দূরদেশের লোকগল্প— আরব (ওমান)/তিন রাজপুত্তুরের জামাই আদর /চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প— আরব (ওমান)
তিন রাজপুত্তুরের জামাই আদর

চিন্ময় দাশ


অনেক কাল আগের কথা। আরব সাগরের কোলের দেশ ওমান। সেখানে বড় বড় মরুভূমি পার হয়ে, ওমানের উপর দিয়ে একটা রাস্তা এসে ছুঁয়েছে  সাগরকে। উটের পিঠে মশলাপাতি, খেজুর, বাদাম, আখরোট নানান জিনিষ চাপিয়ে, সেই রাস্তা ধরে দূর দূর দেশে যাওয়া-আসা করত বণিকের দল। বাণিজ্য থেকে ধনী হয়ে উঠেছিল কতো লোক। তাদের হাতে ছোট বড় কত শহর নগর গড়ে উঠেছিল সেই রাস্তার দু’ধারে। 
তেমনই একটি নগরে বাস করত এক রাজা। একটিই মেয়ে সেই রাজার। দেখতে দেখতে বিয়ের বয়স হয়েছে সুন্দরী মেয়েটির। আসা যাওয়া শুরু হয়েছে ঘটকের। রাজার ছেলেরাও চলে আসে কখনওবা। 
একদিন হয়েছে কী, তিন-তিন রাজার ছেলে একসাথে এসে হাজির। দেউড়ির ঘন্টা বাজিয়েছে ছেলেরা। সেপাই গিয়ে দ্যাখে, এক সাথে তিন মূর্তি। 
রাজার হুকুমে ভিতরে আনা হোল তাদের। রাজার পাশে বসে আছে তাঁর সুন্দরী মেয়েটিও। দুটি খর চোখ মেলে, ছেলেগুলোকে জরীপ করছে মেয়েটি। 
জরীপ শেষ হলে, মেয়েটি ফিসফিস করে বলল—দোহাই তোমার বাবা, এদের কাউকে বিয়ে করতে বোল না আমাকে। 
--কেন রে,মা? কী হোল?
মেয়ে বলল—প্রথম জনকে দ্যাখ, কেমন দেমাকি? মাঝের জনের পোশাকটা দেখেছো খেয়াল করে? কী বিচ্ছিরি, কী বিচ্ছিরি! 
রাজা বলল—আরও তো একজন আছে। 
মেয়ে বলল—ওই গোবেচারাকে আমি বিয়ে করতে পারব না। 
ভারি আদরের মেয়ে রাজার। জোর করে তার বিয়ে দেবে না কোনমতেই। এদিকে যে ছেলেকে ফিরিয়ে দেবে, তার বাবা লেগে এক্সাবে ষত্রুতা করতে। পড়শি রজাদের চটানোটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। 
রাজা ছেলেদের বলল—দেখা শোনা হোল। একটু ভেবে নিই আজকের দিনটা। আগামীকাল এসো তোমরা।
পরদিন তিন রাজপুত্র আর মেয়েকে নিয়ে বসেছে রাজা। রাজা বলল— তোমরা তিনজনেই আমার মেয়ের উপযুক্ত। কিন্তু বাপুরা, তিনজনেই তোমরা একসাথে এসে হাজির হয়েছ। কার হাতে দেব মেয়েকে? 
তিন ছেলেই চাইছে, তার সাথেই বিয়ে হোক এই মেয়ের। রাজা বলল—তোমাদেরই বুঝিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে, কে আমার মেয়ের উপযুক্ত। এক কাজ করো তোমরা। সামনে বিশাল দুনিয়া পড়ে আছে তোমাদের। আজই বেরিয়ে পড়ো তোমরা। ঠিক এক বছর এক দিন বাদে, কোনও একটা জিনিষ নিয়ে, ফিরে আসবে আমার এই দরবারে। যার জিনিষটি সেরা হবে, সেই ছেলেই পাবে আমার মেয়েকে। 
রাজার মেয়ে ভারি খুশি, এক বছর অন্তত রেহাই পাওয়া গেল! আপাতত বোঝা নেমে গেল ঘাড় থেকে, রাজাও কম খুশি নয়।
একসাথে বেরিয়েছে ছেলে তিনটি। হপ্তাখানেক চলবার পর, একটা চৌমাথায় পৌঁছেছে তারা। সেখানে রাস্তার মধ্যিখানে একটা কুয়ো
প্রথম ছেলেটা বলল—আর এক সাথে নয়। এবার আলাদা আলাদা রাস্তা ধরেই যেতে হবে আমাদের।
বাকি দুজনও সায় দিল সে কথায়। ঠিক হোল, বছর ফুরোবার এক সপ্তাহ আগে, ঠিক এখানটিতে এসে মিলিত হবে তিনজনে।
নিজের নিজের মতো করে নানান দেশ ঘুরেছে তিনজনে। কথামত, সঠিক দিনেই সেই চৌরাস্তায় এসে আবার মিলিত হোল তারা। কুশল বিনিময়ের পর, শুরু হোল কার কপালে কী জুটেছে, তার আলোচনা। 
প্রথম ছেলেটা বলল—আমি পেয়েছি বড় আকারের একটা স্ফটিক। এটার গুণ হোল, এখনই গোটা দুনিয়ার কোথায় কী ঘটছে, চাইলে এটার ভিতর দিয়ে দেখতে পাবে তুমি। 
দ্বিতীয় ছেলে বলল—আমি পেয়েছি একটা যাদু গালিচা (কার্পেট)। এটায় চেপে, চাইলে এক লহমায় দুনিয়ার যে কোন জায়গায় চলে যেতে পারা যাবে।
তৃতীয় ছেলে একটা কৌটো বের করল জোব্বার পকেট থেকে। বলল—যাদু মলম আছে এতে। এক ফোঁটা তুলে বুলিয়ে দাও, মূমুর্ষুও উঠে দাঁড়াবে প্রাণ ফিরে পেয়ে। আরও কী বলেছে জানো, সত্যি সত্যি ভালোবেসে লাগালে, যৌবনও ফিরে আসে এর ছোঁয়ায়। 
দ্বিতীয় ছেলেটার অন্য কথায় কান নাই। সে প্রথমকে বলল—আচ্ছা ভাই, তোমার স্ফটিকে যদি গোটা দুনিয়া দেখা যায়, তাহলে একবার রাজার মেয়েকেই দেখি এসো এখন। কতটা সুন্দরী সেই মেয়ে, ভালো করে দেখা হয়নি সেদিন।
স্ফটিকটা  তো হাতেই ছিল প্রথমের। মুঠো খুলে তাতে একবার হাত বুলিয়ে দিল ছেলেটা। ঝাপসা ভাব কেটে গিয়ে, এখন সেটা দেখাচ্ছে ঝকঝকে একটা আয়নার মত। আর, সত্যিই অবাক করা ব্যাপার! রাজকুমারীকে দেখা যাচ্ছে তাতে।
কিন্তু কিছু একটা ঘটেছে নিশ্চয়। বিছানায় শুয়ে আছে সেই মেয়ে। নড়া নাই, চড়া নাই। মুখখানি শীর্ণ আর ফ্যাকাশে, একেবারে মড়ার মত। তার বাবা রাজামশাই ঝুঁকে আছে মেয়ের ওপর। রাজবৈদ্য একেবারে পিছনটিতেই।  
রাজা আকুল সুরে জানতে চাইল—কিছুই করতে পারবে তুমি? 
এই ক’দিন আমার সাধ্যমত করেছি আমি। ঔষধ কাজ করছে না আর। মাথা নামিয়ে বৈদ্য বলল—সত্যি বলতে কী, সময়ও আর বেশি বাকি নাই সব শেষ হয়ে যেতে।
চমকে উঠেছে তিনটি ছেলেই। তৃতীয় জন বলল—কিছুতেই মরতে দেওয়া যাবে না এই মেয়েকে। মলম আছে আমার হাতে। একবার কপালে বুলিয়ে দিতে পারলে, আর ভাবনা ছিল না। কিন্তু এখনও সাত দিন দূরে আছি আমরা।  
--চটপট সবাই আমার কার্পেটে চড়ে পড়। দ্বিতীয় জন কার্পেট বিছিয়ে ফেলেছে বলতে বলতে। -- চোখের পলক পড়তে পাবে না। রাজবাড়িতে পৌঁছে যাব আমরা। 
সত্যি সত্যিই, যাদু আছে কার্পেটে। মুখের কথা ফুরোয়নি। রাজার মেয়ের পালঙ্কের পাশটিতে হাজির তিনজনে।
রাজা আর বৈদ্য ছাড়া, আরও অনেকেই ছিল সেই ঘরে। তিনজনের এমন আচমকা আবির্ভাবে, সবাই হতভম্ব। যেন মাটি ফুঁড়ে উঠে এল তিনটে মানুষ। কেউ কিছু প্রশ্ন করবার আগেই, তৃতীয় ছেলেটি পৌঁছে গেছে বিছানার পাশে। আঙ্গুল ডুবিয়ে মলম তুলেছে কৌটো থেকে। আলতো করে বুলিয়ে দিতে লাগল রাজার মেয়ের কপালে।
মলমের কৌটোটা পালঙ্কে রাখছে, ততক্ষণে পিটপিট করে চোখ দুটো খুলে ফেলেছে মুমূর্ষু মেয়ে। একটু বাদে উঠেও বসল আড়মোড়া ভেঙে—বাব, এখন বেশ একটু ভালো লাগছে শরীরটা। 
রাজা যতটা আনন্দিত, আশ্চর্য হয়েছে তার চেয়েও কম নয়। বলেও ফেলল—এ যে দেখছি একেবারে ভোজবাজির মত ব্যাপার। হোলটা কী করে! 
ততক্ষণে একটু হুঁশ হয়েছে মেয়ের। সামনে, মানে তার ঘরের ভেতরেই তিনটি ছেলেকে দেখে সে অবাক—আরে, এ তো সেই তিনজন! এরা আমার ঘরে কেন? এলোই বা কী করে? 
--সব বলছি তোমাকে। একটু সবুর করো, মা। রাজা তাড়াতাড়ি ছেলেগুলোকে নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মেয়ের মেজাজ মর্জি বোঝা ভার। আরও কী বলে ফেলে, তার নাই ঠিক। সরে যাওয়াই নিরাপদ।
বেশ যত্নয়াত্তি করে রাজবাড়িতে রাখা হয়েছে ছেলেদের। ভূরিভোজ করে খাওয়ানো হয়েছে।
বিকেলে দরবার বসানো হোল। রাজামশাই বসেছে মেয়েকে পাশটিতে নিয়ে। ইতিমধ্যে সব ঘটনা খুলে বলেছে মেয়েকে। তখন থেকে মেয়ের মনে ভীষণ বিরক্তি, কিন্তু মুখে কুলুপ আঁটা। 
উজির-নাজির, লোক-লস্কর সবাই হাজির দরবারে। বুড়ো হাকিমও এসেছে সভায়। চিকিতসার যাদুটা কী, মগজে ঢোকেনি বুড়োর। মনভর্তি কৌতুহল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজার পিছনটিতে। পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে অস্থিরতা কাটাতে। 
প্রথম ছেলেটি বলল—রাজামশাই, আপনার কথা মতো তিনজনে গিয়েছিলাম আমরা। তিনজনেই ফিরে এসেছি। তিনটে জিনিষও এনেছি আমরা। বলতে গেলে, সবগুলিই অত্যাশ্চর্য। 
--আমি এনেছি একটা স্ফটিক। এই মূহুর্তে, দুনিয়ার যত দূরেরই দেশ হোক না কেন, যেখানে যা ঘটে চলেছে, চাইলেই দেখা যাবে এখানে। আর, এই স্ফটিকের কারণেই আমরা দেখতে পেয়েছিলাম, আপনার মেয়ের আয়ু আর বেশিক্ষণ নয়। আপনি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন, এটাই সেরা জিনিষ। সেকারণেই, আমি রাজকুমারিকে বিয়ে করতে চাই। 
দ্বিতীয় ছেলে এগিয়ে এল কার্পেট  হাতে নিয়ে। রাজামশাই, আমার এই কার্পেটখানায় চড়ে, এক লহমায় দুনিয়ার যে কোন জায়গায় পৌঁছে যাওয়া যায়। এটা না থাকলে, রাজকুমারি শেষ শয্যায়, এ সংবাদ জেনে, কী এমন যেত আসত? আমরা ত ছিলাম সাত দিনের দূরের দেশে। এই কার্পেটে চড়েই তো এক লহমায় হাজির হতে পেরেছি এখানে। তা হলে আপনিই বলুন, আপনার মেয়ের বিয়েটা আমার সাথেই হওয়া উচিত কি না। 
ছেলেটাকে দেখেই রাজকুমারি যে নাক সিঁটকাতে লেগেছে, সেটা কেউ নজরও করেনি।
শেষ জন এগিয়ে এসে বলল—আমার বন্ধুরা ঠিক কথাই বলেছে, স্ফটিকের জন্য রাজকুমারির বিপদের খবর নিজেদের চোখে দেখেছি আমরা। কার্পেটে চড়ে পৌঁছেও গেছি চোখের পলক না ফেলতে। কিন্তু পৌঁছে হোতটা কী? হাকিম সাহেবও তো হাল ছেড়ে দিয়েছিল। আমার যাদু মলম ছিল বলেই তো রাজকুমারিকে ফিরে পাওয়া গেছে। তাহলে, আমিই নিশ্চয় সেরা জিনিষটা এনেছি।
রাজা বিভ্রান্ত। তিনজনের যুক্তিই অকাট্য। কাকে বেছে নেওয়া যায়? একজনকে বাছলে, বাকি দুজনের বাপ শত্রুতা শুরু করে দেবে। মহা ফ্যাসাদে পড়া গেল দেখছি। 
রাজা বলল—আজ রাতটুকু খাওয়া-দাওয়া বিশ্রাম করে কাটাও। কাল সকালে আমার ফয়সালা জানিয়ে দেব তোমাদের। 
কোন ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে হবে, সেটা নিয়ে রাজার ভাবনা নাই। তার দুশ্চিন্তা বাকি দুটো দেশের সাথে বিবাদ কী করে এড়ানো যায়? 
রাতে উজিরকে নিয়ে শলা-পরামর্শ করল রাজা। বুড়ো উজির বলল—হুজুর, রাজকুমারির বিয়ে আমাদের দিতেই হবে। এদিকে যে কোন দুটো রাজ্যের সাথে বিবাদের বীজ বোনা হয়ে যাবে তাতে। সেইটা এড়ানোই একমাত্র কাজ।
--আরে, এই চিন্তায় কাল সারা রাত ঘুম হয়নি আমার। কিছু একটা উপায় বার করো তুমি। অনেক রিয়াল (আরব দেশের টাকা) খেয়েছ আমার। এখন বিপদের সময় আমার। একটা কিছু উপায় তুমি করো, বন্ধু। 
উজির বলল—তাহলে, বিচারক আনতে হবে অনেক দূরের দেশ থেকে। তার বিধানই মেনে নেব আমরা। যে কোন একজনের ঘরে যাবে রাজকুমারি। বাকি দু’জন? তারা চটলে বিচারকের উপর চটবে। আমাদের কোন সমস্যা নাই। সমস্যা হলে, সেটা যাবে বিচারকের ঘাড়ে। 
রাজা তো ভারি খুশি। বলল-- এখুনি ব্যবস্থা করো তুমি। আমার আপত্তি নাই।
--কিন্তু একটা সমস্যা আছে। আমি এমন যে লোককে জানি, সে থাকে অনেক দূরের দেশে, রাশিয়ায়। লোক পাঠিয়ে আনতে যাওয়া, সেখান থেকে ফিরে আসা অনেক দিনের ধাক্কা। ততদিন ব্যাপারটা ঠেকানো যাবে কী করে?
--আরে, এটা কোন সমস্যা হোল? রাজা তো লাফিয়ে উঠল। কোন চিন্তা কোর না। আজ রাতেই আনিয়ে নেব লোকটাকে। 
উজির মাথা চুলকে বলল—আরও একটা সমস্যা আছে, হুজুর।
--আবার কী হোল? 
লোকটাকে শেষ যখন দেখেছিলাম, বলতে গেলে একেবারে থুত্থুরে বুড়ো। এতদিন টিকে আছে কি নাই,  কে জানে।
রাজা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল কথাটা—এখুনি বলে দিচ্ছি, লোকটা বেঁচে আছে কি না। তবে, রাজি করাবার দায়িত্ব তোমার। 
তিনটি ছেলের তিনটি জিনিষ জমা ছিল দরবারে। স্ফটিকে দেখে নেওয়া হোল, বেঁচে আছে মানুষটি। উজির লাফিয়ে উঠল তাকে দেখে—হ্যাঁ, এই সেই বিচারক! 
নিজেই কার্পেটে চড়ে বসল। উড়ে গেল রাশিয়া। খানিক বাদেই ফিরেও এলো বিচারককে নিয়ে। এতক্ষণে বিরাট লম্বা একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে, ধড়ে প্রাণ ফিরল রাজার।
পরদিন সকালে আবার দরবার বসেছে। রাজা বলল—আমার মেয়ের বিয়ে। আমার রায় একপেশে হতেও পারে। তাই অনেক দূরের দেশ, সুদূর রাশিয়া থেকে বিচারক আনা হয়েছে। এ মানুষটা তোমাদের চেনে না, আমাদেরও না। সব কথা, সবার দাবী খুলে বলো তিনজনে। আমি বলে রাখছি, যে রায়ই হোক না কেন, মেনে নিতে আমার বা আমার এই রাজবারির কারও, কোন আপত্তি নাই। 
ছেলেগুলো তাকিয়ে দেখল মানুষটাকে। একেবারেই থুত্থুরে বুড়ো। হাড়-পাঁজরা বের করা। শিরা ওঠা লিকলিকে হাতে, আদ্যিকালের একটা পুরাণো লাঠির ঠেকনা দিয়ে, কোন রকমে দাঁড়িয়ে আছে মানুষটি।
তিনজন ছেলেই বলল—আমাদেরও মেনে নিতে আপত্তি নাই। 
--ভালো কথা, খুব ভালো কথা। রাজা বলল-- তাহলে, আর কী? এবার তোমরা যে যার দাবি পেশ করো বিচারকের সামনে।
গতকালের চেয়ে আরও বিশদে নিজের নিজের কথা বলে গেল তিনজনেই। সবার যুক্তিই অকাট্য। কোনও ছেলের দাবীই ফেলে দেবার মতো নয়। 
রাজা বলল—এই নিয়ে দু’বার শুনলাম আমি এদের কথা। প্রত্যেকের সাথেই আমি একমত। আমার পুরো দরবার একমত। এবার বিচারকই রায় দেবে, কোন ছেলের সাথে বিয়ে হবে আমার মেয়ের। 
এদিকে বিচারকও বিভ্রান্ত। সিদ্ধান্ত নেওয়া ভারি কঠিন। কিন্তু রায় তো দিতেই হবে। কথা বলতে গিয়ে, কাশি শুরু হোল বুড়োর। কাশির ঝোঁক থামলে, আলখাল্লা তুলে মুখ মুছল মানুষটা। 
তারপর বলল—তিন জন এরা প্রত্যেকেই অত্যাশ্চর্য জিনিষ এনেছে। তিনজনের কারণেই জীবন বেঁচেছে রাজকুমারীর। অনেক দূরের দেশের মানুষ আমি। এ দেশের নিয়ম-কানুন সব জানা নাই ভালো করে। তবুও আমি বলব, বিয়েটা রাজকুমারির। সবার আগে তার মতটা নেওয়াই উচিত। রাজকুমারিই বলবে, কাকে তার পছন্দ। 
শুনে, রাজা মনে মনে প্রমাদ গুনল। সেই একই সঙ্কট আসতে চলেছে। ততক্ষণে তিনজন ছেলেই সেটা মেনে নিয়েছে। তারা বলল—তাই হোক। রাজকুমারিই তার পছন্দের জনকে বেছে নিক। আমাদের আপত্তি নাই। 
বুড়ো বিচারক বলল—তাহলে, রাজকুমারি! তুমিই বলো, কাকে তোমার পছন্দ? কাকে তুমি স্বামী হিসাবে বরণ করতে চাও?
একটু চুপ করে রইল রাজকুমারি। চোখ তুলে চাইল ছেলে তিনটির দিকে। আহ্লাদে গদগদ হয়ে বলল—আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছ তোমরা। সে কৃতিত্ব তোমাদের তিনজনেরই। সারাজীবনভর একথা মনে রাখব আমি। 
এবার বুড়ো বিচারকের দিকে ঘুরে বলল—তবে এই একজন মানুষ, যে প্রথম বলল, যার বিয়ে, পছন্দ করার অধিকার তারই। এত সম্মান এতদিন কেউ দেয়নি আমাকে। এই বিচারককেই আমার পছন্দ। আমি একেই বিয়ে করব। 
সভায় যেন বাজ পড়ল আকাশ থেকে । অন্দর মহল থেকে মহিলারাও এসে ভীড় করেছিল আজকের সভায়। তাদের দু’-একজন তো আছাড় খেয়ে পড়েই গেল মূর্ছা লেগে। রাজামশাই আঁতকে উঠে, চেঁচিয়ে বলল—বলছোটা কী তুমি? এ কখনো হতে পারে? 
সে কথায় কানই দিল না মেয়ে। আসন থেকে নেমে এল গটগট করে। বুড়োর সামনে গিয়ে দাঁড়াল খাড়া হয়ে। বুড়ো নিজেও হতভম্ব। 
রাজার মেয়ে শেষ যাদুটা দেখাল তারপর। মলমের কৌটো থেকে এক খাবলা মলম তুলে, লাঠি ধরা বুড়োর কপালে, মুখে, বুকে, হাতে ঘষে যেতে লাগল যত্ন করে।
আতেই ঘটে গেল আসল যাদু। এক লহমাও লাগল না। কোথায় গেল থুত্থুরে বুড়ো। কোথায় গেল তার লাঠি ধরা কাঁপা কাঁপা লিকলিকে দুটো হাত। দেখা গেল, সুঠাম বলশালী রূপবান এক যুবকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে  রাজকুমারি। আনন্দের বন্যা বয়ে গেল রাজবাড়িতে।
ধুমধাম করে বিয়ে গেল দুজনের। রাজ্যশুদ্ধ লোক সাত দিন ধরে ভোজ খেল চেটেপুটে। ছেলে তিনটিও ভোজ খেয়ে গেছে রাজার বাড়িতে। একেবারে যাকে বলে জামাই আদর করেই খাওয়ানো হয়েছে ছেলেগুলোকে।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. জমাটি গল্প যাকে বলে। ঝরঝরে ভাষা নদীর মত বয়ে যায়। আর শেষে কি দারুণ চমক। লেখককে অনেক অভিনন্দন।

    ReplyDelete
  2. গল্পটা দারুণ। দুয়েকটা শব্দ ঠিক বুঝলাম না। ভাষা আরেকটু ভারমুক্ত হোক, প্লিজ! রাজকুমারী বানানে 'রি' কেন?

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন