পথরেখা গেছে মিশে - শেষ পর্ব (অপরাজিতা)/মিলি ঘোষ

পথরেখা গেছে মিশে - শেষ পর্ব

অপরাজিতা

মিলি ঘোষ

পৃথিবীটা যেন ধ্বংস হয়ে গেল। 
ঘটনার আকস্মিকতায় ছুটে এসেছিল সবাই। যে শুনেছে সে। অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই অপার, যে বহু মানুষ আন্তরিকভাবেই ছুটে এসেছিল। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যতদূর থাকা যায়, ততদূর পাশে থেকেছিল অপাদের। 
পুত্রশোক সইতে পারবেন না বুঝেই অক্ষয়ের মা'কে কিছুই জানানো হলো না। তিনি মামার বাড়িতে রয়ে গেলেন। বয়স্ক মানুষ। যে যা পারল বোঝাল। ছেলে আন্দামানে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। ছুটি পায় না, ইত্যাদি। 

কয়েকদিন পরে অপা অনুভব করল, এবার ওকে মাথা তুলতেই হবে। মেয়ের গোটা জীবনটা পড়ে রয়েছে সামনে। শুধু ভুলে গেল নিজের জীবনের কথা। শোক আর জীবন সংগ্রাম সমান্তরালে চলতে লাগল। 
ছোট্ট অরুনিকা বাবার জন্য মন খারাপ করে অপার চোখের আড়ালে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদে, যাতে মায়ের কষ্ট না হয়। এ দুঃখ অপা কোথায় রাখে ? কীভাবে যে নিজেকে আর মেয়েকে সংযত করবে বুঝেই উঠতে পারছিল না অপা।    

অপার লড়াইটা ছিল সৌরভ গাঙ্গুলির মতো। চার বছর পর ফিরে এসে সৌরভ তো শুধু প্রতিপক্ষ দেশের বিরুদ্ধে খেলেনি, খেলেছে নিজের দেশের কিছু মানুষের বিরুদ্ধেও। বহু লোক চাননি বাংলা থেকে একটা ছেলে দাঁড়াক। অপার লড়াইটাও এই ধরনেরই। যদিও তুলনাটা আকাশ ছোঁয়া। সৌরভ, সৌরভ। আর অপা হলো, "প্রাচীরের ছিদ্রে এক নামগোত্রহীন ......।"
তবু এই ছোট্ট মেয়েটাই ধীরে ধীরে অপার বন্ধু হয়ে উঠতে শুরু করল। মায়ের সাথে সমানভাবে ঝড়ের দাপট সামাল দিত সে । ঝড় মানে, এলোপাথাড়ি। চেনা পৃথিবীটা কেমন করে যেন পাল্টে যেতে লাগল। আয়ানার দিকে তাকিয়ে নিজের চেহারা দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপা। ভাবে, "এর পরেও আলাদা করে যন্ত্রণা দেবার প্রয়োজন পরে মানুষের ?"

অক্ষয়ের অফিসের 'দয়ার চাকরি' অপা নেয়নি। নিজের যোগ্যতায় চাকরি পেত, সে অন্য কথা। হাত পাততে বেধেছে অপার। বাড়িতে ছাত্র পড়ানো শুরু করল অপা, অঙ্ক, বিজ্ঞান। সাথে ছিল ঘরের, বাইরের সমস্ত কাজ ও অরুনিকাকে পড়ানো। অপার মনে হতো, দিনটা অন্তত ছত্রিশ ঘন্টায় হলে ভালো হয়। 
তবু অরুনিকাই ভোরের সূর্য, অরুনিকাই বসন্তের কোকিল। জন্ম থেকেই সে চনমনে ছটফটে। ওর চঞ্চলতাই নিস্প্রাণ বাড়িতে প্রাণের প্রদীপ। যত্ন করে অপা সে প্রদীপে তেল দেয়, সলতে ভিজিয়ে রাখে। তার  হাজারো পরিশ্রম, হাজারো ক্লান্তি খোলা আকাশে নিশ্বাস নেয় ওই কচি মুখের দিকে চেয়ে। 

অক্ষয় চলে যাবার বছর তিনেক পরে অক্ষয়ের মাও চলে গেলেন। সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। একজন মানুষের থেকে একটা চরম সত্যি, দিনের পর দিন লুকিয়ে রাখতে গিয়ে আপনজনেরাও ভাবে, এ পৃথিবীতে তাঁর না থাকাই ভালো। অধিকার ছিল তাঁর জানার। মা জানবে না ছেলের খবর ? তবু মুখের ওপর ওই নির্মম সত্যটা জানানো সম্ভব হলো না। জীবনের একটা চূড়ান্ত বেদনাদায়ক অধ্যায় না জেনেই তিনি অজানায় পাড়ি দিলেন। 

পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলল অপার জীবনের গতি। দিন রাত্রির হিসেব সেখানে সংখ্যা মাত্র। এরই মাঝে অরুনিকা শিশু থেকে বালিকা, বালিকা থেকে কিশোরী হয়ে উঠল। খুব সহজে নয়। তবু হলো।
অপা তখন মেয়েকে নিয়ে ভুবনেশ্বরে। অরুনিকা সেখানে একটা নাচের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। দু'দিন দারুণ আনন্দে কাটে। একসাথে গ্ৰুপ শুদ্ধ হৈ হৈ করে যাওয়া আসার যে কী আনন্দ! তা ছাড়া প্রতিযোগিতার ফলও ছিল সুখদায়ক। কিন্তু আনন্দের সাথে যেন জন্মগত শত্রুতা অপাদের।  ওই সময়ের মধ্যেই আর একটি জীবন চলে গেল, অপার মামা শ্বশুর। 
দেখা হলো না। এমন একজন মানুষ, যিনি মানুষকে মানুষই ভাবতেন। ভালোবাসতেন সুর। বাস্তব বুদ্ধি কম থাকায় লোকে সুযোগ নিয়েছে প্রচুর। অক্ষয়কে সন্তানের মতোই দেখেছেন। স্নেহ করেছেন অপাকেও। পরিবারের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছেন। পাশে থেকেছেন অপার। 

পড়াশুনার সাথে সাথে শ্রী তন্ময় করের কাছে নৃত্যের তালিম চলে অরুনিকার। প্রায় সমানভাবেই। সারাদিনে সময় হয় না অপার। রাত এগারোটার সময় মেয়েকে নিয়ে বসে। দুটো পর্যন্ত চলে পরীক্ষার প্রস্তুতি। কোন বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করলে অরুনিকার পক্ষে সুবিধাজনক হবে সমস্ত অপা অরুনিকার শিক্ষক মহাশয়দের সঙ্গে আলোচনা করেছে। অরুনিকার ইচ্ছা অনিচ্ছার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনে তার মতকে প্রাধান্য দিয়ে তবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে অপা। 
সসম্মানে একটার পর একটা হার্ডল টপকাতে থাকে অরুনিকা। আর অপার শত্রু শিবিরের পরিধি বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হতে থাকে। 
আয়নার দিকে তাকিয়ে হাসে অপরাজিতা। 

অক্ষয় চলে যাবার ঠিক দশ বছর পরে অপার সেই দিদি, যে একজন বাবার বয়সী মুখোশধারী মানুষের মুখের ওপর আঙ্গুল তুলে কথা বলার সাহস দেখিয়েছিল, প্রতিবাদ করেছিল অন্যায়ের, সেই দিদি ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হলো। আবার বজ্রাঘাত। ওর ছেলে তখন আমেরিকায় ডক্টরেট করছে। ঠিক একটা বছর সময় দিল। 
ছোটবেলায় যত ঝামেলা অপার এই দিদির সাথেই হতো। বয়সের সাথে সাথে বুঝেছে অপা, ওর মতো সাচ্চা মানুষ হয় না। চাকরি করত,পূর্ত ভবনের ফিনান্স অফিসার। জোট বেঁধে সমালোচনার তুফান তোলা ছিল ওর স্বভাববিরুদ্ধ। সর্বোপরি অক্ষয় চলে যাবার পর থেকে এই দশটা বছরে অপার অন্যতম মেন্টাল সাপোর্টার হয়ে পাশে ছিল এই দিদি। 
শোক যেন আর বাঁধ মানছিল না। 

অপা ঝড় দেখেছে, বজ্রপাত দেখেছে। আবার প্রকৃতির শান্ত রূপও দেখেছে। অপার অবস্থান একই আছে। রিলে রেস অব্যহত। শুধু ব্যাটন হাত বদল হয়। ধাক্কা খেতে খেতে অপা এখন ভয়ানক মুখরা। অপা বোঝে, তার যে স্বামী নেই, সেটা তার চেয়ে অন্য লোকে বেশি মনে রাখে। রাজনীতি মানেই তো মিথ্যা বা অর্ধসত্য। 
তবু অপার ক্লান্ত লাগে আজকাল। তাকে কে বুঝল, না বুঝল কিছুতেই কিছু এসে যায় না আর। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে কি না সে খোঁজ আর রাখে না অপা। 

অরুনিকা বড়ো হয়ে গেল। বিটেক করে টিসিএস এ চাকরি করছে সে। ভালোবাসল অফিসের এক কলিগকে। অপা দেরি করতে চাইল না। নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে তার ভয়। সামান্য শরীর খারাপ হলেই চিন্তা হয়, "আমার কিছু হয়ে গেলে মেয়েটার কী হবে!" এই চিন্তা অবশ্য অক্ষয় চলে যাবার পর থেকেই। এখনই বিয়ে করার ইচ্ছা দু'জনের কারোরই ছিল না। কিন্তু অপার একটা  মেরুদন্ডের রোগ আছে। নাম স্কোলিওসিস্।  মাঝেমাঝেই সেটা ভোগায়। তার ভয়াবহতার কথা অরুনিকা জানে। তাই বুঝল, দু'জনেই। বিয়েটা হয়েই গেল। 

অক্ষয়ের করে রেখে যাওয়া বাড়িতে অপা এখন একা। মাঝেমাঝে অপার অনেক বছর আগের অক্ষয়কে মনে পড়ে। 
ভাবে, "দেখতে না পেলেই কি সে নেই ? অক্ষয়ের  ক্ষয় হওয়া কি অতই সহজ ? চোখের সামনে না থাকলেও মনের মধ্যে তো সে রয়েই গেছে।" 
নির্জন দুপুরে, যখন একটি পাতাও নড়ে না গাছের, শুধু ঘুঘুর ডাকটাই কানে মিঠে লাগে, তখন মনে হয় অপার, অক্ষয় যদি ফিরে আসে। 
অপা দেখাবে, ওর বই, জিনিসপত্র সব অপা গুছিয়ে রেখেছে যত্ন করে। এমন কি ঘড়িটাও। শেষ ব্যবহার করা সিগারেটের প্যাকেটটাও।
অক্ষয় হয়তো এসে মেয়েকে খুঁজবে। 
অপা বলবে, "তোমার মেয়ে তো শ্বশুরবাড়িতে। কত বড়ো হয়ে গেছে, চাকরি করে, জানো না?"
কান্না পায় অপার। মনকে শান্ত করে নিজেই। 

অরুনিকা জানে, তার মা বই পড়তে ভালোবাসে। অনেক বই এনে দেয় সে। অপা পড়ে শেষ করতে পারে না। মাঝেমাঝে শখ হলে, আনাড়ি হাতে অপা কলম নাড়ে, মনের পিপাসা মেটাতে। 
অরুনিকা এখন ব্যস্ত। অফিস, সংসারের কাজ।  সুযোগ হলে হোয়াটসঅ্যাপে মা'কে দু'একটা মেসেজ। মাসে একবার এসে দু'তিন দিন থেকে যায় মায়ের কাছে। আর নিয়ম করে প্রতি রাতে মা'কে ফোন করে। 
রাতের সব কাজ সেরে অপা শুয়ে থাকে, কখন ভ্রাম্যমানটি সুর তোলে, সেই আশায়। পৃথিবীর একপাশ যখন হালকা থেকে গাঢ় ঘুমের দিকে হাত বাড়ায়, কোলকাতার দুই প্রান্তে থাকা মা আর মেয়ে তখন গল্পে মশগুল। রোজই যে অনেক কথা থাকে, তা নয়, তবু কথা এগোয় ভালোবাসার পরশ মেখে। 
কথা শেষ হলে অপরাজিতা ইউটিউবে গান চালিয়ে ফোন পাশে রাখে। রাত গভীর হয়। কানে তার ভেসে আসে শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠ, "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে ....।" 

(সমাপ্ত)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
 

Comments

  1. দুর্দান্ত

    ReplyDelete
  2. Khub bhalo laglo

    ReplyDelete
  3. লেখার মধ্যে ভালো ভাবে অপার জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে৷ অপার মতো সবাই দুঃখকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলুক৷

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯