আর কবে ভাবব! ( পর্ব ৩ )/সংস্কার সু না কু ? /মিলি ঘোষ

আর কবে ভাবব! ( পর্ব ৩ )
সংস্কার সু না কু ? 
মিলি ঘোষ

 কেন জানি না, সংস্কার শব্দটির আগে 'কু'টাই ম্যাচ করে। তাই সরাসরি কু-সংস্কারেই চলে যাই। তবে যাকে আমরা কু-সংস্কার বলি, সব ক্ষেত্রে তা কু হয় না। 
যেমন ধরুন, পোশাক পরিহিত অবস্থায় সেলাই করতে নেই। হয়তো খুব সামান্য একটু ছিঁড়ে গেছে, তবুও না। একটা 'নেই' জুড়ে দেওয়া মানেই কিন্তু তা কু-সংস্কার এর আওতায় চলে গেল। কারণ, যিনি বলছেন তিনি কোনো যুক্তি দেখাতে পারলেন না। অথচ এর আসল কারণ ওই সূচের মধ্যেই নিহিত। জামাকাপড় গায় দেওয়া অবস্থায় সেলাই করতে গেলে গায় সূচ ফুঁটে যাবার সম্ভবনা থাকে। বারণ সে'জন্যই করা হয়। মুশকিল হলো যিনি বারণ করছেন, তিনি নিজেও কারণটা জানেন না। তাই পাল্টা চ্যালেঞ্জ করলে, তিনি উত্তর দিতে পারেন না। শুধু 'নেই'তে আটকে থাকেন। 
 মানুষের সহজাত ধর্ম হলো নিষেধ না মানা। তাকে বুঝিয়ে বললে, সে শুনবে না। তাই একটা 'নেই' বসিয়ে ভয় ধরানোর চেষ্টা। 'নেই'-এর মাহাত্ম্য বিশাল। এই 'নেই'তে যারা একবার ডুব দিয়েছেন, তাঁরা এর থেকে বেরোতে পারেন না। বংশ পরম্পরায় তাঁরা 'নেই'কে লালন করে চলেছেন। কাজেই যুক্তির চেয়ে 'নেই' ভালো। দুঃখের বিষয়, কখনও তলিয়ে দেখা হয় না, এর পেছনে আসল কারণটা কী। তাই যে বুঝতে চায়, শুনতে চায়, তাকেও তাঁরা বোঝাতে পারেন না। নিজে বুঝলে বা অপরকে বুঝিয়ে বললে, তা কিন্তু আর কু-সংস্কার হিসেবে গণ্য হয় না। 
 
বলা হয়, রাত্রিবেলা গাছে হাত দিতে নেই। এখানেও নেই এর পেছনে একাধিক কারণ আছে। গাছে পোকা-মাকড় বা সাপ থাকলে রাতের অন্ধকারে বা সীমিত আলোয় তা বোঝা যাবে না, এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে রাত্রিবেলা গাছে হাত দিতে বারণ করা যেতেই পারে। আরো একটা কারণ আছে। বেশিরভাগ গাছ রাতে কার্বন ডাইঅক্সাইড ছড়ায়, যা আমাদের শরীরের পক্ষে ভালো নয়। তাই রাতে গাছের কাছে না যাওয়াই ভালো। কিন্তু যেতে নেই, হাত দিতে নেই যারা করছেন, তাঁরা এর কারণ না জেনেই করছেন। দাদুর আমলে হলে মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু এই ২০২২ এ দাঁড়িয়েও যদি শহুরে, শিক্ষিত মানুষেরা শুধু 'নেই' এর বেড়াজালে নিজেকে বা অন্যকে আটকাতে চান, তাহলে মানতে কষ্ট হয়। যুক্তি দিয়ে আসল কারণটা বলুন, সবাই বুঝবে, সবাই মানবে। অন্তত সাপের ভয়ে তো মানবেই। 
তবে যারা কথায় কথায় বসতে নেই, ঘুমোতে নেই, ছুঁতে নেই, বেরোতে নেই, খেতে নেই করেন, তাঁদের 'নেই' এর গ্রাফ ব্যক্তি বিশেষে ওঠানামা করে। 
রাত্রিবেলা গাছে সাপের উপস্থিতির কথা যখন উঠলই, সে প্রসঙ্গে অন্য একটি প্রশ্ন আছে। কোন যুক্তিতে রাত্রিবেলা সাপকে, 'সাপ' না বলে 'লতা' বলতে বলা হয় ? এরকম উদ্ভট প্রস্তাব দেবার লোক আগের থেকে একটু কম হলেও একেবারে যায়নি। যারা এখনও রাত্রিবেলা 'লতা' বলে স্বস্তি পান, তারা একটু জানাবেন সময় বিশেষে শব্দ পরিবর্তনের মূল কারণটা কী। 

সদ্যজাত বাচ্চার পায়ের তলায় বা কপালে, আধুলি সাইজের একটা কাজলের টিপ হয়তো অনেকেই দিয়ে থাকেন। নজর এড়াতে। এই 'নজর'টা কী জিনিস। নজর মানে তো দৃষ্টি। বোধহয় কু-দৃষ্টির কথা ভেবেই নিষ্পাপ শিশুটিকে নিয়ে এ'খেলা চলছে নিরন্তর। এই নজর সু বা কু যাই হোক, এর সঙ্গে কি একটি শিশুর জীবন, বেড়ে ওঠা, সুস্থ থাকার কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে ? এর সাথে কাজলের টিপের যে কী অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধি আজও বোঝেনি। 
আবার বাচ্চার ভ্রু-যুগল ঠিক মতো না দেখা গেলেও মা ঠাকুমা, প্রতিবেশীদের চিন্তার অবধি থাকে না। দুশ্চিন্তা মুক্ত হতে নিজেরাই রাস্তা বার করেছেন। আই ভ্রু পেনসিল দিয়ে ওই স্থানে আঁকতে পারলে নাকি ভ্রু ওঠে। জানি ঝাঁপিয়ে পড়বেন। বলবেন, আমার মেয়ের ওভাবেই কাজ হয়েছে। ছেলেরও হয়েছে। একেবারে প্রত্যক্ষ প্রমাণ। 
বলি কি, পেনসিল না চালালেও আপনার সন্তানের ভ্রু গজাতই। একটা আই ভ্রু পেনসিল, সেটা কী দিয়ে তৈরি জানি না। সেটাকে একটা বাচ্চার চোখের খানিক ওপরে ঘষছেন। যাঁদের কথা বলছি, তাঁরা কিন্তু কেউ অশিক্ষিত না। হয়তো বা অনেকেই বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনাও করেছেন। নিউটন, আইনস্টাইন, আর্কিমিদিস একেবারে গুলে খেয়েছেন। আপনাদের বেশভূষা, জীবনযাপন সব কিছু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলেছে। শুধু মনের দরজাটা খুলতে পারলেন না। 

একটা বিষয় নিয়ে আমার মতো অনেকেই ভাবেন। সেটা হলো আমিষ ও নিরামিষ। শুধুমাত্র স্পর্শের ওপর ভিত্তি করে নিরামিষ কী করে আমিষ হয়ে যায় জানি না। তাহলে, ওই একই কারণে আমিষ কেন নিরামিষ হয় না ? এমন নয় যে এক পাত্রের খাবার জাম্প করে অন্য পাত্রে চলে গেল। হয়তো কোনো ব্যক্তি আগে আমিষের পাত্র ধরে নিরামিষ পাত্র ছুঁয়ে ফেলেছেন। তাতেই নিরামিষ খাবারটা, আমিষ হয়ে গেল। এই যুগেও মানছেন অনেকে। ওপর থেকে বুঝতেই পারবেন না তাঁদের দেখে। যিনি আজও মানছেন, তাঁর মা'ও মেনেছেন এক সময় বা এখনো মানেন। তাঁরও মা, দিদিমা মেনেছেন। এভাবেই লালিত হচ্ছে। মা, দিদিমা'র যা জীবনযাত্রা ছিল, আপনার কি তাই আছে ? সব রকম সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন, সব দিকে নিজেকে পাল্টেছেন। অথচ এইগুলো আঁকড়ে বসে আছেন। এসবই যে নির্মাণ, সেটা যদি তলিয়ে নাও ভাবেন, চোখ বন্ধ করে খেয়ে নিন। আপনার যা প্রাণে চায় খান না। যদি সামর্থে কুলায় আর ডাক্তারের নিষেধ না থাকে, আমিষ-নিরামিষ না ভেবে খেয়ে যান। যত এসব মনের মধ্যে স্থান দেবেন, মানসিক অশান্তি বাড়বে। ফলে শরীরও খারাপ হবে। নিয়ম আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। আপনি বলবেন, অনিয়মও বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু নিয়ম না মানা আর অনিয়ম করা এক জিনিস নয়। 

এবার যা নিয়ে বলব, ৯০ শতাংশ মানুষ আমার সাথে সহমত হবেন না। বিবাহিত জীবনে মহিলাদের  শা‌খা-পলা-সিঁদুর পরা নিয়ে কিছু কথা। এগুলো কেন পরেন, স্বামীর মঙ্গলের জন্য ? তা আপনার মঙ্গলের জন্য আপনার স্বামী কী পরেন ? আজকাল অবশ্য অনেকেই এসব পরেন না। কিন্তু লোহাটা তো হাতে থেকেই যায়। এই লোহাটা আসলে কী জানেন ? ওটা হলো শিকল। সে অর্থে শিকল দিয়ে আপনাকে হয়তো কেউ বেঁধে রাখছে না। কিন্তু ওই মঙ্গল টঙ্গল বাজে কথা। স্বামীর মঙ্গল চাইলে তার শরীর, মন যাতে ভালো থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। হাতে বের পরে কোন মঙ্গলটা করছেন তাঁর ? তা ছাড়া মঙ্গল চাওয়া তো কোনও একদিকে হতে পারে না। যাইহোক, সে অন্য প্রসঙ্গ। 
আর আপনার যদি এগুলো পরতে ভালো লাগে, তো পরুন না। ভালো লাগাই যদি হয়, তো বিয়ের আগেও তো পরতে পারেন। স্বামীর মৃত্যুর পরেও পরতে পারেন, যদি শুধুই ভালো লাগা থেকে পরেন। তবে সমাজ  আপনাকে ছেড়ে দেবে না, এটুকু বলতে পারি। তারমানে জীবনের একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আপনাকে এগুলো পরতে হবে। সেটা আপনি মানতে পারেন বা নাও পারেন। কিন্তু ওই সীমারেখার আগে বা পরে আপনি শখ করেও পরতে পারবেন না। কারণ এটাও নির্মাণ। আর এই নিয়ে সব থেকে বেশি প্রতিবাদ আসবে মহিলাদের দিক থেকেই। কেন মহিলাদের দিক থেকে ? তা নিয়ে আর একটি পর্বে বলব।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Post a Comment

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন