ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা - ৯৭

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা - ৯৭


সম্পাদকীয়,
'এত মাস পরে মাকে দেখে জয়াবতীর বুকের ভেতরটা আকুলিবিকুলি করছিল, সে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল প্রায়, কিন্তু... ' কিন্তু কী? বলব না। জয়াবতী পড়ে জেনে নাও। মায়ের কথায় বলি মা কি কেবল মা, মা মানে বড়মা, মেজ মা, সেজ মা, ন'মা, ফুল মা, রাঙা মা, নতুন মা, ছোট মা, ভালো মা, দুগগা মা, আর সর্বোপরি দেশ মা। দেশ মাকে স্বাধীন করতে কত কত তাজা প্রাণ বলিদান দিয়েছে। তবেই না আমরা এই অমৃত মহোৎসবের আয়োজন করতে পারছি। টুকুর খবর জানো কিছু?  ওর আবার জ্বর। ওর মা গা স্পঞ্জ করে গায়ে পাউডার মাখিয়ে দেয় রোজ। টুকুর গল্প লিখেছে সরিতা আন্টি। আর সেই বৃদ্ধ বটগাছ। যার বয়স ২৭০ সে কিন্তু আমফানের ঝড়ে পড়ে গেছে। সে কোথায় ছিল তা জেনে নাও শ্রীছন্দা মাসির কাছ থেকে কেমন?  মলয় জেঠুর বেড়ানোর গল্প শেষ। তা হবে না কেন? মলয় জেঠু এবার দেশে ফিরবে, কারণ মা আসছে তো। আর আসছে ছোটোবেলা ১০০  পীযূষ আঙ্কেল আরো একজব গুণী বিদ্বান ব্যক্তির জীবনী বলেছেন। আর তোমাদের ছোট্টো বন্ধু রূপম একটা মিষ্টি গল্প লিখেছে।  এত সবের পরেও বলব,  মায়ের কাছে কিন্তু সবাই সমান। 
মৌসুমী।

ধারাবাহিক উপন্যাস
জয়াবতীর জয়যাত্রা
২৯ প র্ব
তৃষ্ণা বসাক

৩৩
পালকিতে ওঠার আগে জয়াবতী পেরজাপতিকে শাসিয়েছিল।
‘বোলসিদ্ধি পৌঁছে  কাল থেকেই তুই লাঠি খেলা শিকবি। এদেশের মেয়েমানুষের শরীর শক্ত না হলে মনের ভয় যাবে না দেখছি’।
তার ফলেই কিনা  কে জানে, বোলসিদ্ধিতে বাড়ির দুয়ারে পালকি থামতে ওরা যখন নেমে এল, দেখা গেল পেরজাপতির হাতে একটা গাছের বেঁটে মোটা ডাল, লাঠির বিকল্প হিসেবে বেশ কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। জিজ্ঞেস করে জয়াবতী জানতে পারল, বনের পথ দিয়ে আসার সময় কাহারদের বলে ওটি যোগাড় করেছে পেরজাপতি। দেখে বেশ খুশিই হল জয়াবতী। সেনাপতির কথা তাহলে হেলাফেলা করেনি তার সৈন্যরা।
গ্রামে ঢুকতে তাদের দুপুর গড়িয়ে গেল। সে একপক্ষে ভালই হল। চারদিক শুনশান। পথে একটাও লোক নেই, শুধু ঠাকুরদালানে কয়েকটা  বাচ্চা। তারা এমন নিবিষ্ট হয়ে  ঠাকুর গড়া দেখছে যে তাদের খেয়াল করল না। দেখে বুকটা চিনচিন করে উঠল  জয়াবতীর। আগের বছর সেও এমনি করে… যাক খেতি কী। এখন তো রোজই যেতে পারবে।
সে ভেবেছিল সারা গ্রামের মত মাও ঘুমচ্ছে বুঝি। এইসময় মা যে ভাইকে পাশে নিয়ে একটু গড়িয়ে নেয় তা সে জানে। কিন্তু ঘোড়া আর তার পেছন পেছন পালকি থামা মাত্তর তাকে অবাক করে দিয়ে শাঁখ বেজে উঠল জোরে। জয়াবতী দেখল মা বরণডালা নিয়ে বরণ করে নিতে দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘোড়ার পায়ে গংগাজল ঢেলে, তাকে প্রদীপের তাপ, ধান দুব্বো দিয়ে বরণ করার পর সে নামতে পারল। শুধু তাকে না, সবাইকেই একই ভাবে বরণ করল মা। তারপর মুখে গুঁজে দিল সন্দেশ। রান্নি বেটি গুনগুন করে উঠল ‘এবার উমা এলে উমাকে আর ফেরাব না’
একটু দূরে পুণ্যির মাও দাঁড়িয়ে আছে দেখা গেল। জয়াবতী তাকে বলল ‘ও খুড়িমা, তুমি বরণ করছ না যে?’
রান্নি হেসে বলল ‘ জয়া ঠাকরুন সেই আগের মতই রয়ে গেছে, না মাঠান? এই কমাসে একটুও বদলায় নি।‘
তারপর সে চাপা গলায় বলে ‘পুণ্যির কি বাবা আচে? ওর মা তো বেধবা। বেধবা মানুষকে কি বরণ করতে আচে? এসব তো এয়োস্তিরিদের কাজ!’
এত মাস পরে মাকে দেখে জয়াবতীর বুকের ভেতরটা আকুলিবিকুলি করছিল, সে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল প্রায়, কিন্তু রান্নির কথায় তার মাথায় আগুন চড়ে গেল। সে বলল ‘হ্যাঁ গা মেয়ে, তোমার মাতায় কিচু বুদ্ধি আচে জানতাম। তুমি আমায় বলো দিকি বাছা, বাপ মরে গেলে মা কি আর মা থাকে না? পুণ্যির মা কি শুধু তার বাপের ইস্তিরি ছিল? পুণ্যির মা –এইটেই তো একন তার সবচে বড় পরিচয়। মেয়ে বিদেশ বিভুঁই থেকে ঘরে এল, সব মায়েরই সাধ জাগে তাকে বরণ করে ঘরে তুলতে। সেখানে আবার সধবা বিধবা কি? মা, তোমার বরণ হয়ে গেলে খুড়িমাকে বরণডালাটা দাও। নইলে, এই আমি ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে চল্লুম সোনাটিকরি’
জয়াবতীর মা দেখলেন ভাল বিপদ, এদ্দিন পরে ঘরে এল মেয়ে, তাও একটা তুচ্ছ কথায় সে আবার না ফিরে যায়। কিন্তু বেধবা মেয়েমানুষের হাতে বরণডালা দিলে সংসারের অকল্যাণ হবে না তো! তিনি যখন এই নিয়ে দোনামনা করচেন, তখন দুর্গাগতি হামা দিতে দিতে এসে তাঁর কাপড় ধরে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে।তার কচি মুখের দিকে চেয়ে হঠাত তাঁর মনে হল, আজ যদি, ঠাকুর না করুন, এদের পিতাঠাকুরের কিছু হয়ে যায়, তখন তো তাঁকেই এদের দুটিকে নিয়ে বুক বেঁধে সব কাজ করতে হবে। সত্যিই তো যে মা বুক দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখে, সেই মা বিবাহ, উপনয়ন সব শুভ কাজে বরণ করতে পারবে না? কথাটা মনে হতেই তিনি পুণ্যির মাকে ডেকে বললেন
‘এসো দিদি। কিচু মনে করো না। মেয়ের কতা শুনে মাঝে মাঝে একটু আতান্তরে পড়ে যাই। আসলে হাজার বছরের অন্ধকার ঘর তো, হঠাৎ আলো এলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, মানিয়ে নিতে সময় লাগে। নাও, তুমি এদের বরণটা সেরে নাও চট করে। কম পথ এসেছে সব! মুখ শুকিয়ে সবার আমসি হয়ে গেছে। আর ধুলোয় ধুলোয় ধূল্পরিমাণ হয়েছে সব।‘
পুণ্যির মা বরণ করছে যখন, জয়াবতীর মার খেয়াল হল শাঁখ বাজাচ্ছে না তো রান্নি। তিনি বললেন ‘কী হল গো মেয়ে? বরণের সময় শাঁখ বাজাবার কথা কি তোমাকে বলে দিতে হবে নাকি?’
অনিচ্ছুক মুখে শাঁখ বাজাল বটে রান্নি, কিন্তু বরণের পালা শেষ হতেই সে বলে উঠল ‘যাই বলো মাঠান, তোমাদের যত অনাছিস্টি কাণ্ড। বামুনের ঘরে এমনটা দেকিনি কোনদিন। বেধবাকে যদি শুভ কাজে নেওয়া যায়, তবে মায়ের বরণে কেন বেধবাদের যাওয়া মানা বলতে পারো? ওকানে সিঁদুর নিয়ে খেলা হয় বলে। বেধবাদের শরিলে সিঁদুর লাগলে ছিস্টি রসাতলে যাবে যে’ পালকি থেকে নেমে ততক্ষণে পুণ্যি আর পেরজাপতি  কোমর ছাড়াচ্ছে । বাব্বা সেই কোন ঝুঁজকো ভোরে বেরিয়েছে তারা! খিদে তেমন পায়নি। অনেক ক্ষীরের সন্দেশ, খই মোয়া, চিঁড়ে গুড় সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিল ঠাকমা আর খুড়িমা। বনকাপাসি বলে এক গাঁয়ে টলটলে এক দিঘির ধারে পালকি আর ঘোড়া থামিয়ে গাছের ছায়ায় বসে তারা দিব্যি জলপান করেছে, তাই খিদে তেমন পায়নি। অপূর্ব সেই জায়গাটি। একটা মস্ত শিরিশ গাছের ছায়ায় বসে বিশাল সেই দীঘি, যাতে শয়ে শয়ে পদ্ম ফুটে আছে দেখতে দেখতে উমাশশী খাওয়া ভুলে বলে উঠেছিল
‘আহা ফুটিয়াছে কত রাঙ্গা শতদল
 ধন্য বনকাপাসি, ধন্য দীঘিজল’
জয়াবতী, অত মুখফঁড় মেয়ে,সেও দুদণ্ড কোন কথা বলতে পারেনি। কেমন একটা ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে দেখছিল চারপাশ।
ততক্ষণে আকাশ হালকা নীল থেকে গাঢ় নীল হয়েছে  যেন একখানা নীলাম্বরী শাড়ি। পেঁজা তুলোর মতো  হালকা সাদা মেঘ  ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। দীঘির জলে তার ছায়া।
সেদিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে জয়াবতী বলে উঠল ‘এই দীঘি, আকাশ, ঐ পদ্মফুল, এই সোনার মতো রোদ কে সৃষ্টি করেছে বল দিকি? শুধু তাই নয়, এই যে পুজোর আগেই প্রত্যেকবার শিউলি ফুল ফোটে, মাঠে কাশের ঝাড়, রোদে সোনা, আকাশ কেষ্টঠাকুরের গায়ের মতো নীল, হাওয়ায় একটু শীত শীত ভাব, এসব কে করে?’
ওর এই কথায় সবাই অবাক। পুণ্যি একটা মোয়া চিবুতে চিবুতে বলল ‘তুই দেখছি অবাক করলি গঙ্গাজল! পেট থেকে পড়া বাচ্চাও জানে এসব ভগমানের সৃষ্টি। আর তুই জানিস নে বলতে চাস?’
উমাশশী  কোত্থেকে একটা ছড়ি  জোগাড় করে একটু দূরে দূরে  ঘুরছিল। সে কিছু বলল না। কিছু শুনেছে কিনা বোঝাই গেল না। কিন্তু পেরজাপতি ভারি আচ্চযয হয়ে গেল।জয়াদিদির এত জ্ঞান আর এই তুচ্ছ কথাটা জানে না?
সে সাধারণত ভয়ে চুপ করে থাকে সবসময়, কিন্তু এখন সাহস করে বলেই ফেলল ‘সেকি জয়াদিদি! এসব তো ভগমানের লীলে। তিনি চেয়েছিলেন বলেই নদী, গাছপালা, মানুষ সবার জন্ম। এ তো সবাই জানে’
‘সে তো বুজলুম, ভগমান সব সৃষ্টি করেছে, কিন্তু তেনাকে কে সৃষ্টি করেচে বল দিকি? না রে এসবের মধ্যে অন্য কিচু গুহ্য কথা আচে। নাহ থাক এসব কথা। তোদের মাথায় ঢুকবে না। আমি নিজেই ভাল বুজতে পারছি না ছাই। ভারি ধাঁধা  লাগছে। তবে জায়গাটা বেশ, কী বল পুণ্যি? রোজ বাড়িতে কত কী খাই, মুখে লাগে না। আর আজ এখানে বসে চিঁড়ে মোয়া খেতেও কত ভাল লাগছে। শীত ভাল করে পড়লে আমরা এখানে একদিন চড়ুইভাতি করতে আসব, হ্যঁ ভাই?’
এখন পালকি থেকে নেমে সেই কথাটা মনে পড়ছিল পুণ্যির। সত্যি বেশ জায়গাটা। একবার সত্যি সত্যি চড়ুইভাতি করলে হয় হাঁড়িকুড়ি নিয়ে গিয়ে। কিন্তু আগে বাড়িতে ঢুকবে তারপর না ফেরার কথা উঠছে। ঐ যে রান্নি কী বলল তাতেই তো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল গঙ্গাজল। সে হাত পা নেড়ে বলল ‘তুচ্ছু সিঁদুর হাটে দু পয়সা দিলেই পাওয়া যায়, তার জন্যে কি বেধবাদের ভেন্ন করে রাকতে হবে? মা দুগগা কানে কানে বলে গেছেন বুজি তোমাকে? বেধবারা বরণ করতে পারবে না? কেই বা বলেছে সধবাদের একা সিঁদুর পরতে হবে?  মোচলমানের সধবারা কি সিঁদুর পরে? তারা বুজি এই পিথিমির বাইরে? আর বিয়ের ছেলেরা তো কিচুই পরে না, তারা ড্যাং ড্যাং করে সব জায়গায় যাচ্ছে। আসলে কি জানো, ওরাই আইন বানাচ্ছে ইচ্ছেমত, আর তোমাদের মতো বোকা মেয়েরা সেইটা সব জায়গায়  এমন ঢেঁড়া পেটাচ্ছে যে লকে ভাবছে সেটা ভগমানের তৈরি আইন’
আর কত কী বলে যেত সে, যদি না ভেতর থেকে   সেই মুহূর্তে রামগতি টোলের পড়ানো ছেড়ে উঠে আসতেন তার গলা পেয়ে। তিনি এসে দাঁড়িয়ে বললেন ‘সব বক্তিমে কি এখানেই শেষ করে ফেলবি নাকি, ওরে পাগলি?’
তাঁর কথায় লজ্জা পেয়ে দুর্গাগতিকে কোলে তুলে নিতে গেল জয়াবতী। পেছন থেকে পুণ্যি বলল ‘তোর যদি হুঁশজ্ঞান থাকে একটুও। বাইরের কাপড়, ছিস্টি ছুঁয়ে ঘোড়ার গায়ের পোকার মধ্যে বসে এলি। ঐ হাতে বাচ্চা ধরতে আছে? ওর অসুখ করবে না?’
জয়াবতীর তখন আর এক প্রস্থ লজ্জা পাবার পালা। (ক্রমশ)


ফিরে দেখা বোটানিক্যাল গার্ডেন
শ্রীছন্দা বোস


আমাদের স্কুল থেকে প্রতিবছর  বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও ভ্রমণের জন্য বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে পিকনিকও   হয়ে যেত। এককথায় রথ দেখা কলা বেচা।
 ছোট বেলা থেকে কতবার গিয়েছি কিন্তু কোনোবারই একঘেয়ে মনে হয়নি। আসলে সেখানে একটু শিক্ষামূলক ব্যাপার গুলোও ছিল তাই স্কুল কর্তৃপক্ষ সেই জায়গাটাকে
প্রাধান্য দিতেন। শীতকালে  সেই সময় বাগানটা অপূর্ব মূর্তি ধারণ করতো।
প্রথমে টিফিন করে আরম্ভ হতো ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। দৌড় প্রতিযোগিতায় সেকেন্ড বা থার্ড এর বেশি আসতে পারতাম না, কিন্তু মেমোরি টেস্ট আর সুচে সুতো পরিয়ে দৌড়ে আমাকে কেউ হারাতে পারতো না, আমিই ফার্স্ট হতাম। খেলা ধুলার শেষে দুপুরে বনভোজনের পালা চলতো।
বোটানিক্যাল গার্ডেন টাতে এসে মুগ্ধ হয়ে চারিদিক দেখতাম। কী অপূর্ব গাছপালা, বিশ্বের সমস্ত গাছগুলি এসে যেন ঠাই নিয়েছে এখানে।
এর মধ্যে যেটা উল্লেখযোগ্য  তা হোল  খুব পুরোনো বট গাছ।
 সেই বটগাছ টিকে আমাদের দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। এক শাখা থেকে আর এক শাখা এমনি করতে করতে কত দূর বিস্তৃত  দেখলে আশ্চর্য হতে হোত। অনেক গুলি ঝড় সহ্য করে দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় 270 বছর কিন্তু বৃদ্ধ বটগাছ টি কে সুপার সাইক্লোন আমফান এসে উপড়ে দিল। মহানগরের সবচেয়ে পুরোনো গাছ এটি, গিনেস বুকেও এর নাম ছিল।এখানে অনেক দুষ্প্রাপ্য এবং শোভাবর্ধক গাছ আছে কিন্তু উদ্যানের "চোখের মণি " ছিল শতাব্দির  সেই প্রাচীন বটবৃক্ষ।

গাছটির পরিধি 330 মিটার ছিল দেড় একর জমির ওপরে শত শত ঝুড়ি নিয়ে বিরাজমান।
এই গাছ ছাড়াও অন্যান্য গাছেদের মধ্যে রয়েছে মেহগনি, সাল, সেগুন, বট,অশত্থ, শিমুল, পিয়াল, আর নানা প্রজাতির পাম গাছ।রয়েছে লবঙ্গ দারুচিনি, জায়ফল, তেজপাতা, রবার ও নানা প্রকার ঔষুধি বৃক্ষও।
1788সালে কর্ণেল কিড এই বাগানটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্বের বৃহত্তম গার্ডেনের শিরোপা  পরেছিলো বহুকাল ধরে এই বোটানিক্যাল গার্ডেন।
ভারতের কোম্পানি আমলে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম উদ্যান।

এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাতীয় উদ্যান গ্রিনল্যান্ডে অবস্থিত, নাম নর্থ ইস্ট গ্রীনল্যাণ্ড ন্যাশনাল পার্ক।
শিবপুরের এই বোটানিক্যাল গার্ডেন পরবর্তী  কালে আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বোস বোটানিক্যাল  গার্ডেন বলে  নামকরণ হয়েছে যিনি " গাছের প্রাণ আছে " এটি আবিষ্কার করেছিলেন।

আমরা সেই সময়ে দেখিনি  পরে শুনেছি নদীর ধারে ধারে নাকি ম্যানগ্রোভ গাছ  চাড়া দিয়ে উঠেছে যা,  নাকি সুন্দরবনকে অনেক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে থাকে। সমুদ্রের নোনা জলে জন্মানো ম্যানগ্রোভ কী করে গঙ্গার মিষ্টি জলে  জন্মালো তা নিয়ে উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞরা  অবাক হয়ে গেছেন। কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ধারণা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে।

গাছপালার পাশাপাশি  নানা রকমের প্রাণীর বাস এখানে,বিভিন্ন পতঙ্গ, সরীসৃপ ,পাখি এবং উভয়চর প্রাণীর আবাস এখানে।এখানে যারা আসেন তাদের চোখে বেজি শেয়াল,বিভিন্ন বিষাক্ত ও বিষহীন সাপ ও কচ্ছপ নজরে পড়ে। কিছু পাখির প্রজাতি হোল রোজ রিঙড প্যারাকিট, হাঁড়িচাচা(রুফাস ট্রিপাই), বেনে বৌ( ব্ল্যাক হুডেড ওরি উল) পরিযায়ী পাহাড়ি ময়না,কাঠ ঠোকরা,বসন্ত বৌরি, বি ইটার, প্যাঁচা,বুটেড ঈগল ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়।

শীতে বোটানিক্যাল গার্ডেন অপূর্ব রূপ ধারণ করে.সবুজ ঘাসের ওপর সূর্যের আলো, দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রতিটি ঘাসের মাথায় যেন মুক্তোদানার মতন শিশিরকণা  জ্বলছে।ভোরের শিশিরে ভেজা , ঘন কুয়াশা চাদরে আবৃত উদ্যানটির সৌন্দর্য  দেখার  মতন,ঘন কুয়াশা ভেদ করে মিষ্টি আলোয় সকাল নামে উদ্যানে।
শীত ঋতু নানান রকম ফুলের ডালি নিয়ে বাগানকে সাজিয়ে দেয় যেমন চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, কসমস,ডেইসি জিনিয়া গাঁদা। এছাড়া এখানে গোলাপের বাগান দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়, রূপে গন্ধে অসামান্য।

যে বছর টার কথা বলছিলাম  সেই সময় আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি, দুপুরে খেলাধুলার পরে বনভোজনের প্রস্তুতি যখন শুরু হোল তখন আমিও উৎসাহে কাজে নেমে পড়লাম।
দিদিরা রান্নার কাজে হাত লাগালো চাল,  ডাল  তরকারি নিয়ে আসা হয়েছিল, দেশী মুরগি স্থানীয় অঞ্চল থেকে কিনে আনা হয়েছিল। সবাই যেমন হাত লাগিয়ে, উৎসাহ ভরে কাজ করছিল বাড়িতে এমনি উৎসাহ দেখা যায়না, একসাথে হলেই বোধহয় এই মজাটা হয়। ভাত, ডাল তরকারি মুরগির গরম গরম  ঝোল বেশ  আনন্দের সাথে খাওয়া হোল সঙ্গে বাঙালির বিখ্যাত রসগোল্লাও পাতে পড়লো।

উদ্যানে ঘুরতে ঘুরতে একসময় গঙ্গার পাড়ে কয়েক জন এসে বসলাম।
নদীর ওপরে কয়েকটা গাছের ডাল এসে পড়েছে, দুএকটা হাঁড়িচাচা আর কাঠঠোকরা পাখি বসে আছে, পরে একঝাঁক টিয়ার দল এলো আমাদের স্বাগত জানাতে
মন আনন্দে ভরে গেলো। এই সমস্ত অপার্থিব বস্তু দেখা বড়ই দুষ্কর।


4-30 টে তখন প্রায় বাজে শীতের বিকেল তাই বাড়ি ফেরার তাড়া শুরু হোল। বন্ধুরা মিলে সুন্দর দিনটি ছিল মনে রাখার মতন। সেদিন কোনো ছুটির দিন ছিল না তাই উদ্যানে কোনো ভীড় ছিল না।চারিদিক শান্ত সমাহিত, ঠিক যেন একটা তপোবন। ফেরার পথে একটা পুকুরে দেখি ভর্তি পদ্ম ফুল  ফুটে আছে। কল্পনার জগতে মনে হোল স্বয়ং লক্ষ্মী দেবী পদ্মের ওপরে বসে আছেন।
মনে মনে কর্ণেল কিড সাহেব যিনি এই উদ্যানটি গড়ে তুলেছিলেন, তাঁকে অনেক ধন্যবাদ দিলাম।
ঈশ্বরের হাতে সৃষ্টি এই প্রাকৃতিক জগৎকে সেদিন দেখেছিলাম অন্য চোখে, আজ যখন নস্টালজিক হয়ে যাই তখন চোখে দৃশ্য গুলি অন্য রূপে ধরা দেয় আর রবিঠাকুরের গানের লাইন টা ভেসে ওঠে, "চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে
অন্তরে আজ দেখবো যখন আলোক নাহিরে "--



টুকুর বন্ধু                                 

সরিতা আহমেদ


সাল্মো-নেলা-টাইফো-আর্থরাইটি।
এমন সুরেলা শব্দ যে এত ভয়ংকর একটা রোগের নাম হতে পারে, তা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি। তখন তার এক্কা দোক্কা, রুমাল চোর আর টিয়ার ঝাঁকের সাথে কলকল করেই ছুটি কাটানোর সময়। তা নয়, এই বিতিকিচ্ছিরি নামের জ্বর , ব্যাথা আর রাজ্যের ঘ্যান ঘ্যানানি নিয়ে গোটা ছুটির দিনগুলো পার করতে হচ্ছে! তবু ভালো বইটা সাথেই আছে।
ক্লাস ফোর বি'র রোল নং ৪-র 'আমি কিছু জানি না ,মিস' -এর সময়টা সত্যি বাজে যাচ্ছিল।
জেনারেল ওয়ার্ডে সকাল ৮:১০ মিনিটে ডঃ মিত্র যখন রাউন্ড শেষে তার গাল টিপে 'শিগগির ভালো হয়ে যাবে' বলার পরে বাবা গম্ভীরভাবে তাকালেন মায়ের দিকে।
সে তখন হাত উলটে গাল মুছে 'টুকুর বই' -এ ডুবে গেল, রোজকার মত। বাবার দেওয়া যে ক'টা জিনিসের নাম সে গুনতে পারে, 'টুকুর বই' তার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়।
'বড় হয়ে কি হতে চাও' - রচনায় যখন ক্লাসের সবাই ডাক্তার, টিচার, পাইলট, সায়েন্টিস্ট বা নিদেন পক্ষে হালুইকর হতে চাইত, তখন সে প্রায়ই রাতে দেখা স্বপ্নগুলোর, যার বেশিটাই জুড়ে আছে 'টুকুর বই' আর 'জাঙ্গল বুক', হিজিবিজি ছবি আঁকে আর- শিরোনাম দেয় 'আমি স্বপ্নওয়ালা হতে চাই।'
হাসপাতালের নীল দেওয়ালে নোনা ধরা দাগ। মুন্সিপাড়ায় তাদের বাড়িতে যেমন দাগ দেখা যায় তেমনি। আজ ১৫ দিন পুরো হল সে ৫ নং বেডে শুয়ে রয়েছে । স্পাঞ্জ করার পর মা যখন গায়ে পাউডার লাগিয়ে দেন, তার খুব ইচ্ছে হত টুকুর মত তারও একটা পোষা ভূত থাকুক খালি পাউডারের কৌটোয়।
যে সময়টায় ইঞ্জেকশানের ট্রে নিয়ে সিস্টাররা আসা যাওয়া করতেন, সেই সময়টায় তার টুকুর-হাতে- ঠোক্কর-মারা-বুলবুলি হতে ইচ্ছে করত। ইস যদি সে বুলবুলি কিম্বা মুনিয়া হতে পারত , সবাইকে ধাপ্পা দিয়ে ফুড়ুক করে জানলা গলে দিব্যি পালিয়ে যাওয়া যেত।
ওরা যে কেন বোঝে না, ইঞ্জেকশান ব্যাপারটাই তাকে সেই ঝগড়ার দৃশ্য গুলো মনে করিয়ে দেয়। অমন ভারি নামের অসুখ তো শুধু ডাক্তারি বইয়ের কথা। আসলে তার অজ্ঞান হওয়া, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আর ভুল বকার পেছনে অশান্তির ওই দিনগুলো দায়ী, সে কথা কেবল সেই জানে।
ওই সেদিন যখন ভিজে গামছা দড়িতে মেলতে বলায় বাবা খেপে গিয়ে মায়ের চুলের মুঠি ধরে উঠোনে ঠেলে ফেলে দিল আর দেখতে দেখতে মায়ের ফর্সা কপাল কেটে রক্তে ভেসে গেল থান ইঁটের দুপাশ , সেদিনই রাতে সে ভুল বকল, জ্বরে কাদা হয়ে অজ্ঞান হল। সে তো নতুন কিছু না, অনেকবারই তো এসব হয়েছে ; কিন্তু এমন হাসপাতাল কেস তো আগে হয় নি। 
সে জানে এসব কাউকে বলা যায় না , 'প্রাইভেট' ব্যাপার। কিন্তু এখানে এসে সে টুকুকে না বলে থাকতে পারল না। হোক না সে গল্পের চরিত্র , তাই বলে কি টুকু তার বন্ধু নয় !
রাতে ওয়ার্ডের সব আলো নিভে গেলে, সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল – “ টুকু তোর বাবাও কি তোর মাকে এরকম মারে?'’ উত্তর দিলো না কেউ। উল্টে পেছনের ঝোপে একটা ঝিঁঝিঁ ডেকে উঠল তারস্বরে। সে চমকে উঠে ছোট্ট লম্বা-শ্বাসটা গিলে ফেলল।
পোষা ভুতও প্রশ্নটা শুনতে পেল না বোধ হয়, কে জানে ঘুমিয়েই পড়েছে হয়ত। হাজার হোক টুকুর পোষা কৌটোর ভূত তার ডাকে সাড়া দেবেই বা কেন! অগত্যা পাশবালিশে মুখ গুঁজে চোখ বুজল সে।

অশান্তির দিনগুলোকে সে এরকম ভাবেই ভুলে থাকতে চায়। জোর করে হলেও, সে মনেপ্রাণে চায় ‘ভুলে যাওয়া’ নামের একটা ইরেজার যদি টুকুর ভূতটা ম্যাজিক করে এনে দিত !
ফিকে হলদে দুপুরগুলোয় যখন রূপকথার পরীরা চুপিচুপি নামে কলুপুকুর ধারে আর তাদের ধরতে ন্যাংটো ছেলের দল জলময় দাপাদাপি করে , তখন সে ভাবে ভাগ্যিস টুকুর কোনও বাবা নেই ।
কেবল চারটে আরশোলা, একটা টিকটিকি, দুটো ল্যাজঝোলা আর একখানা কৌটো-ভূত নিয়েই তার সংসার ;তাই তো তার নেই কোনও মন খারাপ, নেই কোনও অসুখ অথবা হাসপাতালের জুজু। 
মনে মনে সে টুকুর সাথে কথা বলে 'তুই কি লাকি রে টুকু! ঝগড়া দেখিস নি কখনো, শুধুই আনন্দের সাথী নিয়ে তোর হাসিখুশির রাজপাট!' 
এসব কথা চালাচালির সময় টুকুর উপর এক চিমটে হিংসেও হয় তার। আবার সে ছোট্ট শ্বাস টেনে হিংসেটাকে টুক করে গিলে ফেলে।
  
   হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার দিন বিকেলে ঋদ্ধি এসে পরীক্ষার রুটিন দিয়ে গেল । মাত্র দেড় মাস বাকি ।
সেই রাতে মা কিছু খেল না। গালের পাশে চাকা চাকা দাগ হয়েছে – স্পষ্ট দেখেছে সে । সারা সন্ধ্যে বৃষ্টি হয়েছে । বাইরে ও ঘরে । খাটের কোণা ধরে গুটিয়ে শুয়ে আছে মা । আঁচল লুটিয়ে আছে মাটিতে ।
টুকু পা টিপে টিপে বিছানায় এলো । অনেকক্ষণ এপাশ ওপাশ করল , কিন্তু চোখে ঘুম এল না মোটেই । রাত তখন কত কে জানে । টুকুর বন্ধুরা বোধহয় সবাই ঘুমিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে সে উঠে বসল । তারপর চুপিচুপি মশারি থেকে বেরিয়ে মা যাতে একটুও টের না পায় তেমন করে আলতো হাতে টেবিল ল্যাম্পের সুইচ জ্বেলে টুকুকে সে চিঠি লিখতে বসল তার অতি প্রিয় রাফখাতার ভাঁজে । বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ । তবু কে জানি তার চোখে- নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে কেউ ।নাক টানতে টানতে আর চোখের এককুচি নোনা জলকে টুপ করে মুছে ট্যাঁরাব্যাঁকা কাঁপা হাতে সে লিখল, '' এবারের পরীক্ষায় বাবার শেখানো aim in life টা লিখব না, বুঝলি । লিখব আমি টুকু হতে চাই। ব্যস আর কিচ্ছু না ! ''
আর তক্ষুনি কোত্থেকে আওয়াজ এল , “ঠিক ! ঠিক ! ঠিক !”


অহংকারের পতন 

রূপম সরকার 
পঞ্চম শ্রেণিপাটিকাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, পাটিকাবাড়ি, নদীয়া 


একটা গর্তে অনেক পিঁপড়ে থাকতো। তাদের মধ্যে একজন রাজা ছিলো। তাঁর খুব অহংকার ছিলো। তারা একদিন খাবারের খোঁজে খাবার খুঁজতে বেরোলো। তারা দেখলো একটা বাড়িতে খুব মিষ্টি তৈরী হচ্ছে। তারা সেই বাড়িতে গেলো এবং কিছু খাবার খেলো। খেয়ে তাদের পেট ভরে গেলো। কিন্তু রাজা পিঁপড়ে দেখলো অন্য গর্তের পিঁপড়েরা বেশী করে মিষ্টি খাচ্ছে। সেটা দেখে তার হিংসে হলো। তখন সে মিষ্টি ভেবে একটি টক দইয়ের হাঁড়িতে ঝাঁপ দিলো। সে সেই হাঁড়িতে পড়া মাত্রই দইয়ে মেখে গেলো তখন অন্য পিঁপড়েরা তাকে ধরে তুলে গর্তে নিয়ে গেলো। সে সেখানে অনেক দিন কাটিয়ে সুস্থ হয়ে গেলো। তখন গর্তের সব পিঁপড়ে আবার খাবারের সন্ধানে গেলো। তখন তারা খাবারের খোঁজে সেই মিষ্টির দোকানে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু খাবার খেলো। খেয়ে তাদের পেট ভরে গেলো। এবার রাজা পিঁপড়ে আবার অন্য গর্তের পিঁপড়েদের বেশী করে খেতে দেখে তার হিংসে হলো। সে আবার টক দইয়ের একটি হাঁড়িতে লাফ দিলো। আবার সে দইয়ে মেখে গেলো। তখন পিঁপড়েরা আবার তাকে গর্তে নিয়ে গেলো। সেখানে সুস্থ হয়ে তারা আবার একদিন খাবারের সন্ধানে গেলো। তখন তারা একটি লোককে হেঁটে যেতে দেখলো। তার ঝোলায় কিছু ছিলো। পিঁপড়েরা সেই ঝোলার থেকে মিষ্টি গন্ধ পেয়ে সেই ঝোলায় ঢুকে গেলো। ঝোলায় ঢুকে তারা খাবার খেয়ে সেই ঝোলায় বসে ছিলো। কিন্তু রাজা মিষ্টির ওপর বসে খেয়েই যাচ্ছিলো। যখন লোকটি ঝোলার থেকে মিষ্টিগুলো খেলো তখন রাজা মিষ্টি শুদ্ধ তার মুখের মধ্যে ঢুকে গেলো। তখন সে মারা গেলো।


ধারাবাহিক ভ্রমণ
হিমবাহের ঘাড়ের উপর
শেষ পর্ব

মলয় সরকার


এই ব্লু আইস কিন্তু সব বরফে পাওয়া যায় না।এরকম জায়গায়, আন্টার্ক্টিকা কি বরফের রাজ্যেই সাধারণতঃ এর দেখা মেলে।
এটা আসলে, আলোরই এক রহস্যময় কারিকুরি।  যখন বরফের গুঁড়োর মধ্যে অসংখ্য হাওয়ার বুদবুদ আটকা পড়ে, প্রচণ্ড চাপে আর ঠাণ্ডায় তারা লাল থেকে শুরু করে সমস্ত রঙ হারিয়ে ফেলে তখন তারা বিচ্ছুরণ করতে থাকে এই নীল রঙ। যত দূর থেকে এটা দেখা যাবে ততই বেশী ঘন নীল দেখা যায়। এও একটা নতুন জিনিস দেখা হল আমার। 
তোমরা যখন আরও বড় হয়ে বিজ্ঞানের মধ্যে আলো নিয়ে পড়াশোনা করবে, তখন এর সম্বন্ধে আরও বেশি ভাবে জানতে পারবে। আসলে আমরা যা দেখি, তার মধ্যে অনেক কিছুই তো আলোরই খেলা।

আমরা আরও এগিয়ে দেখি একটা বিশাল বরফের ফাটল। সে জায়গাটায় আদৌ বরফ নেই।বরফের ফাটলের  দুপাশে বরফের পাহাড় আর মাঝে বেশ কিছুটা পথের মত। সেখানে দেখি বেশ কিছু লোক, পাহাড়ে চড়ার যন্ত্রপাতি, বরফ কাটার কুঠার, বিশেষ ধরণের জুতো ,দড়িদড়া নিয়ে খাড়াই বরফের দেওয়ালে উঠছে। হাঁ করে, আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগলাম, চারিদিকে দুধ সাদা বরফের মধ্যে মানুষের কারিগরি আর লাফালাফি।
এই এত বিশাল বরফের রাজ্যে, আমার কিন্তু মনে হচ্ছিল, এই কয়েকটি মানুষকে দেখে, ঠিক যেন একটা চিনির পাহাড়ে গোটা কতক কালো পিঁপড়ে নড়াচড়া করছে।

এই মাতানুষ্কা হিমবাহ কিন্তু, বৈজ্ঞানিকরা বলছেন, পরিবেশ উষ্ণায়নের জন্য বছরে এক ফুট করে উচ্চতা হারাচ্ছে। আর উচ্চতা হারানোর অর্থ বুঝতে পারছ? ওই বিশাল পরিমাণ বরফ গলে জল হয়ে যাচ্ছে।আর সেই জল চলে আসছে নদী হয়ে সমুদ্রে।আর এরকম, কেবল মাতানুষ্কাই তো নয়।সারা পৃথিবীতে অসংখ্য হিমবাহরা গলে যাচ্ছে।ফলে সমুদ্রের জলের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। তার ফলে হচ্ছে বন্যা, সমুদ্র এগিয়ে এসে গ্রাস করছে ভূমি।তলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক ভূমিখণ্ড। হচ্ছে সাইক্লোন টাইফুন বা নানা ধরণের ঘুর্ণিঝড়।

তোমরা হয়ত ভাবছ, কেন, মেঘ হয়ে তো সেই জল আবার পাহাড়ের মাথায় গিয়ে জমে যাবে।তাহলে এটা কেন হবে? না, তা হয় না।এই হিমবাহ তৈরী হয়েছিল বহু আগে বরফ যুগে।এই সমুদ্রের জল বাষ্প হয়ে ফেরত গিয়ে জমে আর হিমবাহ তৈরী করতে পারে না।এরা বরফ হয় ঠিকই, সেগুলো আবার যেই রোদ ওঠে বা গরম পড়ে গলে নেমে আসে। কিন্তু হিমবাহের বরফ, যেমন সহজে গলেও না, সহজে তৈরীও হয়ও না।যে হিমবাহ তৈরী হয়েছিল বরফ যুগে, সেগুলিই অল্প অল্প গলে নদী তৈরী হয়।এই মাতানুষ্কা যেমন, তৈরী হয়েছিল প্রায় ২২০০০ বছর আগে। মাতানুষ্কা হিমবাহ গলে মাতানুষ্কা নদী হয়ে নীচে নামছে।ঠিক যেমন, আমাদের দেশের গঙ্গা তৈরী হয়েছে গোমুখের কাছে গঙ্গোত্রী গ্লেসিয়ার থেকে, ব্রহ্মপুত্র তৈরী হয়েছে তিব্বতের কাছে Chemayungdung গ্লেসিয়ার থেকে। সব নদীই গ্লেসিয়ার থেকে হয়েছে তা নয়।তবে অনেক বড় নদীই তাই।এই নদীগুলোতে ওই জন্য সারাবছরই প্রায় জল থাকে।আসলে সাধারণ জল জমা বরফের থেকে এই হিমবাহের বরফ কিছুটা ভারী হয়। তার কারণ সুদীর্ঘ দিন ধরে জমার ফলে এর ভিতরে হাওয়ার পরিমাণ চাপের চোটে কমে যায়। সেজন্য এই বরফ গলেও খুব ধীরে ধীরে এবং সারা বছর ধরে নদীকে জলে পুষ্ট করে। সারা পৃথিবীর যতটা নির্মল জল আছে, দূষিত নয় বা কোন কিছু মিশ্রিত নয়, তার বেশির ভাগটাই আছে এই সব গ্লেসিয়ার বা হিমবাহগুলির মধ্যে।

আর একটা মজার কথা বলি। জান কি, এই হিমবাহ যদি চলতে চলতে, ধর একটা সমুদ্রের কাছে হাজির হল। কি হবে তাহলে? তাহলে সমুদ্রে ভেঙ্গে পড়ে বিশাল হিমবাহের বরফের চাঁই। সেগুলো অনেক গুলোরই আকৃতি হয় ছোটখাট পাহাড়ের মত। সেগুলোই সমুদ্রে ভেসে বেড়ায় আর তখন তাদেরই বলা হয় '.আইসবার্গ' বা হিমশৈল। তোমরা সবাই নিশ্চয় জান, এরকমই এক আইসবার্গের সাথে ধাক্কা লেগেছিল ১৯১২ সালের ১৪ই এপ্রিল সেই বিখ্যাত জাহাজ টাইটানিকের, যার ফলে যাত্রার প্রথম দিনেই ধ্বংস হয়েছিল উত্তর আটলাণ্টিক সমুদ্রে সেই বিলাসবহুল জাহাজ, এবং ফলে সলিল সমাধি হয়েছিল প্রায় ১৫০০ যাত্রীর। আন্টার্কটিকার সমুদ্রে এরকম অনেক হিমশৈল ভেসে আছে দেখা যায়, যাদের শরীরের বেশির ভাগই ডুবে থাকে জলের নীচে।

যাই হোক, আমরা সঙ্গে খাবার কিছু নিয়ে গিয়েছিলাম, ফ্লাস্কে করে চা। খেয়ে নিলাম, বরফের উপরেই।তবে নিয়ম হচ্ছে, কোন কিছু খেয়ে তার উচ্ছিষ্ট বা কাগজপত্র ফেলে নোংরা করা যাবে না। 
অনেক ছবি নেওয়া হল। যখন ফেরার বেলা হল, কিছুতেই আর ফেরার মন নেই।এরকম একটা জিনিসকে চিরদিনের জন্য বিদায় দিতে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল বৈকি। তবে নতুনের দিকে তো এগোতেই হবে।তাই ছেড়ে এলাম মাতানুষ্কাকে বিদায় জানিয়ে।আমার জীবনে অনেক আশ্চর্য জিনিস দেখার লিস্টে এটা হয়ে রইল আর এক নতুন সংযোজন।এগিয়ে চললাম আর এক নতুনের সন্ধানে। ( শেষ)



স্মরণীয়
(রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী)
কলমে - পীযূষ প্রতিহার


    বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার আপোষহীন পথিকৃৎ ছিলেন রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জেমো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬৪ সালের ২০ আগষ্ট। তাঁর পিতা ছিলেন গোবিন্দসুন্দর ও মাতা ছিলেন চন্দ্রকামিনী। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ১৮৮২ সালে কান্দি ইংলিশ স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন তিনি। ১৮৮৪ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে এফ. এ. পরীক্ষা দেন এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তিনি। রামেন্দ্র সুন্দর ১৮৮৬ সালে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের অনার্স পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৮৮৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দেন এবং প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। ১৮৮৮ সালে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি অর্জন করেন। ১৮৯২ সালে রিপন কলেজে(বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯০৩ সালে তিনি ঐ কলেজেরই অধ্যক্ষ হন এবং আমৃত্যু ঐ পদে কর্মরত ছিলেন।
    রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী ১৮৯৪ সালে 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ' গঠনের অন্যতম কান্ডারী ছিলেন। বাংলা সংস্কৃতির ধারা বজায় রাখার জন্য এই পরিষদ সদা সতর্ক ছিল। ১৯০৪ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত তিনি এই পরিষদের সম্পাদক ছিলেন। ১৯১৯ সালে তিনি এই পরিষদের সভাপতির পদ অলংকৃত করেছিলেন। ১৮৯৯-১৯০৩ এবং ১৯১৭-১৮ পর্যন্ত দু দফায় তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, বিজ্ঞান, বেদবিদ্যা ও লোকসাহিত্যের মতো নানা বিষয়ে অসাধারণ জ্ঞান ছিল তাঁর। বিজ্ঞান ও দর্শনের জটিল তত্ত্ব মাতৃভাষায় প্রাঞ্জল করে বর্ণনা করায় তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। বিশেষত মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার জন্য তিনি ছিলেন আপোষহীন। একবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে বাংলায় বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ পাঠ করতে বাধা দেওয়া হলে তিনি প্রবন্ধ পাঠ প্রত্যাখ্যান করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দেবীপ্রসাদ সর্বাধিকারী মহাশয়ের অনুরোধে মাতৃভাষাতেই প্রবন্ধ পাঠ করেন।
    রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী ছিলেন একাধারে স্বদেশপ্রেমিক ও জাতিভেদ প্রথার বিরোধী। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অরন্ধনের ডাক যাঁরা দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে তিনি এই সময়ে রচনা করেছিলেন 'বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা'(১৯০৬) গ্রন্থখানি। তাঁর রচনায় বিজ্ঞান মনস্কতা ও সাহিত্য রসের মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহ হল- 'প্রকৃতি'(১৮৯৬), এটি তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধের সংকলন; 'জিজ্ঞাসা'(১৯০৩), এটিতে রয়েছে তাঁর দর্শন বিষয়ক প্রবন্ধ; 'কর্মকথা'(১৯১৩), 'চরিতকথা'(১৯১৩), 'শব্দকথা'(১৯১৭), 'বিচিত্র জগৎ'(১৯২০), 'নানাকথা'(১৯২৪) প্রভৃতি। এছাড়াও বেদচর্চার ক্ষেত্রেও যে তিনি আগ্রহী ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর রচিত ঐতরেয় ব্রাহ্মনের বঙ্গানুবাদ(১৯১১) ও 'যজ্ঞকথা'(১৯২০) বই দুটিতে। এছাড়াও তিনি বেশ কিছু পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল 'Aids to Natural Philosophy' গ্রন্থটি।
    এই প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও লেখকের ১৯১৯ সালের ৬ জুন জীবনাবসান হয়।


পাঠ প্রতিক্রিয়া
( ছোটোবেলা ৯৬ সংখ্যাটি পড়ে ফাল্গুনী পান্ডা যা লিখল)

12 ই আগস্ট এ যে বিশ্ব হাসি দিবস তা জ্বলদর্চি না পড়লে জানতেই পারতাম না ।চিত্রগ্রাহক রাকেশ সিংহ দেব একটা অসাধারণ ছবি তুলেছেন  তাকে ধন্যবাদ। জয়াবতীর জয়যাত্রা তৃষ্ণা বসাকের লেখা  পড়ে জানতে পারলাম  এক আশ্চর্য  পেরজাপতীর  কথা যা কাছে থাকলে সব রোগ সেরে যায়।  ধন্যবাদ লেখিকাকে। চুনীর খোঁজ রুপা চক্রবর্তীর লেখায় ভারী মিষ্টি বুলবুলি আর টুনটুনির কথোপকথন পেলাম। পিঁপড়ে পরিচয় সৌগত রায়ের লেখা পিঁপড়া সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্য পেলাম তার জন্য লেখককে ধন্যবাদ। সমাদৃতা রায়ের ভাষা কবিতাটি আমার বেশ ভাল লেগেছে।  ধারাবাহিক ভ্রমণ হিমবাহের ঘাড়ের উপর লেখা মলয় সরকার ।পড়তে পড়তে কখন যেন আমিও পৌঁছে গেছি পাহাড়ের দেশে নয়নাভিরাম দৃশ্য বর্ণিত আছে যা লেখা আছে তা প্রত্যক্ষ করতে পারছি চোখের সামনে এটা লেখনীর গুনে। স্মরণীয় পীযূষ প্রতিহার এর লেখা সুকান্ত ভট্টাচার্যকে নিয়ে এই লেখায় প্রতিবারের মত অনেক তথ্য জেনে সমৃদ্ধ হলাম। সবশেষে বলি সম্পাদকীয় থেকে শুরু করে পত্রিকার অন্দরমহল ধারাবাহিক ভ্রমণ ,চিত্র ,গল্প ,কবিতা, স্মরণে, ধারাবাহিক উপন্যাস এককথায় অতুলনীয় জলদচী এবারের সংখ্যা পরে আবারো উদগ্রীব হয়ে বসে রইলাম পরবর্তী সংখ্যার  জন্য ।এক কথায় এই  পত্রিকাটি নিজ গুণে সমৃদ্ধ করেছে আমায়। এভাবে এগিয়ে চলুক জ্বলদর্চি এটাই কাম্য।

আরও পড়ুন 


পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯