দূরদেশের লোকগল্প—চেকোশ্লোভাকিয়া /চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প—চেকোশ্লোভাকিয়া 

চিন্ময় দাশ

চতুর মোরগ সরল মুরগি

একটা হৃষ্টপুষ্ট মোরগ আর সুন্দর ছিপছিপে একটা মুরগি। কাছাকাছিই থাকে দুটিতে। ভারি ভাব দুজনের। 
একদিন মোরগ বলল—চলো, খেতের দিকে যাই। খাবার দাবার নিশ্চয় কিছু না কিছু পাওয়া যাবে।
মুরগি বলল—চলো তাহলে, যাওয়া যাক।
পথে যেতে যেতে মোরগ বলল— তবে আমার একটা প্রস্তাব আছে। খোঁটাখুঁটি করে তুমি যা পাবে, আমার সাথে ভাগ করে খাবে। আর, আমি যা পাবো, তোমার সাথে ভাগ করে খাবো।
মুরগি বলল— এ তো ভালো কথা। অসুবিধার কী আছে? আমি রাজি। 
মোরগ-মুরগিদের খাবার খোঁজা মানে, দুটো পা দিয়ে আঁচড়ানো, নয়তো বা, ঠোঁট দিয়ে ঠোকরানো। তাতে যখন যা উঠে আসে। 
দুজনেই খোঁজাখুঁজি করছে। খানিক বাদে একটা কেন্নো পেয়ে গেল মুরগি। ভারি আনন্দ তার মনে। মোরগকে ডেকে বলল— এসো, ভাগ করে খাই দুজনে।
আরও দু’বার এটা ওটা পেল মুরগিটাই। প্রত্যেক বারেই মোরগকে ভাগ দিয়ে, খেলো সে। 
খানিক বাদে চিনে বাদামের বড়সড় একটা দানা পেয়ে গেল মোরগ। দানাটা চোখে পড়ামাত্রই, মুখে লালা এসে গেল তার। স্বভাবেও ভারি চতুর সে। মনে ভাবল, এত বড় দানাটার ভাগ দিয়ে দিতে হবে মুরগিকে?
আড় চোখে একবার চেয়ে দেখল মুরগির দিকে। না, সে এদিকে তাকিয়ে নাই। বাদামটা চোখে পড়েনি তার। তাহলে আর চিন্তার কী আছে? বাদামটাকে ঠুকরে ভেঙে খাওয়া যায়। তবে, তাতে মুরগির চোখে পড়ে যাবে। আর একবার মুরগির দিকে তাকিয়ে নিয়ে, বাদামটা কপ করে গিলে ফেলল মোরগ।


আর যায় কোথায়? তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে, দানাটা গিয়েছে গলায় আটকে। তাতে শ্বাস আটকে যাচ্ছে মোরগের। ছটফট করতে করতে চিত হয়ে, মাটিতে পড়ে গেল। 
মুরগি চমকে গিয়ে দেখে, মোরগ মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। পা দুটো উঁচিয়ে আছে শূন্যে আকাশের দিকে। চিতকার করে বলল—আরে, আরে! অমন করছ কেন? কী হয়েছে তোমার?
ভারি কষ্ট হচ্ছে তখন মোরগের। কোন রকমে বলল—দম আটকে আসছে আমার। এক ঢোঁক জল দাও তাড়াতাড়ি। নইলে মারা পড়ব। 
মুরগি কূয়ার কাছে দৌড়ে গিয়ে বলল-- দম আটকে আসছে মোরগের। গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। পা দুটো আকাশে তোলা। এক ঢোঁক জল দাও তাড়াতাড়ি। নইলে মারা পড়বে সে।
কুয়া বলল—আমার কাছে জল চাইছো, দেবোও আমি জল। কিন্তু নেবে কী করে? তাড়াতাড়ি দর্জির কাছে যাও। একটা রুমাল এনে দাও আমাকে। তবেই জল পাবে। 


মুরগি ছুটতে ছুটতে দর্জির বাড়ি গিয়ে হাজির। বলল-- দম আটকে আসছে মোরগের। গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। পা দুটো আকাশে তোলা। এক ঢোঁক জল দেবে কুয়া। তুমি একটা রুমাল দাও তাকে। তাড়াতাড়ি করো। নইলে মারা পড়বে মোরগ বেচারা।
দর্জি বলল—রুমাল একটা দিতেই পারি আমি। কিন্তু এমনি এমনি কি আর কিছু দেওয়া যায়? এদিকে আমার চটির খুব দরকার। রুমাল নিতে হলে, চটপট মুচির কাছ থেকে এক জোড়া চটি এনে দাও আমাকে। 
মুরগি ছুটল মুচির বাড়ি। বলল-- দম আটকে আসছে মোরগের। গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। পা দুটো আকাশে তোলা। এক ঢোঁক জল চাই তার। দর্জিকে এক জোড়া চটি দাও তুমি। দর্জি একটা রুমাল দেবে কুয়াকে। তাহলেই জল দেবে কুয়া।  তাড়াতাড়ি করো। নইলে মারা পড়বে মোরগ বেচারা।
মুচি বলল—জুতো আমি দেব। এমনি কি আর দেওয়া যায়, বলো? একটা ব্রাশ দরকার আমার। আগে তুমি একটা জুতোর ব্রাশ এনে দাও আমাকে।
ছুটতে ছুটতে দোকানির বাড়ি হাজির হোল মুরগি-- দম আটকে আসছে মোরগের। গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। পা দুটো আকাশে তোলা। এক ঢোঁক জল চাই তার। তুমি একটা ব্রাশ দাও মুচিকে। মুচি একজোড়া চটি দেবে দর্জিকে। দর্জি একটা রুমাল দেবে কুয়াকে। তাহলেই জল দেবে কুয়া। তাড়াতাড়ি করো। নইলে মারা পড়বে মোরগ বেচারা। 
দোকানি বলল—সে তো বুঝলাম, বাছা। কিন্তু বললেই কি আর ব্রাশ দিয়ে দেওয়া যায়? হয়েছে কী, মাখন খাবার ভারি সাধ আমার। তুমি খানিকটা মাখন এনে দাও আমাকে। ব্রাশ পেয়ে যাবে।
হাঁফাতে হাঁফাতে গোয়ালার বাড়ি এসে হাজির হোল মুরগি। বলল-- দম আটকে আসছে মোরগের। গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। পা দুটো আকাশে তোলা। এক ঢোঁক জল চাই তার। তুমি খানিকটা মাখন দাও দোকানিকে। দোকানি একটা ব্রাশ দেবে মুচিকে। মুচি একজোড়া চটি দেবে দর্জিকে। দর্জি একটা রুমাল দেবে কুয়াকে। তাহলেই জল দেবে কুয়া। তাড়াতাড়ি করো। নইলে মারা পড়বে মোরগ বেচারা। 
গোয়ালা বলল—সবই বুঝলাম। কিন্তু তুমি চাইলে, আর অমনি আমি মাখন দিয়ে দিলাম তোমাকে—তা কি আর হয়, বাপু? মাঠ থেকে এক আঁটি সবুজ ঘাস এনে দাও আমার গরুর জন্য। মাখন পেয়ে যাবে।
ছুটতে ছুটতে মাঠের কাছে হাজির হোল মুরগি। বলল-- দম আটকে আসছে মোরগের। গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। পা দুটো আকাশে তোলা। এক ঢোঁক জল চাই তার। তুমি এক আঁটি ঘাস দাও গোয়ালার গরুর জন্য। গোয়ালা খানিকটা মাখন দেবে দোকানিকে। দোকানি একটা ব্রাশ দেবে মুচিকে। মুচি একজোড়া চটি দেবে দর্জিকে। দর্জি একটা রুমাল দেবে কুয়াকে। তাহলেই জল দেবে কুয়া। তাড়াতাড়ি করো। নইলে মারা পড়বে মোরগ বেচারা। 
মাঠ বলল—বিপদের সময় কাউকে সাহায্য করতেই হয়। করবোও আমি সাহায্য। তাহলে, এক কাজ করো। আকাশের কাছে যাও তুমি। কিছুটা শিশির এনে দাও তাড়াতাড়ি। ঘাস পেয়ে যাবে। 
মুরগির তখন কাহিল অবস্থা ছোটাছুটি করে। কোন রকমে আকাশের কাছে হাজির হয়ে, বলল-- দম আটকে আসছে মোরগের। গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। পা দুটো আকাশে তোলা। এক ঢোঁক জল চাই তার। তুমি কিছুটা শিশির দাও মাঠকে। সে এক আঁটি ঘাস দেবে গোয়ালার গরুর জন্য। গোয়ালা খানিকটা মাখন দেবে দোকানিকে। দোকানি একটা ব্রাশ দেবে মুচিকে। মুচি একজোড়া চটি দেবে দর্জিকে। দর্জি একটা রুমাল দেবে কুয়াকে। তাহলেই জল দেবে কুয়া। তাড়াতাড়ি করো। নইলে মারা পড়বে মোরগ বেচারা।   
আকাশ তো সবই দেখছিল ওপর থেকে। বদমাশ মোরগটা চাতুরি করছিল মুরগির সাথে। তার ফলও পেয়েছে হাতে নাতে। দম আটকে, মরতে বসেছে হতভাগা। তবে, সিধে সরল মুরগিটাকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে আকাশের। বন্ধুর জন্য কী প্রাণপাত ছোটাছুটিই না করছে বেচারি! 
দয়া হোল আকাশের মনে। খানিকটা শিশির তুলে দিল মুরগির হাতে। শিশির পেয়ে, মুরগিটা কী খুশি, কী খুশি! তা দেখে, মন ভরে গেল আকাশেরও। 
ছুটতে ছুটতে মাঠে এসে পৌঁছালো মুরগি। শিশির দিল ঘাসের মাঠকে। শিশির পেয়ে, মাঠ এক আঁটি ঘাস দিল গোয়ালাকে। ঘাস পেয়ে, গোয়ালা মাখন দিল দোকানির জন্য। মাখন পেয়ে, দোকানি সাথে সাথে ব্রাশ তুলে দিল মুরগিকে। ব্রাশ পেয়ে, চটিজোড়া দিয়ে দিল মুচি। একজোড়া চটি বলে কথা! সাথে সাথে দর্জি একটা রুমাল সেলাই করে দিল। রুমাল পেয়ে, কুয়া বলল—তাড়াতাড়ি জলে ভিজিয়ে নাও রুমালটা। দৌড়ে যাও বন্ধুর কাছে। দু’ফোঁটা নিংড়ে দাও গলায়। প্রাণে বেঁচে যাবে। ভয় পেয়ো না।


পড়ি কি মরি করে, মোরগের কাছে ফিরে এলো মুরগি। খানিকটা জল পড়তেই, বাদামের দানা নেমে গেল গলা থেকে। 
অমনি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উঠে দাঁড়াল মোরগ। গলা ছেড়ে ডেকে উঠল—“কোঁ-ও-কো-র-কোঁ-ও। কোঁ-ও-কো-র-কোঁ-ও”।
আসলে মোরগটা বলল—কক্ষনো করব না আর এমনটা। কক্ষনো না।  
সত্যি সত্যিই, সেই থেকে শুধরে গিয়েছে সে। যখনই যা খাবার পায়, পোকা-মাকড় হোক, বা জোয়ার-বাজরার দানা, ভাগ করেই খায় মুরগির সাথে। চাতুরি করতে ভুলেই গেছে মোরগ।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন