মাটিমাখা মহাপ্রাণ। বত্রিশ /শুভঙ্কর দাস

মাটিমাখা মহাপ্রাণ। বত্রিশ

শুভঙ্কর দাস 

"দুঃখ যদি না পাবে তো
দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে?

এড়িয়ে তাঁরে পালাস না রে
ধরা দিতে হস না কাতর 
দীর্ঘ পথে ছুটে কেবল
দীর্ঘ করিস দুঃখটা তোর
মরতে মরতে মরণটারে
শেষ করে দে একেবারে 
তার পরে সেই জীবন এসে
আপন আসন আপনি লবে"

একটি ছোট্ট শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। 
নিচে গোটা পাঁচেক মাদুর পাতা।তার ওপর সাদা ধবধবে চাদর দেওয়া হয়েছে। একটি সভা বসেছে। একেবারে মাঝখানে বসে আছেন গান্ধিজি।
নাড়োজলের কুমার বাহাদুর দেবেন্দ্রলাল খানও বসে আছেন।তাঁর গৃহে অবস্থান করেছেন গান্ধিজি।
১৯২৫ সাল।
গান্ধিজি কাঁথি হয়ে মেদিনীপুরে এসেছেন। দেশ স্বাধীনতার আন্দোলনের জন্য তাঁর এই অভিযান নয়, তিনি জেলায় জেলায় ঘুরতে ঘুরতে দেখে নিচ্ছেন দেশ গঠনের কাজ কেমন করছেন কংগ্রেসের সেবাকর্মীরা। কারণ তিনি বার বার প্রতিটি সভায় বলে চলেছেন, স্বাধীনতার আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও শতগুণ গুরুত্বপূর্ণ দেশগঠন।
ট্রেনে করে আসার সময় গান্ধি যে সিটে বসেছিলেন। তার সামনে ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও কুমারচন্দ্র সিটের সামনে মেঝেতে বসে ছিলেন।
সঙ্গে আরও দশবারোজন কংগ্রেসকর্মীও বসে ছিলেন।গান্ধিজি বলে উঠলেন,এক বাত আপ সব লোককে ম্যাঁয় বিশবাস করনে কো অনুরোধ করতা হুঁ। এ বাত আপলোক জরুর ইয়াগ রাখেনঙ্গে,একশো বাত-সে বহুত আচ্ছা এক সাচ্চা কাম।

কথাটি শুনে কুমারচন্দ্র অভিভূত হয়ে গেলেন।একশো কথার চেয়ে একটি সত্যিকারের কাজ সবচেয়ে বড়।

একজন কংগ্রেসকর্মী মৃদুস্বরে বলে উঠলেন, আপনার কথামতো কাজ হচ্ছে, কিন্তু আমাদের দেশের মূল শক্তি চাষী-তাঁতি-জেলে এবং শ্রমিক। তাদের সঙ্গে কাজ করতে গেলেই ইংরেজ পুলিশ কংগ্রেসকর্মীদের শুধু হেনস্তা করছে না,তারা ঐসব সাধারণ মানুষদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভয় দেখাচ্ছে!  কারও জমি কেড়ে নেওয়ার,কারও নৌকা, আবার কাউকে হাত কেটে দেওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে, যাতে সে কাজ করতে না পারে! এমন অবস্থায় কী করে কাজ হবে?

একজন ব্যক্তি এইসব কথাগুলো হিন্দিতে অনুবাদ করে দিলেন।
গান্ধিজি মন দিয়ে শুনলেন।
শুনতে শুনতে নীরবভাবে জানালার বাইরে চেয়ে রইলেন।
তারপর একটা অদ্ভুত কাণ্ড করলেন।
একজনকে তিনি নিজের একটা উত্তরীয় নিতে বললেন।(পূর্বের একটি সভাতে এই উত্তরীয়টি লাভ করেছিলেন)।
সেই কংগ্রেস নেতাটি উত্তরীয় হাতে নিতেই গান্ধি তাঁকে তা মেঝেতে ফেলতে ইশারা করলেন। সেই কংগ্রেসী লোকটি অবাক হয়ে গেলেন।
প্রথমে একটু অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলেন!
কিন্তু গান্ধিজির কথায় লোকটি উত্তরীয়টি ছুঁড়ে দিলেন মেঝেতে।
মেঝেতে পড়তে গান্ধি নিজেই তা কুড়িয়ে নিয়ে লোকটির হাতে দিলেন।
তারপর একই কাজ করতে বললেন।
কংগ্রেসী লোকটি আবার উত্তরীয়কে ছুঁড়ে দিলেন।
গান্ধি আবার মেঝে থেকে তুলে দিলেন।
লোকটি আবার ছুঁড়লেন।
গান্ধি তুলে দিলেন।
এই দৃশ্য দেখে অন্যান্যরা স্থির দৃষ্টিতে অপেক্ষমান। এ  কি হচ্ছে?  তারা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না!
গান্ধিজির মতো নেতা এইসব কী ধরণের আচরণ করছেন!
এরকম পাঁচ-ছয়বার হওয়ার পর 
লোকটি যখন উত্তরীয় ছুঁড়ছিলেন,তখন গান্ধি মেঝেতে গিয়ে বসে পড়লেন। সবার সঙ্গে বসে পড়তে আশেপাশে সকলে সংকুচিত হলেন!
কিন্তু গান্ধি নির্বিকার।
এবার তিনি মেঝেতে বসেই উত্তরীয় মেঝে থেকে তুলে সেই কংগ্রেসী লোকটির হাতে দিতে চাইলেন।
তখন দেখা গেল,সেই লোকটি উতরীয় ছোঁড়ার কাজটিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে!
তিনি উত্তরীয়টি এগিয়ে এসে গান্ধির হাতে দিলেন।এবং গান্ধিজি সেই উত্তরীয় মাথায় বেঁধে নিলেন।

তারপর বলে উঠলেন।
আমি যতক্ষণ ওপরে ছিলাম,ততক্ষণ এই কাপড়টির জন্য আমাকে কষ্ট করে নিচ-ওপর করতে হচ্ছিল। কিন্তু যেই আমি কাপড়টির জন্য নিচে এসে বসলাম। তখন এই কাপড়টি তুলতে বা কুড়িয়ে রাখতে কোনো অসুবিধা হল না।অর্থাৎ যা আমার প্রাপ্ত অধিকার, তার সঙ্গে মিশে যেতে পারলেন,কোনো বাধা অসুবিধা, কেনোকিছুই তোমার অধিকারকে আটকাতে পারবে না!
ভাইসব,সাধারণ মানুষের,শ্রমজীবী মানুষের জন্য কাজ বাইরে থেকে করলে হবে না। ইংরেজ পুলিশ আমাদের গেস্ট, বাট উই আর নট দ্যাট। আমরা যদি আমাদের চাষী-তাঁতি-জেলেদের বাইরে থেকে না দেখে তাদের একজন হই,তাদের সঙ্গে এক হই,তখন ইংরেজ পুলিশ কেন, স্বয়ং ইংল্যান্ডের অধিপতিও ভয় দেখালেও কোনো লাভ হবে না।
তাই বাইরে থেকে নয়, ভেতরে আপনজনের মতো জনগণের সেবা ও সাহস বাড়াতে হবে। 
লক্ষ্য করার মতো,এই ব্যক্তি কাপড়টি ততক্ষণ ছুঁড়ে ফেলতে আগ্রহী ছিল, যতক্ষণ আমি ওপর-নিচ করছিলাম,তারপর যে মুহূর্তে আমি মেঝেতে চলে গেলাম,সেই মুহূর্তে ওর এই ছোঁড়াছুঁড়ির আগ্রহ কমে গেল।
ইংরেজ সরকার এই দেশটাকে বাইরে থেকে দেখে, বোঝে,শাসন করে,তুমলোগ আগর ইস্তারা দেশকো দেখোগে,সমঝোগে, কাম করোগে,তব তো এ দেশ কভি স্বাধীন নেহি হোগা। 
এক বাত ইয়াদ রাখো,স্রিফ তিরাঙ্গা লেহারানেসে দেশ স্বাধীন নেহি হোতা,ও তিরাঙ্গা দিল মে ওড়না চাহি হে..

সকলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল।
এতো সহজ করে এতো গভীর সত্যি তিনি বোঝাচ্ছেন।

সেই কংগ্রেসকর্মী আবার জিজ্ঞেস করলেন,নেতারা কি এইসব মেনে চলবেন? তাঁরা কি সাধারণ মানুষের একজন হতে পারবেন? মিশতে পারবেন?

গান্ধি অবাক হয়ে বলে উঠলেন, নেতা!  নেতা?  কিসের নেতা?  হামলোককো কোয়ি নেতা নেহি চাহিএ,কংগ্রেস দল সেবক চাহাতো হ্যয়, ইশ দেশকা সাচ্চা সেবক।স্বামী বিবেকানন্দের এক বাত থি, আপ লোক
জরুর মালুম হোগা,"কারও ওপর হুকুম চালাবার  চেষ্টা করো না... যে অপরের সেবা করতে পারে,সেই যথার্থ সর্দার হতে পারে।"
যো মন সে কাম করতা হ্যায়,ওহি সর্দার মিনস লিডার হো সাকতা হ্যায়!

 গান্ধি চলন্ত ট্রেনের মধ্যে বক্তব্য থামিয়ে সহসা জিজ্ঞেস করলেন,তোমাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের কোনো দেশাত্মবোধক গান গাইতে পারবে?

কংগ্রেসকর্মীরা একটু সচকিত হয়ে একে-অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। গান্ধি অতি উৎসুক চিত্তে তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ঠিক সেই সময় নিচে বসে থাকা কংগ্রেসকর্মীদের মধ্যে একেবারে পেছনের দিক থেকে এই গানটি ভেসে এলো,

"একসূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন
এক কার্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন
বন্দে মাতরম 
আসুক সহস্র বাধা,বাধুক প্রলয়। আমরা সহস্র প্রাণ রহিব নির্ভয়।
বন্দে মাতরম"

চোখ বন্ধ করে গানটা গাইছিলেন কুমারচন্দ্র।

চোখ খুলে দেখলেন সামনেই গান্ধিজি এগিয়ে এসেছেন। কুমারচন্দ্রের কাঁধে একটা হাত রেখে গান্ধি পরিষ্কার কণ্ঠে বলে উঠলেন, " এক কার্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন"
এক কাজ হল দেশসেবা। জীবনপণ করে দেশসেবা।

কুমারচন্দ্র গান্ধিজির দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলেন। যে মানুষটার দিকে জন্য সারা ভারতবর্ষ তাকিয়ে আছে,সেই পরম শক্তিমান পুরুষ তাঁর দিকে তাকিয়ে... 

এ এক বিরাট প্রাপ্তি। 


মেদিনীপুরের সভাতে গান্ধিজি বললেন,দেশগঠনের জন্য আমি আঠারো দফা কর্মসূচি তৈরি করেছি।আপনাদের সামনে তা পাঠ করে শোনাচ্ছি।আপনারা
একটার পর একটা আমার সঙ্গে উচ্চারণ করুন।
বলেই গান্ধি বলতে শুরু করলেন এবং কংগ্রেসের কর্মীরা তাঁর কণ্ঠের অনুসরণে বলতে লাগলেন,
১।সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি 
২।খাদি ও চরকা প্রচলন
৩।অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ 
৪।কুটির শিল্প স্থাপন
৫।মাদক বর্জন
৬।নারীশক্তি জাগরণ 
৭।বুনিয়াদি শিক্ষাপ্রচলন
৮।গণশিক্ষার প্রসার সাধন 
৯।হিন্দি ভাষা শিক্ষা 
১০।মাতৃভাষা চর্চা 
১১।গ্রামীণ স্বাস্থ্য 
১২।কৃষক উন্নয়ন 
১৩।শ্রমিক উন্নয়ন 
১৪।ছাত্র সংগঠন 
১৫।আদিবাসী উন্নয়ন 
১৬। হরিজন উন্নয়ন 
১৫।কুষ্ঠা নিবারণ
১৮।সাফাই ও শারীরশ্রম

এগুলি বলার পর গান্ধিজি এইবার সভার মধ্যে উঠে দাঁড়ালেন।তারপর চারিপাশে বসে থাকা কংগ্রেসকর্মীদের দিকে একবার তাকিয়ে নিলেন।
সঙ্গে সঙ্গে কুমারচন্দ্র জানা উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সকল কংগ্রেস কর্মী উঠে পড়লেন।
গান্ধিজি বলে উঠলেন,এই দফাগুলো শুধু মুখে উচ্চারণ করলে হবে না,একে অন্তর থেকে বিশ্বাস করে কাজ করে যেতে হবে।স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে কঠিন কাজ।পারবে তো তোমরা? 

হ্যাঁ,অবশ্যই পারব, বন্দেমাতরম্, বন্দেমাতরম্,বন্দেমাতরম! 

কুমারচন্দ্র জানা এগিয়ে গেলেন।হাতে তাঁর একটি শালুক ফুলের মালা।তিনি গান্ধিজির গলায় পরিয়ে দিলেন।বললেন, আপনাকে অনন্তপুর জাতীয় বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বরণ করে নিলাম।

গান্ধিজি সহাস্যে তা পরে নিলেন এবং ট্রেনে যে গান করেছিলেন,তাই কুমারচন্দ্রকে সহজেই চিনতে পারলেন। গান্ধি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, এক কার্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন। 
কুমারচন্দ্র অভিভূত হয়ে মাথা নাড়তে লাগলেন।
গান্ধিজি কুমারচন্দ্রকে একটি ছাপানো লিফলেট, যাতে আঠারো দফা কর্মসূচি লিপিবদ্ধ আছে,তা নিজের হাতে তুলে দেন।
কুমারচন্দ্র সেই লিফলেটকে মাথায় ঠেকিয়ে বলে উঠলেন, এহি মেরা জীবন,এহি মেরা মরণা হ্যায়।
বলতে গিয়ে চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠল।
গান্ধিজি কুমারচন্দ্রের মাথায় হাত রাখলেন। আশীর্বাদ করলেন।
কুমারচন্দ্র পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন।

বাসুদেবপুরে ফিরে কুমারচন্দ্র গান্ধিজিকে যে আঠারো দফা কর্মসূচিকে সফল করবেন কথা দিয়েছিলেন, তার জন্য একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

ফুলবাড়ি। 

ঠিক বাতিঘরের পাশে একটি ছাত্রসম্মেলন ডেকেছেন কুমারচন্দ্র। আশেপাশের পাঁচ-ছয়টি বিদ্যালয়ের ছাত্রদের জমায়েত হয়েছে। 
অনন্তপুর জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সূর্যকান্ত চক্রবর্তী, ডাক্তার অমূল্যচরণ খাটুয়া,ডাক্তার জনার্দন হাজরা,ডাক্তার নিত্যগোপাল দাস উপস্থিত ছিলেন।
ছাত্রসভায় প্রত্যেকে শিক্ষার গুরুত্ব এবং যথার্থ শিক্ষালাভের মাধ্যমে কীভাবে দশের একজন, দেশের একজন হয়ে কাজ করা যায়,তার সহজ সরল ব্যাখ্যা দিলেন।
কুমারচন্দ্র ছাত্রদের দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে নিলেন।তারপর বললেন,ছাত্ররা যদি সঠিকভাবে বুঝতে পারে দেশ কী, তাহলে ইংরেজ সরকার কেন, পৃথিবীর কোনো সরকার আমাদের পরাধীন করে রাখতে পারবে না!
কিন্তু এই দেশের সংজ্ঞা বোঝার আগে তোমাদের পড়াশোনা করতে হবে। একে-অপরের সহযোগী হতে হবে। তোমরা দেশকে ভালোবাসবে,তার আগে নিজের ভাইকে ভালোবাসো। সে ভাই যে ধর্মের হোক,হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সবাই এক মায়ের সন্তান।
নিজের দেশকে বুঝতে হলে আগে নিজের গ্রামকে বুঝতে হবে।দেশনায়কদের কথা বুঝতে হলে আগে 
নিজের মাস্টারমশাইয়ের কথা মন্ত্রের মতো মেনে চলতে হবে।তবেই কিছু কাজের কাজ হবে।আর একটি কথা সর্বদা মনে রাখবে,এই দেশ আমাদের, এই গ্রাম আমাদের, এই দেশের মানুষ,এই গ্রামের মানুষ আমাদের শক্তি,সম্পদ এবং আগামীর ভবিষ্যৎ। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের জন্য ভাবো,ঘরে ভাবো,বাইরে ভাবো,একে অপরের পাশে থাকো।
এই সব কাজ করতে গিয়ে কেউ যদি ঠকায়,তোমরা কোনোদিন ঠকানোর চিন্তা করবে না।
সকলে আমার সঙ্গে সমস্বরে বলো,ঠকিলেও ঠকাইব না।
বলো, একসঙ্গে বলো, 
গোটা সভা একটা স্রোতের মতো চিৎকার করে উঠল,ঠকিলেও ঠকাইব না। 
আবার বলো
তারা আবার চিৎকার করে বলে উঠল।
যেন গোটা সভাতে একটা মন্ত্র উচ্চারণের ঝড় উঠেছে।

এরপর কুমারচন্দ্র মঞ্চের ওপর দুজন ছাত্রকে ডেকে নিলেন।
তারা দুজন মঞ্চের ওপর দাঁড়াল।
কুমারচন্দ্র তাদের বললেন,তোমার একে একে জোর গলায় তোমাদের নামগুলো বলো?
একজন ছাত্র এগিয়ে গিয়ে বলে উঠল,মহাদেব 
অপরজন এগিয়ে গিয়ে বলল,ইসমাইল। 
কুমারচন্দ্র আবার বললেন,আবার বলো
তারা আবার চিৎকার করে তাদের নাম বলল।
তারপর কুমারচন্দ্র দুজনের হাতে দুটো রাখি দিলেন।
তারপর বলে উঠলেন, ১৯০৫ সালে রাখিবন্ধন উৎসব উপলক্ষ্যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ একটি গান লিখেছিলেন। যে গানের আবেগ ও ভাষা আমাদের প্রত্যেক বাঙালিকে ছুঁয়ে গেছিল। সেই গানের উত্তাল উচ্চারণ শুনে বৃটিশ সরকার পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেছিল। স্বয়ং কবিগুরু পায়ে হেঁটে মসজিদে ও গুরুদ্বারে গিয়ে রাখি পরিয়েছিলেন। আমরা সবাই সেই গান করব এবং সেই গানের সঙ্গে সঙ্গে মহাদেব ও ইসমাইল একে-অপরকে রাখি পরাবে।
ঠিক আছে, গান শুরু হোক।
বলা মাত্র পূর্বে থেকে শেখানো পাঁচজন ছাত্র সমবেত সংগীত শুরু করল।
" বাংলার মাটি,বাংলার জল, বাংলার বায়ু,বাংলার ফল
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান
বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন 
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।"

সেই গানের সঙ্গে সঙ্গে যখন মহাদেব ও ইসমাইল একে-অপরকে রাখি পরিয়ে দিল,তখন গোটা সভা হাততালিতে ভরে গেল।
তার মধ্যে সহসা সূর্যকান্ত এগিয়ে এসে কুমারচন্দ্রের কানে কানে কী যেন বললেন।
শুনেই কুমারচন্দ্র শুধু জিজ্ঞেস করলেন,কোথায়?

ঐ যে সভার কাছাকাছি একটি গাছের তলায়।

চলো।

বলেই সভা ভেঙে গেল এবং কুমারচন্দ্র হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন গাছতলায়।
সেখানে একটি ছাত্র গাছের গায়ে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে।তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে।
তারপাশে তারই বয়সী একটি বালক।
সে মৃদুস্বরে বলল,সকাল থেকেই জ্বর, বার বার বারণ করা সত্ত্বেও এই সভায় এসেছে। বাধা দিতে গেলে বললে,কুমার স্যর ডেকেছেন,যেতেই হবে।
সেই দুর্বল শরীরে এসেছে।
কিছুক্ষণ পরেই এমন অসুস্থ হয়ে পড়ে,যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না!
কুমারচন্দ্র নিচু হয়ে বসে পড়লেন সেই ছাত্রটির পাশে।মাথায় হাত দিয়ে দেখলেন,বেশ গরম।
তিনি মঞ্চের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,জনার্দন, এসো, তাড়াতাড়ি। 
জনার্দন ছুটে এসে সেই ছাত্রটির জ্বর দেখলেন। তারপর বললেন,এখুনি ইঞ্জেকশন দিতে হবে।
তাহলে চলো।
বলেই কুমারচন্দ্র ছাত্রটি কোলে তুলে নিয়ে এগোতে লাগলেন।
সামনে একটি গরুর গাড়ি ছিল।
তাতে বসিয়ে কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলেন।সেখানেই ডাক্তার জনার্দন ছাত্রটিকে ইঞ্জেকশন দিলেন।
দুদিন পরে।
ছাত্রটি একটু সুস্থ হল।
চোখ খুলেই ছাত্রটি বলে উঠল,ঠকিলেও ঠকাইব না। 
ডাক্তার জনার্দন ও নিত্যগোপাল মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। 
কুমারচন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন,এই শরীর নিয়ে কেউ কোনোদিন সভায় যায়?

ছাত্রটি করুণকণ্ঠে বলল,না গেলে,কী করে হবে,আপনি ডেকেছেন,আপনার কথা আমার কাছে বেদবাক্য। 
সে কথা বলছে বটে,কিন্তু তার আচরণে একটা অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তার পাশে একজন মহিলা বসে আছেন। তাকেও খুব চঞ্চল দেখা যাচ্ছিল। জানা গেল,সে ছাত্রটির বিধবা দিদি।

তা তোমার নাম কী?ছাত্রটিকে জিজ্ঞেস করলেন কুমারচন্দ্র।

আজ্ঞে যুগলকিশোর 

ওহ্ তুমি কি হালদারদের ছেলে? 

হ্যাঁ

বেশ,এখন সুস্থ হয়ে নাও,তারপর কথা হবে।

কিন্তু আমাকে যে যেতেই হবে 

মানে? কেন?  

আমার গাঁয়ের মানুষজন মারা যাচ্ছে, কলেরায়,এই সময় তাদের পাশে থাকতে হবে।

কী বললে!কোন গ্রাম?

দণ্ডীপুর 

আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি সুস্থ হও, আমি কথা দিচ্ছি, নিজে গিয়ে সবকিছুর ব্যবস্থা করব।

কুমারচন্দ্রের কথা শুনে ছেলেটি যেন স্থির হল। সে জানে,কুমার স্যর,এমন মানুষ,কাউকে কথা দিয়েছেন তো,সে কথার নড়চড় হবে না!

কুমারচন্দ্র সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেলেন দণ্ডীপুর।গ্রামে প্রবেশ করে বুঝলেন,কলেরা রীতিমতো তার সর্বগ্রাসী ছোবল দিয়ে ফেলেছে। আবার ভয়ংকর সত্যি এই, শুধু দণ্ডীপুর নয়, মনোহরপুর, গুয়াবেড়্যা পর পর গ্রামগুলোতে মড়ক লেগে গেছে। 
একটি কঙ্কালসার বয়স্ক লোক বুকে হেঁটে পুকুরের পাড়ে এসে হাঁপাচ্ছে।নিশ্চিত প্রচণ্ড জলতেষ্টায় কাতর।কিন্তু বাড়িতে কেউ জল মুখে তুলে দেওয়ার নেই! তাই নিজেই বুকে হেঁটে পুকুরের কাছে চলে এসেছে। জল খেতে গিয়ে বিপত্তি, পাড় থেকে মুখ বাড়িয়ে জল খেতে গিয়ে পড়েই যাচ্ছিল, কুমারচন্দ্র ছুটে গিয়ে তার হাতটি ধরে ফেললেন। তারপর নিজেই হাতের তালুতে জল এনে খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন।
লোকটি জল খেয়ে স্থির হল।
আঙুল তুলে নিজের গৃহটি দেখাল। সেই সঙ্গে অতি কষ্টে কী সব বলতে লাগল,বোঝা গেল না!
অনতিদূরে একটা মাঠ পেরিয়ে খড়ের চালার ঘর। জল পানের জন্য মাঠটা বুকে হেঁটে এসেছে। সেখানে লোকটি যেতে চায়।
কিন্তু তাকে কোলে তুলতে হলে আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কারণ মলমূত্রাদিসহ বমি-টমি তার সর্বাঙ্গে লেগে আছে।তাই একটা দুর্গন্ধ থেকে থেকে বড্ড পীড়া দিচ্ছে। 
কুমারচন্দ্র নিজের কাঁধ থেকে জিনিসপত্রের ঝোলাটি নামালেন।তার ভেতর থেকে একটি ঘটি বের করলেন। তারপর পুকুরের জল দিয়ে সযত্নে লোকটির শরীর পরিষ্কার করে দিলেন।
লোকটি কেঁদে চলছিল।
জনার্দন ডাক্তার সেই কাজে হাত লাগিয়েছিলেন।
তারপর কুমারচন্দ্র তাকে কোলে করে নিয়ে মাঠ পেরিয়ে সেই ঘরে নিয়ে গেলেন।
ঘরের ভেতর ঢুকে কুমারচন্দ্র থমকে দাঁড়ালেন। একজন মহিলা একরাশ খড়ের ওপর চোখ উলটে পড়ে আছে।
দেখে বোঝা যায়,কিছুক্ষণ আগে মৃত্যু হয়েছে। 
এই জন্য বুঝি লোকটি কাঁদছিল। 
লোকটি এবার অতি করুণকণ্ঠে বলে উঠল,শ্যামা,মা-রে, আর একটা দিন কাটাতে পারলি না!
কুমারচন্দ্র অতি দ্রুত সৎকারের ব্যবস্থা করলেন।নিত্যগোপালসহ কয়েকজন সেই কাজে এগিয়ে এলেন।
অন্যদিকে সেই লোকটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হল।
এইভাবে সারা গ্রামে কুমারচন্দ্র ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। দু-তিনদিনের মধ্যে কতজন কলেরায় একেবারে মরণাপন্ন তার চিহ্নিতকরণ করলেন। তাদের জন্য একটা চণ্ডীমণ্ডপ তলায় ক্যাম্প তৈরি করলেন। যাতে সেখানেই একসঙ্গে চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা যায়।
তারপর গাঁয়ের পুকুর,রাস্তাঘাটের নোংরা পরিষ্কার এবং ঘরে ঘরে জীবাণুনিরোধক পাউডার ছড়ানোর কাজ করতে লাগলেন।
এইভাবে সাতদিন কেটে গেল।
একদিন বিকেলবেলা। 
একটি রোগী প্রায় মৃতপ্রায়। 
একটু আগে তার মাথাটি কোলে নিয়ে বসে ছিলেন কুমারচন্দ্র। কারণ লোকটি ঘন ঘন বমি করছিল।
একটি কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করে চলেছেন কুমারচন্দ্র। অমূল্য ডাক্তার ইঞ্জেকশন দিয়েছেন।
তা সত্ত্বেও তার বক্তব্য, এই রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
কিন্তু হাসপাতাল সেই তমলুকে।
এতটা পথ অতিক্রম কীভাবে হবে সেই চিন্তা কুমারচন্দ্র করছিলেন। একটি যদি ঘোড়ার গাড়ি পাওয়া যেত তাহলে খুব সুবিধা হত।
এইসব অঞ্চলে একমাত্র কোনো জমিদারের বাড়িতে এই ধরণের গাড়ি পাওয়া সম্ভব। 
তাও চেষ্টা করেছিলেন। সূর্যকান্তকে পাঠিয়ে ছিলেন,স্থানীয় জমিদারের গৃহে।
কিন্তু সূর্যকান্তের প্রস্তাবে সেই জমিদার সবকিছু শুনে প্রচণ্ড রাগান্বিত হন। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে গেট থেকে বের দিয়েছে।
জমিদারের নায়েব নাকি হাসতে হাসতে বলে উঠেছে,গরীবের ঘোড়ারোগ বলে একটা কথা আছে না! আরে ওগুলো জন্মায় মরে যাবার জন্য, ওদের কোনো জীবনের কোনো দাম আছে!
সেই সূর্যকান্ত মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন।
কুমারচন্দ্র একজনকে পাঠিয়েছেন বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের কাছে।কিন্তু বীরেন শাসমল এখন কলকাতায় আছেন।
তাই তার ফিরে আসতে দুদিন লাগবে।
কী করবেন এইভেবে প্রচণ্ড অস্থির হয়ে উঠলেন কুমারচন্দ্র। 
চোখের সামনে যেখানে মানুষ সুচিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে, সেখানে দেশ স্বাধীনতার জন্য মঞ্চ বেঁধে বক্তব্য করার কী দরকার জানা নেই তাঁর। তাই যখন মেদিনীপুর জেলার কংগ্রেস কর্মীরা একটা সভার আয়োজন করতে প্রধান বক্তা হিসেবে কুমারচন্দ্রকে নিতে এলেন,তখন কুমারচন্দ্র তাদের মুখের ওপর বললেন,এই সভার জন্য যে পয়সা তুলেছেন,তাতে একটা ঘোড়ার গাড়ি কিনুন, সেটা অনেক বেশি কাজ দেবে।
তাঁরা বলে উঠলেন, এ কিন্তু গান্ধিজির নির্দেশ,মানুষের মধ্যে কংগ্রেস দলের গুরুত্ব ও দায়িত্ব বোঝানোর জন্য এই সভা।আপনি সেই দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন,তাই আপনাকে যাওয়া উচিত। 
কুমারচন্দ্র দৃঢ়কণ্ঠে বলে উঠলেন, আমিও গান্ধিজির নির্দেশ মেনে কাজ করছি,এক কাজ করুন, আপনরা মঞ্চের ওপর সালাম,আমি মঞ্চের নিচটা সামলাচ্ছি। 

কংগ্রেস কর্মীরা এসব শুনে অবাক হয়ে গেল।তাঁরা কিছুক্ষণ গজগজ করতে করতে ফিরে গেল।
কুমারচন্দ্র সেই লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বললেন,একবারও এই অসহায়,অসুস্থ মানুষের কথা বললেন না! সত্যি! এভাবে এঁরা দেশসেবা করবেন।
অন্যরা চুপ করে শুনছিল।
ঠিক সেই সময় একজন ছাত্র উপস্থিত হল।তার চুল উশকো-খুশকো, মুখটা রোদে পুড়ে কালো হয়ে গেছে।তার চোখে যেন একটা আতঙ্ক কাজ করছে।
তাকে দেখে কুমারচন্দ্র বলে উঠলেন, আরে যুগলকিশোর, কেমন আছো? জ্বর ছেড়েছে তোমার? 

স্যর,আমার মাকে বাঁচান,গত দুইদিন ধরো কলেরায় ভুগছে,আজ তাঁর অবস্থা সঙ্গীন,আপনি একটু চলুন।

তাই, আচ্ছা,কোনো ভয় পেও না,আমার সঙ্গে যাঁরা আছেন,এঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ করা সব ডাক্তার। কোনো চিন্তা নেই। 

চলুন একবার 

হ্যাঁ,তারপর সেই মুমূর্ষু লোকটির পরিবারের একজনকে বললেন,আমি সংবাদ পাঠিয়েছি,বীরেন শাসমল একটা ব্যবস্থা করবেন।

বলেই তিনি সেই গৃহের বারান্দা থেকে বাইরে এসে দাঁড়াতে গেলেন। সহসা চোখের সামনে অন্ধকার দেখলেন। মাথাটা দুম করে ঘুরে গেল।
কুমারচন্দ্র নিজেকে টাল সামলাতে না পেরে ধপ্ করে মাটিতে পড়ে গেলেন।
কুমারবাবু কী হল আপনার? 
সকলেই প্রায় চিৎকার করে উঠলেন।

তারপর কুমারচন্দ্রের আর কোনোকিছু মনে নেই। তিনি অন্যের রোগের জন্য সেবা করতে করতে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
দুদিন পর।
বাসুদেবপুরে নিজের গৃহের বারান্দায় মাদুরে শুয়ে আছেন।ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখেছেন,এই রোগ মারাত্মক বিসূচিকা। 
ঘনঘন বমি এবং পাতলা পায়খানা হয়ে যাচ্ছে। তাতে কুমারচন্দ্রের কোনো হুঁশ নেই। তিনি যখন চোখ খুলছেন,বাইরের কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না,কারও কোনো কথা শুনতে পাচ্ছেন না!
যদি দেখতে পেতেন বা শুনতে পেতেন তাহলে বুঝতে পারতেন,তাঁর এই অবস্থার জন্য তাঁর অনুগামীরা কীভাবে দিনরাত এক করে দিচ্ছে সেবায় ও যত্নে।এবং আরও একজন নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন,যাঁর চোখের পাতা কেউ এক করতে কেউ দেখেননি!  তিনি যেন সেবময়তার জাগ্রত দেবী। তিনি চারুশীলা। 
এতো বমি, এতো পায়খানা নিজের হাতে পরিষ্কার করছেন,অথচ মুখে কোনো বিরক্তি নেই, কোনো মন্তব্য নেই, কোনো নির্দেশ নেই। 
ডাক্তার যেরকম বলছেন,তাই বাধ্য ছাত্রীর মতো করে চলেছেন।
কুমারচন্দ্র অর্ধ জাগ্রত অবস্থায় মাঝেমধ্যে নিজের পেটে ধরে কেঁদে ওঠেন। হাতে সহস্র পিন ফুটলে যেমন যন্ত্রণা হয়,তেমনি তলপেটে প্রচণ্ড যন্ত্রণা। মুখে কিছু দিলেই হড় হড় করে বমি হয়ে যাচ্ছে। 
কুমারচন্দ্র যেন জাগ্রত-অজাগ্রত অবস্থার একটা আশ্চর্য জগতে পড়ে আছেন।কী যে হচ্ছে?  কেন হচ্ছে?  কিছুই বুঝতে পারছেন না!
সহসা কুমারচন্দ্র দেখতে পেলেন তিনি সেই কৈশোরে ফিরে গেছেন।
সেই গরুচরানোর মাঠে।
যে মাঠে তিনি দিনের পর দিন গরু চরানোর ফাঁকে ফাঁকে বই পড়তেন। এমনভাবে পড়াশোনা করতেন,কখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল,এবং বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামত বুঝতে পারতেন না!
এইরকম একটা দুপুরবেলা। 
কুমারচন্দ্র বুঝতে পারলেন না,একি হচ্ছে! 
তিনি কী করে এই মাঠে এসে পৌঁছালেন! তাহলে কি তাঁর মৃত্যু হয়েছে!
না হলে এসব কী করে সম্ভব? 
একটি বই পড়ছিলেন। বোধদয়। বিদ্যেসাগরের লেখা।কিন্তু বইটি বড্ড ছেঁড়া।তিনি খুব যত্ন করে পড়ার চেষ্টা করছিলেন।
কিন্তু বাতাসের জন্য মাঝেমধ্যে সেই খণ্ডিত গ্রন্থের পাতা উড়ে যাচ্ছিল!
সেই রকম একটি পাতা উড়ে যেতেই কুমারচন্দ্র উঠে কুড়োতে যাবেন,সহসা দেখেন, একজন লোক হেঁটে আসছেন,তাঁর গায়ে খদ্দেরের ফতুয়া এবং ধুতি।মাথাটা ওড়িয়াবাসীদের মতো কামানো।খুবই তেজদীপ্ত চক্ষু,পায়ের তালতলার চটি। তিনি এগিয়ে এসে সেটি পাতাটি কুড়োলেন।
এবং কুমারচন্দ্রের কাছে এসে মাটিতে বসে পড়লেন।
তারপর নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটা বই বের বের করলেন। বোধদয়। একেবারে নতুন ঝকঝকে। সেটি হাতে তুলে দিলেন কুমারচন্দ্রের হাতে।
তারপর জলদগম্ভীর স্বরে বললেন,কুমার এই বইটি তোমার খুব প্রিয় না! এবার আর কষ্ট করে পড়তে হবে না,এটি তোমাকে দিলাম।
কুমারচন্দ্র অবাক দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন। তিনি যাঁকে সামনে দেখছেন,তা যদি সত্যি হয়,এতো জীবনের পরম সৌভাগ্য! 

আ-আপনি এখানে এসেছেন! আ-আপনি বিদ্যাসাগর!ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর! 

হ্যাঁ,লোকে আমাকে তাই বলে ডাকে।তা এখন কেমন লাগছে তোমার? 

'বোধদয়' বইটিকে বার বার মাথায় ঠেকিয়ে কুমারচন্দ্র বলে উঠলেন, স্বয়ং বিদ্যাসাগর বিদ্যার বই যার হাতে তুলে দেন,সে কী আর অবিদ্যায় থাকতে পারে! কিন্তু কি জানেন,ছোটবেলায় এই বইটি কত সন্ধান করেছি,কত কষ্ট করেছি,বই পড়ার জন্য, তা আপনাকে কী আর বলব!

কিছু বলতে হবে না,আমি সব জানি।

তা ঠিক, আপনি দয়ার সাগর, আপনার পায়ের ধূলি যার মাথায় ওঠে,তার জীবন ধন্য।এই বইটি আমি কোনো কাছছাড়া করব না।খুবই মন দিয়ে পড়ব।

বিদ্যাসাগর খুব খুশি হলেন।বেশ এবার একটি গান শোনো। কই হে আব্দুল ফকির, এসো।
সঙ্গে সঙ্গে কুমারচন্দ্র দেখতে পেলেন তাঁর পাশে আবদুল ফকির বসে আছে। তাঁকে দেখে কুমারচন্দ্র বিস্মিত হয়ে গেলেন।
একি! 
আব্দুল ফকিরের বয়স এতো কমে গেল কেন?
এতো সেই ছোটবেলায় যেমন দেখেছিলেন,এ তো সেই রকম আছেন।
বিদ্যাসাগর বললেন,আব্দুল আমার প্রিয় গানটি শোনাও তো 
আবদুল অতি বিনয়ের সঙ্গে মাথা নত করে বলে উঠল, যে আজ্ঞা কর্তা।
বলেই তাঁর সুমিষ্ট কণ্ঠে গেয়ে উঠলেন, 

"তুমি আপনি মাতা,আপনি পিতা 
আপনার নামটি রাখবো কোথা,সে নাম হৃদয়ে গাঁথা 
আমার গোঁসাইচাঁদ বাউলে বলে,সে নাম ভুলাবো না রে প্রাণ গেলে!
তুমি আপনি অসার,আপনি হও সার
আপনি হও সে নদীর দু'ধারে,আপনি নদীর কিনার 
আমি অগাধ জলে ডুব দিতে যাই,সে নাম ভুলবো 
নারে প্রাণ গেলে।
আপনি তরা,আপনি সারা,আপনি জরা,আপনি মরা
আপনি হও সে নদীর পাড়া,আবার আপনি হও সে
শ্মশানকর্তা গো
আপনি হও সে জলের মীন,ও নিরঞ্জন, তোর
কোথায় গো সাকিম
আমি ভেবে চিন্তে হলেম ক্ষীণ। 

কোথায় ভুলে রয়েছে ও নিরঞ্জন নির্ণয় করবে কে রে?"

কুমারচন্দ্র দেখলেন,গান শুনে বিদ্যাসাগরের চোখে জল।তিনি মৃদুস্বরে বলছেন,আহ্ কোথায় ভুলে রয়েছে ও নিরঞ্জন নির্ণয় করবে কে রে? 

সহসা কুমারচন্দ্রের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল!
একটা কুয়াসার চাদর সামনে এলো।সেটা একটু পরিষ্কার হতেই কুমারচন্দ্র দেখলেন কোথায় বিদ্যাসাগর? কোথায় আব্দুল ফকির?  সব কোথায় হারিয়ে গেছেন!
সহসা পিতার কণ্ঠ পেলেন, কী রে কুমার,কত ঘুমাবি? এই  দ্যাখ বাবা, কে তোকে দেখতে এসেছেন? 

কুমারচন্দ্র ভালো করে চোখটা মুছে নিলেন। তিনি নাকি ঘুমোচ্ছিলেন! কোথায় তাঁর তো মনে নেই, তাঁর মনে হচ্ছে, তিনি যেন অন্ততকাল জেগে আছেন!
তারপর কুয়াসা কাটতে দেখলেন,একি দৃশ্য!  স্বয়ং গান্ধিজি এগিয়ে আসছেন,তাঁর হাত ধরে আছেন ঠাকুরদাস। 
পিতার হাত ধরে ধীর পদে এগিয়ে আসছেন!
গান্ধিজি মুখে বলছেন,কী হল কুমার?  এটা মনে আছে তো, " এককার্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন" মনে আছে তো? মনে আছে তো?

একথা বলতে বলতে সহসা গান্ধিজি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন।
কুমারচন্দ্র আঁতকে উঠলেন।
গান্ধিজি পড়ে গেছেন! গান্ধিজি পড়ে গেছেন!

তারপর শুনলেন, কী হলো গো? কে পড়ে গেছেন?
একটি নারীকণ্ঠ।

কুমারচন্দ্র ধড়ফড় করে বিছানায় বসে পড়লেন।চারিপাশে অন্ধকার। ঘরের এককোণায় একটি প্রদীপ জ্বলছে।
তাতে যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে দেখলেন,চারুশীলা পাশে বসে আছেন!
কী হলো গো?

মনে হল গান্ধিজি পড়ে গেছেন? কাঁপতে কাঁপতে বললেন কুমারচন্দ্র।

না,না,কেউ পড়ে যায়নি! তুমি স্বপ্ন দেখছিলে!

ওহ্ স্বপ্ন!  আচ্ছা এখন কত রাত?

ভোর হতে আর বাকি নেই! 

আচ্ছা, আমার শরীরে এতো টান লাগছে কেন? কী হল আমার? 

তুমি চার-পাঁচদিন পরে এই প্রথম উঠে বসলে,তোমার শরীরে কাদা-জলের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। 

কী? কী বলছ? জনার্দন, নিত্যগোপালরা কী করছে?

ওরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে এই চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে।শুধু অ্যালোপথিতে কাজ হচ্ছিল না!

তাই? আমার এতো খারাপ অবস্থা ছিল!

সেই কথার কোনো উত্তর দিলেন না চারুশীলা দেবী।

তাহলে কে এই চিকিৎসা করছে? কেশবচন্দ্র? 

হ্যাঁ,সুতাহাটার বিখ্যাত স্বভাব ডাক্তার কেশবচন্দ্র প্রামাণিককে ডাকা হয়েছিল। তিনি কাদা-জলের টোটকা লাগিয়ে দিয়েছেন। তাতে তো একটু একটু সুস্থ হচ্ছেন।এর আগে তো যম-মানুষে টানাটানি চলছিল!

তাই,আচ্ছা, তাই এতো পেটে ও পিঠে চিড়চিড়ে টান অনুভব করছি

আসলে ওখানে কাদামাটি শুকিয়ে গেছে তো,তাই ওরকম লাগছে, একটু দাঁড়াও,আমি তুলে দিচ্ছি 

না, থাক,সকাল হতে বেশি বাকি নেই, আমি বেশ সুস্থবোধ করছি,একটি বার দণ্ডীপুর যেতে হবে,সেখানে অনেক কাজ বাকি থেকে গেছে!

আতঙ্কিত হলেন চারুশীলা দেবী,মুখে বললেন,এই শরীর নিয়ে! এই সবে তো বিছানায় উঠে বসলে!
আরও বিশ্রাম দরকার।

না গো, আমি বেশ সুস্থ, আমি পারব,ওহ্ আমার কাছে যুগলকিশোর এসেছিল,তার মায়ের অবস্থা খারাপ ছিল, সেটা দেখতে হবে!

চারুশীলা দেবী মৃদুস্বরে বলে উঠলেন, যুগলের মা মারা গেছেন

অ্যাঁ! কী বললে! 

চারুশীলা দেবী নীরব।

কুমারচন্দ্র আবার বিছানায় শুয়ে পড়লেন।এক অপরিসীম বেদনায় তাঁর দুচোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল...


ক্রমশ....

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯