উর্বশীর অভিশাপ /বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

উর্বশীর অভিশাপ

বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


(অস্ত্র শিক্ষা গ্রহন এবং স্বর্গরাজ্যের ভয়ঙ্কর অস্ত্র শস্ত্র সংগ্রহের জন্য তৃতীয় প্যান্ডব অর্জুন অমরাবতীতে এসে ছিলেন। সেখানে সুপুরুষ
ধনঞ্জয়ের রূপ দর্শনে অনন্ত যৌবনা স্বর্গের বারবধূ
রূপসী উর্বশী তাঁর প্রতি আকৃষ্টা হন।কামাতুরা
উর্বশী অর্জুনের আসঙ্গ লিপ্সায় তাঁর কাছে আসেন
এবং তাঁর সঙ্গ কামনা করেন।অর্জুন যখন জানতে
পারলেন উর্বশী তাঁর প্রপিতামহেরও প্রপিতামহী তখন তিনি উর্বশীকে প্রত্যাখ্যান করেন। কুপিতা উর্বশী তখন তাঁকে ক্লীবত্বের অভিশাপ দেন)

অর্জুন: 
পাণ্ডু পুত্র অর্জুন আমি গাণ্ডিবী গুড়াকেশ,
অমর্ত্যলোকে এসেছি এখন ধরেছি ছদ্মবেশ।
অস্ত্র শিক্ষা ,সমর বিদ্যা এখানে শিখবো আমি,
স্বর্গ আয়ুধে সজ্জিত হয়ে হবো মর্ত্যের স্বামী।।

দিনটা কেটেছে শিক্ষণে আর শস্ত্র অভ্যসনে,
হয়েছি এখন সুপ্তি মগ্ন,অবসাদ প্রশমনে,
কেগো রূপবতী,সুরূপা শ্রীমতি দাঁড়ালে সুমুখে এসে
আছি সুষুপ্ত,চেতনা লুপ্ত, অবিন্যস্ত বেশে।।

তুমি তো শ্রীময়ী,লাবণ্যময়ী, চিত্ত হারিণী বামা
রূপগর্বিনী,উত্তম ধনি, যৌবনবতী রামা,
বলো সুবদনী, প্রয়োজন শুনি,অসুর এসেছে হেথা?
খুঁজি শরাসন, অসি প্রহরণ, সত্ত্বর যাই সেথা ।।

উর্বশী :
শোনো ও শোভন,করো দর্শন, রূপ আমার লীলাময়
আমার হাস্যে,মধুর লাস্যে,পুরুষ মোহিত হয়,
ক্ষীণ কটি আমি ,সুদেহিনী আমি,দেখো তো আমায় চেয়ে,
দেবতা দানব,সকল মানব,ধন্য আমায় পেয়ে।।
সে আমি স্বয়ং এসেছি নিকটে আজ,
বাহুপাশে নাও,সোহাগ জানাও, দূরে ফেলে রাখো লাজ।।

অর্জুন:
বলোতো সৌম্যা, কি তোমার পরিচয়?
আমার সকাশে দাঁড়িয়েছো এসে ফেলে রেখে লাজ ভয়,
এ কথা সত্যি তোমার সুছাঁদ প্রবল আকর্ষণ,
পরিচয় আগে জেনে নিতে চাই করোনা কিছু গোপন ।।

উর্বশী  :
আমি উর্বশী চির যৌবনা স্বর্গ মদিরা--  মধু,
নৃত্য ও গীতে পটিয়সী আমি স্বর্গের বারবধূ,
অনাদি নিধন তিনি নারায়ণ তাঁর উরু হতে এসে,
ইন্দ্র পেলেন আমার অধিকার নন্দকী নির্দেশে ।।

ভোগ লালসায় লিপ্ত হয়েছি ইচ্ছা /অনিচ্ছায়,
আমার দেহের লাবণ্য,মধু সকলেই পেতে চায়,
ত্বরা করো বীর, থেকো না সুধীর,নাও গো আলিঙ্গনে,
কেউ জানবে না এমত ঘটনা রইবে সঙ্গোপনে।
আমি সেবাদাসী, স্বয়ং অভিলাষী তোমাকে আজ আমি চাই,
বাঞ্ছা পূরণ,দাও আলিঙ্গন,তুমি ছাড়া কেউ নাই।।

অর্জুন:
তুমি উর্বশী?স্বর্গ রূপসী?কি কথা শোনালে আজ?
এ কথা শ্রবণে,মনের গহনে,পেলাম আমি বড়ো লাজ,
পূর্ব পুরুষ পুরুরবা, তুমি তাঁরই ছিলে তো স্ত্রী,
তুমি তো তখন ছিলে গো শ্রীময়ী তাঁরই ঘরের শ্রী।।

তুমি তো তাহলে নমস্যা,মোর জননী স্বরূপা তুমি,
আরাধ্যা তুমি পূজনীয়া তুমি ,তোমার চরণ চুমি,
আশিস ছড়াও আমার এ দেহে  মস্তকে রাখো
 হাত।
পাপিষ্ঠ হতে বলো না আমাকে এটা যে বড়ো আঘাত।।

মাতা স্নেহময়ী,বিশ্ব বিজয়ী,আমি তোমা হতে সৃষ্ট,
যদি দিই সায় তোমার কথায় হবো যে আমি নিকৃষ্ট,
নাও এ শ্রদ্ধা,হও আরাধ্যা, মা আমার উর্বশী,
তোমার আবেদন,ভ্রষ্টাচরণ,শুনে রাখো ও রূপসী।।

উর্বশী  :
হবো না গো মাতা, তোমারই কান্তা হতে চাই আমি আজ,
মর্ত্য লোকের রীতি নীতি মেনে স্বর্গে হয়না কাজ।
চন্দ্র বংশ পুরুরবা সাথে কেটেছে পাঁচ দশ ন বছর,
আট সন্তান দিয়েছি তাঁর হাতে, সকলে জানে খবর।।

তা বলে ভেবো না হয়েছি বৃদ্ধা, আমি যৌবনবতী,
এখনো তো আমি অতি রূপবতী কেলি কলাতেই মতি ,
ঘরেতে দ্রৌপদী,সুভদ্রা আছে তাদের জন্য ভয়?
জানবে না তারা তোমার আমার গোপন এই পরিচয়।
বাহু বন্ধনে ধরো গো আমায় কামানলে আমি তপ্ত,
মহাবীর তুমি জানি অর্জুন দেখাও তো পুরুষত্ব ।।

অর্জুন  :
ক্ষমা করো মাতা করবো না আমি হেন অন্যায় কাজ,
জননী সদৃশা তুমি ওগো মাতা অসম্ভব এটা আজ।
ফিরে যাও মাতা আপন আলয়ে ভেবে দেখো একবার,
মাতার সঙ্গে পুত্র মিলন এযে ঘোর অনাচার ।
প্রপিতামহের প্রপিতামহী  তুমি আমার আপন জন,
শোভা পায় বলো তোমার সঙ্গে এই পাপ আচরণ?

উর্বশী  :
আকাঙ্খা  মোর মেটাবে না তুমি ওগো বীর প্যান্ডব?
ধিক্কার দিই তোমায় আজ আমি কোথা তব গৌরব?
পৌরুষ হীন অক্ষম তুমি দিলে তার পরিচয়,
বীর তুমি নও করে চলো শুধু বীরত্ব অভিনয়।।

অভিশাপ দিই ভাবীকালে তুমি এ রকমই ক্লীব রবে,
নরাধম তুমি ছিন্নমুষ্ক এভাবেই রবে ভবে ।
কোনও রমণীর প্রেম ও প্রণয় পাবে নাকো কোনো দিন,
ক্লীব হয়ে রবে সারাটি জীবন যে জীবন বড়ো
হীন।।

অর্জুন  :
এই অভিশাপ বড়োই কঠিন তবুও মায়েরই দান,
জননী গো তুমি জননীর স্নেহে করালে আমাকে স্নান।
ব্যভিচারী হয়ে মাতাকে আমার করিনি অসম্মান,
এই সান্ত্বনা সদা রবে মনে এটাই আমার মান ।
পদধূলি দাও হে মাতা অমার এ আমার গৌরব,
অভিশাপ পেয়ে সর্ব সময়ে করবো তোমার স্তব।।

উর্বশী  :
জিতেন্দ্রিয় মুনি ঋষিরাও আমায় কামনা করে,
আমাকে করেছে অংকশায়িনী রভস রমণ তরে।
আত্মদমনে সক্ষম তুমি ,তুমিই জিতেন্দ্রিয়,
সংযত এই চিত্ত তোমার তুমি হবে মোর প্রিয়।।

অভিশাপ মোর হবে না বিফল এ কথাটা তুমি মেনো,
এ শাপই আবার আশিস ও হবে এটাও তুমি গো জেনো।
নপুংসক রবে একটি বছর অজ্ঞাত বাস কালে,
উজ্জ্বল হয়ে আবার ফিরবে প্রভাছটা নিয়ে ভালে।।

গান্ডিবী        : অর্জুন
গুড়াকেশ।    : অর্জুন
অমর্ত্যলোকে: স্বর্গ
সুষুপ্ত            : নিদ্রিত
বামা               : সুন্দরী রমণী
রামা               : সুন্দরী রমণী
অনাদি নিধন  : নারায়ণ
কান্তা              : প্রেমিকা
কেলি কলা     : বিহার/কৌতুক
ছিন্ন মুষ্ক।        : নপুংসক

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন