভাসানোর উৎসবই 'বেড়া উৎসব'। ভাদ্রের শেষ বৃহস্পতিবার আয়োজিত হয় তা। ইসলামী মতে মুসলিমদের জলদেবতার নাম খাজা খিজির। তিনি ছিলেন পির। এই পিরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভাগীরথীর জলে বেড়া ভাসানো হয়।

অসংখ্য কলা গাছের ভেলা বানিয়ে তার ওপর বাঁশ কিংবা কাঠ দিয়ে সুদৃশ্য বেড়া তৈরি হয়। তাতে রঙ কাগজ দিয়ে সাজিয়ে মিনার, তোরন, গম্বুজ বানানো হয়। মূলতঃ ভেলাকেই এখানে বলে 'বেড়া'। কেউ কেউ ভেলাকে বলেন 'ভুঁড়'। আসলে 'ভড়' হল বড় নৌকা। 'বেড়া' অর্থে প্রাচীর বা fence বোঝায়। নৌবহর অর্থেও ব্যবহৃত হয়। বাঁশের বেড়া বানিয়ে তৈরি গম্বুজ ভাসানোর রীতিই তাই বেড়া উৎসব। হাজারদুয়ারীর প্রাসাদের সামনে থাকা তোপখানার ঘাট থেকে রাত ১১ টায় কামান থেকে তোপ দেগে বেড়া ভাসানো হয়। বেড়ার লটবহর ভেসে চলে দক্ষিণমুখী হয় ভাগীরথীর বুকে। আলোকময় হয়ে ওঠে নদী। সঙ্গে এগিয়ে যায় অসংখ্য নৌকা এবং লোকজন। আতসবাজির রোশনাইতে আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ভাগীরথীর জল।

বেড়া উৎসবের রীতিনীতি কি রকম? একসময় এই বেড়া ভাসানোতে সাতটি সোনার প্রদীপ থাকতো। এখন একটি সোনার ও একটি রূপার প্রদীপ জ্বলে। কিন্তু ভেলায় সাজানো হয় বাঁশ দিয়ে চারখানা বিশাল নৌকা। অবিকল নৌকার মতো দেখতে। তাতে বিশেষ উপায়ে সাজানো থাকে কয়েকশ প্রদীপ। সেগুলি যাতে বাতাসে নিভে না যায় তার জন্য ঘিরে রাখা থাকে সাদা পলিথিন দিয়ে। বাঁশের বাতায় ঝোলানো থাকে অজস্র প্রদীপ। এমনভাবে বেড়াটি তৈরি হয় তাতে মনে হতে পারে এটি আসল নৌকা। নানা রঙের কাগজ, রাংতা, অভ্র দিয়ে ময়ূরপঙ্খী নৌকা আকারে বানানো হয়। মোট চারটি। এদের সামনের অংশ মকর তথা কুমীরের মতো দেখতে এবং পেছনের অংশ হাতির মতো। এগুলো ১৩ হাত লম্বা এবং দেড় হাত চওড়া। এ এক অভিনব আলোকসজ্জা। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নাগড়ের কালীদহ ও মাকড়দহের জলে আয়োজিত আলোকময় নৌরাসযাত্রার কথা। 

আতসবাজির রোশনাইতে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদের ভাগীরথীর পশ্চিমপাড়। বেড়া ভাসানো হয় ইমামবাড়া ঘাট থেকে লালবাগ কোর্ট ঘাট পর্যন্ত। তোপখানা থেকে কামান দাগা হলে ভেলার দড়ি কেটে দেওয়া হয়। তখন সেগুলি ভেসে ভেসে চলতে থাকে। আর মতিমহল থেকে সুসজ্জিত হাতি ঘোড়া অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীও মন্থর গতিতে জলযানের সাথে তাল মিলিয়ে যেতে থাকে। এখন অবশ্য এরকম দৃশ্য বিলুপ্তির পথে। সেসময় বজরা ছিল ৩০০ হাত লম্বা ও ১৫০ হাত চওড়া। এখন ৮০ হাত লম্বা এবং ৫০ হাত চওড়া। তবুও এখনো বহু মানুষ উপভোগ করেন নবাবী আমলের এই লৌকিক উপচার। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অন্যতম উদাহরণ বেড়া ভাসানো।

এই বেড়া উৎসবের বিবরণ পাই এল এস এস ও ম্যালির বর্ণনাতেও, "This is observed by launching tiny lightships on the river, a spectacle which may be seen to great advantage on the Bhagirathi. On certain nights in the rainy season thousands of little rafts, each with its lamp burning, are floated down the stream. Their construction is very simple, for a piece of plantain or bamboo bears a sweetmeat or two and the lamp. The festival is celebrated with much magnificence on the last Thursday of the month of Bhadra (September). A raft is constructed of plantain trees and bamboos and covered with earth. On this is erected a small fortress, bearing fireworks on its walls. At a given signal the raft is launched and floated to the further side of the river, when the fire-works are let off, their reflection on water producing a picturesque effect."


ইংরেজ সিভিল সার্জন জে এইচ ওয়ালশ "এ হিস্ট্রি অফ মুর্শিদাবাদ ডিস্ট্রিক্ট"তে জানিয়েছেন যে মুর্শিদকুলী খাঁ এই উৎসব করতেন। কিন্তু তিনি জানাতে পারেননি যে মুর্শিদকুলী খাঁই এই উৎসবের প্রবর্তক‌। বাদশা জাহাঙ্গীরের আমলে একসময় মুকাররম খান বাংলার সুবেদার থাকাকালীন ঢাকাতে ১৬৯০ সালে এটি চালু হয়। মুর্শিদকুলী খাঁ ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী পরিবর্তন করার পর এখানে হাজারদুয়ারীর ঘাটে তা শুরু হয় ১৭০৪ সালে। তিনি ১৫ টি মোহর ও সোনার প্রদীপ ১৫ টি সোনার থালায় সুসজ্জিত করে কলার ভেলায় তৈরি বেড়া তথা বজরার সর্বেসর্বার হাতে তুলে দিয়ে বেড়া ভাসানো শুরু করতেন। উইলিয়াম হজেস তাঁর "ট্রাভেলস অফ ইণ্ডিয়া"তে যে বেড়া উৎসবের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন তা তিনি দেখেছিলেন মীরজাফরের তৃতীয় পুত্র মুবারকউদ্দৌলার আমলে। যদিও এই মুবারকউদ্দৌলার সময় থেকে ওয়ালা জার (১৮২৪) সময় পর্যন্ত এই উৎসব বন্ধ ছিল। তবে বেড়া উৎসবের বর্তমান রূপদান করেছিলেন নবাব ফেরাদুন জার মা রইস উন নেশা।


কোনো কোনো গবেষকদের মতে, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা শুরু করেছিলেন বেড়া উৎসব। এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে ভোলানাথ চন্দ্রের "দ্যা ট্রাভেলস অফ এ হিন্দু" (১৮৪৫) তে। তেমনি জেমস ওয়াইজের "দ্যা মোহামেডানাস অফ ইষ্টার্ন বেঙ্গল" কিংবা ঐতিহাসিক গোলাম হোসেনের "সিয়র ইল মুতাখ্খরিন"তে নবাবকেই এই উৎসবের প্রবর্তক হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। 

নদী পথে চলাচলকারী মাঝিমাল্লাদের বিশ্বাস নদী সমুদ্রে যাতায়াতে তাঁদের জীবন রক্ষা করেন এই পির খোয়াজ। সেই কারণে তাঁরা এই পিরকে শ্রদ্ধা করেন। সেইসাথে তাঁকে ঘিরে নানা ধরনের আচার অনুষ্ঠান পালন করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তাঁদের বিশ্বাস, নানা অসুখ-বিসুখ, বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করেন এই জিন্দা পির। তাঁদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস এই যে, কেউ যদি টানা ৪০ দিন নদী বা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে তবে তাঁকে সশরীরে দেখা দেন এই জিন্দা পির। পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের নাটশাল এলাকায় রূপনারায়ণ নদের পাড়ে নৌকার মাঝিমাল্লাদের কাছে ঠিক এরকমই এক জিন্দা পির "বদর ঠাকুর" রয়েছে। নৌকা নিয়ে যাওয়ার সময় নদীর পাড়ে থাকা পিরকে উদ্দ্যেশ্য করে শ্রদ্ধা জানায় সুষ্ঠুভাবে এবং নিরাপদে ফিরে আসার কামনায়। 

এখানে খাজা খিজির হলেন পির দেবতা। বিষয় ঘোষ বেরা উৎসবকে "খোজা খিজির" বলে উল্লেখ করেছেন। খিজির পিরকে নিয়ে একটি লোককথা প্রচলিত রয়েছে লোকসমাজে। সফিউন্নিসা উল্লেখ করেছেন, "তিনি জন্ম নেওয়ার পর এক দরবেশ ভবিষ্যদ্বাণী করেন ২ মাস বয়সের মধ্যে বিয়ে না দিলে এই শিশুর মৃত্যু হবে। তাঁকে বাঁচাতে এক যুবতীর সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেন তাঁর মা। সেই যুবতী নানারকম লোকনিন্দা সহ্য করতে না পেরে একটা ভেলায় তুলে তাঁকে নদীতে ভাসিয়ে দেন। ভাসতে ভাসতে সেই শিশু হাসতে হাসতে বলে ওঠে আর মাত্র আড়াই দিন অপেক্ষা করলে তাঁরা অনেক ধনী হয়ে যেত। অনুতপ্ত যুবতী তখনই জলে ঝাঁপ দেন। সেই থেকেই তাঁরা অথৈ জলে বাস করেন। মাঝিমাল্লাদের বিপদে আপদে রক্ষা করেন। সাধারণ মানুষের মনস্কামনা পূর্ণ করেন।"

গবেষক ওয়াকিল আহমদ লিখেছেন "খায়াজ খিজির মুসলিম বিশ্বের একটি পৌরাণিক চরিত্র। পণ্ডিতগণের মতে, ইহুদিদের এলিজা ও মুসলমানদের ইলিয়াস নবী পরবর্তীকালে রূপক চরিত্র খোয়াজ খিজিরে পরিণত হন। খ্রিস্ট্রীয় আট শতকে সুফি দরবেশ ইব্রাহিম ইবন অহদম প্রথম খোয়াজ খিজিরের অলৌকিকত্ব প্রচার করেন। তাঁর শিষ্যগণ ভারতে খিজিরিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। মুঘল আমলে শিয়াদের মাধ্যমে বাংলাদেশে এই সম্প্রদায়ের অনুপ্রবেশ ঘটে বলে ধারণা করা হয়।" তিনি উল্লেখ করেছেন, "বাংলার সাধারণ মানুষ বেরা উৎসব এবং কেন্দ্র-চরিত্র খোয়াজ খিজির সম্পর্কে কৌতূহল পোষণ করে লোকসমাজে নানান বিশ্বাস-সংস্কার ও আচারাদি গড়ে তুলেছে। আঠারো শতকের শেষভাগে গরীবুল্লাহ রচিত 'আমীর হামজা' কাব্যে খোয়াজ খিজির আধ্যাত্মিক গুরুরূপে চিত্রিত হয়েছেন।"

তেমনি গবেষক সফিউন্নিসা লিখেছেন, "মুর্শিদাবাদ তো বটেই একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলাতেই জনমানসে খিজির পিরের অনেকখানি  প্রভাব ছিল। এখনো ঢাকা ও ময়মনসিংহে খিজির পিরকে স্মরণ করে ভাদ্রমাসের শেষ বৃহস্পতিবার বেরা ভাসানো হয় মহা সমারোহে। ভেলায় তাঁকে চাল, কলা আর মিষ্টি নিবেদন করা হয়। সুন্দরভাবে সাজানো সব নৌকায় রাখা এসব উপাচার ভেসে ভেসে তাঁর কাছে পৌঁছে যায়। আর তিনি তা গ্রহণ করেন বলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন। তাছাড়া, কেউ তাঁর কাছে কোনো মানত করে সফলকাম হলে বছরের যেকোনো সময়ে বেরা ভাসিয়ে তাঁর কাছে শিরনি নিবেদন করে কৃতজ্ঞতা জানান।"

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি