জঙ্গলমহলের দুর্গাপূজা /সূর্যকান্ত মাহাতো

জঙ্গলমহলের জীবন ও প্রকৃতি

পর্ব - ৩৯

জঙ্গলমহলের দুর্গাপূজা

সূর্যকান্ত মাহাতো


কাশফুল। উজ্জ্বল সাদা সাদা রঙের লোমশ ফুল গুলো। ঝুঁকে ঝুঁকে পড়ে খাল বিল ও নদীর পাড়ে। আশ্বিনের বাতাসে সেগুলো তিরতির করে কাঁপে। বিকেলের নরম রোদ গায়ে পড়লে উজ্জ্বলতা যেন আরো দ্বিগুণ বেড়ে যায়। শরতের অপরূপ সাজে সেজে ওঠা এই ফুলগুলোই তো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবকেই আবাহন জানাই।। আমরাও বুঝে যাই পুজো আসছে। তারপর একসময় পুজো আসে।

জঙ্গলমহলে দুর্গাপূজার এখন যে আড়ম্ভর, প্যান্ডেলের অভিনবত্ব, শহুরে ছোঁয়া, সেটা আগে ছিল না। মূল শহর বা বাজারগুলোতে হাতে গোনা কয়েকটা পুজোই হত মাত্র। ধীরে ধীরে পূজোর সংখ্যাগুলো বাড়ল। শহর থেকে সেই বিপুল খরচের পূজা এখন গ্রামেও পৌঁছে গেছে। সুতরাং আনন্দের ধারাটাও বদলে গেছে। এবং সেটাই তো স্বাভাবিক!

তারপরেও বলা যায় এই দুর্গোৎসবে জঙ্গলমহলের মানুষ শহরবাসীর মতো করে আনন্দ উপভোগ করে না। যতটা "বাঁদনা" কিংবা "মকরে" করে। নতুন জামা কাপড় কেনাও দুর্গাপূজায় তেমন চল নেই। একমাত্র চাকুরিজীবি পরিবারগুলোর মধ্যেই এটা দেখা যায়। জঙ্গলমহলের মানুষ নতুন জামা কাপড়ে সেজে ওঠে একমাত্র "মকর" পরবে। মকর স্নান করে নতুন বস্ত্র তারা গায়ে দেবেই দেবে।

তাহলে জঙ্গলমহলে দুর্গোৎসব কীভাবে পালিত হয়? উত্তরে বলা যায়, একেবারে স্বাভাবিকভাবে। শহরবাসীর মতো অত উচ্ছ্বাস থাকে না। কারণ চার পাঁচ কিলোমিটার দূরে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজার সঙ্গে গ্রামের মানুষেরা সেরকম ভাবে আত্মিক যোগ খুঁজে পায় না। সকলেরই মনে হয় পুজোটা যেন আমাদের নয়। তাই এই দূরত্বটাই পূজোর আবহটাকে অনেকটা ম্লান করে দিয়েছে।

পূজার প্রাক দিনগুলোতে গ্রামের মাটির বাড়িগুলোর দেওয়ালে মাটি লেপনের কাজ শুরু হয়। আসলে জঙ্গলমহলের অধিকাংশ বাড়িই কাঁচা। বর্ষার সময় বৃষ্টির জলে দেওয়ালগুলো অধিকাংশই ধুয়ে যায় কিংবা ছড়ে যায়। তাই বর্ষার শেষে শরৎ এলেই ফের মাটি লেপনের কাজ শুরু হয়, বাড়িগুলোর দেওয়ালে দেওয়ালে। বলা হয় "ঠাকুর"(দেবী দুর্গা) ঘর ঢুকবে। তাই এমন প্রস্তুতি। সুতরাং এটাও একটা পূজা পূজা ভাব। মাটি লেপনের পর খড়িমাটি আর নীল বড়ির সংমিশ্রণে দেয়ালগুলোকে রং করা হয়। বেশ নীলাভ সাদা একখানি রং ফুটে ওঠে। অনেকে গেরুয়া ও নীল সাদা রঙের বিভিন্ন ফুল, পাখি, লতাপাতার নকশাও আঁকে। এই গেরুয়া রংটি বিশেষ একটি পাথরকে ঘষে ঘষে বের করতে হয়। দেওয়ালে সেই গেরুয়া রঙে "দুর্গা" নামের বানান ভুল করে অনেকেই অদক্ষ হাতে লিখে,

"এসো মা "দূর্গা"(দুর্গা-র পরিবর্তে) বসো মা ঘরে,
আমাদের ঘরে থেকো, আলো করে।"

জঙ্গলের মাঝে মাঝে উঁকি মারা গ্রামগুলোর "এসো মা দুর্গা"-র এই যে আহ্বান, সেটা যতটা না দেবীকে আহ্বান, তার থেকেও বেশি যেন আপন দুহিতাকে আহ্বান। এই আহ্বান সমস্ত স্নেহ কাতর মায়েদের। পুজোতে মেয়ের আগমনের আনন্দ তো এটাই।  দীর্ঘদিন পর মেয়েকে কাছে পাওয়া। তার কোলে ফেরা। ছলছল চার চোখে তখন মিলনের আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। কন্যার শ্বশুরালয় থেকে পিতৃ গৃহে ফেরাটাই এখানকার পুজোর আসল আনন্দ। পূজার কটা দিন "মায়ে- ঝিয়ে"-র(কন্যা) আনন্দে ও  খুশিমনে সময় যাপনটাই  তো এখানকার পুজোর সমস্ত আনন্দ আর খুশি।

কেবল কন্যারই বাপের বাড়িতে ফেরা নয়। ঘরের ছেলেদেরও বাড়ি ফেরা। জঙ্গলমহলের অধিকাংশ গ্রামের ছেলেরাই এখন শ্রমিকের কাজে ভিন জেলায় কিংবা ভিন রাজ্যে কাজ করে। কেউ কেউ চাকরি সূত্রেও বাইরে থাকে। তাই প্রতিবছর পুজোর এই সময়টাই তারা যেখানেই থাকুক ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরে। পুজোর সময় তারা বাড়ি ফিরলে পরিবারেরও দারুণ আনন্দ। এটা ওদের কাছে পুজোর আনন্দের থেকেও অনেক অনেক বেশি। কয়েক কিলোমিটার দূরে ঠাকুর দেখার আনন্দর থেকেও চোখের সামনে ঘরের ছেলেমেয়েদের সর্বক্ষণ দেখতে পাওয়াটাও কত যে খুশির, সেটা বলে বোঝানো যাবে না।


পূজার দিনগুলোতে আদিবাসীরা "ভুয়াং নাচ" ও "দাঁশায়" গানে আর নাচে নাচে মেতে ওঠে। পুরুষেরা মেয়েদের শাড়ি পরে নাচে। মাথায় বাঁধা থাকে একটি পাগড়ি। পাগড়ির দুই পাশে গোঁজা থাকে লম্বা ময়ূর পালক। হাতে থাকে কাঁসার থালা। আর বাজানোর জন্য ছোট্ট একটি লাঠির টুকরো। থালায় লাঠি ঠুঁকে ঠুঁকে বাজনার তাল তৈরি করে। আর সেই তালে তাল রেখে নির্দিষ্ট ছন্দে সামনে পিছনে পা ফেলে ফেলে নাচ করে। "ভুয়াং" হল শুকনো লাউয়ের খোল। সেটাকে বেশ সাজিয়ে তোলা হয়। তার মধ্যে ধনুকের টঙ্কার জুড়ে, তাকে টেনে ছেড়ে দিয়ে দিয়ে বাজানো হয়। হায়রে! হায়রে! বলে এই গানে দুঃখ প্রকাশও করা হয়।

কুড়মিরাও "কাঁঠি নাচ" ও "পাঁতা" নাচে পুজোর কটা দিন মেতে থাকে। পুরুষ নর্তকীরা মেয়েদের সাজে সেজে ওঠে, হাতে থাকে কাঠি বা রুমাল। কাঠি নিয়ে বিশেষ মুদ্রায় নাচ করে বলেই এই নাচের নামকরণ কাঁঠি নাচ"। গানের মাঝে মাঝে এই নর্তকীরাও "হায়! হায়!" বলে দুঃখ প্রকাশ করে। এই দুই সম্প্রদায়ের গানের মধ্যে তাই দারুণ একটা মিল রয়েছে। মনে করা হয় আর্যদের হাত থেকে বাঁচতেই অনার্য পুরুষরা এভাবেই মহিলার ছদ্মবেশে গঙ্গার এপারে চলে এসেছিলেন। কারণ আর্যরা নাকি মহিলাদের আক্ৰমণ করত না। তাই নারীদের ছদ্মবেশ। সেই ধারাই এ গানে ও নাচে প্রতিফলিত। বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই নাচ গান করে মাগণ করে। মাদল, করতাল, হারমোনিয়াম হল এই নাচ ও গানের বাদ্যযন্ত্র। গানের শেষে চাল পয়সা আদায় করা হয়। পরে সেই টাকায় একদিন ফিস্ট করে সকলে খাওয়া দাওয়া করে।

এখন কাঁঠি নাচ আর সেরকম ভাবে দেখা যায় না। পুজোর সংখ্যাও এখন অনেক বেড়ে গেছে। একাধিক গ্রামে এখন 'দুর্গাপূজা' অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই আনন্দের ধারাটাও বদলে গেছে। পুজোর কটা দিন পূজা প্রাঙ্গণে  নানা ধরনের নৃত্যানুষ্ঠান চলে। যেমন, ছৌ নাচ, ঝুমুর নাচ, বাচ্চাদের নৃত্যানুষ্ঠান, অর্কেস্ট্রা বা জলসা অনুষ্ঠিত হয়। জঙ্গলমহলে পুজোর সেরা আকর্ষণ ছিল যাত্রাপালা। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই যাত্রাপালা এখন জঙ্গলমহল থেকে প্রায় একরকম উঠেই গেছে বলা চলে। অথচ কয়েক বছর আগেও এই যাত্রাপালাগুলোই ছিল জঙ্গলমহলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিনোদন। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক, ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক যাত্রাপালাগুলোতে বুঁদ হয়ে পড়ত জঙ্গলমহলবাসী। আগে পূজোর সময় বিভিন্ন ধরণের যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হত। সুদূর কলকাতা থেকে বেশ নামী দামি যাত্রার দল আসত। কলকাতার যাত্রাপালার সঙ্গে সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়ে স্থানীয় মানুষেরাও যাত্রাপালায় অভিনয় করত। মহিলা চরিত্রের জন্য বাইরে থেকে ফিমেল চরিত্র নিয়ে আসা হত। জঙ্গলমহলেই এমন অনেকে ফিমেল চরিত্রে অভিনয় করে জীবিকা নির্বাহ করত। এখন যাত্রাপালার দিন একরকম শেষ। তাই তাদেরও বিকল্প জীবিকার সন্ধান করতে হচ্ছে।

যেসব মেয়েদেরকে বাপের বাড়িতে শ্বশুর বাড়ির লোকেরা পাঠায় না সেই সব মায়েদের বাড়িতে সেরকম ভাবে খুশি থাকে না। পুজোর দিনগুলো একরকম মন খারাপ নিয়েই ওদের কাটে। একটা অদৃশ্য কষ্ট যেন সর্বক্ষণ ঘিরে থাকে বাবা-মায়ের মনে।

ছেলে বা মেয়ের বাড়ি আসার আনন্দও খুব বেশিদিন থাকে না। দশমীর পরেই তো সেই চিরাচরিত বিচ্ছেদ। তাই মায়েদের মন 'নবমী' এলেই এক অদৃশ্য বিষাদ আর বিষন্নতায় ভরে ওঠে। মা 'মেনকা'-র মতোই তাদেরও যেন একটাই আর্তি---

"ওরে নবমী নিশি না হইও রে অবসান।"

কিন্তু নবমী নিশির অবসান অবশ্যম্ভাবী। একটা সময় নবমী নিশিরও অবসান ঘটে। বিজয়ার বিষন্নতা গ্রাস করে। বাড়ির ছেলেমেয়েদের আবারও দূরে চলে যাওয়ার কষ্ট যেন সকলকেই ঘিরে ধরে। তারপরেও দশমী তথা বিজয়ার আনন্দ জঙ্গলমহলে দারুণ খুশির। না সিঁদুর খেলার আনন্দ নয়। বিজয়া দশমীর খাওয়া-দাওয়ার আনন্দ জঙ্গলমহলে দারুণভাবে পালিত হয়। মাছ, মাংস, মিষ্টি সবাই যেন কব্জি ডুবিয়ে খায়। একেবারে দরিদ্র পরিবারগুলোও এদিন মাছ নয় তো মাংস সহযোগে ভাত খায়। এই দিনটিই ওদের কাছে পুজোর সবথেকে বেশি আনন্দের দিন।

বিজয়া দশমীর দিন জঙ্গলমহলের অনেক জায়গায় "রাবণ পোড়া"-র অনুষ্ঠান হয়। কান ফাটানো বোমের আওয়াজে রাবণ বধ ঘটে। প্রচুর মানুষ এই অনুষ্ঠান প্ৰত্যক্ষ করতে আসেন। এটাও একটা আনন্দের মেলা।


পুজোর পুরোনো সেই দিনগুলো এখন আর নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কত কিছুই হারিয়ে গেছে। তেমনি আবার কত নতুন কিছু সংযোজিতও হয়ে চলেছে। পরিবর্তনশীলতাই তো জীবন ও সংস্কৃতির অঙ্গ। সে কথা আমরা  ভুলে যাই কিভাবে। যাই হোক, এই হল জঙ্গলমহলের দুর্গা পুজোর একটা চেনা ছবি।

 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন