জীবনের গভীরে বিজ্ঞান-১২/নিশান চ্যাটার্জী

জীবনের গভীরে বিজ্ঞান-১২

গরলকে করি সরল...

নিশান চ্যাটার্জী

গত পর্বে আলোচনা করেছিলাম প্রগতির গরল কিভাবে আমাদের চারপাশের জলজ পরিবেশে বিস্তৃত। এই গরল যখন আমাদেরই মন্থনজাত তাই তা দূর করার দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে। আমরা যতই প্রকৃতির ওপরে অত্যাচার করিনা কেন, একাজে যদি কেউ আমাদের সাহায্য করতে পারে তা হল প্রকৃতি স্বয়ং। বিগত পর্বে আলোচনা করেছিলাম জলভাগ দূষিত হওয়ার ফলে জীবজগতে তার প্রভাব পড়ছে, যা সামগ্রিক ভাবে আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য কে  বিনষ্ট করছে। সেক্ষেত্রে উপায় হলো যথেচ্ছ পেস্টিসাইডের পরিবর্তে খাদ্য উৎপাদনে পরিবর্তন আনা অথবা পেস্টিসাইড পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করেও জলজ প্রাণীর স্বাস্থ্য রক্ষা ও জলের স্বাস্থ্য রক্ষায় সাহায্য করা। প্রথম উপায়টি নিয়ে আমরা আগামী পর্বে অবশ্যই আলোচনা করবো। আপাতত দ্বিতীয় উপায়টির দিকে দৃষ্টিপাত করাই এই পর্বের মূল উদ্দেশ্য। আগেই বলেছি প্রকৃতিকে বিষমুক্ত করার উপাদান রয়েছে প্রকৃতির মধ্যেই শুধু প্রয়োজন তাকে খুঁজে বের করার। এই বিষয়ে বর্তমানে বহু গবেষণা চলছে সেগুলো যতটুকু সম্ভব তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। DDT এই নামটির সাথে আপনারা সকলেই কমবেশি পরিচিত। 

এই পেস্টিসাইডটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে " বিস্ময়কর রাসায়নিক"("Wonder-Chemical") নামে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৭২ থেকে ২০০১ যত সময় এগিয়েছে এর ব্যবহারে ক্রমেই নিষেধাজ্ঞা গড়ে উঠেছিল। Centers for disease control and prevantion (CDC) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, DDT পরিবেশে ভেঙে যে সকল পদার্থ উৎপন্ন করে তার ৯৯ শতাংশই মানুষের রক্তে পাওয়া যায়। আবার ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট এর রিপোর্ট অনুযায়ী, যে সকল মহিলারা বয়ঃসন্ধির পূর্বেই এই রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসেন তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অন্ততঃ পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। DDT কে হয়তো নিষিদ্ধ করা গেল। কিন্তু এমন বহু রাসায়নিক রয়েছে, যার ব্যবহার ছাড়া খাদ্যের বিপুল চাহিদার জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই ঝুঁকি সত্ত্বেও সেগুলোর ব্যবহার চলছে। আমাদের প্রকৃতিতে এমন বহু ভেষজ উদ্ভিদ রয়েছে যার গুন সম্পর্কে অনেকেই অবহিত। এই উদ্ভিদ গুলি থেকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নিঃসৃত পদার্থ(Chemical extract) যদি জলে ব্যবহার করা যায়, তাহলে তার ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে জলজ প্রাণীদের রক্ষা করা অনেকটাই সম্ভব। যেমন ২০১৭ সালে আমি এবং আমার সহ গবেষকরা আমাদের গবেষণাপত্রে(Phytochemical profiling...Butea superba Roxb.) উল্লেখ করেছিলাম যে, "লতা পলাশ" নামক একটি উদ্ভিদ যেটা পশ্চিম মেদিনীপুর ও পুরুলিয়ার কিছু অংশে পাওয়া যায় তার পাতা থেকে যে "ফেনল" নামক প্রাকৃতিক রাসায়নিক পাওয়া যায় তা ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম। তাই জলে ধুয়ে আসা রাসায়নিকের বিরুদ্ধে আমরা যদি এই উদ্ভিদের পাতার নির্যাস পর্যাপ্ত পরিমাণে জলে স্প্রে করতে পারি তাহলে জলজ প্রাণীদের tissue damage কিছুটা হলেও আটকাতে পারবো। কাইরন এবং তার সহযোগী গবেষকগণ ২০০৫ সালে তাদের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন, পরিবেশের ক্ষতিকারক পদার্থ সমূহের থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো ঐ সমস্ত পদার্থকে ভেঙে অপেক্ষাকৃত সরল পদার্থ উৎপাদন করা, যা পরিবেশের নিজস্ব প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নষ্ট হয়ে যাবে। প্রকৃতির মাঝে এই ব্যাপারে সাহায্য করে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া। এই ঘটনাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় "বায়োরেমিডিয়েশান"("Bioremediation")। 

এই প্রক্রিয়া অনেক সরল এবং কম খরচ সাপেক্ষ। প্রকৃতির সেই পথকে অনুসরণ করেই আমরাও ভেষজ উপাদান ব্যাবহারের মাধ্যমে জলভাগে মিশ্রিত ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ সমূহ কে অপেক্ষাকৃত সহজ ভাঙন ( Biodegradable) বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন পদার্থে রূপান্তরিত করতে পারি। একাজে আমরা বিশেষ কিছু ভেষজ উদ্ভিদ যেমন কালমেঘ, নিম প্রভৃতির থেকে পৃথকীকৃত উপাদান সমূহকে ব্যবহার করতে পারি। কারন ২০১৪ সালে আমার একটি রিভিউ আর্টিকেল যেটি Global Journal Of Research On Medicinal Plants & Indigenous Medicine (GJRMI) এ প্রকাশিত হয়েছিল (Andrographis paniculata a traditional herb... A Review), তাতে উল্লেখ করেছিলাম যে- এই উদ্ভিদে আ্যন্ড্রোগ্রাফোলিড ( Andrographolid) নামক রাসায়নিক এর উপস্থিতি একে  আ্যন্টিব্যাক্টেরিয়াল( Anti Bacterial),  আ্যন্টিফানগাল(Anti Fungal), আ্যন্টিক্যানসার(Anti Cancer) প্রভৃতি গুণসমৃদ্ধ করে তুলেছে। যদিও এই বিষয় গুলি এখনো গবেষণার স্তরে রয়েছে এবং আরো বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। তবুও একথা বলা যেতেই পারে আমাদের দ্বারা সৃষ্ট গরলকে নির্বিষ করার চেষ্টা আমাদেরকেই করতে হবে। তবেই আগামী প্রজন্মের কাছে বাসযোগ্য করে তোলা যাবে এই সুন্দর শস্যশ্যামলা পৃথিবীকে। তাই জীবনের লক্ষ্য হোক কবির ভাষায়- 

চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি -
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি