কবিতা অ্যভিনিউ --১৯/বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

কবিতা অ্যভিনিউ
বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় 

পর্ব ১৯

আগের পর্বে কবি রণজিৎ দেব সম্পর্কে, তাঁর কবিতাযাপনের বিভিন্ন পরিসর সম্পর্কে কিছু কথা লিখেছিলাম। এই পর্বেও তাঁর কবিতায় প্রকৃতিচেতনা এবং নিসর্গপ্রেমের  বিভিন্ন দিগন্ত  উঠে আসবে। শাখা প্রশাখা শেকড়গুচ্ছ  কাব্যগ্রন্থের  কবিতাগুলির ভেতর স্মৃতি এবং স্বপ্নের যৌথ উদযাপন আমরা দেখতে পাই। দেখতে পাই  উদযাপিত উপলব্ধির প্রকাশ। যে ভূমির উপর দাঁড়িয়ে জীবনের সতেজ স্বপ্নের ডালপালা মেলে দেয় জীবন। ব্যক্তিগত চাহিদা এবং তাচ্ছিল্যের বিপরীতে এই জীবনের ভেতর নিসর্গের ভেতর  সত্যের বিম্বনচিহ্ন সনাক্ত করবার দায় থাকে কবির। জীবনের শাখাপ্রশাখায় “ যে যার মতো অনির্দেশ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে” আর সমসময়ের যুক্তি এবং প্রতিপ্রশ্নের  দৃষ্টি এড়িয়ে আলোর দিকেই মেলে দেয় তাঁর ক্লোরোফিল।  
বৃক্ষের মতন উদ্বাহু হয়ে দাঁড়িয়ে আছি
খঞ্জনী গান  চেতন জুড়ে 
       আমাকে কে নেবে তুলে 
বুক পেতে আমি নেব কাকে ? (খঞ্জনী গান চেতনা জুড়ে) 
স্বপ্ন দেখার জন্য শক্ত জমি লাগে যেখানে ‘ নদীর পাড় ঘেঁষে বিস্তীর্ণ সবুজ ক্ষেত পড়ে আছে “ এরকম এক ভূখণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে শক্ত শিকড়ের উপর দাঁড়িয়ে কবি লেখেন 
অচেনা দ্বীপের মতো এই দেশটা কেউ কারো চেনা নয়
শব্দ নেই কোনোখানে অথচ শব্দে দেখো দুকানে তালা লাগে
বাতাসে বারুদের গন্ধ, ধুপকাঠি আর এখানে পোড়ে না 
স্বপ্নেরা ঘুমিয়ে থাকে আমরা অজস্র প্রহরী 
কুয়াশায় পথ চিনে নিতে হয়
              ঘাসের বুকে আর ফড়িং নাচে না  (প্রতি ভোরে মা আসেন)  

পালতোলা নৌকা আর বদলে যাওয়া স্বদেশ বারুদ গন্ধে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার ভালোবাসার সংবেদী বিষয় ধুপগন্ধের মতোই বিলীয়মান। তবু কেউ যেন শৈশবের গান গেয়ে ফেরে। ‘ আলোকিত স্মৃতির মতো দরজায় কড়া নাড়া’ দেয়। 
আমার দুঃখের দিনে চিঠি এলো নীল বর্ণ খাম
এতো চাইনি আমি , চাইনি কখনো হৃদয় প্রবাস
অরণ্যের একাকীত্ব চেয়েছি আমি কিংবা হোক চারদিকে অনর্গল বৃষ্টিপাত
কুয়াশার অন্ধকারেই আলোর প্রদীপ আমার এই হাত ছুঁয়েছিল ( আমার দুঃখের দিনে চিঠি এলো )

হাওয়ার মিথুন কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি  উত্তরবঙ্গের  শ্যামল প্রকৃতি এবং নিসর্গের পাশে সরল মানবতার স্পন্দন। যে জীবনের ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে কবি তুমুল ভাবে ভালবেসেছেন প্রান্তিক আদিবাসী মানুষজন। ভালোবাসার হাত রেখেছেন অমলিন বন্ধুত্বে, তাঁদেরই একজন হয়ে উঠেছেন কবি রণজিৎ দেব 

এই হাত স্বর্গের সুষমা গোলাপ জলে ডোবানো 
ঢের বুঝতে পারি আমি- চলছে এখন বেহিসেবী দিন
বুকের ভিতর বয়ে চলে নিরবধি মানানসই নদী 
                       ঘুরপাক খাওয়া একটি জীবন  (এই হাত) 

অথবা বলেছেন 

আমার কাছে কি চাও তুমি অস্ত রাগের আলো 
পাহাড়ি ঝোরার জলে ভেজা আঁধার কালো ?
হাজার পাখির ডানার কাঁপন চিলাপাতার বন
বনজ গন্ধে খসে তারা বাতাসে ইমন ? ( ঘাস বিছানো ভূমি ) 
কবি রণজিৎ দেবের লেখায় পারিপার্শ্বিক জীবনের প্রাঞ্জলতা মর্মদেশ থেকে উঠে আসে। আন্তরিক জীবনকে তিনি ঠাওর করেছেন গভীর মগ্নতায়, তাই প্রাণের আর্তি নিয়ে জীবনের মহত্তর এবং বৃহত্তর আকরকেই খুঁজে পেতে চেয়েছেন –
বন্ধুরা কখনো কখনো আর বন্ধু থাকেনা 
শত্রুরা কখনো কখনো আর শত্রু থাকেনা 
নতজানু হয়ে জড়িয়ে ধরে পা।
অনেকেই ঠকে অহরহ, ঠকে
ঠকতে ঠকতে শিখে
শিখতে শিখতে থকে-
একবিন্দু আলো পেলে শ্বাস নিতে পারে ( শত্রু বা বন্ধু বলে কিছু নেই )

 একবিন্দু আলো পেলে শ্বাস নিতে পারে। এর নামই ভালোবাসা। একবিন্দুর আলোর প্রতীক্ষাই আমাদের সকলের। ক্রমাগত প্রতারিত হতে হতে নিরন্তর ঠকতে ঠকতে যে অধ্যায়গুলি আমাদের চোখের সামনে জানলা খুলে দেয় যা আলো দেখায়, যা ব্যক্তির অন্তর্গত রসায়নকে বুঝতে সাহায্য করে।নিজস্ব অধিকারের সাথে সমষ্টির দাবির যে সংঘাত তাকেই শুধু পরিস্ফুট করে না, জাগতিক লোভ লালসার চিত্রগুলিও লিপিবদ্ধ করে।এই আলোটুকু খুব জরুরি।নইলে এই লিপিপাঠ আমাদের কাছে স্পর্শের অতীত থেকে যায়। এর ভেতর দিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের শ্বাস নেওয়ার পরিসরটুকু উন্মুক্ত।     
পাহাড়ি ঢল কাব্যগ্রন্থে রয়েছে ভালোবাসার বিশল্যকরনী। একদিকে প্রকৃতি, অন্যদিকে মানবী এই দুইএর সংমিশ্রণে এক অপূর্ব রূপমাধুরী ফুটে উঠেছে  এই কাব্যগ্রন্থে।
একগাল হাসি , অফুরন্ত আনন্দ-ভৈরব 
নবীন প্রাণে দোলা দেওয়া ভূমি 
বুকের মধ্যে নাচে শুভ্র- চাঁদা মাছ
কতকালের সাধনা আমার এই ডুয়ার্সে জন্মেছি ( ডুয়ার্স সুন্দরী আমার ) 

 ডুয়ার্সের নদী আর অরণ্যের চঞ্চল সজীবতা, বিকেল ছড়িয়ে লাল হয়ে যাওয়া পাহাড়ি জল মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেয় সমস্ত সত্তা।ফুন্টসোলিং পাহাড়ের সেই উঁচু মন্দির যেখান থেকে প্রিয় হাওয়া বয়ে নিয়ে যায় তৃপ্তির জলস্রোত। নদী সাঁতরে বাঘ আসে, হরিণীর প্রসব চিৎকার শোনা যায়এবং ‘’ ঝর্নার জলের সঙ্গে দুঃখগুলি ছোট্ট পাখির ডানার মতো  ওড়ে এসে স্থির হয়ে বসে’ 
এভাবেই ডুয়ার্স কবিতার শরীরে আত্মার মতো মিশে যায় ।প্রেম আবর্তিত হয়  প্রতিদিনের জাগরণে 
হাট করে খুলে রাখো পুরনো দরোজা 
তুমি কেমন প্রেম, দুঃখহর তুমি?
মলিন সুখের রেখায় গণ্ডী আঁকো 
গুটিপোকার মতো নিজের শরীর নিজেই বাঁধো 
সে কি  কোনও মহাপুণ্যের কথা, না শুধু শিল্পই তুমি ? ( তুমি কেমন প্রেম )
কবির রোম্যান্টিক চেতনায় উচ্চারিত হয়েছে অমোঘ শব্দমালা।কখনও শারীরিক অনুভবে আশ্লেষে আবার কখনও শরীর উত্তীর্ণ অতীন্দ্রিয় সত্তার গভীরে অনুরণিত হয় নিজস্ব ওঙ্কার ধ্বনি । যা হৃদয়ের চিরকালীন মর্মবানীরই প্রতিফলন।সংকটের প্রাত্যহিকী পেরিয়ে মাটির কাছে ফিরবার আকুলতা, ফেলে আসা প্রাকৃতিক আবেষ্টনীর মধ্যে জড়ানোর আকুলতা যেমন আছে, আছে নারী ও নিসর্গের কাছে নিজেকে সমর্পন করার অদম্য পিপাসা। 
সাঁওতাল রমণীর উদোম শরীরের ঘ্রাণে 
মুগ্ধ বনতল
পাপড়ি খসার মতো যৌবন ওড়ে 
চিলাপাতার গভীর বনে
দু একটি শিকারী বাঘ 
থাবা তুলতে গিয়ে গভীরে ঘুমোয় ( এক একটি রাত ) 
খুন, হত্যা অসময়োচিত মৃত্যু,রক্তাক্ত বেদনা, নির্জন অসুখের সন্নিহিত এক আত্মনির্বাসিত পৃথিবীতে ক্রমাগত ভালোবাসার অনুসন্ধানই একজন কবির কাজ। পরিত্যক্ত স্মৃতির ছবিগুলিই সঞ্চারিত হতে থাকে চারণভূমির শেকড়ে যা মাটির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা বিশ্বাস আর ভালোবাসার বিচ্ছুরণকেই ব্যপ্ত করে তোলে । সমষ্টির ভেতর সংক্রামিত করে এই প্রেম ও প্রতীতি। দুর্বিষহ পীড়িত সময়েও “ তবু কেন ভেসে আসে সোনার থালার মতো লালবিন্দু-  সে কি স্বপ্ন –ভালোবাসা!” 
একটি রুমাল ছিল হাতে সেখানে  ছিল তুলির আঁচড় গোপন কথা
ছিল জীবনযাপন নিয়মসূচি আর কিছু দুঃখ ব্যথা।
একটি আঁচল উড়ল হাওয়ায়  যেন রঙিন ঘুড়ির ঘাই ওঠে 
নীল আকাশের তুষার মেঘ হঠাৎ থেমে ভীষণ ছুটে ।

ঠোঁটের কাঁপন দেখেই বুঝে আবার বুঝি বৃষ্টি নামে 

                                    পাতাল জুড়ে
ভাসবে দুকূল ভিটেমাটি কান্নাভেজা জীবন থামে নয়নপুরে 
একটি কথা শব্দ তুলে একলা পেলে মধ্য যামে খাচ্ছে কুরে!
তুলির আঁচড় গোপন কথা জীবনযাপন নিয়মসূচির অনেক বহর
তবুও বলি এসব আজ অকাল বোধন কাটছে বসে তিরিশ বছর (অকাল বোধন ) 
কবি রণজিৎ দেবের কাব্যবুননের ভাষা বাধাহীন মুক্তপ্রবাহী তা তেমন অহেতুক আলংকারিকতায় বিদ্ধ নয় ঠিক একই রকম ভাবে তরলতার নির্যাসেও পরযবসিত হয়নি।  প্রতিদিনের ছোট ছোট বেঁচে  থাকা এবং আপাত  বৈশিষ্ট্যহীন  উপাদানগুলিকে নিজস্ব ভাবনার জারনে শিল্পসমৃদ্ধ করে তুলেছেন সহজেই। আমাদের চেতনার স্তরকে যা সহজেই সক্রিয় করে তোলে এবং তূলির আঁচড়ে জীবনযাপনের সমস্ত নিয়মসূচির সমস্ত আন্তঃসাক্ষ্যকে,পিপাসার্ত সত্তাকে রহস্যময় পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত করে দেয়। 
‘দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছে অজস্র মানুষ 
আগে আসার ধুম লেগে যায়
তোমাকে বুঝে নিতে হবে 
        কোনটা ভুল অথবা ঠিক । 

বুঝে নিতে হবে – জীবনটা 
   বুঝে নেওয়ারই সংগ্রাম”  (জীবনটা / অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র ) 
জীবন তো চারপাশের সমস্ত কিছুকে  আত্মস্থ করারই নিরন্তর প্রয়াস। গতির মুখোশ পরে অহেতুক ব্যস্ত থাকবার তাড়না থেকে  আপাত তুচ্ছ বিষয়সমূহের দিকে লক্ষ্য রাখলেই আমরা দেখতে পাব জন্মসমগ্রের হাতছানি। “ ধরো ,যদি একটা মানুষ  তার লম্বা হাত পা ছুঁড়ে  শুয়ে আছে/ তিস্তার পয়স্তিতে তার পা থেকে ঝরে পড়ছে অতীত/দিনের স্মৃতি ও ভ্রমণ কাহিনী রহস্য হয়ে উঠছে ক্রমে (ধরো যদি)” অপ্রকল্পিত ভ্রমণের দাগে ক্রমাগত চিহ্ন বুনে যাওয়া এই সঞ্চারপথ যেখানে পায়ের থেকে মুহুর্মুহু ঝরে পড়ছে স্মৃতির সরণি ।এই উন্মোচনের জন্যই বোধের বীজক্ষেতে স্বরচিত অনুরণন ।বিন্যাসের প্রতিবর্তী নকশার বাইরে এক মননবিশ্বের আয়োজন 
টুকরো টুকরো গল্পগুলি স্বপ্ন হয়ে যায় ছোট ছোট কথাগুলি
স্মৃতি হয়ে ঝরে। দাঁড়িয়ে থাকে ফেলে আসা ছেলেবেলাগুলি-
মানুষ কিভাবে খণ্ড খণ্ড হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর কাছে (আজ আমি দুঃখ ছোঁব ) 
এই খণ্ড খণ্ড চিত্র থেকেই সমগ্রপথের সন্ধান। জীবনপথে ফেলে যাওয়া অলংকারের টুকরোটাকরাগুলি সেলাই করতেই করতেই আমরা বুঝে নিতে পারি ‘ আড়ালে কোথাও লুকিয়ে আছে কান্নার রাত- হাড় হিম শত্রুতা” কোথাও আঁধার জমে আবার কোথাও অন্তর্গত বৃষ্টিপাত ধুয়ে দেয় সমস্ত মালিন্য।
শরীর জুড়ে যতটা ঝরনার জল ঝরে তারও বেশি আজ 
ভেতরে-আগুন, মুহূর্তগুলি রাতজাগা পাখির মতো ডাকতে থাকে-
অল্প অল্প আঁধার জমেছে, অল্প অল্প বৃষ্টিও ( আজ আমি দুঃখ ছোঁব ) 
অল্প অল্প আধার জমেছে, ইতস্তত বৃষ্টির মৃদু সুর। রাতজাগা পাখির অস্থিরতা নিয়ে অতি পরিচিত সে সব মুহূর্ত থেকেই  উঠে আসে স্মৃতির চেয়েও নতুন এক তরঙ্গ যা জীবনদৃষ্টির কাছে এক উজ্জ্বল চিত্রশরীর। ক্রমিক জারনে নিজস্ব ভাষামাটির উপর শব্দের প্রলেপ বুলিয়ে তিনি অনুভব করেছেন 
গাছ, গাছের মাঝখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাতা
পাতার নীচে মাটি ছুঁয়ে থাকা জলপ্রপাত
আমার থেকেও নিঃশব্দে তোমাকে ছুঁয়ে  দুঃখ হয়ে নামছে।
মেঘলা আকাশ থেকে বৃষ্টি নামার আগেই
জঙ্গল ঘিরে ধরছে অকাল আঁধার , কোলাহল –
কিছুদিন আগে বা পরে যে-কোনদিন
ঠোঁটের পাপড়ি থেকে উড়ে যেতে পারে রঙিন প্রজাপতি ( রঙিন প্রজাপতি)
কবি রণজিৎ দেবের কবিতায় প্রকৃতি এবং মানব সম্পর্কের অমোঘ রহস্যরূপ আশ্চর্য  শিল্পদক্ষতায় পরিস্ফুট হয়েছে।প্রকৃতির মাঝে ব্যক্তির গূঢ় রহস্য শব্দের দীপ্ত উদ্ভাসনে উজ্ব্বল হয়েছে। পাশাপাশি ভৌগোলিক সত্তা এবং মানব অস্তিত্বের মেলবন্ধনে  অঙ্গীভূত হয়ে ঘনিষ্ঠ রোমান্টিকতায় আশ্লিষ্ট হয়েছে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র এর কবিতাগুলি। প্রীতিময় ইচ্ছার সাথে চেতনার বিন্দু থেকে অক্ষর তরঙ্গ হয়ে নেমে এসেছে সাবলীল ভাবে  

আশ্চর্য ভঙ্গিমায় বিস্ময় ও শিহরণ জাগিয়ে
                              উড়ে যায় পাখি
আকাঙ্ক্ষা স্বপ্ন ডুবে যাচ্ছে অতলে
সুন্দরী রমণীদের ভিড় ঠেলে কি সংকেত পাঠাবে  তুমি ?

বইয়ের পাতা ওলটানোর মতো 
                      আজও
            অনবরত ভিজে যাই
কালোদাগগুলি প্রতিদিন ভাসিয়ে দিই জলে (অনবরত ভিজে যাই) 
আশ্চর্য ভঙ্গিমায় শিহরণ জাগিয়ে শব্দগুলি নিঃশব্দে অদৃশ্য ধ্বনির ভেতর আশ্রয় নেয়। আকাঙ্ক্ষা প্রসূত হয় এক আচ্ছন্ন স্বপ্নের অতলে।হাওয়ার মিথুনে ধ্বনিগুচ্ছ মরমী ও স্বর্গীয় হয়ে ওঠে । ভিজিয়ে দেয় আমাদের। এই ভিজে যাওয়ার জন্যও পরিসর লাগে। লাগে সেই সিক্ততাকে সমর্পন করবার স্বাভাবিক শান্ততা। বইয়ের পাতায় কালোদাগগুলি আকাঙ্ক্ষিত ফুল হয়ে ফুটে ওঠে।সার্বজাগতিক বিশ্ববোধের ভেতর কবিতা এভাবেই মানুষের চিরন্তন আকুতি এক চিরন্তন রূপরেখার রহস্যকে জাগ্রত করে রাখে । শুধু তাই নয় সৌন্দর্যের শাশ্বত ছায়াপথ  নির্মাণে তাঁর চিন্তালোক ভরে ওঠে মায়াবী বিচ্ছুরণে। আত্মিক পরিস্থিতির নিবিড় আলিঙ্গন থেকে, মর্মস্থল থেকে, নিজের  সৃজনশীল সমস্ত অন্তর্বস্তুকে স্বপ্নলোকের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক সঞ্চারপথ তৈরি হয় তাঁর কবিতায়।অস্তিত্বের আবহমান কিরণসম্পাত থেকে শব্দপথে নেমে আসে শুশ্রূষার বীজ। মৃদু উচ্চারণে কথা বলেন তিনি । সুর ছড়িয়ে যায় তাঁর শব্দের বারান্দায়। আমরা  এই মূল সুরটিকে অনুভব করি তাঁর কবিতার বয়নে। ইশারার ভেতর দিয়ে অন্ধকার বিবর খুঁড়তে খুঁড়তে জীবনের শূন্যায়তনের অভিব্যক্তিকে প্রকাশ করেন কখনও , আবার কখনও তা ভরে ওঠে বিশুদ্ধ সৌরভে। সময় চিহ্নিত শিল্পের অপরিহার্য দাবি তাঁকে আলোড়িত করে। আস্তিত্বিক জীবনের বাইরে এক পারমার্থিক সংকেত তুলে ধরার অনন্য সংবেদ স্থাপন করে তাঁর কবিতা । মিথ্যার মনোরঞ্জক আবহ তৈরি করার ছলাকলায় অনভ্যস্ত বলেই ঋজু এবং স্পষ্ট বাকভঙ্গিমায়  কবি রণজিৎ দেব লিখতে পারেন  অকপট অনিবার্য শব্দমালা।  
(চলবে)

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯