মানব জাতির সংকটে "পিক-অয়েল" /নিশান চ্যাটার্জী


জীবনের গভীরে বিজ্ঞান- ১৪

মানব জাতির সংকটে "পিক-অয়েল"

নিশান চ্যাটার্জী

শুধু আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ নয়, পৃথিবীর সব দেশেরই জনসাধারণ অতি বিব্রত, বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছে পেট্রোলিয়ামের মূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে দফায় দফায় বাড়তে থাকার জন্য। পেট্রোলিয়াম এমন একটি পণ্য যার দাম বাড়লেই অধিকাংশ জিনিসের দাম বেড়ে যায়। যেহেতু এটি পরিবহন ব্যবস্থার সাথে জড়িত। আবার অধিকাংশ ব্যবসায়ী এই দাম বৃদ্ধিকে অতিরিক্ত লভ্যাংশ ঘরে তোলার সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করে থাকে। বিশ্ব ব্যাপী মন্দার জন্য আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে তেলের দাম যখন যখন ৫০ শতাংশের ও বেশি কমেছে তখন আমাদের দেশে তা কমেছে মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ। এরপর  আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে আবার যখন তেলের দাম বাড়ে তখন আমাদের দেশে সবকিছুই আবার নতুন করে বাড়বে। এভাবেই এতো দিন চলে এসেছে। 

এই যে তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় পৃথিবীর সম্পদ সীমিত, মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা সীমাহীন। এই সীমিত সম্পদের পৃথিবীতে উত্তরোত্তর বৃদ্ধির প্রক্রিয়া আর কতদিন ই বা অব্যাহত রাখা সম্ভব? মাত্র ১৫০ বছর হল আমরা পেট্রোলিয়াম ব্যবহার করছি। এর আগে পেট্রোলিয়াম বস্তুটি কি সেটাই জনা ছিলনা। ১৮৫৯ সালে আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় প্রথম পেট্রোলিয়ামের কূপ খনন করা হয়, তারপর থেকেই শুরু হয় পেট্রোলিয়ামের যুগ, আগুনের মতো অতি দ্রুত এই পণ্যটির চাহিদা পৃথিবীর সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে।

 ফিওফিজিসিস্ট ডঃ এম বি হুবার্ট ১৯৫৪ সালে পেট্রোলিয়াম কূপ থেকে তৈল উৎপাদনের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি গ্রাফ তৈরি করেছিলেন, এই গ্রাফটির আকার ঘন্টাকৃতি। যার অর্থ কূপ খননের পর তৈল উৎপাদন ক্রমেই বাড়তে থাকে, তারপর সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছয়, একে বলা হয় " পিক-অয়েল"। দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ এই সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছানোর পর শত চেষ্টা করেও তা আর বাড়ানো যায় না, তার পরেই শুরু হয় পতনের পর্ব। প্রতি বছরই উৎপাদনের পরিমাণ কমতে থাকে। এই সময় তেলের গুণমান ও ক্রমেই নিকৃষ্টতম হতে থাকে। আমেরিকার অধিকাংশ তৈল ক্ষেত্র গুলির পিক অয়েল বা সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ১৯৭০ সালেই পৌঁছে গেছে তারপর থেকে শুরু হয়েছে তাদের নিন্মগামী পতনের পর্ব, তার প্রভাব সারা বিশ্বের অয়েল মার্কেটের ওপর পড়েছে। এই সময় থেকেই তেলের দাম দফায় দফায় বাড়তে শুরু করেছে এবং অর্থনৈতিক চাপ কমানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল তৈল ক্ষেত্র গুলির আধিপত্য স্থাপনের জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যা শেষ পর্যন্ত ইরাকী যুদ্ধে পর্যবসিত হয়েছে। এই পিক-অয়েল শুধু মাত্র আমেরিকার তৈল ক্ষেত্র গুলির ওপর প্রযোজ্য তাই নয়, পৃথিবীর সকল তৈল ক্ষেত্র গুলিই গড়পড়তা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছতে চলেছে সম্ভবত সামনের কয়েক বছরের মধ্যেই। 

প্রতি বছরই তেলের সৃষ্টি তিন শতাংশ করে কমতে থাকবে। বিশেষজ্ঞদের মতে এক নিরবচ্ছিন্ন তৈল সংকটের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে চলেছে সারা বিশ্ব। বিগত ৩৫ বছরে আমাদের দেশে ১ লিটার পেট্রোলের দাম যেখানে প্রায় ১১০ টাকায় উঠেছে সেখানে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র অতি বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে পেট্রোলের দাম স্থিতাবস্থায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ১৮৫৯ সালে যখন প্রথম পেনসিলভানিয়াতে তৈল কূপ খনন করা হয় তখন সারা পৃথিবীতে আনুমানিক দু হাজার বিলিয়ন ব্যারেল পেট্রোলিয়াম মাটির নিচে ছিল। মানুষ ইতিমধ্যেই তার অর্ধেক শেষ করে ফেলেছে। এখনো এক হাজার বিলিয়ন ব্যারেল  মাটির তলায় আছে। প্রতিদিন যদি বর্তমান হারে ( ৮৪ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন) তোলা হয় তাহলে আরো ৩৩বছর চলে যাবে এই তেলে। কিন্তু এই হিসেবটি সম্পূর্ণ ভুল। কারণ প্রতি বছরই চাহিদা বাড়বে দুই শতাংশ করে এবং উৎপাদন কমবে তিন শতাংশ করে। চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে  দ্রুত ক্রমবর্ধমান ব্যবধান ই সমস্যাটির সৃষ্টি করছে।
কিন্তু এই পেট্রোলিয়ামের পরিবর্তে অনান্য শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা বাস্তবে কতটুকু ফলপ্রসূ হতে পারে? বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই অভাব অনান্য শক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ পূরণ করা অসম্ভব। কাগজে কলমে সৌরশক্তির পরিমাণ দৈনিক ৮৪ মিলিয়ন ব্যারেল পেট্রোলিয়াম জ্বালানির থেকে অনেক বেশি হলেও তা ব্যপক হারে কাজে লাগাবার জন্য কোনো টেকনোলজি এবং পরিকাঠামো আমাদের হাতে নেই। একথা পরমাণু শক্তি, জলশক্তি, হাইড্রোজেন থেকে শক্তি, জৈব শক্তি এবং অন্যান্য অচিরাচরিত শক্তি গুলি সম্পর্কে ও প্রযোজ্য। প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার ও ক্ষয়িষ্ণু। প্রাকৃতিক গ্যাসের সাহায্যে গাড়ি চালানো যায়, বর্তমানে চলছেও। কিন্তু সারা পৃথিবীর গাড়ির জ্বালানির মতো উৎপাদন নেই।

 সুতরাং এই সংকটের সমাধানের কোনো সম্ভবনা নেই। এখন বোঝা যাচ্ছে গত দুশো বছর ধরে যে বুনিয়াদের ওপর নির্ভর করে মানুষ তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিশাল ইমারত গড়ে তুলেছে তার মূল নকশাটাই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এই ত্রুটিপূর্ণ অগ্রগতিই মানুষকে আজ তার অস্তিত্ব রক্ষাকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এবং সামগ্রিক ভাবে মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯