নূতন শিক্ষা নীতি ২০২০ (NEP- 2020) - কিছু প্রশ্ন /পর্ব - ১/অধ্যাপক সজল কুমার মাইতি

নূতন শিক্ষা নীতি ২০২০ (NEP- 2020)  - কিছু প্রশ্ন 
পর্ব - ১

সজল কুমার মাইতি

আমাদের দেশে এর বেশ কয়েকটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছিল। তাঁদের পরামর্শ মতো আমাদের দেশের শিক্ষা নীতিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। বতর্মান শিক্ষা নীতি অর্থাৎ নূতন শিক্ষা নীতি ২০২০ (NEP) চালু হল প্রায় ৩৪ বছর পর। এর আগে ১৯৮৬ (NPE) তে আমাদের দেশে নূতন শিক্ষা নীতি চালু হয়েছিল। ১৯৯২ সালে এই নীতিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সেই হিসেবে বতর্মান শিক্ষা নীতি আমাদের দেশে প্রায় চৌঁত্রিশ বছর পর নূতন শিক্ষা নীতি। 
প্রথমে দেখা যাক নূতন শিক্ষা নীতির ভূমিকায় কি বলা হয়েছে। " মানবিক শক্তির পূর্ণ বিকাশ ও একটি ন্যায়সঙ্গত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য ও রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীন উন্নতি সাধনের জন্য শিক্ষাই হল মূল ভিত্তি।" এ এমন এক সমাজ যেখানে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে। এমন এক সমাজ যেখানে সবার আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সুস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব। এই নীতির বিরুদ্ধে কোনো বড় নিন্দুক ও সমালোচকের বলার কিছু থাকে না। এই ভূমিকায় আরও অনেক কিছু বলা আছে যার বিরুদ্ধে বলার মতো তেমন কিছু নেই। কেই বা না চায় শিক্ষা নীতির লক্ষ্য হোক এটাই। আসলে বলে দিলেই হলো ! কিন্তু কিভাবে তার রূপায়ন সম্ভব? তার জন্য আর্থিক ও অন্যান্য পরিকাঠামোর ব্যবস্থা কিভাবে হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তার উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আবার একটা নূতন শিক্ষা নীতি চলে আসবে হয়তো।

সারা বিশ্বে শিক্ষা উন্নয়নের কার্যসূচী ও লক্ষ্য ঠিক করা হয় এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তার রূপায়নের সময় সীমা ও নির্ধারিত হয়। একেই Goal 4 (SDG4) বলা হয়। এটি Sustainability Development Goal 4 হিসেবে পরিচিত। ভারত সরকার ২০১৫ সালে এই কার্যসূচী গ্রহণ করে। ভারত সরকারের কার্যসূচীতে একথা বলা হয় যে, " সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত উন্নত মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে এবং সারা জীবন শিক্ষা গ্রহণের সুযোগকে উৎসাহ দান করা হবে।" এবং এই লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে পূরণের ব্যবস্থা করা হবে। এই লক্ষ্যে পৌঁছনোর কোন প্রোগ্রাম নজরে পড়ছে? অনেকটা আকাশবাণীর মতো শোনাচ্ছে। এর প্রায়োগিক দিকটা স্পষ্ট করা জরুরি।

আগামী দিনে আমাদের দেশ বিশ্বের সর্ববৃহৎ তিনটি অর্থনীতির একটি হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। বিশ্ব দ্রুতগতিতে এগুচ্ছে। জ্ঞানের চিত্রভূমি ও উত্তরোত্তর পরিবর্তিত হচ্ছে। আগামী দিনে অদক্ষ কাজ বা দক্ষতাশূন্য বা স্বল্প দক্ষতামুক্ত কাজ হয়তো মেশিন দিয়ে করানো হবে। দক্ষতার দরকার পড়বে সেই মেশিন তৈরি ও চালনার জন্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়বে। গনিত, কম্পিউটার সায়েন্স, ডেটা সায়েন্স এর অধিক চাহিদা দেখা দেবে। সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ের চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রবল। বিজ্ঞান ও সাহিত্য - কলাবিদ্যার পরস্পর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে। পরিবেশ দূষণরোধ ও সবুজায়নের প্রয়োজনীয়তা আগামী দিনে বৃদ্ধির সম্ভাবনা যথেষ্ট। উদ্ভূত মহামারি ও অতিমারীর জন্য ভ্যাকসিন তৈরি জন্য বিভিন্ন বিষয়ের সহযোগিতা আগামী দিনে অধিক অনুভূত হবে। আমাদের দেশে কলা ও সাহিত্য চর্চার প্রয়োজনীয়তা ও অস্বীকার করার উপায় নেই। এই সব বিষয়ে সহমত না হয়ে বিরুদ্ধ মত প্রকাশের সুযোগ খুব কম। 

এই পরিবর্তিত চাহিদা মাথায় রেখে শিক্ষা ব্যবস্থায় ও উপযুক্ত পরিবর্তন আনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শিক্ষা নীতিতে তার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন অবশ্য জরুরি। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে একটি বৌদ্ধিক ধারনার প্রবর্তন ও জরুরি। অভিজ্ঞতাধর্মী শিক্ষাদান, সৃজনশীলতায় উৎসাহ দান, আত্মোপলব্ধি লাভ ও আত্ম বিকাশ ও আত্মমুক্তির শিক্ষা দান - এগুলি ও জরুরি। আমাদের দেশ উন্নত মূল্যবোধের শিক্ষার পরম্পরা ও হেরিটেজ শিক্ষাদানের অন্যতম এক উৎকৃষ্ট পীঠস্থান। শিক্ষাক্ষেত্রে তার প্রয়োগ আবশ্যিক। বলা হয়েছে, " Education is a great leveler". উচ্চ নীচ, ধনী দরিদ্র, সর্ব ধর্ম জাতের জন্য সমান শিক্ষার অধিকার। Inclusive ও Equitable শিক্ষা ব্যবস্থার কথা ও বলা হয়েছে। শিক্ষাই বহুত্ববাদী সমাজের মধ্যে মিলনের মেলবন্ধন করে। লোকাল ও গ্লোবাল চাহিদা মাথায় রেখে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আমাদের উন্নত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা ও মনে রাখা জরুরি। নূতন শিক্ষা নীতি এই লক্ষ্যেই রচিত। কিন্তু প্রশ্ন কিভাবে এই উচ্চাশা পূরণ সম্ভব তার পূক্ষানুপূক্ষ বর্ননা যেন খুঁজে পাওয়া কঠিন। স্বপ্ন দেখা এক কথা কিন্তু কঠিন বাস্তব সে তো বড়ই রূঢ়।

নূতন শিক্ষা কর্মনীতির নীতি  
শিক্ষা কর্মনীতির মূল উদ্দেশ্য হল ভাল মানুষ তৈরি করা যার মধ্যে থাকবে বিচক্ষন চিন্তা শক্তি, সৃজনশীল কল্পনা, অপরের বিষয়ে বোঝা বা অনুধাবনের ক্ষমতা, বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনার ক্ষমতা, মানবিক মূল্যবোধের গুনাবলী। শিক্ষা এমন একজন নাগরিক তৈরি করবে যে ন্যায়সঙ্গত, সর্বজন অংশগ্রহণকারী এক বহুত্ববাদী সমাজ গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করবে। 
এই নীতি অনুযায়ী একটি ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে বোঝায় এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে সকল ছাত্র পড়তে আগ্রহী হয়। সেখানে প্রতিটি ছাত্রের যত্ন নেওয়া হয়। যেখানে শিক্ষা অভিজ্ঞতার বিস্তৃতি যথেষ্ট। শিক্ষার পরিকাঠামো উন্নত ও শিক্ষা উপযোগী সকল সম্পদে প্রতিটি ছাত্রের সমান সুযোগ আছে। সকল উৎকৃষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য এটাই হওয়া উচিত।
শিক্ষা কর্মনীতির মূল নীতিগুলি যা শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনই যেকোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

পরিচিতিকরন, চিহ্নিতকরন, ও ছাত্রের বিশেষ গুনের প্রতিপালন - শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ছাত্রদের শিক্ষাগত ও শিক্ষা বর্হিভূত ক্ষেত্রে বৌদ্ধিক উন্নতির জন্য উৎসাহ দানের ব্যবস্থা করা  নিয়মিত রূপে দরকার। প্রতিটি ছাত্রের বিশেষ গুন চিহ্নিত করে সেই বিষয়ে তাকে উদ্বুদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার - প্রতিটি ছাত্র যেন অক্ষর ও সংখ্যা বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয় তা নিশ্চিত করা অবশ্যই কর্তব্য।
নমনীয়তা - শিক্ষা ব্যবস্থায় নমনীয়তা খুবই জরুরি। ছাত্র তার আগ্রহ ও ক্ষমতা অনুযায়ী জীবনে তার পছন্দের পথ খুঁজে নিতে পারে সেই সুযোগ থাকা অত্যন্ত আবশ্যক।
কোন কঠিন পৃথকীকরণ নয় - বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে কোন কঠিন বেড়াজাল থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। কলা ও বিজ্ঞানের মধ্যে যাতায়াতের পথ অনেক মসৃন হওয়া উচিত। পেশাগত শিক্ষা ও অন্য শিক্ষার মধ্যে ও কঠিন বেড়াজাল কাম্য নয়। শিক্ষামূলক ও শিক্ষাবর্হিভূত বিশেষ ক্ষেত্রের মধ্যে ও জটিলতা দূর করা দরকার যার ফলে ছাত্র স্বাধীনভাবে তার বিচরন ক্ষেত্র খুঁজে নিতে পারে।

বিভিন্ন শিক্ষার মিশ্রন ও বৌদ্ধিক সামগ্রিক শিক্ষা  - কলা, বিজ্ঞান, বানিজ্য, পেশাগত শিক্ষা, গান বাজনা, খেলাধূলা প্রভৃতি বিষয়ের মিশ্রন ছাত্রকে তার আগ্রহের বিষয় খুঁজে নিতে সাহায্য করে। শিক্ষা ব্যবস্থায় এই সামগ্রিক বৌদ্ধিক বৈশিষ্ট্য থাকা জরুরি।
ধারনা ভিত্তিক বোঝায় জোর দেওয়া - শুধু মুখস্থ বিদ্যার ওপর ভরসা করে পরীক্ষায় পাশের বদলে ধারণা ভিত্তিক বোঝানোর প্রয়োজন অধিকতররূপে।
সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা - যুক্তিপূর্ন সিদ্ধান্তগ্রহনে সাহায্য করা ও নতুন আবিষ্কারের উৎসাহদান জরুরি।
বহু ভাষায় উৎসাহদান ও ভাষার ক্ষমতা  - শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহন উভয় ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ দরকার।
কলাকৌশলের ব্যাপক প্রয়োগ  - শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রে টেকনোলজির বহুল প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
সকল পাঠক্রমের মধ্যে সংঘবদ্ধ শক্তির প্রকাশ  - শিশু শিক্ষা থেকে উচ্চ শিক্ষা সর্বক্ষেত্রে পাঠক্রমের মধ্যে সাঞ্জস্য জরুরি।
ক্রমাগত মূল্যায়ন  - ক্রমাগত চালিয়ে যাওয়া গবেষণা ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ দ্বারা নিয়মিত মূল্যায়ন দরকার।
এতকিছুর হয়তো দরকার আছে সুষ্ঠু শিক্ষার জন্য। কোন একক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই উপাদান জোগাড় করা ও তার  সুষ্ঠু প্রয়োগ প্রায় অসম্ভব। চেষ্টা করে কারুর পক্ষে দেখা ও সুকঠিন। ( চলবে) 

সজল কুমার মাইতি।
প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, বানিজ্য বিভাগ, হুগলী মহসীন কলেজ। পূর্বতন অধ্যাপক, গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্স এ্যান্ড বিজনেস অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন, কলকাতা। চৌত্রিশ বছরের অধিক কাল ইউ জি ও পি জি শিক্ষা দানের অভিজ্ঞতা। বতর্মানে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কলেজের বানিজ্য বিষয়ে সিনিয়র সার্ভিসের একমাত্র অধ্যাপক।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন