ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১০১

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১০১

সম্পাদকীয়,
গণেশ সর্ববিঘ্নহারী, মঙ্গলমূর্তি, সিদ্ধিদাতা - একথা কেনা জানে। একবার স্বর্গে কোন দেবতা সবচেয়ে বড়ো সে নিয়ে যুদ্ধ শুরু হলে মহাদেব সকল দেবতাকে ত্রিলোক ভ্রমণে পাঠান। যে আগে ফিরবে সেই শ্রেষ্ঠ এই যুক্তিতে সবাই যেযার বাহন নিয়ে বেরিয়ে গেলেও গণেশ নিজের মাতা-পিতা, হর-পার্ব্বতীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম সেরে বসে গেল মোদক খেতে। গণেশের এই  বিচক্ষণতার জন্যই তিনি শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পেলেন। আর আমরাও তাই যেকোন পুজোর আগে গণেশ পুজো করি, কি তাইতো? এবারের উৎসব সংখ্যাও এই রীতি মেনেই করা হল। রামামৃত কাকুর লেখা থেকে আমরা প্রথমেই গণেশকে স্মরণ করে নেব।  শুধু গণেশ কেন, গণেশের বন্ধু হাতির কীর্তির কথা অনন্যা আন্টির গল্পে পড়ে নিও। এবারের উৎসব সংখ্যা শুরু হয়েছে দু দুটি উপন্যাস দিয়ে। একটি সুকুমার জেঠুর লেখা ধানের শীষে শিশিরবিন্দু, অন্যটি তপশ্রী আন্টির থ্রিলার। থ্রিলারের রোমাঞ্চ শুধু উপন্যাসেই নয় কৃষ্ণা পিসির গল্পেও আছে। আমি জানি তোমরা আজকালকার ছেলেমেয়েরা ভূত টুতে ভয় টয় পাওনা। তাকে তোমরা পুত বানিয়ে ফেলেছো। তাই ভূতের মজা ছড়ায় লিখে দিলেন প্রভাত জেঠু। ছড়ার কথায় একটুস জ্ঞান দিই। এবারের উৎসব সংখ্যা ১ তোমরা যারা ছড়া লেখ তাদের কাছে খুব আনন্দের। কারণ এবারে স্বপ্ননীল কাকু লিখে পাঠিয়েছেন ছ ছটি লিমেরিক। লিমেরিক কী? লিমেরিক আয়ারল্যান্ডের একটি জায়গার নাম। ফ্রান্সের সৈন্যদল সেখানে থাকাকালীন একত্রে ছোটো ছোটো গীতিকবিতার মতো ছড়ার গান বাঁধতো। সেগুলি তারা যুদ্ধের পর বাড়ি এসে ছোটোদের বলে শোনাতে থাকে। লিমেরিক থেকে ফিরে বলতে শুরু করা হয় বলে এগুলোর শৈলীকে লিমেরিক বলা হতে লাগল। লিমেরিক পাঁচ লাইনের। তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন বাকি গুলোর থেকে ছোটো হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। দীপ আঙ্কেলও দারুণ ছড়া লিখেছেন। তাবলে ভেব না ছড়া আর লিমেরিক আলাদা। দুজনের গলায় গলায় ভাব, শ্রীরাধা আর ফতেমার মতো। শ্রীরাধা আর ফতেমা কে? সেটা জানতে পড়তে হবে দিলীপ জেঠুর গল্প। না না উৎসব সংখ্যা এখানেই শেষ নয়। মালয়েশিয়ায় থাকতো এক ইঁদুরের মতো দেখতে হরিণ। তারপর? তারপর জানতে পড়ে নাও ইন্দিরা আন্টির লেখা মালয়েশিয়ান লোকগল্প। কি হল কিনা শেষে ইঁদুরের কথা? আরে বাবা গণেশ দিয়ে শুরু করে ইঁদুরের কথা বলব না, তা কখনো হয়? বাকি রইল উৎসবের সাজ। উৎসবের সাজে মা সেজে উঠছেন সে ছবি পাঠিয়েছে মৃণাল আঙ্কেল। শুধু বাকি চক্ষুদান। সে হবে মহালয়ায়। এবারের সংখ্যাকে উৎসবের সাজে সাজাতে ইলোরার মাসির আঁকাও যেমন সাহায্য করেছে তেমন করেছে অংশিকা, তুহিন, পৃথা আর অরিন্দমের আঁকাও। এসো ছোটোবেলার হাত ধরে  উৎসবের আনন্দ লুটে পুটে নিই। ---- মৌসুমী ঘোষ।

নিবন্ধ
পার্বতী পুত্র গণেশ 
রামামৃত সিংহ মহাপাত্র 



গণেশ এই নামের মধ্যেই অর্থ লুকিয়ে রয়েছে। গণের ঈশ অর্থাৎ গণের অধিপতি তথা গণদেবতাগণের প্রধান। বারো আদিত্য, দশ বিশ্বদেব, আট বসু, ছয় তুষিত, চৌষট্টি আভাস্বর, ঊনপঞ্চাশ বায়ু, দুই শত কুড়ি জন মহরাজিক, বারো জন সাধ্য, এগারো জন রুদ্র- এই গণদেবতাগণ মহাদেবের অনুচর। এদের অধিপতি হলেন গণেশ বা গণপতি।
    তবে এই সব গণদেবতাগণ সহজে গণেশের অধীনতা মেনে নেন নি। গণেশকে রীতিমতো যুদ্ধ করে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর সহ সকল গণদেবতাগণকে পরাজিত করে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে হয়েছে।
    এই যুদ্ধে তিনি পাশে পেয়েছেন একমাত্র মাতা পার্বতীকে। এমনকি পিতা মহাদেবেও তাঁকে সাহায্য করা তো দূরে থাক যখন দেখেছেন তাঁর সুশিক্ষিত সৈন্যদল হারতে বসেছে একরক্তি গণেশের কাছে তখন নিজেই অস্ত্র তুলে নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন যোদ্ধার ভূমিকায়।
   এতবড়ো যোদ্ধা হয়েও পার্বতী পুত্র গণেশ সর্বদা মাতৃবৎসল, মায়ের আদেশে, মায়ের মর্যদা রক্ষায় কখনো পিছুপা হননি বড় বড় দেবতা বা দানবদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে। আর হবেনই না বা কেন? গণেশ তো প্রকৃত অর্থেই পার্বতীর আত্মজ।
   স্কন্দপুরাণের মহেশ্বর খণ্ডে গণেশের জন্মকথা বলতে গিয়ে বলা হয়েছে পার্বতী নিজের গাত্রমাল থেকে এক গজমুখ মনুষ্যমূর্তি নির্মাণ করেন তাঁকে স্মৃতিধর এবং জগতের শ্রেষ্ঠ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য। তাঁর এই গুণের জন্যই বেদব্যাস মহাভারত রচনার জন্য তাঁর বহু পণ্ডিত শিষ্যদের গণ্য না করে গণেশকে বেছে নেন। হস্তীমুখ হবার কারণে গণেশের অপর নাম গজানন। এই হস্তীমুখ হবার পিছনে এক এক পুরাণে এক এক রকম গল্পের অবতারণা করা হয়েছে।আমরা বহুল প্রচলিত দুটি গল্পের অবতারণা করবো। জন্মমুহূর্তে অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে শনিদেবতাও আসেন পার্বতীর পুত্র দর্শনে। তাঁর দৃষ্টি পড়তেই গলা থেকে মুন্ডু খসে পড়ে শিশু গণেশের। সেই সময় বিষ্ণু আদেশ করেন এমন কারও মাথা নিয়ে আসতে যে উত্তর দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। শিবের অনুচরেরা একটি হস্তীশাবককে উত্তরমুখে শুয়ে থাকতে দেখে। তখন তারা ঐ হস্তীশাবকের মুণ্ডু কেটে নিয়ে এলে, বিষ্ণু গণেশের গলায় ঐ মুণ্ডুর পুনঃস্থাপন করেন।
   অন্য একটি গল্পে বলা হয়েছে গণেশকে তৈরি করে পার্বতী তাকে প্রহরায় রেখে চান করতে যান।যাবার সময় নির্দেশ দিয়ে যান তিনি চান করে না আসা পর্যন্ত যেন গণেশ কাউকে ঘরে ঢুকতে না দেয়।হেনকালে সেখানে দেবাদিদেব মহাদেব উপস্থিত হন।তাকেও ঘরে ঢুকতে বাধা দেয় গণেশ। তুমুল যুদ্ধ শুরু হয় শিব অনুচরদের সঙ্গে। তাদের সকলকে পরাজিত করে দেয় গণেশ। তখন শিব ক্ষিপ্ত হয়ে ত্রিশুল ছোড়েন।ত্রিশুলের আঘাতে গলা থেকে মুণ্ডু খসে পড়ে।
    পার্বতী ফিরে এসে গণেশকে ঐ অবস্থায় দেখে রুষ্ট হয়ে পৃথিবী ধ্বংস করতে উদ্যত হলে শিব তাঁর অনুচরদের নির্দেশ দেন উত্তর দিকে শুয়ে থাকা কোন প্রাণীর মাথা নিয়ে আসতে। অনুচরেরা একটি হস্তী শাবকের মুণ্ডু নিয়ে আসে। শিব তখন ঐ মুণ্ডু জুড়ে দিয়ে গণেশের দেহে প্রাণ সঞ্চার করেন। কিন্ত মন থেকে গণেশের এই রূপ মেনে নিতে পারেন না মাতা পার্বতী। তখন সকল দেবতা মিলে আশ্বস্ত করেন দেবকুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা বলে পরিগণিত হবেন গজানন। সবার প্রথমে গণেশ পুজো করে তবেই অন্যান্য দেবতাদের পুজো করা যাবে।না হলে সেই পুজো নিষ্ফলা হবে।এতে রাগ কমে পার্বতীর। 
     অন্য আর একটি কাহিনীও অবতারণা করা হয়েছে, পুরাকালে মালী ও সুমালী নামে দুই শিবভক্ত দৈত্য ছিল। সূর্যের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ বাঁধে।সূর্য তাদের হত্যা করতে উদ্যত হলে তারা দুজনেই শিবের শরণাপন্ন হয়। নিজের ভক্তদের বাঁচানোর জন্য শিব সূর্যকে ত্রিশুলের সাহায্যে আঘাত করে অচেতন করে দেন। সূর্য কে এই অবস্থায় দেখে বিহ্বল হয়ে পড়েন,সূর্যের পিতা মহর্ষি কশ্যপ এবং ছিন্নমস্তক পুত্রলাভের অভিশাপ দেন।
   কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর রামায়ণ পদ্যানুবাদে গণেশের জন্মকাহিনিটি অন্তর্ভুক্ত করেন।গণেশের কাহিনী যুক্ত হয়েছে মঙ্গলকাব্যগুলিতেও। মধ্যযুগের রায়মঙ্গল কাব্যের অন্যতম কবি হরিদেব লিখেছেন-" আশ্চম্বিতে উচাটিল গণেশের মাথা।/ দক্ষিণে আসিয়া সেই হইল দেবতা।।" এই উপাখ্যান থেকে গণেশের কাটামুণ্ডুর হদিশ দেওয়া হয়েছে। ঐ কাটা মুণ্ডুই পরে ধীবর জাতির কাছে দক্ষিণ রায় হিসাবে পূজা পেতে থাকে। ১ লা মাঘ যে দেবতার মূল পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ মহাকাব্যেই ঐ কবি লিখেছেন- "আমি ত জঙ্গল রাজা দক্ষিণ ঈশ্বর। / আমার সেবক যত ভাটির ধীবর।।"
     মুণ্ডুহীন গণেশ পূজিত হন মুনকাটিয়া নামে। মন্দির রয়েছে উত্তরাখণ্ডে শোনপ্রয়াগ ও গৌরীকুণ্ডের মাঝে। প্রসঙ্গত ভারতে এটিই একমাত্র মুণ্ডুহীন গণেশের মন্দির। 
    প্রকৃতপক্ষে শৈব ও বৈষ্ণব উভয় ধর্মের বিরোধে সমন্বয় স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় গণপত্যধর্ম। উভয় ধর্মের মূল দেবতা শিব বা বিষ্ণুকে মহান হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস থেকেই গণেশের গজমুণ্ডের অবতারণা। উভয় ধর্মই গণেশের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকার করে সর্বাগ্রে গণেশ পুজো করার রীতিকে মেনে নেয়। সেই সঙ্গে গণেশের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে হাতির মতো বীর, নির্ভীক, বুদ্ধিমান ও বিশালকায় প্রাণীর মাথা নির্বাচন করলো উভয় ধর্ম মতে বিশ্বাসীরা। 
    ঐতিহাসিকদের মতে পৃথক দেবতারূপে গণেশের উদ্ভব খ্রিষ্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্তযুগে। নবম শতাব্দীতে গণপতির জনপ্রিয়তা সর্বাধিক বৃদ্ধি পায়। সম্ভবত এই সময়েই চার প্রধান স্মার্ত দেবতা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এবং সূর্যের উপরে প্রাধান্য লাভ করে পঞ্চজন হিসাবে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।গাণপত্য নামে পৃথক এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে।জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায় ঘরে ঘরে গণেশ বন্দনার মাধ্যমে।প্রাচীনতম দেবতা শিবের পরেই গণেশের মন্দির রয়েছে সর্বাধিক। ভারত এবং ভারতের বাইরেও বিভিন্ন দেশে পূজ্য দেব হিসাবে গণেশ যথেষ্ট জনপ্রিয়। পুরাণে গণেশের ৩২ টি রূপের কথা জানা যায়।এর মধ্যে তাত্ত্বিক গাণপত্য মতের দেবতা উচ্ছিষ্ট গণেশ। এই গণেশের উপাসনা বামাচারী মতে করা হয়।জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে গণেশের উল্লেখ পাওয়া যায়।গুপ্তযুগের শেষে বৌদ্ধ ভাস্কর্যে বৌদ্ধ দেবতারূপে গণেশের নৃত্যরত মূর্তি পাওয়া গেছে। জৈন ধর্মমতে গণেশ মণিভদ্র রূপে পূজিত হন। 
   গণেশ চতুর্থী গণেশের জন্মদিন।মূলত কার্যারম্ভ ও বিঘ্ননাশের দেবতা ইনি। পাঁচ প্রধান হিন্দু দেবতার অন্যতম গণেশ। ঋকবেদে গণেশকে উল্লেখ করা হয়েছে গণপতি বলে। এখানে তাঁর অপর নাম বৃহস্পতি বা বাচস্পতি।অনেক গবেষকের মতে ভারতের আদিম অধিবাসীদের পূজিত হস্তিদেবতা ও লম্বোদর যক্ষের মিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছেন দেব গণেশ।সেই অর্থে গণেশ অনার্য দেবতা।বাহন ইঁদুর এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। বাঙালী সংস্কৃতিতে গণেশের প্রবেশ সিদ্ধিদাতা রূপে রামায়ণ ও মঙ্গলকাব্যের হাত ধরে। তাই গণেশ চতুর্থী ছাড়াও পয়লা বৈশাখ ও অক্ষয় তৃতীয় গণেশ পূজার দিন।গবেষণার বিষয় এই গণেশ কেন বুধের পরিবর্তে বনিকদের পূজিত দেব হয়ে উঠলেন। বৃহঃস্পতি পত্নী তারা ও শিষ্য চন্দ্রের পুত্র বুধের বনিকদের দেবতা থেকে অপসারণ ঘটে মূলত গুপ্তযুগের সময় থেকে। এর পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল গাণপত্য সম্প্রদায়ের। বিষ্ণুর উপাসকদের অনুকরণে সৃষ্ট এই ধর্মসম্প্রদায় গণেশের আট অবতারের কথা প্রচার করেন। দ্বিভূজ,চতুর্ভূজ,ষড়ভূজ ও দ্বাদশভূজ গণেশ মূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়। দ্বাদশভূজ গণেশের কথা উল্লেখ আছে বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনাতে। 
    ভাদ্রমাসের শুক্লা চতুর্থী গণেশের আবির্ভাব তিথি। বাৎসরিক আরাধনার এই তিথিকেই লোকমান তিলক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য সর্বজনীন গণেশ উৎসব পরিণত করেন। এছাড়াও সরস্বতী পুজোর আগের দিন গণেশ পুজোর বিধান রয়েছে। ঐ দিন মোদক সম্প্রদায়েরা গুড় ও হলুদ এবং সিঁদুর গণেশকে নিবেদন করার পর কপালে তিলক হিসাবে গ্রহণ করেন।    
  পুরাণ অনুযায়ী গণেশের দুই স্ত্রী ঋদ্ধি ও সিদ্ধি এবং দুই পুত্র শুভ ও লাভ এবং এক কন্যা সন্তোষী।ব্যাসদেব বিরচিত মহাভারতের লিপিকার গণেশ খর্বাকৃতি, হৃষ্টপুষ্ট এবং ত্রিনয়ন বিশিষ্ট। সাধারণ ভাবে গণেশ চারহস্ত বিশিষ্ট। চারহাত সজ্জিত থাকে শঙ্খ, চক্র,গদা ও পদ্ম দ্বারা। আবার কোনো কোনো গণেশ মূর্তির হস্তে রয়েছে লাড্ডু, টাঙি, গদা ও পদ্ম। গণেশের বাহন মূষিক।প্রকৃতপক্ষে এই মূষিক ধর্মের অবতার। পুরাণ মতে পৃথিবী জন্ম মুহূর্তে গণেশ কে দেখতে এসে উপহার হিসাবে মূষিক প্রদান করেন। 
     আবার ভিন্ন মতে এই ইঁদুর প্রকৃতপক্ষে ঋষি বামদেব কতৃক অভিশাপ প্রদত্ত গন্ধর্বরাজ ক্রৌঞ্চ।
   দক্ষিণ ভারতের অধিকাংশ গণেশ মূর্তি একদন্তবিশিষ্ট।এরকারণ পরশুরামের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধে তাঁর কুঠার আঘাত প্রতিহত করেছিলেন একটা দাঁত দিয়ে।আবার বলা হয় মহাভারত লেখাকালীন কলমের কালি শেষ হয়ে গেলে একটা দাঁত উপড়ে নিয়ে লিখতে শুরু করেন গণেশ। 
    কাবেরী নদী উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গণেশের নাম।মদাসুর এবং তালাসুরকে হত্যা করে স্বর্গ রাজ্য পুনরুদ্ধার করে তিনি হয়ে উঠেছেন বিঘ্নবিনাশক।মহিষাসুরের সঙ্গে দেবী দুর্গার যুদ্ধের শুভ সূচনা করে তিনি হয়েছেন সিদ্ধিদাতা। সিঁদুর অসুরের হাত থেকে মাতা পার্বতীকে উদ্ধার করে হয়ে উঠেছেন প্রকৃতঅর্থেই পার্বতী নন্দন। আবার পিতা মাতা কে তিনবার পরিভ্রমণ করে জগৎ পরিভ্রমণের সঙ্গে তুলনা করে তিনি হয়ে উঠেছেন পিতৃ-মাতৃবৎসল।ইন্দ্র, কুবের ও যমরাজের দর্প হরণ করে প্রমাণ করেছেন গণপতির উর্দ্ধে কেউ নন।
     প্রকৃতপক্ষে যুগ যুগ ধরে দেবতা হিসাবে পূজিত হলেও লোককথা ও পুরাণের গল্পে এমন ভাবে গণেশ মিশে গেছেন যে তাকে মনে হয় আমাদের ঘরের আদর্শ সন্তান যিনি মাতা পার্বতীর আজ্ঞাবহ তথা স্নেহ বৎসল সন্তান। এটাই প্রকৃত পরিচয় হয়ে উঠেছে তাঁর।


ভূতের গল্প
প্রভাত মিশ্র

শুয়ে শুয়ে চুপচাপ
শুনেছি তো ধুপধাপ
দোতলার ছাতে!
এসেছিল বুঝি তারা --
ঘুম হচ্ছিল সারা
সেই মাঝরাতে!

যদি না আসত ঘুম,
পরীক্ষা মরশুম --
কী হ'ত সকালে !
আছে যে পরীক্ষা অঙ্ক
আমার সে মহাতঙ্ক
দুঃখ-ই থাকত কপালে!

পাশে ছিল ছোটকাকা,
গল্প শুনেছি একা --
কখন এসেছে ঘুম মনে নেই।
গল্পের ভূতগুলি
খেলছিল ডাঙ্ -গুলি
আমাদের বাড়ির ছাতেই!

হঠাৎ ছোটকাকা 
ডেকে ওঠে: ওঠ্ খোকা --
বেলা হ'ল বসে যা পড়তে।
আমি লাফ দিয়ে উঠি,
কলতলাতে ছুটি --
সুদকষা আছে বাকি করতে।


লোকগল্প
মৃগ-মূষিকের বুদ্ধি 
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 


(Khairun Nisa'র মালয়েশিয়ান লোকগাথা অবলম্বনে)  

মালয়েশিয়া হল ট্রপিকাল রেইন ফরেস্টের আওতায় একটি সুন্দর দেশ। সেখানে জঙ্গলে যেমন অবিশ্রান্ত নানারকমের পাখপাখালির শ্রুতিমধুর কলতান শোনা যায় তেমনি অগণিত কীটপতঙ্গের দাপুটে কনসার্টে মেতে থাকে প্রকৃতি। সেইসঙ্গে অচেনা সব বানরের আনাগোনা। কেউ তারা সাথী কে চিৎকার করে ডাকতে ব্যস্ত। কেউ আবার খাবারের খোঁজে জঙ্গলের এক প্রত্যন্ত কোণায় চুপটি করে বসে আছে মহীরুহ থেকে ঝুলতে থাকা লতানে গাছের শক্ত ডাল ধরে। 
এমন এক গহীন অরণ্যে বাস করত এক ইঁদুর মুখো হরিণ। তার নাম ছিল স্যাঙ ক্যান্সিল। এই মৃগ-মূষিক জীবটি এই অরণ্যের অনেককালের বাসিন্দা। সেখানে জঙ্গলের পশুপাখিদের নিজেদের ভাষায় দিব্য আলাপচারিতা ছিল। তারা সবাই সবার ভাষা বুঝত। ঠিক যেমন মানুষ মানুষের ভাষা বোঝে। দুঃখে, আনন্দে গল্পমুখর হয়ে উঠত তাদের অরণ্যের দিনরাত্রি। 
এই ইঁদুরমুখো হরিণের না ছিল স্ত্রী। না কোনও সন্তানাদি। তার সেই অরণ্যে নিজের স্থায়ী বাসস্থানও ছিলনা। তবে তার ছিল খুব বুদ্ধি। আজ এখানে, কাল সেখানে ঘুরে বেড়াত স্যাঙ। কোনোদিন বৃহৎ মহীরুহের ঝুলন্ত ঝুরিগুলো আঁকড়ে ধরে সে ঘুমিয়ে থাকত। কোনদিন আবার মাটিতে ঝরে পড়া শুকনো পাতার বিছানায় এলিয়ে দিত তার শরীর। এই গল্পের সূত্রপাত এমনই এক সময়। যেদিন স্যাঙ মনের সুখে ঘুমিয়েছিল একটি ঝোপঝাড়ে, যার পাশেই ছিল এক সেঙ্গাল গাছ। এই বৃক্ষের বেশ শক্তপোক্ত উঁচু গুঁড়ি হয়। 
হঠাত শুয়ে থাকতে থাকতেই স্যাঙের পেট গুড়গুড় করে উঠল। সেদিন ভোর থেকে তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি। খিদে পেয়েছিল খুব। কিন্তু খাওয়ার মত তেমন কিছুই খুঁজে পেল না সে। কয়েকটা মাত্র লতানে গাছের কচি কচি ডগা ছাড়া আর কিছুই জুটল না সে যাত্রায়। স্যাঙ ভাবল নিশ্চয়ই রুষা সাম্বার হরিণগুলো সব খেয়ে শেষ করেছে। নয়ত সে কেন খাবার পাচ্ছেনা? সাধারণত রুষা সাম্বার হরিণেরা সূর্যোদয়ের আগে খুব ভোরে অথবা সূর্যাস্তের পরে আলো আঁধারি তে এ অঞ্চলে এসে জঙ্গলে ঢুকে খাদ্য সংগ্রহ করে। আশেপাশে প্রচুর চেস্টনাট বাদাম গাছ ছিল। সেই বুনো বাদামাগাছের নীচে বাদামের অনেক সবুজ খোলা পড়েছিল। এ নিশ্চয়ই বুনো শুয়োরের কাজ। তারা এ অঞ্চলে বাদাম খেতেও আসে তবে। ভাবল স্যাঙ। এদিকে ভেজা ভেজা সেই জলাভূমিতে পচে যাওয়া শুকনো পাতা আর যত্রতত্র পচে গলে যাওয়া কাঠের গন্ধে চারিপাশ ম ম করছিল। স্যাঙ নাকে সেই স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ পেল। সে খিদের তাড়নায় মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ করে শব্দ বের করল। যাতে কেউ শুনতে পায়। যদি কিছু বুনো চেস্টনাট বাদামও পাওয়া যায় সেই আশায়। যদি বুনো শুয়োর তার প্রতি সদয়  হয়। 
নাহ! বিফল মনোরথ স্যাঙ খালি পেটেই ঘুরে বেড়াতে থাকল। সামান্য কিছু খাবারের সন্ধানে। সে হাঁটতেই থাকল। রোদের তাপে প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল স্যাঙ। সূর্যের আলো যদিও ঘন অরণ্যের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনা কিন্তু সূর্যের তীব্রতা আর তাপমাত্রা ও সেইসঙ্গে আর্দ্রতা বৃদ্ধি তে কাহিল করে দিল স্যাঙ কে। ট্রপিকাল রেইন ফরেস্টে এমনই জলবায়ু যে। কী আর করবে স্যাঙ? একে ক্ষুধার্ত সে আর সেইসঙ্গে প্রচণ্ড তৃষ্ণার্তও হয়ে পড়ল।  
হঠাত ভাগ্যক্রমে স্যাঙ একটা ছোট্ট নদীর ধারে এসে পড়ল। নদীর জল বেশ ঘোলা। কাদায় ভর্তি। কিন্তু তিরতির করে বয়ে চলেছিল নদী। অনেক কাঠের গুঁড়ি পড়ে ছিল নদীর জলে। স্যাঙ চারিদিক ভালো করে দেখল। হঠাত তার চোখে পড়ল নদীর পাড়ে কতগুলো লাল টুকটুকে বট ফল। চোখ চকচক করে উঠল স্যাঙের। ওপরে তাকাতেই দেখল, প্রকাণ্ড এক বটগাছ থেকেই সেই ফল টুপটাপ ঝরে পড়েছে। 
গাছটা কে চিনে ফেলেই মনে বড় আনন্দ হল। "এই ফল তো তবে খাওয়াই যায়" সেই ভেবেই স্যাঙ আনন্দে আত্মহারা হল। 
ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা ফলগুলোর সামনে গিয়ে বলল,  
নাহ! এ তো একটা অন্য গাছ। লাল রঙের পাকা পাকা ফল। এ তো বট ফল নয়। কিছু ফল তখনও গাছে ঝুলে রয়েছে। মুখে তুলে খাবে কিনা ভাবতে ভাবতে কয়েকটা ফল ছুঁড়ে ফেলে দিল নদীর জলে। ভাসতে ভাসতে চলল সেই ফল নদীর ঘোলা জলের মধ্যে দিয়ে। স্যাঙের পেটে প্রচণ্ড খিদে। অথচ অচেনা সে ফল চেখে দেখার উপায় নেই। তার চেয়ে নদীর জলে একটা একটা করে ফল ছুঁড়ে ফেলে সেই শব্দটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে লাগল স্যাঙ। 
নদীর মন্থর স্রোতে ভেসে যাওয়া লাল পাকা ফলগুলোকে পার হওয়া অসহায়ভাবে দেখতে লাগল। কিছুই করার নেই তার। যদিও নদীর স্রোত খুব ক্ষীণ তবুও জল খুব গভীর ছিল আর নদীটি খুব প্রশস্ত থাকায় স্যাঙের পক্ষে সাঁতার কেটে ওপারে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। তবুও স্যাঙের মনে তখন ক্ষীণ আশার আলো জেগে উঠল। 
নদীর ওপারেই যেন তার জন্য সারাবেলার আহার সাজিয়ে অপেক্ষা করছে কেউ। কিন্তু সে যাবে কেমন করে? ওপারের সব রসালো ফলের মিষ্টতা কল্পনা করেই তার মুখে জল এল কারণ সে আগেও সেইসব রসালো ফলের স্বাদ পেয়েছে। 
ইতিমধ্যে স্যাঙ তৃষ্ণা কাটিয়ে উঠেছে এবং সে নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা নীচু জায়গা খুঁজে পেল যেখানে নেমে সে একটু জল পান করতে পারে। জলপানের চিন্তা মাথায় নিয়ে স্যাঙ নদীতে নামতে যাবে অমনি দেখতে পেল তার খুব কাছ দিয়েই একটা গাছের গুঁড়ি ভেসে চলেছে।
স্যাঙ টের পেল কিছু একটা ধারালো জিনিষ তার পা টাকে ধরেছে। প্রচণ্ড আওয়াজ করল সে। এবং বুঝতে পারলো জল থেকে একটা কুমীর কামড়ে ধরেছে তার পা।পরক্ষণেই নদীর জলে রক্ত দেখে তা বুঝতে আরও সুবিধে হল। কেমন করে নিজের পা সেই কুমীরের গ্রাস থেকে ছাড়াবে ঠাণ্ডা মাথায় সেই উপায় বের করতে লাগলো স্যাঙ। 

"এই যে সুং বুহা তো আপনি? আমার পায়ে ভুল করে কামড় দিলেন যে।এটা আমার পা নয়। একটা গাছের শক্ত ডাল। আপনি হয়ত জানেন না যে একটা ইঁদুর মুখো হরিণের পা লম্বা আর সরু হয় ঠিক গাছের ডালের মতোই। অবিশ্যি ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক।" কুমীর কে বলল স্যাঙ।  
কুমীর ছিল অত্যন্ত বোকা। সে ভাবল, তবে গাছের ডাল কে ছেড়ে দেওয়াই সমীচীন। গাছের ডালে কী আর কুমীরের পেট ভরে? 
সেই শুনে কুমীর যেই স্যাঙের পা ছেড়ে দিল অমনি এক লাফে স্যাঙ তার তিন পায়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতেই টুক করে ডাঙায় গিয়ে উঠে পড়ল। কুমীর তা দেখেই বুঝল সে সাঙ্ঘাতিক বোকা বনেছে। সেদিনের কত বড় একটা শিকার তার হাতছাড়া হয়ে গেছে।  
স্যাঙ জানত যে সেই আহত পা নিয়ে সে বেশিদূর যেতে পারবে না। তবুও কুমীরের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করে সাময়িক ভাবে স্বস্তি পেল সে। মাথায় একটা বুদ্ধি এল তার। ডাঙায় দাঁড়িয়েই সে কুমীরের উদ্দেশ্যে বলল, 
“প্রিয় বন্ধু, সুং বুহা, একটা ছোট্ট অনুরোধ। দয়া করে আমার প্রতিশোধ নেবেন না। আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসার জন্য আমার উদ্দেশ্য আপনি এখনও জানেন না,” 
সেই শুনে কুমীর সুং বুহা তো অবাক। সে বলল, "তার মানে? তাহলে স্যাঙ ক্যান্সিল আপনার উদ্দেশ্য টা কী বলুন তো" 
স্যাঙ কান্সিল নামে সেই ইঁদুর মুখো হরিণ সেই ঢালু মাটিতে তিনটি পা দিয়ে ভারসাম্য রাখতে রাখতে বলল, তবে শুনুন সুং বুহা। 
"আসলে, মহামান্য রাজা সলোমন আমাকে এই নদীতে কতগুলি প্রাণী আছে তা গণনা করতে পাঠিয়েছেন"   
রাজা সলোমনের নাম শুনে সুং বুহা ভীত ও অস্থির হয়ে পড়ল।বাদশাহ সলোমন ছিলেন মালয়েশিয়ার মানুষ, জীবজন্তু, পশুপাখি, দৈত্য, দানো সবার শাসক। প্রতিটি প্রাণীই পরাক্রমশালী এই রাজার ভয়ে তঠস্থ।

"ও তাই বুঝি?" সুং বুহা বলল।

"হ্যাঁ। অতএব এখন আপনি আর সময় নষ্ট করবেন না, আপনার দলনেতাকে বলুন সব কুমীর কে একত্র জড়ো হয়ে এখানে থাকতে। আমি তবে শীঘ্রই গণনা শুরু করব। 
আর হ্যাঁ। মনে রাখবেন - কোনো কুমীর সদস্যকে কিন্তু বাদ দেবেন না।রাজামশাই তবে রাগ করবেন" স্যাঙ বেশ জোর দিয়ে বলল। 
মূল্যবান সময় নষ্ট না করে, সুং বুহা তার নেতাকে জানানোর জন্য দ্রুত নদীতে ডুব দিলেন। সাঁতার কেটে অনেক দূরে যাওয়ার আগেই স্যাঙ আবারও বলল 
"আমাকে ক্ষমা করুন সুং বুহা।আমি আপনাকে একদম বলতে ভুলে গেছি।  রাজা সলোমন একথাও বলেছেন যে আমাকে যে এই গণনার কাজে সাহায্য করবে তাকে তিনি নিজের হাতে পুরস্কৃত করবেন।"

"ও তাই বুঝি?" বললেন সাং বুহা।
আর সেই বলে তিনি তার আত্মীয়দের জানাতে দূরে সাঁতার কেটে চলে গেলেন। 

কয়েক মুহূর্ত পরে স্যাঙ আবিষ্কার করল। সেই শান্ত নদীতে ভেসে যাওয়া যেসব গাছের গুঁড়িগুলি দেখেছিল সে সেগুলো আসলে কুমীর। নিমেষের মধ্যেই নদীর মধ্যে বিভিন্ন বয়সের এবং নানা আকারের কুমীরদের সাঁতার কাটতে দেখল সে। কোনো কোনো কুমীর অতি বৃদ্ধ। কোনটা আবার নিতান্তই শিশু। 
একটি মালয় প্রবাদে বলে  "এয়ার ইয়াং তেনাং জাঙ্গান দিসাংকা তিয়াদা বুয়া" যার আক্ষরিক অর্থ "শান্ত জলে কুমীর নেই বলে আশা করবেন না"। প্রকৃত অর্থে একটি শান্ত পরিস্থিতি যে কখনোই কোনও বিপদ ডেকে আনবে না তা হয়না। 

"এবার আমার সহকর্মী কুমীর কে নিয়ে আমি এখনই গণনা শুরু করব" এই বলে সুং বুহা নদীর সব কুমীর কে  সরলরেখায় সারিবদ্ধ হওয়ার আদেশ দিল। যাতে সহজেই সে সকলকে গণনা করতে পারে। 
কয়েক মিনিটের মধ্যে, নদীর ঘোলা জল জুড়ে সমস্ত বয়সের কুমীরের সারিবদ্ধ একটি সরলরেখা দেখা গেল।সেই দেখে স্যাঙ তখন আহত পা নিয়েই কুমীরদের মাথার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তবে মাথায় রাখল কোনোমতেই নদীর জলে সে পা দেবেনা ভুলেও। এবার কুমীরদের সংখ্যা গুণতে গুণতে গান গেয়ে উঠল স্যাঙ। 

"সাতু, দুয়া, টিগা লেকুক, 
জনতান, বেটিনা আকু কেতুক! 
এম্পাত, লিমা, এনাম, টুঝু
লাপান, সেম্বিলান, ডান, সেপুলা।"  

গানের মধ্যে দিয়েই এক, দুই, তিন, চার করে এক নিঃশ্বাসে গুণে ফেলতে লাগল স্যাঙ আর এক কুমীরের মাথা থেকে আরেক কুমীরের মাথার ওপর দিয়ে টপকাতে টপকাতে নদীর অপর পাড়ে অনায়াসে পৌঁছে গেল। 
ওপারে উঠে স্যাঙ মনের সুখে বলল, 
“আমার প্রিয় কুমীরগণ, আমার গণনা শেষ করেছি। এখন, আপনারা সবাই স্বাধীনভাবে আবারও নদীতে বিচরণ করতে পারেন" 

সেই আদেশ শুনে বেচারা কুমীরগুলো সাঁতার কেটে নিজেদের মত চলতে লাগল। কিন্তু মাত্র একজন বাকি ছিল এবং সে সেখানে তখনও অপেক্ষা করছিল। সে হল সুং বুহা। 
স্যাঙের ছড়ানো পাকা চেস্টনাট ফল চিবোতে চিবোতে সুং বুহা বলল, 
"স্যাঙ কান্সিল, তুমি কী ভুলে গেছ তোমার প্রতিশ্রুতি?" 

স্যাঙের মুখেও ফল। সে মুখে পাকা ফল গুঁজতে গুঁজতে বলল, “কী প্রতিশ্রুতি? আপনি কি রাজা সলোমনের প্রতিশ্রুতি বলতে চেয়েছেন?” 
বিস্মিত কন্ঠে স্যাঙ উত্তর দিল। 

"হ্যাঁ, রাজা সলোমনের আমার জন্য উপহার কোথায়? সুং বুহার সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল। এই মুহুর্তে তার মনে অনেক কিছু কল্পনা ছিল। সে নিজের মনে কল্পনা করে নিল যে রাজার দেওয়া চকচকে সোনার মেডেল পরেছে সে এবং সদর্পে সে তার আত্মীয়দের সামনে প্যারেড করছে। সে যে কতটা গর্বিত তা দেখতে পাচ্ছিল স্যাঙ। 

"প্লপ..." জলের মধ্যে টুক করে কিছু একটা পড়ে গেল। স্বপ্নের ঘোর থেকে ফিরে এল সুং বুহা। 

"ওগুলো তোমার উপহার, সুং বুহা।" স্যাঙ কান্সিল বললো। 
সুং নদীর জলে ভাসমান লাল ফলের গুচ্ছের দিকে তাকাল। ফল প্রায় ভেসে চলেই গেল। 

“এগুলো মহামান্যের নিজের কাছ থেকে উপহার। তোমাকে খেতে হবে, নইলে...” 

বিভ্রান্ত সুং বুহা মুখ দিয়ে ফলগুলো ধরে ফেলল ইচ্ছাকৃতভাবে আর বেশ রাগতস্বরে বলল, 

“পৃথিবীতে আমার মতো কুমীর কেন এই ফলগুলো খেতে চাইবে? এটি যদি মাংস হয় তবেই না খাবে তারা " 

স্যাঙ বলল, 

“এগুলো ছিল মহামান্যের উপহার। রাজা সলোমন রাগান্বিত হলে কী হবে জানেন?”

সুং বুহার সব আশায় ছাই। তার ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন নিয়ে মনের দুঃখে সে সাঁতরে চলে গেল। 

নিরাপদে নদীর ওপারে স্যাঙ কান্সিল নামে সেই মৃগ-মূষিক প্রচুর ফল খেতে ব্যস্ত তখন। সব ফল শেষ করতে তার একটু সময় লাগবে। বড় খিদে পেটে তার। তবে সেই ডাঙায় আর কুমীর নেই, সেটাই বড় শান্তির।


পরনকথা
দীপ মুখোপাধ্যায়

একটা-দুটো বক উড়ে যায়
খিড়কিপুকুর আরশিপানা
হাঁসের পেছন হাঁস চলেছে
বুক ঠোকে তার লক্ষ্মীছানা
হিরের পাহাড় ক্ষীরের নদী
পান্না চুনী উপচে পড়ে
ডাইনে রেখে তিন্তিরিগাছ
মন ছুটে যায় তেপান্তরে।
সাতরঙা সেই ইচ্ছেগুলো
টগরতলায় জ্যোৎস্না মাখে
ঠিক যেখানে ডাইনিবুড়ির
কৌটোতে প্রাণভোমরা থাকে
চম্পাবতীর মাথায় তখন
অতসীফুল কদমকুঁড়ি
ছবির মতো পরনকথায়
পুকুরপাড়ের তালসুপুরি।
নাও ভেসেছে মনপবনের
তেরোনদীর ফটিকজলে
আকাশ থেকে শুকতারাটা
টুপুস পড়ে আশুততলে
পৌঁছে গেল পক্ষ্মীরাজও
ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমির বাড়ি
ময়ূরপঙ্খী নাও চেপে তাই
ঝলমলালো রাজকুমারী।
হাওয়ায় ওড়ে নকশীকাঁথা
জলনিকানো শীতলপাটি
উড়তে থাকে মাটির ঘোড়া
যেই ছুঁয়ে যায় সোনারকাঠি
ঠাম্মা দিদার মুখের থেকে
এমনি অনেক গল্প-ছড়া
দৌড়ে আসে ঘুমপরিরা
আর তখুনি ঘুমিয়ে পড়া।


ছোটদের জন্য উপন্যাসিকা
ধানের শীষে শিশিরবিন্দু 
সুকুমার রুজ  
পর্ব ১


  অনেকদিন আগে তোমাদেরকে সুহাসের গল্প বলেছিলাম। তোমাদের মনে আছে কিনা জানি না। 
  কী বললে? একটু একটু মনে আছে!   
  হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। সেই গাঁয়ের ছেলে সুহাস। তোমাদেরই বয়সি। জানো! সে এখন খুব কষ্টে আছে। তার গল্পই এখন তোমাদের বলবো। 
  অ্যাঁ, কী বলছো? কষ্টের গল্প শুনতে চাও না! মজাদার কিংবা হাসির গল্প শুনতে চাও! 
  ও! তুমি আবার বলছো ভূতের গল্প। 
  এই! আস্তে আস্তে! এতো হট্টগোল করো না! সবাই একসঙ্গে বললে কী করে বুঝবো! আচ্ছা, তুমি বলো! 
  ও! তোমার রহস্য-রোমাঞ্চ ভালো লাগে! 
  ঠিক আছে, ঠিক আছে, তোমার কথাও শুনেছি। তুমি বলছ কল্পবিজ্ঞানের গল্প! আচ্ছা আচ্ছা! এখন সবাই চুপচাপ বসো! আমি যা বলছি, শোনো! কেউ কথা বলবে না!     
  বলছি যে, মজাদার হাসির গল্প তো তোমরা অনেক শোনো। খুব মজা পাও, হাসো। সাময়িক আনন্দও পাও। পড়াশোনা ও পরীক্ষার চাপের মধ্যে মাঝেসাঝে সে আনন্দেরও নিশ্চয় দরকার আছে। কিন্তু শুধু আনন্দ ও হাসি দিয়েই তো জীবন কাটবে না! কখনও-সখনো জীবনে দুঃখ-কষ্টও আসে। তাই সেসবের অভিজ্ঞতাও দরকার। তাছাড়া, অন্ধকার না থাকলে যেমন আলোর প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায় না, খারাপ না থাকলে যেমন ভালো বোঝা যায় না, তেমনি দুঃখ-কষ্ট না থাকলে আনন্দ-সুখকেও ভালোভাবে উপভোগ করা যায় না।  
  কী হল! সকলের মুখ নিচু হয়ে গেল যে! শোনো! ভূতের গল্পের কথা যদি বলো, হ্যাঁ, একটা গা-ছমছমে ভয় মেশানো আনন্দ হয়তো পাওয়া যায়। কিন্তু আজকালকার দিনে তোমরা বিজ্ঞান-পড়া ছেলেমেয়ে। তোমাদের বিজ্ঞানসম্মত বোধ ও যুক্তি দিয়ে এসব গল্পের বিচার করতে গেলে দেখবে, কেমন জোলো ও ফিকে হয়ে যায়। উদ্ভট ব্যাপার-স্যাপার মনে হয়। তখন গল্প পড়া বা শোনার আনন্দটাই মাটি হয়। 
  কী বললে? ভূতের গল্প আজগুবি! হ্যাঁ, শুধু তোমার কেন, অনেকেরই ভূতের গল্প আজগুবি মনে হয়। তবে কারও কারও ওই ভয়-টা পেতে ভালো লাগে। যাই হোক, আজ হাসির গল্প কিংবা ভূতের গল্প নয়, সুহাসের জীবনের গল্প বলবো। শুধুই তার দুঃখ-কষ্টের কথা নয়, তার আনন্দ, তার খেলাধুলো, তার ভালো লাগার কথাও বলবো। দেখবে, তোমাদের কেউ কেউ নিজের জীবনের সঙ্গে ওর মিল খুঁজে পাবে। যারা রহস্য-রোমাঞ্চের গল্প শুনতে চাইছো, তারা এখানেও রহস্য-রোমাঞ্চ পাবে।    
  হ্যাঁ, অবশ্যই পাবে। রহস্য মানেই তো খুন-জখম, হিরে-চুরি, গোয়েন্দাগিরি, এসব নয়! আমাদের জীবনে চলার পথেই কত রহস্য লুকিয়ে আছে। সেসব আবিষ্কার করার মধ্যেও রহস্য উদঘাটনের আনন্দ পাওয়া যায়, শরীরে রোমাঞ্চ জাগে। যেমন ধরো, গা-গঞ্জে যেখানে এখনো ঝোপ জঙ্গল রয়েছে, ইট-কাঠ-পাথরের বড় বড় বাড়ি সমস্তটার দখল নেয়নি, সেখানে এখনো প্রহরে প্রহরে শেয়ালের ডাক শুনতে পাওয়া যায়। এই শেয়াল প্রহরে প্রহরে হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া ক'রে ডাকে কেন? এটাও এক রহস্য। এটা জানাও তো এক রহস্য উদঘাটন। ঠিক কিনা?       
  হ্যাঁ-হ্যাঁ, বলব। শিয়াল ডাকার কারণ বলবো। ব্যস্ত হয়ো না। আর যারা অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শুনতে ভালোবাসো, নিশ্চয়  শুনবে। তাতে অনেক কিছু জানা যায়, অচেনাকে চেনা যায়। গভীর জঙ্গলের গাছপালা, পশুপাখি সম্পর্কে যেমন জানা যায়, গহীন সমুদ্র কিংবা নির্জন দ্বীপ সম্পর্কেও জানা যায়। কিন্তু তোমার বাড়ির কাছে কোনও গ্রাম কিংবা তোমাদের মামার বাড়ি বা গ্রামের বাড়ির মাঠঘাট, নদীনালা, গাছপালা, ফসল ফলানোর নানান কাজকারবার, এসব সম্পর্কে জানাটাও তো ওইসব  অ্যাডভেঞ্চারের চেয়ে কিছু কম নয়! তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কবিতার লাইনগুলোঃ
বহুদিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু।
  আচ্ছা! হাত তোলো তো! তোমাদের মধ্যে ক'জন দেখেছো ওই ধানের শীষের উপরে শিশিরবিন্দু?    
  মাত্র ছ'জন! তাহলে দেখো, এতজনের মধ্যে তোমরা মাত্র ছ'জন দেখেছো। সবাই যদি এই গল্পের মধ্যে দিয়ে এসব দেখতে  পাও বা জানতে পারো যে, ওই শিশিরবিন্দুর উপরে সকালবেলার সূর্যের কিরণ প'ড়ে কী দারুন আলো ঠিকরোয়! চোখ   ঝিকমিকিয়ে ওঠে। তাহলে কি ভালো লাগবে না? নিশ্চয়ই ভালো লাগবে। তোমাদের বেশিরভাগ জনই এই ধানগাছ, গাছের শীষ, তার উপরে শিশির, এসব দেখনি। কিন্তু আজকের গল্পের নায়ক সুহাস রোজ ভোরবেলায় এই মনোরম দৃশ্য দেখে।  কেননা, ভোরবেলায় উঠেই তাকে মাঠের মধ্যে যেতে হয়। 
   না না, যা ভাবছো, তা নয়। মাঠের আলপথ ধরে সে সকালে টিউশনি পড়তে যায় না। কিংবা পাশের গ্রামে মর্নিং স্কুলেও যায় না। সে মাঠে যায় চাষের কাজ করতে।    
  কী বললে? আলপথ কাকে বলে? আর চাষের কাজ কেন করতে যায়? বলছি। তোমরা ট্রেনে-বাসে যেতে যেতে দেখেছ, দিগন্ত বিস্তৃত জমি। সবুজে সবুজ হয়ে আছে। কত ধরনের সবুজ। সেটাকে একখানা বিশাল জমি মনে হলেও জমির মালিক কিন্তু একজন নয়! অনেকজনের কিছু কিছু জমি পাশাপাশি রয়েছে। নিজের নিজের জমির সীমানা বোঝানোর জন্য, দু'জনের জমির সংযোগস্থলে একটু উঁচু করে মাটির বাঁধ দেওয়া হয়। তার উপর দিয়ে হেঁটে যাতায়াতও করা যায়। সেটাকেই বলে আলপথ। আবার কখনো একই মালিকের জমির মধ্যেও আল দেওয়া হয়, জমিতে জল ধরে রাখার জন্য। জমিটা যদি এক দিকে ঢালু হয়, তাহলে সব জল তো ঢাল বেয়ে নীচের দিকে গিয়ে জমবে। ডাঙার দিকে জল থাকবে না। তাই মাঝখানে আল বা বাঁধ তৈরি করে ডাঙায় জল ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ফসল ফলানোর জন্য তো গাছের গোড়ায় জল থাকা দরকার। তাই না!      
  সুহাস জমিতে এই জল ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে খুব পারদর্শী। তাই সে মাঠে গিয়ে বেশিরভাগ আল বাঁধার কাজ করে।  দিনের শেষে কিছু মজুরি পায়। সেই টাকা দিয়ে সে চাল-ডাল-আলু কিনে নিয়ে যায়। ওর মা রান্না করে ওর জন্য, ওর বুনু  চন্দনা আর নিজের জন্য। আলুসিদ্ধ, ডাল আর ভাত। মাছ-মাংস কেনার মতো ওদের টাকা নেই যে! তবে গ্রামের শেষে যে বিল আছে, সুহাস কখনো সখনো ছিপ দিয়ে সেখান থেকে মাছ ধরে।  
  বিল কী?  বলছি। এই যাঃ! আজ তো ঘণ্টা পড়ে গেল। কাল এর পর থেকে আবার শুরু করবো। ঠিক আছে! তোমরা এক কাজ করবে! রবীন্দ্রনাথের এই কবিতাটা সকলে মুখস্ত করে আসবে, আমি কিন্তু ধরবো।   
দুই

   এই তো, তোমরা সবাই এসে গেছ দেখছি। গল্প শোনার জন্য তোমাদের মন হাঁকপাঁক করছে, বুঝতে পারছি। আচ্ছা, কাল কতদূর বলেছিলাম?
  হ্যাঁ, ঠিক বলেছ! বিল কাকে বলে, জিজ্ঞেস করেছিলে কেউ একজন। সেটাই বলছি। এক কথায় বলা যায়, বিল হল বড় জলাশয়। আমরা বলি তো, খাল-বিল, নদী-নালা। গ্রামের দিকে তো শহরের মতো অতি আধুনিক জল নিকাশের ব্যবস্থা নেই। শহরের মতো আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন, হাইড্রেন্ট, এসব দিয়ে, পচা খাল হয়ে নোংরা জল নদীতে পড়ে না! সব গ্রামের পাশে নদীও নেই। কিন্তু গ্রামের মানুষের ব্যবহার করা নোংরা জল তো জমিয়ে রাখা চলবে না। তাতে পরিবেশ দূষণ হবে। মশা-মাছি, রোগবালাই বাড়বে। তাই সে নোংরা জল কাঁচা ড্রেন দিয়ে কোনও বড় পুকুরে, কিংবা পাশের জমিতে নিয়ে গিয়ে ফেলা হয়। সেই জমিতে পড়া জল আরও ঢালু জমি বেয়ে নিচু জায়গায় গিয়ে জমা হয়। সেইসঙ্গে বৃষ্টির জলও তো আছে। সেসব গ্রামের প্রান্তে নিচু জায়গায় গিয়ে জমা হয়ে বিল তৈরি হয়। বিলের গভীরতা বেশি থাকে না। কিন্তু আয়তনে অনেক বড় হয়। ওই বিলে অনেক মাছ থাকে।   
  ভালো প্রশ্ন করেছো। না, মাছের ডিম কিংবা মাছের ছানা সেখানে কেউ ছাড়ে না। তাহলে মাছ হয় কী করে! সে এক মজার ব্যাপার! বর্ষার সময় অনেক পুকুর কিংবা নদী জলভর্তি হয়ে গিয়ে ভেসে যায়। পুকুর থেকে জল বেরিয়ে যায়। সেই সঙ্গে পুকুরের মাছও বেরিয়ে যায়। নদী ভেসে গিয়েও নদীর মাছ চলে আসে। সেইসব মাছ ওই বিলে গিয়ে জমা হয়। সেই মাছগুলো উপযুক্ত সময়ে ডিম পাড়ে। সে ডিম থেকে বিলের মধ্যে অনেক মাছ হয়ে যায়। এই বিলের নির্দিষ্ট কোন মালিক নেই। বিলের মাছে ওই গ্রামের মানুষের সকলের অধিকার। তাই যে কেউ বিলে ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে পারে। তবে জাল ফেলে মাছ ধরা চলবে না।   
  তবে বিলটা একদম যে মালিকবিহীন, তা বলা যাবে না। আশপাশের গ্রামের যে গ্রাম পঞ্চায়েত বা অঞ্চল-অফিস আছে, আইন মাফিক মালিকানা ওই অঞ্চল-অফিসেরই। তা না হলে তো বিলে সকলের দখলদারি নিয়ে ঝগড়া বাঁধবে! যেমন ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা ভাঙা চক-পেন্সিলের দখলদারি নিয়ে তোমরা মাঝে মাঝে ঝগড়া করো! 
  ও! তোমরা ঝগড়া করো না! আচ্ছা, ঠিক আছে, তোমরা ভালো ছেলেমেয়ে। তো ওই অঞ্চল-অফিস করে কী, কোন ধনী লোককে টাকার বিনিময়ে ওই বিল একবছর বা দু'বছরের জন্য লিজ দিয়ে দেয়। সেই টাকায় গ্রামের রাস্তাঘাটের উন্নতি করা হয়। তখন সেই বিলে মাছ ধরার অধিকার ওই লিজ নেওয়া ধনী লোকটার। অন্য কেউ মাছ ধরতে পারবে না। তবে ছেলেপিলেরা ছিপ দিয়ে মাছ ধরলে, কিছু বলে না। ছিপে আর কত মাছ ধরা যায়! 
  ছিপ কী, সেটাও জানো না? ঠিক আছে, বলছি। এসব বলতে গিয়ে তো আসল গল্প বলাই যাচ্ছে না! তবুও বলছি। বাঁশগাছের ডালপালা, যার নাম কঞ্চি, তা সবাই চেনো নিশ্চয়ই! 
  চেনো? ঠিক আছে। তো ছ'সাত ফুট লম্বা ওই কঞ্চির সরু দিকটাতে লম্বা সুতো বাঁধা হয়। 
  না না, কাপড়-জামা সেলাই করার সুতো নয়, ঘুড়ি ওড়ানোর সুতোও নয়। বিশেষ ধরনের সুতো। খুব শক্ত। যাকে বলে মুগা সুতো। ওই সুতো কঞ্চির সরুদিকটাতে ভালো করে বাঁধা হয়। সে সুতোর অন্য প্রান্তে বঁড়শি বাঁধা হয়। বঁড়শি হল ইস্পাতের বা পিতলের তৈরি সরু বাঁকানো এবং ধারালো একটা জিনিস, যেটাতে টোপ লাগিয়ে জলে ফেলা হয়। মাছ সেই টোপ বা মাছের খাবারটা গিলে নিলেই ওই বঁড়শি মাছের গলায় কিংবা ঠোঁটে আটকে যায়। তখন টান দিয়ে মাছ ডাঙায় তোলা হয়। জলের মধ্যে টোপসহ বঁড়শিটা ঝুলিয়ে রাখার জন্য শোলা বা ময়ূর-পেখমের মাঝখানের শক্ত দাঁড়ার টুকরো সুতোয় বাঁধা হয়। তাকে ফাৎনা বলে। সেটা জলে ভেসে থাকে। বঁড়শিটাকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় ঝুলিয়ে রাখে। একেই বলে ছিপ। ছিপ নানা রকমের হয়। এখন খুবই আধুনিক ছিপ তৈরি হয়। শখের মাছ ধরার জন্য সেসব ছিপ শৌখিন মানুষেরা কিনে নিয়ে যায়। তাকে হুইল ছিপ বলে। মোটামুটি এই হল ছিপের কথা।       
  শুনে তোমরা ততটা বুঝতে পারবে না। একদিন গ্রামে বেড়াতে নিয়ে যাব, তখন ছিপ দেখাবো। এখানে অবশ্য শহরের শৌখিন মানুষেরা বিভিন্ন সরোবরে ছিপ দিয়ে মাছ ধরে। মাছ ধরার জন্য তাদের টিকিট কাটতে হয়, তবে সরোবরে ছিপ  ফেলার ছাড়পত্র পাওয়া যায়। সে মাছ ধরাতে যেন বিশ্বজয় করার আনন্দ আছে, তেমনি বাহাদুরিও আছে। শহরে মাছ ধরার  প্রতিযোগিতাও হয়। প্রতিযোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মাছ যে ধরে, তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়। 
  ওরা আনন্দের জন্য মাছ ধরে। কিন্তু গাঁয়ের বিলে সুহাস মাছ ধরে ভাতের সঙ্গে একটু মাছ পাওয়ার জন্য। ওর বোনটা শোলমাছ খেতে খুব ভালোবাসে। তাই ও শামুকের মাংসের টোপ দিয়ে শোলমাছ ধরে। ওর মাছ ধরতে যাওয়ার খুব একটা সময় হয় না। চাল-ডালের টাকা জোগাড়ের জন্য জমিতে কাজ করতে যেতেই হয়। ওর মা-ও অন্যদের বাড়িতে মুড়িভাজা, ধানসিদ্ধ করার কাজ করে। তবে টাকা পায় খুবই কম। কেউ আবার নগদ টাকা না দিয়ে মুড়ি কিংবা চাল দেয়। 
  কী বলছো? ধানসিদ্ধ ব্যাপারটা কী?       
  না না, আলুসিদ্ধ, পেঁপেসিদ্ধর মতো ধানসিদ্ধ খাওয়া যায় না। 
  আস্তে আস্তে! হাসি নয়। ও জানে না, তাই জিজ্ঞেস করে নিলো। ভালোই তো করলো। যারা জানতে না, তারাও জেনে গেলে যে, ধানসিদ্ধ করা হয় চাল তৈরি করার জন্য। জমির ধান ঝাড়াই বাছাইয়ের পর, বড় বড় হাঁড়িতে সিদ্ধ করা হয়। তারপর সেগুলো একদিন জলে ভিজিয়ে রাখা হয়। পরের দিনে জল ঝরিয়ে তুলে নিয়ে আবার সিদ্ধ করা হয়। তারপর ভালো করে রোদে শুকোনো হয়। এরপরে ধানকলে নিয়ে গিয়ে খোসা ছাড়িয়ে তা থেকে চাল বের করা হয়। খোসাগুলোকে তুঁষ বা কুঁড়ো বলে। সেগুলো থেকে আবার তেল তৈরি হয়। আর চাল থেকে ভাত হয়, মুড়ি হয়। সেই ভাতমুড়ি আমরা খাই। এটা তোমরা জানো। কিন্তু এটা জানো না যে, গাঁয়ের মানুষের অনেকেরই দু'বেলা ভাত জোটে না। হয়তো বলবে, গ্রামেই তো ধান হয়! তাহলে গ্রামের মানুষের ভাতের অভাব হবে কেন?      
  আরে বাবা! গ্রামের মানুষের সকলের তো আর নিজের জমি নেই। যেমন সুহাসদের নিজের জমি নেই। অনেক আগে অবশ্য ওদের কিছুটা জমি ছিল। কিন্তু ওর বাবার রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সে জমি বেচে দিতে হলো। সেই জমি বেচা টাকায় মুম্বাই নিয়ে গিয়ে ওর বাবার চিকিৎসা করানো হল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ওর বাবা বাঁচলো না। লিভারে ক্যান্সার হয়েছিল যে!   এখনো ক্যান্সার রোগের তো ওষুধ বেরোয়নি। তোমরা যারা গল্প শুনছো, তাদের মধ্যে কেউ হয়তো বড় হয়ে ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার করবে।   
  ও! এই ক্যান্সারের ওষুধের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল সুহাসের স্কুলবেলার একটা ঘটনার কথা। যদিও ওর এখনও স্কুলবেলা। ওর এমন কিছু বয়স হয়নি। ও তখন ক্লাস সেভেনে  পড়ে। লেখাপড়ায় খুবই ভালো ছিল। আর সেরকম দস্যিও ছিল। পড়াশোনার ফাঁকে সুযোগ পেলেই বনে-জঙ্গলে, আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতো। গাঁয়ের পলান মালির সঙ্গে ওর খুব বন্ধুত্ব ছিল। তার কাছে বন-জঙ্গলের সমস্ত গাছ ও চিনে নিয়েছিল। গাছগুলোর নামও মুখস্ত করে ফেলেছিল। যেমন কচাগাছ, আশশেওড়া, নিশিন্দা, ভেরেন্ডা, বনতুলসী, শিয়ালকাঁটা, রাংচিতা এরকম সব অসংখ্য গুল্ম গাছপালা ওর চেনা।    
  কী বলছ! গুল্মগাছ কাকে বলে? যে গাছের ডালপালা থাকে, কিন্তু গুঁড়ি বেশি মোটা হয় না, গাছ বেশি বড়ও হয় না, সেই গাছকে গুল্মগাছ বলে।  যেমন জবা, নিশিন্দা, কচা, রাংচিতা। এই রাংচিতা গাছের ডাল ও পাতার রং কালচে সবুজ। ডাল থেকে পাতা ভাঙলে সাদা রংয়ের আঠা বেরোয়।  ওর মা ওকে একদিন বলেছিল, রাংচিতার আঠা ভীষণ বিষাক্ত। চোখে পড়লে চোখ নষ্ট হয়ে যায়। গায়ে লাগলে ঘা হয়। আর সারতে চায় না। তাই ও রাংচিতা গাছ থেকে দূরে থাকতো।          
  যাঃ! আজকের মতো সময় শেষ। ঠিক আছে, ওই ঘটনাটা দিয়ে কাল শুরু করব। ঠিক আছে। আর শোনো, তোমরা কে কী গাছ চেনো, তাঁর নমুনা হিসাবে সেসব গাছের একটা করে পাতা নিয়ে আসবে। তার নামটা অবশ্যই বলতে হবে। মনে থাকবে! ( ক্রমশ)


ছোটগল্প
একটি জাতি একটি ধর্ম
দিলীপকুমার মিস্ত্রী                                             

শ্রীরাধা আর ফতেমা,দু’জনের মধ্যে যাকে বলে গলায় গলায় ভাব। ওরা শহরের একটি নামকরা স্কুলে ক্লাস থ্রি’র ছাত্রী। ওদের এই বন্ধুত্বের বিষয়ে,বাড়ির লোকজন অবশ্য কিচ্ছু জানেনা। কারণ ওদের দু’জনের মেলামেশা যা হয় সেটা শুধু স্কুলেই। দু’জনের বাড়ি তো ঢের দূরত্বে। আসা-যাওয়াও  হয় স্কুল-বাসে। তাও আবার দু’জনের বাস এক নয়। 
            ওদের বন্ধুত্বের কথা সারা স্কুল জানে। ওরা রোজদিন এক বেঞ্চে পাশাপাশি বসে। বাড়ির থেকে আনা টিফিন খায় নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে,পাশাপাশি বসে। স‍্যার-ম‍্যাডাম ওদের একজনকে কোন কারণে শাস্তি দিলে,অপরজনের চোখে জল টল্-টল্ করে। ওদের এসব কাণ্ড দেখে স্কুলের অনেকেই ব‍্যাঙ্গ করে বলে,’দুই ন‍্যাকাপিসি!’
             কিন্তু স্কুলের স‍্যার-ম‍্যাডামরা ওদের দু’জনকে খুব ভালোবাসে। প্রিন্সিপাল-স‍্যার তো ওদের একদিন  না দেখে থাকতেই পারেন না। তাই নানান অছিলায়, প্রতিদিন  অন্তত একবার ওদের  ডাক পড়বেই তাঁর ঘরে। অন্য ছাত্রছাত্রীরা কোন কারণে প্রিন্সিপাল-স‍্যারের  ডাক পেলে,ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে।  অথচ শ্রীরাধা ফতেমা খবর পাওয়া মাত্র খুশিতে নাচতে নাচতে দে-ছুট্।  তাই স্কুলে ওদের হিংসে করার লোকেরও অভাব নেই। 
          একদিন স্কুলে টিফিনবেলায়,  দুই-বন্ধু বসে ঠিক করল,দু’জনের দুই পুতুলের মধ্যে বিয়ে দেবে। বন্ধুত্বটা তাহলে আরও আঁটোসাঁটো হবে। শীতটা একটু কমলে,হবে বিয়ের অনুষ্ঠান। খুব ঘটা করে দেওয়া হবে বিয়েটা। স্কুলের প্রিন্সিপাল, স‍্যার-ম‍্যাডাম এবং ক্লাসের সব বন্ধুদেরও নেমন্তন্ন করা হবে। প‍্যান্ডেল, আলো,ফুল দিয়ে খুব করে সাজানো হবে বিয়ের আসর। বাজনাও আনা হবে। একবার শুধু দুই-বন্ধু তাদের বাবা-মাকে রাজী করাতে পারলেই হল- ব‍্যাস্ !
         শ্রীরাধা পরদিন বাড়িতে মায়ের কাছে কথাটা পাড়ল। মা সবকিছু শুনে, হ‍্যাঁ না কিছুই বলল না। শুধু  গম্ভীরভাবে বলল,’ফেব্রুয়ারি শেষে তোমার  অ্যানুয়াল এগজাম। হাতে আর মাত্র আড়াইটা মাস। এখন একটু লেখাপড়ায় মন দাও। মিডটার্মে নেচার-স্টাডিজে তুমি এইট্টি পারসেন্টও পাওনি। সেটা মনে আছে তো ? ইংলিশে নাইন্টির ঘরে থাকলেও  বাংলায়,কম্পিউটারে এইট্টির উপরে উঠতে পারনি। বাঙালির মেয়ে,বাংলায় কেন ফুলমার্কস পাবে না ? ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেমেয়েরা একটু চেষ্টা করলে তো সবাই এটা পেয়ে যায় দেখছি ! তুমি কেন পাবেনা শুনি ?’
      ফতেমাও যথারীতি বাড়িতে আম্মুর কাছে কথাটা পাড়ল। আম্মু দু’হাতে তাকে কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরল। খুব করে আদরও করল। তারপর তার মুখের দিকে চেয়ে উদাস-চোখে বলল,’পুতুলের সাদি নিয়ে এতো চিন্তা করে কি হবে শুনি ?  আর ক’বছর পর আব্বুজান তোমারই সাদির তোড়জোড় শুরু করে দেবে। তখন যত খুশি আনন্দ করে নিও। পুতুলের সাদি নিয়ে,এখন এতো মাথাব্যথা করে লাভ নেই ফতু।  বরং মন দিয়ে লেখাপড়াটা করো। ভালো রেজাল্ট না করলে,আব্বুজান তোমার সাদিটাই জলদি দিয়ে দেবে। তাই সেটা আটকাতে হলে,প্রতিবছর তোমাকে ভালো নাম্বার নিয়ে পাশ করতেই হবে। এখন সেই চেষ্টাটাই কর।‘
          পরদিন স্কুলে,দুই-বন্ধু দু’জনের মায়ের কথা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করল। দু’জনেরই মনটা একটু খারাপ হল। কিন্তু তারা ঠিক করল,সামনের এগজামে তারা খুব ভাল রেজাল্ট করবে। আর সেটা করতে পারলে,তখন তাদের আব্দার বাড়িতে ঠিক টিকে যাবে। তখন আর কেউ আপত্তি করবে না। দুই-বন্ধু জোরকদমে নেমে পড়ল ভাল রেজাল্টের জন্য। শেষমেশ তারা সেটা করেও ফেলল। শ্রীরাধা এবং ফতেমা এবার ক্লাস থ্রির ফাইনাল পরীক্ষায় জয়েন্ট-ফার্স্ট।
          দুই-বন্ধুর বাড়িতে এখন উৎসবের মেজাজ। রোজ কত লোকজন ছুটে আসছে। তাদেরকে  আদর করছে,অভিনন্দন-শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। একদিন এলেন স্কুলের স‍্যার-ম‍্যাডামদের সঙ্গে নিয়ে প্রিন্সিপাল-স‍্যার নিজেই। তাতে শ্রীরাধা ফতেমার বাবা-মা,পরিবারের সকলেই ভীষণ খুশি। তাঁদের সামনেই তারা মুক্তকন্ঠে ঘোষণা করল,মেয়ের খুশিতে তারা এবার সবকিছু করতে পারবে। বাচ্চাদের যেকোনো আব্দার তারা এবার পূরণ করবেই। ব‍্যাস্, সেই সুযোগেই দুই-বন্ধু জানিয়ে দিল তাদের একমাত্র আব্দারটি- ধুমধাম করে তাদের পুতুলের বিয়েটা দিতে হবে।
      সবই ঠিক ছিল। সমস্যা হয়ে দাঁড়াল দুই পরিবারের ভিন্ন ধর্ম এবং রীতিনীতি নিয়ে। শ্রীরাধারা হিন্দু। তাই ওদের পরিবারের সদস্যরা চাইছে,পুতুলের বিয়েটা হোক,হিন্দু ধর্ম মতে। আবার ফতেমার বাড়ির লোকজন বলছে,সেটা কিভাবে সম্ভব ! পুতুলের বিয়েটা হবে মুসলিম ধর্মমতে। দু’পক্ষই অনড়। অর্থাৎ সামান্য পুতুলের বিয়ে নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড বেঁধে যাবার উপক্রম। খবর পেয়ে, একদিন দুই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আলোচনায় বসলেন,স্কুলের প্রিন্সিপাল-স‍্যার। সঙ্গে রইল কয়েকজন স‍্যার-ম‍্যাডাম এবং দুইপাড়ার কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষ। আলোচনা সভাটা বসল স্কুলে।
           প্রথমে দুই পরিবারের কথা শোনা হল। শোনা হল প্রতিবেশী, বিশিষ্টজনদের কথাও। সব শুনে প্রিন্সিপাল-স‍্যার হাসতে হাসতে বললেন,আপনারা দুটি পরিবার যথেষ্টই শিক্ষিত, অবস্থাপন্ন এবং সংস্কৃতি-সচেতন। সামান্য পুতুলের বিয়ে নিয়ে আপনাদের এমন গোঁড়ামি আমার ঠিক মনে ধরছে না। তাছাড়া,আপনারা প্রতিবছর লক্ষাধিক টাকা খরচ করে,মেয়েদের শহরের সেরা ইংরেজি মাধ‍্যম স্কুলে পড়াচ্ছেন। তাতে কী ওদের সত্যিই কিছু লাভ হচ্ছে ? ভবিষ্যতে, আমাদের এই সমাজইবা ওদের কাছ থেকে কী ফেরত পাবে,বলুন ?
       প্রিন্সিপালস‍্যার একটু থামলেন‌। তারপর,বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন লোককে ভেতরে ডাকলেন। তাদের দেখিয়ে,তিনি আবার বলতে শুরু করলেন।         
        শ্রীরাধা যার কাছ থেকে পুতুলটি কিনেছে,সেই লোকটি এদের একজন। সে ধর্মে মুসলমান। আর ফতেমা যার কাছ থেকে পুতুলটি কিনেছে,সেও এদের মধ্যে একজন। সে আবার হিন্দু। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়,ওই পুতুল দু’টি যার কারখানায় তৈরি হয়েছে,সেই লোকটিও এদের মধ্যে রয়েছে। সে আবার খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। তাহলে,এবার আপনারা বলুন, আপনাদের বাচ্চার পুতুলদের ধর্মটা আসলে কী হচ্ছে ?
        সবাই চুপটি করে বসে রয়েছে। কা’রও মুখে কোনও কথা নেই। হঠাৎ শ্রীরাধা-ফতেমা দু’জনে একসাথে লাফিয়ে ওঠল। তারা আনন্দে নাচতে নাচতে,সমস্বরে চিৎকার করে বলতে লাগল পেয়েছি পেয়েছি,আমরা খুঁজে পেয়েছি। আমাদের পুতুলের জাত-ধর্ম হচ্ছে, পুতুল। এরপরই তারা আবার হঠাৎ চুপটি করা তাদের মায়ের কাছে গিয়ে বসে পড়ল।
        এখন পর্যন্ত কা’রও মুখে টু-শব্দটি নেই। প্রিন্সিপাল-স‍্যার আবার সকলের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, পৃথিবীতে মানুষ যখন প্রথম সৃষ্টি হয়েছিল তখন সে কোনও জাত-ধর্ম নিয়ে জন্মায়নি। এগুলো অনেক অনেক বছর পর আমারাই সৃষ্টি করেছি। অর্থাৎ,আমরা সবাই আসলে জাতিতে এক এবং অভিন্ন, মানুষ‌ জাতি। আর আমাদের সকলের ধর্ম,সংস্কৃতিও একটিই হওয়া উচিৎ;সেটি হল—মনুষ্যত্ব। আমরা সবাই যদি নিজেদের ঠিক এমন করে ভাবতে পারি,তাহলে পৃথিবীতে কোনদিন জাত-ধর্ম নিয়ে কোথাও কোনও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধবে না। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মেকে নিশ্চিতরূপে একটি ভয়ংকর বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে যেতে পারব,চিরকালের মতো। প্লিজ,আপনারা একটু ভাবুন। এই ছোট্ট শিশুদের মুখের দিকে তাকিয়ে অন্তত--!
         প্রিন্সিপাল-স‍্যারের কথা শেষ হওয়ার আগেই শ্রীরাধা এবং ফতেমার বাবা উঠে দাঁড়িয়েছে। দু’জনেই হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে প্রিন্সিপাল-স‍্যারের সঙ্গে হ‍্যান্ডশেক করল। এখন তাদের দু’জনের চোখের পাতায় জল থৈ থৈ করছে। অন‍্যদের চোখও ছলছল।  কিন্তু কেউ আর কোনও কথা বলতে পারছে না। প্রিন্সিপাল-স‍্যার, শ্রীরাধা আর ফতেমার বাবার কাঁধে তাঁর দু’হাত রেখে,একগাল হেসে বললেন,তাহলে,এবার সমস্যাটা তো মিটেই গেল। আপনারা শীঘ্রই  পুতুলের বিয়ের আয়োজনটা সেরে ফেলুন। সেদিন আমরা সবাই গিয়ে,মিলেমিশে আনন্দ উপভোগ করে আসব ! খেয়েও আসব খুব জমিয়ে।
       শ্রীরাধা ও ফতেমার মায়ের মুখেও এখন লাফিয়ে লাফিয়ে খেলে বেড়াচ্ছে মিষ্টি হাসি। তারাও তাদের দুই মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে খুব আদর করল। তারপর,হাসিমুখে সবাইকে পুতুলের বিয়ের নিমন্ত্রণ করে বাড়ি ফিরে গেল।

লিমেরিক গুচ্ছ
স্বপ্ননীল রুদ্র

(১)
মাসিদের মেনু   

মাসিমণি ছাতু খায় নেই তার দাঁত 
মেসো তিনদিন মুড়ি বাকি দিন ভাত
মাসতুতো দাদা বলে 
'আমার তো রুটি চলে'
দিদি বলে, 'দিনে খাই, উপবাসী রাত!'


(২)
ভোজ 


মালবাজারে চাল খাওয়া হয় ভাত না খেয়ে রোজ
সকাল দুপুর রাতে সবাই করে চালের খোঁজ 
ডাল দিয়ে চাল মেখে পাশে
মাংস রেখে একটু হাসে
তারপরে সব গপ গপাগপ সে এক মজার ভোজ!


(৩)
পায়েস 
 

মধুমেহ রুগির পায়েস রাঁধেন মঞ্জু মাসি
বলেন হেসে, 'ছোট থেকেই পায়েস ভালোবাসি
কিন্তু 'সুগার' করল তাড়া
আমি ডরাই? দেখাই দাঁড়া 
লবণ দিয়ে পায়েস রেঁধে আনন্দে খুব হাসি—'


(৪)
ঝালবিহীন 


ডঙ্কা বাজায় মামা, লংকার তরকারি 
রাঁধে মামী গান গেয়ে পরে বেনারসি শাড়ি; 
'লংকা দাওনি নাকি?
ঝাল দেওয়া আছে বাকি—'
মামা খেয়ে বলে, 'ধুর! পানসে লাগছে ভারি!'


(৫)
ফলাহারী 

মতি পাল আজকাল শুধু ফল খায়
বাড়ির লোকেরা তার করে হায় হায়
কারণটি শোনো তবে 
শুনলে অবাক হবে!
খোসা বীজ আঁটিসহ খেয়ে আরও চায়!


(৬) 
কুলপিদাদু 


ঠাণ্ডা কুলপি দাদু খায় জানুয়ারি মাসে
বিষম কাশিতে যেন প্রাণটি বেরিয়ে আসে!
ডাক্তার শুনে খুব
বকা দিলে দাদু চুপ—
বলে ' স্যার, খাওয়া যাবে বসে আগুনের পাশে?'


ছোটোগল্প
সার্কাসে চোর
অনন্যা দাশ


এক সপ্তা হল জেম্বো শ্রাইনের মাঠে গ্র্যান্ড সার্কাস এসেছে। ছোটো বড়ো রঙিন তাঁবু পড়েছে সারা মাঠ জুড়ে। অনেক ক্যারাভানও দাঁড় করানো হয়েছে, যেগুলোতে সার্কাসের লোকজন থাকে। প্রচুর খাঁচা দেওয়া গাড়িও রয়েছে। তাতে নানা রকমের জন্তুদের বসবাস, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ, জলহস্তি কী নেই। তারা সবাই বিভিন্ন রকমের খেলা দেখায় সার্কাসে। গ্র্যান্ড সার্কাস বেশ নামকরা তাই রোজই প্রচুর লোক আসছে সার্কাস দেখতে। তবে সবচেয়ে বেশি ভিড় হচ্ছে শুক্রবার দিন বিকেলের শোতে আর শনিবার রবিবারের সব কটা শোতে।        
বিলি চোর সেই সব কিছু লক্ষ রাখছিল। সে মনে মনে ভাবছিল এত লোক মানে প্রচুর অর্থ জমা হয়েছে টিকিট বিক্রিতে। আর রবিবার দিন তো ব্যাঙ্ক খোলা থাকবে না তাই সব অর্থ ওদের কাছেই থাকবে। সোমবার দিন ব্যাঙ্ক খুললে তবে ওরা জমা দিতে পারবে। সেই ভেবেই তার মাথায় রবিবার রাতে সার্কাসে চুরি করার ফন্দিটা এল। অনেকদিন হল কোন ভালো দাঁও মারা হয়নি। বিলির এখন আর ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে ইচ্ছে করে না। তার সব সময় মনে হয় মারি তো গন্ডার লুটি তো ভান্ডার। এদিকে ব্যাঙ্ক ডাকাতি ইত্যাদিতে বড্ড বেশি ঝুঁকি আর ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। রবিবার দিন রাতে সার্কাসে ঢুকে চুরি করলে বেশ হবে। অনেকটা অর্থওপাওয়া যাবে আর কেউ বুঝতেও পারবে না চোর কে। সার্কাসের লোকজন তো ক্লান্ত হয়ে ঘুমোবে কারণ রবিবার দিন সব চেয়ে বেশি শো করতে হয় ওদের। সেই সব ভেবেই পরিকল্পনাটা ছকে ফেলল বিলি। কয়েকদিন ধরে নজর রাখল সার্কাসের লোকজনের ওপর। ঘোড়াদের দেখাশোনা করে যে ছেলেটা, যার নাম জিমি, তার সঙ্গে বন্ধুত্বও পাতিয়ে ফেলল। ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা বলল তাকে যে ছোটোবেলা থেকেই বিলির সার্কাস খুব ভালো লাগে। ওদের সার্কাসে কোন কাজ আছে কিনা ইত্যাদি। তারপর কথার ছলে তার কাছ থেকে এটাও জেনে নিল যে টিকিটের অর্থ কোথায় রাখা হয়। ছেলেটা একটু বোকা গোছের মনে হয় তাই সে বিলির কুমতলব টের পেল না, সব কিছুই বলে দিল।         
সুযোগ বুঝে রবিবার দিন রাতে তার কাটার যন্ত্র দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া কেটে সার্কাসের প্রাঙ্গনে ঢুকে পড়ল বিলি। নিশুতি রাত। গ্র্যান্ড সার্কাসের চত্বর চুপচাপ।  দিনের বেলা যেখানে তুমুল হইচই হয় সেখানেই এত রাতে কোন সারা শব্দ নেই।  সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। চাঁদের আলোয় কিছুটা দেখা দেখা যাচ্ছে। বিলি পা টিপে টিপে এগোচ্ছিল। জিমির সঙ্গে সঙ্গে সে সব কিছু ঘুরে দেখে ফেলেছে। সার্কাসের কাশবাক্সোটা থাকে ম্যানেজারের ম্যারাভ্যানে। ম্যানেজারকে ঘুম পাড়ানোর জন্যে সে ক্লোরোফর্ম স্প্রে সঙ্গে এনেছে। আগে থেকে সব দেখে রেখেছিল বলে সুবিধা হল প্রচুর। সোজা গিয়ে একেবারে ম্যানেজারের ক্যারাভ্যানের জানালা দিয়ে উঁকি দিল সে। লোকটার জানালার কাছেই বিছানা। এখন আবহাওয়া ভালো তাই সে জানালা খুলেই ঘুমোচ্ছে। ক্লোরোফর্ম স্প্রে করে ক্যারাভ্যানের দরজার কাছে গেল বিলি। কয়েকটা সিঁড়ি উঠে গিয়ে দরজায় টোকা দিল। লোকটা এখনও অজ্ঞান না হয়ে থাকলে কিছু বলবে বা উঠে আসার চেষ্টা করবে। কিন্তু ভিতর থেকে কোন শব্দ শোনা গেল না। তার মানে ওষুধ ধরেছে! যন্ত্রপাতি বার করে সে অল্প খুটখাটে করেই দরজাটাকে খুলে ফেলতে পারল সে। একেবারেই ঠুনকো ছিটিকিনি, ওর মতন ওস্তাদের কাছে কিছুই নয়। ভিতরে ঢুকে সে পকেট থেকে টর্চ বার করে এদিক ওদিক দেখতে লাগল। ওই তো ক্যাশ বাক্সটা, শোবার জায়গাটার আলমারিটার পাল্লা খুলেই সেটাকে দেখতে পেল বিলি। উল্লাসে বাক্সটাকে বাগিয়ে নিয়ে ক্যারাভান থেকে বেরিয়ে পড়ল সে। এবার কিছুটা পথ হেঁটে গিয়ে আবার কাঁটা তারের বেড়া পেরিয়ে গেলেই কেল্লা ফতে!     
ক্যারাভানের সিঁড়ি দিয়ে নেমে দুপা যেতেই ওর কেমন জানি না মনে হল। মনে হল কেউ যেন ওকে দেখছে। চাঁদের আলোটাও হঠাৎ যেন অদৃশ হয়ে গেল। একটা বিশাল কালো ছায়া এসে পড়ল ওর ওপর। কী হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই একটা মোটা দড়ির মতন কি যেন ওর কোমরটা জড়িয়ে ধরল। তারপর বিলির দেহটা শূন্যে উঠে গেল! ক্যাশবাক্স হাতে বিলি শূন্যে উঠে গিয়ে ভয়ে পরিত্রাহী চিৎকার জুড়ে দিল। কী হচ্ছে কী করে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিল না সে। ওর ওই চিৎকারেই একে একে আলো জ্বলে উঠতে লাগল আশপাশের ক্যারাভ্যানগুলোতে।     
লোকজন জড়ো হয়ে গেল চারপাশে। বিলি তখনও, “বাঁচাও বাঁচাও” বলে চিৎকার করে চলেছে আর হাত পা ছুঁড়ছে! সার্কাসের লোকজন দেখল তাদের আদরের হাতি কোকো নিজের সুঁড়ে একটা লোককে ধরে শূন্যে তুলে রেখেছে। লোকটার হাতে সার্কাসের ক্যাশ বাক্স। লোভী লোকটা তখনও ক্যাশ বাক্সটাকে ছাড়েনি! কোকোর কাছে অবশ্য ক্যাশ বাক্স সহ লোকটাকে তুলে ধরে রাখাটা কোন ব্যাপারই নয়। সেটা সে অনায়াসেই করতে পারছিল। কোন কষ্টই হচ্ছিল না তার।   
জিমি দৃশ্যটাকে দেখে চিৎকার করে বলল, “তুমি কী ভেবেছিলে আমি বোকা? তোমার চুরি করার মতলব আমি বুঝতে পারব না? আমি মজা দেখব বলেই তোমাকে ক্যাশ বাক্স কোথায় থাকে সেটা বলে দিয়েছিলাম। তুমি ভেবেছিলে আমি শুধু ঘোড়াদের দেখাশোনা করি কিন্তু আমি যে হাতিদেরও সামলাই সেটা তো জানতে না। আমি জানি রাতের বেলায় সার্কাসের এই চত্বরকে কোকো পাহারা দায়। এর আগেও কয়েকজন চেষ্টা করেছে এখানে চুরি করার কিন্তু পারেনি! সাবাস কোকো!”
এতটা বলে জেমস থামলেন। তাকে ঘিরে বসে থাকা বাচ্চাগুলো চেঁচিয়ে উঠল, “তারপর কী হল আঙ্কেল?” 
“তারপর আর কী হবে? পুলিশ ডাকা হল। তারা এসে বিলি চোরকে কোকোর খপ্পর থেকে উদ্ধার করল। কোকোর মাথায় এত বুদ্ধি যে সে পুলিশ না আসা পর্যন্ত বিলিকে নিচে নামায়নি। পুলিশ আসতে জিমি গিয়ে কোকোকে বলল, ‘ঠিক আছে রে কোকো, এবার ওকে নামিয়ে দে। ওকে ওর প্রাপ্য শাস্তি দেওয়ার লোকজন এসে গেছে।‘ তাই শুনে কোকো সুঁড় নীচে করে বিলিকে নামিয়ে দিল আর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের লোক তার হাতে হাতকড়া পড়িয়ে দিল। ব্যস আমার গল্প শেষ।“
তাও কি পুঁচকেগুলোর শান্তি হয়! ওদের মধ্যে থেকে একটা মেয়ে তার গালে আঙ্গুল দিয়ে বলল, “আচ্ছা আঙ্কেল তুমি এত কিছু জানলে কী করে? তুমি ওখানে ছিলে নাকি?”      
জেমস হেসে ফেলে বললেন, “চালাক মেয়ে! ঠিক ধরে ফেলেছো দেখছি। আরে বাবা গল্পে যে জিমির কথা বলছিলাম সেটাই তো আমি! যখন ছোটো ছিলাম তখন আমাকে সবাই জিমি বলে ডাকত। আর তোমরা যদি জেম্বো শ্রাইনের মাঠে আসো তাহলে তোমাদের কোকোর সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেবো! সবাই জানে ও রাতে টহল দেয় তাই ওর ভয়ে কোন চোর ঢোকে না সার্কাসের চত্বরে। কোকো এখনও সার্কাসে অনেক খেলা দেখায় আমার সঙ্গে আর ও বাচ্চাদের খুব ভালোবাসে!”



আমি যে বিজ্ঞান শিক্ষক        
কৃষ্ণা দাস  


গতকাল খবরটা পেয়েই আজ ভোরে হাওড়া থেকে ট্রেনে চাপি। বিকেলে ট্রেন থেকে নেমে সরাসরি হাসপাতালে পৌঁচ্ছে যাই। আসলে আমার দাদা অরিত্র উড়িষ্যার বুড়লাতে সরকারী কর্মচারী।গতকাল সকালে ‘সিভিয়ার হার্ট এট্যাক’ হয়েছে। যেহেতু অফিসেই ছিল তাই বন্ধুরা সময় নষ্ট না করে বুড়লা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। যাই হোক আজ বিকেলে দাদাকে দেখে ডাক্তারদের সঙ্গে দেখা করি, দাদা এখন আইসিইউ এ।
 ডাক্তাররা বললেন, প্রাথমিক বিপদ কেটেগেছে। আমি কিছুদিন এখানে থেকে দাদাকে একটু  সুস্থ  করে বাড়ি  ফিরিয়ে নিয়ে যাব। বাকি চিকিৎসা কলকাতাতেই হবে। সেই মত কিছুদিনের জন্য একটা সস্তার হোটেল আমার চাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় শুনলাম সস্তা কেন,‍‍ কোন দামী হোটেলও হাসপাতালের ধারে কাছে নেই। যা আছে তা হাসপাতাল থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে। কিন্তু আমার ঠিক ইচ্ছে নেই দূরে থাকার। আমি যাতে যখন তখন হাসপাতালে দাদাকে দেখতে যেতে পারি এমন একটা কাছাকাছি থাকার জায়গা চাইছিলাম। তা হোটেল না হোক হোমস্টে হলেও চলবে। প্রায় রাত ন'টা নাগাদ হাসপাতাল থেকে বেরলাম। কাছের খাবারের দোকান থেকে রুটি তড়কা পেট ভরে খেয়ে হাঁটতে লাগলাম। একটা পিঠের ব্যাগ ছাড়া আমার আর কোনো লাগেজ নেই। একটা সস্তার আস্তানার যদি খোঁজ পাই। না পেলে হাসপাতালের ওয়েটিংরুমে আজকের রাতটা কাটিয়ে দেব।এখানে ধারেকাছে জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে। থাকার মধ্যে আছে বেশ কিছু অস্থায়ী খাবার দোকান আর চায়ের দোকান। চারদিকটা গাছপালা ভর্তি। খুব নির্জন জায়গা। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ধারে একটা পুরনো দোতলা কটেজ চোখে পড়ল। বেশ সুন্দর।লোকজন চোখে পড়ছে না। রাস্তার আলো আর চাঁদের আলোয় সাইনবোর্ড দেখলাম। লেখা ‘হোমস্টে’। বাইরের দিক থেকে সোজা একটা সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। শরীরটা আর বইছে না।আজকের রাতটুকু যদি এখানে আশ্রয় পেতাম। 
অন্ধকারে মোবাইলের টর্চ জ্বেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম দোতলায়। দোতলায় খোলা বারান্দার ধারে লাইন দিয়ে তিনটে ঘর। মোবাইল টর্চ ফেলে দেখলাম পর পর দুটোতে তালা মারা। শেষ ঘরটায় তালা দেওয়া নেই, সে ঘরের দরজায় শিকল তোলা। চাঁদের আলোয় খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবছি কী করব, তখনই একজন কুচকুচে কালো রোগা লম্বা লোক সিড়ির মাঝামাঝি এসে দাঁড়াল।আমি ওড়িয়া জানি না। শুদ্ধ বাংলায় বললাম থাকার আস্তানা খুঁজছি। শুনে লোকটা ঈশারায় ঘরটা দেখাল। বুঝতে পারছি লোকটি হয়তো বাংলা বুঝলেও বলতে পারে না। 
- আলো নেই কেন? সব অন্ধকার যে। সে কথা বলতেই তাকিয়ে দেখি লোকটি নেই। ভাড়া নিয়েও কোনও কথা হল না। তাহলে কি হাসপাতালে ফিরে যাব? কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীর যে আর বইছে না। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম আজ রাতটা অন্ততঃ বিশ্রাম নিই, কাল সকালে দেখা যাবে।
     শিকল খুলে ঘরে ঢুকলাম।দেওয়ালে ইলেকট্রিক সুইচ টিপে আলো জ্বালাতে আর ফ্যান চালাতে গিয়ে বুঝলাম ইলেকট্রিক লাইন নেই। ভারি মুশকিল তো, এ কোথায় এলাম! মোবাইল টর্চের আলোয় দেখলাম আসবাবপত্র বলতে ঘরের এক কোণে একটা বেশ বড় খাট। এক কোণে কাঠের টেবিল চেয়ার। বন্ধ থাকায় ঘরে কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। যদিও রাত তবু ভ্যাপসা গন্ধটা কাটানোর জন্য পেছনের দিকের জানলা দুটো খুলে দিলাম। চাঁদের আলোয়  জানলার বাইরে গাছপালা চোখে পড়ল। মনে হল যেন গাছপালার ভেতর থেকে কুয়াশা পাক খেয়ে খেয়ে উঠছে। বাইরে অন্ধকারে ঝিঁঝির ডাক মাথা খেয়ে ফেলছে। আমি জানলা দুটো একটু পরেই বন্ধ করে দিলাম। খাটে নিজের সঙ্গে আনা চাদর পেতে কোনরকমে শুলাম। কাল সকাল হলেই চলে যাব হাসপাতালে।হয়তো কাল দাদাকে আইসিইউ থেকে সাধারণ বেডে দিতে পারে।টাকাপয়সা যা লাগবে, এটিএম থেকে তুলতে হবে। বাড়িতে মাকে একটা ফোন করে সব জানাতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।  
তখন ক'টা বাজে জানি না হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। খুব শীত করছে। সারা শরীরে কাঁটা দিয়েছে। উঠে বসে ভাবছি এত শীত করছে কেন? এখন তো গরমকাল,জুন মাস। চোখে পড়ল জানলা খোলা। খোলা জানলা দিয়ে দেখলাম বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকারে জোনাকি জ্বলছে। বুকটা কেমন ছ্যাঁৎ করে উঠল। আমি নিজের হাতে জানলা বন্ধ করেছি না? তাহলে কী করে খোলা হতে পারে?  তবে কি আমি ঘুমের ঘোরে জানলা বন্ধ করেছি মনে করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম? খাট থেকে নেমে আমি তাড়াতাড়ি জানালা দুটো বন্ধ করে দিলাম । মোবাইলে দেখলাম রাত তিনটে বাজে। গলাটা শুকিয়ে গেছে। সঙ্গে জলের বোতল আছে বটে তবে সেটি টেবিলে রাখা পিঠের ব্যাগে আছে। খাট থেকে নামতে যাচ্ছি মোবাইল টর্চের আলোয়  মনে হল ঘরের ভেতর কেমন যেন ধোঁয়ার কুন্ডলি উঠছে। ঠিক তখনই আমি ভয়ানক চমকে উঠলাম, দেখি দুটো জানালাই খোলা। এই মাত্র  যে দুটো নিজের হাতে বন্ধ করেছি সে দুটো নিঃশব্দে আবার কিভাবে খুলে গেল? কী যেন একটা অশুভ অনুভব আমাকে কাঁপিয়ে দিল। বুকের ভেতরে অস্বাভাবিক গতিতে হৃদপিন্ড লাবডুপ করতে শুরু করেছে। সাইন্সের টিচার আমি। ভূত বা অতিপ্রাকৃত কোনো বিষয়ে আমার বিশ্বাস নেই, তবু  আমার শিরদাঁড়া দিয়ে কেমন একটা  ঠান্ডা স্রোত নেমে আসছে।  সিক্সথসেন্স বলছে এখানে কিছু একটা গড়বড় আছে, এখানে থাকাটা  একদম নিরাপদ নয়। দ্রুত পিঠের ব্যাগে বিছানার চাদরটা পুরে  কাঁধে নিলাম। মোবাইল টর্চের আলোয় ঘরের দরজা খুললাম। বাইরে ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। এত রাতে কোথায় যাব? হাসপাতালও প্রায় এক কিলোমিটার হবে। তবু হাসপাতালে যাওয়াটাই ঠিক ভেবে বারান্দায় পা দিলাম। হঠাৎ অন্ধকার থেকে বেশ বড় একটা বল মেঝেয় গড়াতে গড়াতে এগিয়ে এসে পায়ের কাছে থেমে গেল। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। প্রাণপণে নিজেকে সাহস দিতে দিতে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগলাম। পেছনে আওয়াজ পাচ্ছি বলটা যেন ড্রপ খেতে খেতে পিছন পিছন আসছে। ব্যাপারটা কী হচ্ছে জানিনা। আমার এতদিনের অর্জিত বিশ্বাস ভেঙে সব গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। আমি পিছনে না তাকিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে কটেজের ভাঙা গেট পেরিয়ে পিচ রাস্তায় উঠে  এলাম।চাঁদের আলোয় মনে হল চারিদিকের বন্য প্রকৃতি থেকে বিজাতীয় ধোঁয়ার কুন্ডলী উঠছে।আওয়াজ পাচ্ছি পেছনে বলটাও ড্রপ খেতে খেতে আসছে। জীবন হাতে করে আমি দৌড়লাম।
     হঠাৎই দূর থেকে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখে ছুটে গেলাম সেদিকে। মরিয়া হয়ে কাছে গিয়ে দেখলাম রাস্তার ধারে ঝুপড়ি  একটা চায়ের দোকানের ভেতর থেকে  আলোটা আসছে। জানিনা এত রাতে চায়ের দোকান খোলা কেন। তবে মনে বল পেলাম। আমি  আশায় বুক বেঁধে ছুটে দোকানের সামনে এসে এক পলকের জন্য পিছন ফিরলাম। দেখি বলটা এতক্ষণ পিছন ধাওয়া করে এসে এখন শূন্যে স্থির হয়ে আছে।   আমি ছুটে দোকানের ভেতর ঢুকলাম। ভেতরে একজন মাথায় গামছা বাঁধা পুরুষ ও একজন ঘোমটা দেওয়া নারী পেছন ঘুরে বসে। কিন্তু তারা ঘুরে তাকাতেই চমকে উঠলাম । তাদের  মুখের জায়গাটা ফাঁকা। শুধু কাপড় দুজন অদৃশ্য মানুষকে ঘিরে আছে। আমি আর্তনাদ করে ছুটে বেরিয়ে এলাম। 
 ছুটতে ছুটতে একসময় প্রচন্ড জোরে হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেলাম। এরপর আর কিছু মনে নেই।
     জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করলাম। আমি যে আলোকিত পৃথিবীতে আরো অনেকের সঙ্গে বেঁচে আছি এই প্রাথমিক ভাবনাই মুহূর্তে আমাকে সুস্থ করে দিল। এক বয়স্কা নার্স আমাকে চোখ মেলতে দেখে কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাকে জিজ্ঞেস করলাম আমি এখানে কীভাবে? তিনি বললেন কাকভোরে ডিউটিতে আসার পথে আমাকে নাকি রাস্তায় অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন। পালস্ রেট তখন খুবই নিচে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ফোন করেন। তখনই হাসপাতালের লোক গিয়ে স্ট্রেচারে করে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে ।
     নার্স জানতে চাইলেন আমার কী হয়েছিল। তাকে আগের রাতের ঘটনাটা খুব সংক্ষেপে জানালাম। তিনি চমকে উঠলেন। বললেন, “ও বাড়ি তো ভাড়া দেওয়া হয় না! বহুদিন আগে ওই কটেজের একমাত্র বাসিন্দা নিঃসন্তান সুদখোর মালিক নিচেরতলায় বাস করত আর দোতলা  হোমস্টে হিসাবে ভাড়া দিত। তিনি গত হলে ফাঁকা বাড়িটিতে আশ্রয় নেয় স্থানীয় চায়ের দোকানের এক গরীব আদিবাসী পরিবার। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাদের বছর চারেকের ছোট ছেলেটি বল খেলতে খেলতে একদিন দোতলার সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে মারা যায়। এর পর বাচ্চাটির মা শোকে প্রায় পাগল হয়ে যায়। তারা প্রায়ই দেখতো হঠাৎ হঠাৎ একটা বল গড়িয়ে আসতো তাদের পায়ের কাছে। তারা প্রথম দিকে সে কথা একে ওকে বলতোও। কিন্তু ধীরে ধীরে স্বামী-স্ত্রী কেমন যেন হয়ে যায়। বাড়ি ছেড়ে বেরত না। চায়ের দোকান বন্ধ হয়ে গেল। স্থানীয়রা কেউ তাদের খোঁজখবর রাখত না।এরপর একদিন এক স্থানীয়লোক ঐ বাড়ির পেছনে গাছে উঠে শুকনো ডালপালা কাটছিল। হঠাৎ দোতলার খোলা জানলা দিয়ে দেখে লোকটি গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে। পুলিশে খবর দিলে তারা এসে দেখে খাটে স্ত্রীলোকটির মৃতদেহ পরে। বিষ খেয়েছে, অথবা স্বামী তাকে খাইয়ে নিজে গলায় দড়ি দিয়েছে। তারপর তো এই নিয়ে খবরের কাগজে কত লেখালিখি, থানা পুলিশও কত দিন ধরে চলল”।
     আমি ভেতর ভেতর আবার শিউরে উঠলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “আর ঐ চায়ের দোকানটার কী হল”?
     “সে তো আর নেই। তবে চালাহীন ছিটে বেড়ার ভাঙাচোরা দেওয়াল আছে বটে। কেউ কেউ বলে ওখানে নাকি কখনো-সখনো স্বামীস্ত্রীর প্রেতাত্মাকে দেখা যায়।”
     আমি গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। জানলা দিয়ে দিনের প্রথম আলো এসে পড়েছে আমার শরীরে মুখে। আমার মনে হল দিনের আলোয় সব কিছু দেখা যায় না, এমন কিছু পৃথিবীতে আছে যার অস্তিত্ব কেবল রাতের অন্ধকারেই অনুভূত হয়।অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মতো বিজ্ঞান হয়তো একদিন তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ যন্ত্রও আবিষ্কার করে ফেলবে। ততদিন ছাত্রদের এ গল্প বলা যাবে না। আমি যে বিজ্ঞান শিক্ষক।


ধারাবাহিক থ্রিলার উপন্যাস

শয়তানের উঁকি
তপশ্রী পাল
পর্ব ১


গত দুবছর ধরে বাড়িতে বসে আর অনলাইন ক্লাস করে ক্লান্ত প্রোটন, মানে আরাত্রিক বসু। সেই ক্লাস সিক্সে শেষ স্কুলে গিয়েছিলো আর এখন ক্লাস এইট! সকাল সকাল বাবা নিজের গাড়িতে প্রোটনকে পৌঁছে দিয়ে অফিস চলে যেতেন। ক্লাসে যাওয়া মানেই পড়াশুনার সাথে সাথে প্রচুর বন্ধু, মজা, মস্তি আর খেলা। সে সব তো কোথায় হারিয়ে গেলো জীবন থেকে! এখন বিকেলে পাড়ার মাঠে গেলেও মা পিছনে লেগে থাকেন “মাস্ক পরো! গ্লাভস পরো! টুপি পরো! দূরে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলবে। কারো গায়ে হাত দেবে না! আধ ঘন্টার মধ্যে বাড়ি ঢুকবে!” উঃ এর চেয়ে না যাওয়া ভালো। বন্ধ হয়ে গেছে সাঁতার শেখাও। তাই আজকাল বেশীরভাগ মায়ের মোবাইলে গেম খেলেই বিকেলটা কাটিয়ে দেয় প্রোটন। আর সন্ধের পর থেকে বাইজু’স এর লেসন নেয় নিজের মনে। আর আছে অনলাইনে মোহিত স্যারের আঁকার ক্লাস। প্রোটনের আঁকার হাত ভারী ভালো। 
গত দুবছর ধরে করোনার জ্বালায় রোজ এক রুটিন! সকালে ওঠো। মুখহাত ধোও। দুধ, পাঁউরুটি, কলা, ডিম খাও আর স্কুলের অনলাইন ক্লাসে ঢুকে বসে থাকো মায়ের মোবাইল থেকে। সকাল দশটা থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু। মাঝে একবার লাঞ্চ ব্রেক। তারপর একেবারে চারটে অবধি ক্লাস! চোখ ব্যাথা হয়ে যায় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। জুম সফটওয়ারে মিটিং সেট করা থাকে। ওদের সেকশনের সবার জন্য একটাই মিটিং। অধরা ম্যাডাম ওদের ক্লাস টিচার। সেকশনে প্রায় চল্লিশ জন ছেলেমেয়ে। স্ক্রিনে ছোট ছোট বন্ধুদের মুখগুলো দেখতে পায় প্রোটন! এখন সেপ্টেম্বর মাস। পুজো প্রায় এসে গেলো বলে! তখন অন্ততঃ পনেরো দিন অনলাইন ক্লাস বন্ধ! কী আনন্দ! পুজোর ছুটির পরেই হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষা! ম্যাডাম বলেছেন পুজোর ছুটির আগেই বাঁধানো স্টাডি মেটিরিয়াল স্কুল থেকে পাঠানো হবে সব স্টুডেন্টদের কাছে! সেগুলো পড়তে হবে, সলভ করতে হবে পুজোর ছুটিতে! 
পুজোর ছুটিতে এবার স্পেশাল মজা! কাকারা নেদারল্যান্ডে থাকে! কাকা কাকীমা আর দাদা নিউট্রন মানে সাগ্নিক বসু আসছে যে! এখন বেশী প্লেন চলছে না, কিন্তু দেশে আসার জন্য দু একটা স্পেশাল প্লেন চলছে। দাদা, আরাত্রিকের থেকে বছর দুয়েকের বড়ো! এবার স্কুল থেকে মেজর করে বেরিয়েছে! কিন্তু কতো কিছু যে জানে দাদা তা প্রোটন ভাবতেই পারে না! দাদার খুব কম্পিউটার সফটওয়ার শেখার নেশা! নিজে নিজে দুটো অ্যাপ বানিয়ে ফেলেছে! অনেক কম্পিউটারের বই পড়ে, অনলাইন ভিডিও দেখে! দাদার কাছে ওর নিজের ল্যাপটপ আছে! প্রোটনের মনে যতো প্রশ্ন সব দাদার জন্য তোলা থাকে! এই তো আর মাসখানেক গেলেই পুজো।
প্রত্যেকদিনের মতোই সেদিন অনলাইন ক্লাসে ঢুকেছে প্রোটন। অধরা ম্যাম নাম ডাকছেন সবার এক এক করে। এমনিতে ভিডিও অন রাখার কথা, কিন্তু বেশী নেট লাগে বলে অনেকেই ভিডিও অফ করে শোনে অনলাইন ক্লাস। অবশ্য নাম ডাকার সময় ভিডিও অন করতেই হবে। “আরাত্রিক বসু” - ম্যাম ডাকতেই তাড়াতাড়ি ভিডিও অন করে প্রোটন বলে “প্রেসেন্ট ম্যাম!” তারপরেই ম্যাম ডাকেন “বিশাখা বিশ্বাস” আর ঠিক তখনই চোখে পড়ে প্রোটনের! স্ক্রিনে দুটো “বিশাখা বিশ্বাস” এর ছোট ছোট উইন্ডো দেখা যাচ্ছে! দুটোতেই ভিডিও অফ। কিন্তু ক্লাসে তো একটাই বিশাখা! তবে? ম্যাম আবার ডাকেন “বিশাখা! হোয়ার আর ইউ?” এবার একটা ভিডিও অন হয়। বিশাখা বলে “প্রেসেন্ট ম্যাম!” “হোয়াই সো লেট রেসপন্স?” বলে ম্যাম পরের জনের নাম ডাকতে চলে যান। প্রোটন দেখে ম্যাম খেয়ালই করেননি যে দুটো বিশাখা দেখা যাচ্ছে স্ক্রিনে! অত জনের মধ্যে ম্যামের পক্ষে দেখাও সম্ভব নয়। আর যতো অদ্ভুত জিনিসগুলো প্রোটনেরই চোখে পড়ে? একবার প্রোটন ভাবলো নিশ্চই চোখের ভুল! আবার ভালো করে দেখলো স্ক্রিনটা! উঁহু, আজ পঁয়ত্রিশ জন বন্ধু লগ-ইন করেছে, কিন্তু স্ক্রিনে এই তো এক একটা রো তে সাত জন করে, মোট পঁয়ত্রিশ প্লাস দুই সাঁইত্রিশটা উইন্ডো! একটা ম্যামের। আর অন্যটা তবে কার? দুটো বিশাখা হলো কী করে? আর, একবার কোন খুঁতখুঁতি ঢুকে গেলে কিছুতেই বেরোয় না প্রোটনের মন থেকে, যতক্ষণ না তার কারণ আর সমাধান জানতে পারছে! ম্যাম একবার গুণেও তো দেখছেন না, অথচ প্রোটন জলজ্যান্ত দেখতে পাচ্ছে দু দুটো বিশাখা! ততক্ষণে ম্যামের নাম ডাকা শেষ। এবার উনিই ইংলিশ পড়াবেন। তাড়াতাড়ি বই খাতা খুলে বসে প্রোটন! তখনকার মতো ভুলে যায় দুটো বিশাখার কথা। অনলাইন ক্লাস সেদিনের মতো শেষ হতেই খুঁতখুঁতিটা আবার ফিরে এলো মনে! বিশাখাকে একবার ফোন করবে? কিন্তু বিশাখা প্রোটনের তেমন বন্ধু নয়। ও শুধু কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে মেশে। বিশাখার নম্বরটাও বোধহয় নেই ওর কাছে! যাকগে – কী দরকার অকারণ মাথা ঘামিয়ে? তার চেয়ে নতুন চেজ গেমটা খুলে বসে প্রোটন! মাও হাঁক পাড়েন অমনি “প্রোটন – খেয়ে নে! দুপুরে কিছু খেলি না - অমনি খেলতে বসে গেলি?” তাড়াতাড়ি মোবাইল রেখে ছুটলো প্রোটন!         
কয়েকদিন কেটে গেছে। অনলাইন ক্লাস রোজই চলেছে। ব্যাপারটা প্রায় ভুলেই গেছিলো প্রোটন! গতকাল মহালয়া ছিলো। ছোটবেলা থেকেই মহালয়াতে মহিষাসুরমর্দিনী শুনতে খুব ভালোবাসে প্রোটন! সেই কোন ভোরে মা ডেকে দেন! তারপর সবাই মিলে ঐ একটা দিন রেডিও খুলে ঐ অনুষ্ঠান শুনবেই। সবচেয়ে ওর ভালো লাগে শ্লোকপাঠ! মা বলেছেন যে দাদু শ্লোক পড়েছিলেন তাঁর নাম শ্রীবীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র! প্রোটনও ওঁর দেখাদেখি ঐ শ্লোকগুলো বলে নিজের মনে! কল্পনা করে দুর্গা আর অসুরের মূর্তি! মা আবার গানগুলোর বেশী ভক্ত! এমন গান নাকি আর হবে না! 
আর দু একদিনের মধ্যেই পুজোর ছুটি পড়ে যাবে! পঞ্চমীর দিন নিউট্রন দাদারা আসছে! উৎসাহে পড়াশুনা প্রায় মাথায় উঠেছে! বিকেলে একটু সময়ের জন্য পাড়ার প্যান্ডেলে গেছিলো প্রোটন! এবার তো পুজোয় ভীড়ভাট্টা একদম চলবে না। প্যান্ডেলের চারিদিকে বড় করে বাঁশের ব্যারিকেড লাগিয়ে দিয়েছে! ভিতরে সাজানো চলছে। ঠাকুর এখনো আসেনি। বাড়িতে ফিরেই প্রোটন দেখে ওর পড়ার টেবিলে একটা বড়সড় প্যাকেট! মা বললেন “দ্যাখ তো প্রোটন! মনে হচ্ছে তোদের স্কুল থেকে এসেছে। কুরিয়ার এসে দিয়ে গেলো।“ খুলে প্রোটন দেখে সত্যি তাই! মনে পড়ে গেলো ম্যাম বলেছিলেন স্টাডি মেটিরিয়াল পাঠানো হবে স্কুল থেকে! এটাই তাহলে সেই স্টাডি মেটিরিয়াল! পুজোর দিনগুলো কাটুক, তারপর এ সব খুললেই হবে! ভেবে প্যাকেটশুদ্ধ তুলে রাখলো প্রোটন! নিউট্রন দাদার কাছে অনলাইন গেম আছে ভালো ভালো! কটার নাম আর কী করে খেলে জেনে নিতে হবে! মাথায় এখন খালি এইসব ঘুরছে প্রোটনের! অমনি মায়ের হাঁক “প্রোটন, আঁকার স্যার ওয়েট করছেন! ভুলে গেছিস, আজ অনলাইন ক্লাস! শীগগির আয়!” তখনকার মতো ছুটলো প্রোটন। 
পরদিন রবিবার। নো অনলাইন ক্লাস! একটু বেলা হতেই জন্মদিনে পাওয়া ইংরিজীতে ফেলুদার গল্পের কালেকশন, যেটা বাবা কিনে দিয়েছিলেন, তার গভীরে ঢুকে গেলো প্রোটন! ডিটেকটিভ স্টোরি দারুণ লাগে প্রোটনের। নিজেকে ফেলুদার জায়গায় বসিয়ে আগে থেকেই প্রেডিক্ট করে কালপ্রিট কে! মিলে গেলে কনফিডেন্সটা বাড়ে একটু। বড়ো হয়ে ফেলুদার মতো প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর হতে চায় প্রোটন! মা অবশ্য শুনলেই মুচকি হাসেন। আরো ছোটবেলায় নাকি প্রোটন কর্পোরেশনের ঝাড়ুদার হতে চাইত! 
সোমবার অনলাইন ক্লাসে লগ-ইন করার পর প্রোটন দেখলো বন্ধুগুলো একসাথে তারস্বরে চীতকার করছে! সবার ভিডিও অন! সবাই ঢুকে গেলেও ম্যাম ঢুকলেন বেশ লেটে! ম্যাম তো কোনদিন এমন লেট করেন না! ঢুকেই, নাম ডাকার আগে বললেন “স্টুডেন্টস, উই হ্যাভ এ ব্যাড নিউস! জানি না কী ভাবে বলি তোমাদের – বিশাখা ইস মিসিং সিন্স স্যাটারডে!” সবাই মূহূর্তে চুপ! সবার চোখ গোল গোল! ভিডিও অন করে ফেলেছে সবাই! ভয়ে ভয়ে প্রোটন বললো “হাউ ম্যাম?” “ওয়েল, ইট ইস আনবিলিভেবল! হার পেরেন্টস কনট্যাক্টেড মি ইয়েসটার্ডে! বোথ দ্য পেরেন্টস ওয়েন্ট টু দেয়ার অফিস! বাড়িতে ও একাই ছিলো মেডের সঙ্গে! মেড বোধহয় একটু বাইরে গেছিলো। শি কেম ব্যাক অ্যান্ড কুড নট ফাইন্ড বিশাখা এনিহোয়ার! শি টোল্ড হার নট টু ওপেন দ্য ডোর ইন হার অ্যাবসেন্স বাট ইট সিমস শি ওপেনড দ্য ডোর টু সামওয়ান! আমি তোমাদেরও জিজ্ঞাসা করছি – তোমরা কিছু জানো ও কোথায় গিয়ে থাকতে পারে? ওর বন্ধু কারা আছো? তোমাদের সঙ্গে ওর কোন কথা হয়েছিলো?”
সবাই ঘাড় নাড়ে! কেউই কিছু জানে না। কিন্তু সবাই বেশ ভয় পেয়ে গেছে সেটা মুখ দেখেই বোঝা যায়! ম্যাম বললেন “আই অ্যাম নট ইন এ মুড টু টেক এ ক্লাস টুডে! অন্য ম্যামরাও তাই! আমরা কয়েকদিন আগে ছুটি ডিক্লেয়ার করে দিচ্ছি এবার! লক্ষ্মী পুজোর পরের দিন স্কুল খুলবে। তোমরা স্টাডি মেটিরিয়াল পড়ো। কোয়েশ্চেন থাকলে ম্যামদের হোয়াটসঅ্যাপে জিজ্ঞাসা কোরো! যদি বিশাখার সম্বন্ধে কিছু জানতে পারো আমাকে ফোন করবে! ওর বাবা মা পুলিশে খবর দেবেন বোধহয়।“
প্রোটন কোনক্রমে লগআউট করে মাকে খবরটা বললো। মা বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। নিজের টেবিলে ফিরে এসে প্রোটনের মাথাতে শুধু বিশাখার দুটো ঊইনডোর ছবি কেন যেন ভেসে উঠতে লাগলো! দুটোতেই বিশাখার নাম! অধরা ম্যামকে তাড়াহুড়োয় বলতে ভুলে গেলো প্রোটন! ম্যামকে ফোন করবে? কিন্তু না, ম্যাম কি বিশ্বাস করবেন এমন কথা? ভাববেন প্রোটন ভুল দেখেছে! মনটা ভীষণ খুঁতখুঁত করতে লাগলো প্রোটনের! ( ক্রমশ)

আরও পড়ুন 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল