যেতে যেতে পথে--৩৫/রোশেনারা খান

যেতে যেতে পথে
রোশেনারা খান
পর্ব ৩৫

সাড়ে তিনটের সময় বাবলি আমাদের সঙ্গে দেখা করে ওটিতে ঢুকল। ৩ টে ৫৯ মিনিটে রজকুমারী জারা পৃথিবীর আলো দেখল। দীপ ওটি থেকে বেরিয়ে সুখবরটি দিয়ে গেল। এখানে ওটিতে একজনের থাকার পারমিশন আছে। করিডোরের দরজায়  লেখা আছে হাসবেন্ড ও পার্টনার এলাও। একটি লেটার বক্সের ওপর লেখা  আছে, ‘প্লিজ, পোস্ট ইয়োর কমেন্টস হিয়ার’।
    কিছুক্ষণ পরেই দীপ তোয়ালে জড়িয়ে মেয়েকে বাইরে নিয়ে এল। মাথা ভর্তি কালো চুল, মিষ্টি ছোট্ট মুখ। তবে গায়ের রং চাপা হবে মনে হচ্ছে।  তা হোক, ওপরওয়ালা সুস্থ সন্তান দিয়েছেন। আমার মেয়ে সুস্থ আছে, এর বেশি তো কিছু চাওয়ার থাকতেই পারেনা। সঙ্গে থাকা ক্যামেরাতে ওর প্রথম ছবি আমিই তুললাম।  এর মধ্যে বকুল, মনি(আমার ভাই)ফোন করে খোঁজ নিয়েছে। এখন আমি ফোন  করে ওদের সুসংবাদ জানালাম। আধঘণ্টা পরে বেডসহ বাবলি ও বেবিকে আমাদের সামনে দিয়ে ওয়ার্ডে নিয়ে গেল। সাড়ে পাঁচটায় আমরা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলাম। কারণ ৬ টা বেজে গেলে মেডিলিঙ্কের বাস পাওয়া যাবে না। কোয়ার্টারে ফিরে স্নান সেরে মাছের ঝোল আর ভাত করে ইন্টারনেটে পেপার পড়লাম। কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে রাতের খাওয়া সারলাম। তারপর ইন্টারনেটে হিন্দি সিরিয়াল দেখে বিছানায় গেলাম।
    সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে চায়ের পর রান্না বসালাম। দীপ খেয়ে হাসপাতাল যাবে। বাবলির জন্যও নিয়ে যাবে। ওদের খাবার বাবলি খেতে পারবে না। ডাল আর মাখন দিয়ে ভাত মেখে দিলাম। সঙ্গে পোস্ত আর টম্যাটো চাটনি। বাইরে বেশ ঝলমলে রোদ উঠেছে। গতকাল রাতে ওয়াসিং মেশিনে কাপড়জামা  কাচতে দিয়েছিলাম। বের করে পিছনের লনে শুকোতে দিলাম। তবে আকাশের  কোনও ভরসা নেই। এখুনি হয়ত ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি নেমে আসবে। এই রোতে থাকা কোয়ার্টারের প্রত্যেকটা লনে একটা করে কি যেন গাছ রয়েছে। এসে নেড়া দেখেছিলাম, এখন পাতা গজাচ্ছে। কী গাছ, কে জানে? পিছনের লনগুলো কাঠের পাটিশন দিয়ে ঘেরা। একটা কাঠের দরজাও রয়েছে। একটি লোক জানিনা কিভাবে বাইরে থেকে দরজা খুলে ঘাস ছেঁটে লন পরিষ্কার করে।
    কাপড়জামা উলটেপালটে শুকিয়ে তুলে রেখে স্নান খাওয়া করে বিছানায় গা এলিয়ে আইপ্যাড নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। ফোন বাজতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। দীপ হাসপাতাল থেকে ফোন করে বলল বাবলির জন্য রাতের খাবার নিয়ে যাই যেন। খাবার বানাতে গিয়ে আমাদের একটু দেরি হল। হাসপাতালে ভিজিটিং আওয়ার তিনটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত। তবে স্বামী ও পার্টনার যে কোনো সময় দেখা করতে পারেন। সামনের কারপার্কের ওপারে মেডিলিঙ্কের বাস স্টপেজ। স্টপেজে ইলেক্ট্রনিক্স বোর্ডে সবসময় দেখা যাচ্ছে বাস আসতে কত দেরি, কত মিনিট পর বাস ছেড়ে যাবে। বাসে যাতায়াত করার সময় নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। সব বাসে কোনো কিছু ধরে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা নেই। পাহাড়ি উঁচুনিচু রাস্তা। কিছু না ধরে দাঁড়ানো মুসকিল। তাই সিট খালি না  থাকলে বাসে ওঠার সময় ড্রাইভার জানিয়ে দেন। আমরা ওঠার  কয়েকটা স্টপেজ পর এক বৃদ্ধ দম্পতি বাসে উঠতে চাইলে, ড্রাইভার তাঁদের জানালেন একটি মাত্র খালি সিট আছে। তিনি প্যাসেঞ্জারদেরও জিজ্ঞেস করলেন সামনের স্টপেজে কেউ  নামবেন কিনা। যদি থাকেন তিনি উঠে দাঁড়ালে বৃদ্ধ দম্পতি বসতে পারবেন। কিন্তু  কেউ নামার ছিল না। তখন এক সুন্দরী ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়িয়ে ওঁদের সিট ছেড়ে দিলেন। এই পথে একটা মসজিদ ও বাচ্চাদের স্কুল পড়ে। স্কুলের নাম ‘পহেলা কদম’। মনে হল এই এলাকাটি মুসলিম অধ্যুষিত। এখানেই বাস থেকে নেমে পুরনো জিনিস বিক্রির বাজারে যাওয়া যায়।
      হাসপাতালে পৌঁছে দেখলাম ২৯ নং ওয়ার্ডেই একটি আলাদা রুমে বাবলিকে রাখা হয়েছে। দীপ এখানেই আছে। বাবলি আজ হাঁটাচলা করেছে, স্নান করেছে। মেয়েকে নিয়ে রাতে কোনো কষ্টও হয় নি। কান্নাকাটি করতে নার্সরা নিয়ে গিয়ে প্র্যামে ঘুমপাড়িয়ে রেখেছিল। এদেশে প্রসুতির সুবিধার জন্য কতরকম সুব্যবস্থা রয়েছে। একটি ছোট ফ্যানও আছে দেখছি। আমাদের দেখে দীপ বাইরে গেল। আমরা বসে বসে রাজকুমারীর নড়া চড়া দেখছি আর মেয়ের সঙ্গে কথা বলছি। এইসময় একটি ছোট খাটো চেহারার নিগ্রো মেয়ে ট্রলিতে করে খাবার নিয়ে আসে,বাবলি তার কাছে খাবারের লিস্ট চাইল। কয়েকটা খাবারের নিচে টিক দিয়ে আমাদের সেগুলি নিয়ে আসতে বলল। বেরিয়ে খাবারের ট্রলিতে দেখলাম বড় বড় টুকরোর নুন ছাড়া আলুভাজা (পরে মুখে দিয়ে দেখেছি), কড়াইশুঁটিসিদ্ধ, নানারকম ফল, স্যান্ডউইচ, বাটার টোস্ট, কফি, আইসক্রিম, দই, সস আরও অনেককিছু রয়েছে। তার থেকেই কিছু নিয়ে এলাম। বাবলি তো এসবের কিছুই খাবে না, আমাদের নিয়ে চলে জেতে বলল। ইতিমধ্যে দীপ ফিরে এসে ক্যামেরায় আমাদের সবার ছবি তুলল, মিড ওয়াইফরাও বাদ গেলেন না।
      ফেরার সময় বিকেলের পড়ন্ত আলোয় শহরটাকে ছবির মত সুন্দর লাগছিল। উঁচুনিচু, আঁকাবাঁকা রাস্তায় বাস চলছে মসৃণভাবে। এখানকার বাসের চাকাগুলো সব দিকে ঘোরে। যে কারণে ছোট ছোট বাঁকগুলিতেও গাড়ি ঘোরাতে ড্রাইভারের অসুবিধা হয় না। এদেশের আয়তন অনুপাতে জনসংখ্যা খুবই কম, তাই অনেক কাজ যন্ত্রের সাহায্যে করা হয়।
    পরদিন সকালে হঠাৎ করে খুব মাথা ঘুরতে লাগল। বুঝলাম অম্বল হয়েছে, বমি না হলে মাথাঘোরা বন্ধ হবে না। তখন ভাবছি কী করে রান্না করব? একটু পরেই দীপ আসবে, বাবলির খাবার নিয়ে যাবে। সাড়ে নটার সময় বিছানা থেকে উঠে মুখ ধোয়ার চেষ্টা করলাম, সেইসময় সামান্য বমি হল। কিছুটা স্বস্তি পেলাম। দীপ হাসপাতাল থেকে ফিরে জানাল, এবেলা ও খাবার নিয়ে যাবে না। রাতে খুব কষ্ট গেছে, সারারাত জেগে কাটাতে হয়েছে। আমরা যেন বাবলির খাবার নিয়ে তিনটের সময় বেরিয়ে পড়ি। ও এখন স্নান করে খেয়ে ঘুমবে গতকালের কিছুটা রান্না করা মাংস আছে। দীপের হয়ে যাবে। আমাদের জন্য কাঁচকলা দিয়ে মাছের পাতলা ঝোল করলাম।
    আজ আমরা চারটের সময় হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম। বাবলির কাছে গিয়ে দেখলাম একজন অল্প বয়সি ব্রিটিশ মেয়ে বাবলির সামনে বসে কথা বলছে। ও বেরিয়ে যেতে বাবলি বলল, ও মেডিক্যেলের স্টুডেন্ট, আমার কেস হিস্ট্রি জানতে এসেছিল। তোমরা এসেছ বলে ওকে কাল সকালে আসতে বললাম।  সে যাইহোক, বাবলি আর ওর মেয়ে ভালই আছে। আগামীকাল রিলিজ করে দেবে। দীপের আজও নাইট ডিউটি আছে। সকালে ওরা একসাথে ফিরবে।  কিছুক্ষণ পরে দীপ একটি কারসিট হাতে নিয়ে ঢুকল। এতে শুইয়ে মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। এখানে বাচ্চা কোলে নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া যায় না।

    আজ আমাদের রাজকুমারী জারা বাড়ি আসবে। তাই সকাল থেকে ঘরদোর পরিষ্কার করে গুছিয়ে রেখে, রান্না সেরে তার অপেক্ষায় বসেছিলাম। ওরা এলো দুপুর একটা নাগাদ। ছোট্ট জারা গোলাপি চাদরে ঢাকা অবস্থায় পাখির বাসার মত কারসিটে ঘুমছে। মুখখানি নিষ্পাপ দেবকন্যার মত! বিকেল থেকে কেন জানিনা কান্না শুরু করল যে, আর থামতেই চাইনা। সারারাত আমি আর ওর মা প্রায় জেগেই কাটালাম। সকালেও কাঁদছিল। স্নান করানোর পর আরামে ঘুমাল। এরা শ্বশুর জামাই বাজারে গিয়ে অর্ধেক বাজার উঠিয়ে নিয়ে এসেছে মনে হচ্ছে। এখানে পাকিস্তানিদের বড় বড় ‘মালটি পারপাস’ স্টোরে প্রয়োজনিও এবং পছন্দ মত রান্না খাওয়ার সব জিনিস পাওয়া যায়। ওরা মাছমাংস, সবজি ছাড়াও নানারকম খাবারও নিয়ে এসেছে। মিষ্টি এনেছে বিভিন্ন রকমের। জিলিপি, পানতুয়া, মতিচুরের লাড্ডু, সন্দেশ, বরফি, আরও অনেককিছু। ছেলেটা পারেও বটে। তবে আমাদের ওখানের মত মিষ্টির স্বাদ নয়।
      দুপুরে লাঞ্চের পর আমি আর খান সাহেব, দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দীপ দরজায় নক করতে খুলে দেখি ও প্লেট ভর্তি ডালপুরি আর চাটনি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো বাংলাদেশি দোকান থেকে কেনা। এখন সেগুলো ভেজে নিয়ে  এসেছে। শুধু আজ নয়, রোজ দিনই বিকেলে নতুন নতুন খাবার বানিয়ে খাওয়া আর আড্ডা চলে। সেদিন ডালপুরি খাওয়ার পর রাতে কিছু খাবার ইচ্ছে ছিলনা। তবুও দীপ ৩/৪ রকম ফল কেটে, ম্যাংগোসেক বানিয়ে নিয়ে এসে খাওয়াল।

                                      ক্রমশ

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল