জ্বলদর্চির 'কেন লিখি' তৃতীয় খণ্ড নিয়ে অলোচনা করলেন অনিন্দিতা শাসমল


জ্বলদর্চির 'কেন লিখি' তৃতীয় খণ্ড নিয়ে অলোচনা করলেন অনিন্দিতা শাসমল


এ বছরের (২০২২) জ্বলদর্চি উৎসব সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে  সেপ্টেম্বর মাসে। প্রতিবারের মতো এবারও সম্পাদক ও কবি ঋত্বিক ত্রিপাঠীর ফোন-- আপনার সৌজন্য সংখ্যাটা দেবো। আজকের দিনে যেখানে বেশ কিছু সম্পাদক , লেখক সৌজন্য সংখ্যা বিষয়টা মাথার বাইরে রাখেন ইচ্ছে করে , ফোন করে সৌজন্য সংখ্যা চাইলে বলেন-- পত্রিকার দাম ও কুরিয়ার চার্জ লাগবে ম্যাডাম; সেখানে  জ্বলদর্চিসহ বেশ কিছু ‌পত্রিকার সম্পাদক পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ঠিকানা চেয়ে পত্রিকা পাঠিয়ে দেন। সফল ও সম্পূর্ণ সম্পাদক হিসেবে তাঁদের সকলের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানাই প্রথমেই। জ্বলদর্চির সম্পাদককে নিজেই বলে দিই ,আমাকে কুরিয়ার করতে হবে না , পত্রিকা রেখে দিন।ঐ পথে গেলে সময় করে জ্বলদর্চি দপ্তর থেকে নিয়ে নেবো ঠিক। দপ্তরে যাওয়ায় আর একটি কারণ থাকে অবশ্যই। জ্বলদর্চির প্রকাশনা/সম্পাদনায় এত ভালো ভালো বই প্রকাশিত হয় প্রতি বছর, সেগুলো উল্টে পাল্টে দেখার সুযোগ হয়। এবছর জ্বলদর্চি থেকে প্রকাশিত 'কেন লিখি তৃতীয় খণ্ড '(বিশেষ সংখ্যা ২০২২)  কিনে এনেছিলাম। হাতে পেয়েই আচ্ছন্নের মতো পড়তে থাকলাম ছ'জন অত্যন্ত প্রিয় কালজয়ী লেখকের পুনর্মুদ্রিত লেখা। সম্পাদক নিজের ভূমিকা 'আত্মজিজ্ঞাসা'তেই উল্লেখ করেছেন এই উজ্জ্বল উদ্ধারগুলি ২০০০সালে মিত্র ও ঘোষ থেকে প্রকাশিত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় 'কেন লিখি' থেকে সংগৃহীত।পরম শ্রদ্ধেয়  সাহিত্যিক ও কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, অন্নদাশঙ্কর রায়,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়,সমরেশ বসু ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'কেন লিখি'র ভাবনা পড়তে পড়তে এতটাই আবিষ্ট‌ হয়ে গেলাম যে,শেষ না করা পর্যন্ত উঠতে পারলাম না বই ছেড়ে।প্রত্যেক প্রিয় কবি ও সাহিত্যিক কী সুন্দর সহজ সরল স্বীকারোক্তি  দিয়েছেন! প্রথমেই প্রণম্য সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন--"চাষি চাষ করে যে জন্য,শ্রমিক মাটি কাটে যে জন্য,সেই জন্য আমি লিখি;"। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের 'কেন লিখি' প্রসঙ্গে গভীর অন্তর্দৃষ্টি  ও অনন্য অনুভব পড়ে মুগ্ধতায় মন ভরে গেল। আমাদের প্রাণের কবি অন্নদাশঙ্কর রায় কী অপূর্ব করে লিখেছেন --  "আপনারা দূরে থাকেন বলেই লিখি।কাছে থাকলে লিখতুম না,মুখে মুখে বলতুম।যদি আরো কাছে থাকতেন ,কাছের লোক হতেন ,মুখে মুখে বলতে হত না,হাতে হাত রেখে ব্যক্ত করতুম। চোখে চোখ রেখে।" আহা! বারবার ইচ্ছে করছে তাঁর এই কথাগুলো পড়তে।পরম শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সমরেশ বসু দুজনেই সেই খাঁটি সত্য উচ্চারণ করেছেন তাঁদের লেখায়-- না লিখে উপায় নেই বা না লিখে থাকতে পারেন না বলেই তাঁরা লেখেন। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়‌ লিখেছেন--সারাজীবন ধরে যে কোনো কবি একটি কবিতাই লিখে যান। সেই কবিতাকে টুকরো করে  বিভিন্ন নামে কবিতা বা পদ্য লিখে যেতে হয়। 
এইসব মহীয়ান কবি সাহিত্যিকদের 'কেন লিখি' প্রসঙ্গে মতামত পড়ে কোনো পাঠ প্রতিক্রিয়া দেবার দুঃসাহস আমার নেই। শুধু বলবো, পড়তে পড়তে কোথায় যে ভেসে যাচ্ছিলাম , সেই আবেগের কণামাত্র প্রকাশ করলাম শুধু। 

      এরপর আরও তিপান্ন জন বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক ও শিল্পীর 'কেন লিখি' বিষয়ে  সুচিন্তিত মতামত পড়ে মন ভরে গেল। তাঁদের কেউ বিশিষ্ট নাট্যকার (চন্দন সেন), চিত্রশিল্পী ( শুভাপ্রসন্ন) প্রাবন্ধিক (সুমিতা চক্রবর্তী,ত্রিপুরা বসু),কেউ বা একাধারে অর্থনীতিবিদ ও গোয়েন্দা উপন্যাসের লেখক(অভিরূপ সরকার)।এছাড়া বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক দীপ মুখোপাধ্যায়, শুভ দাশগুপ্ত,অচিন্ত্য বিশ্বাস,বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য,বোলান গঙ্গোপাধ্যায়,ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়,পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়,স্মরণজিৎ চক্রবর্তী,হিন্দোল ভট্টাচার্য, তমাল বন্দোপাধ্যায় এবং আরও অনেকের লেখায় সমৃদ্ধ হলাম। তাঁদের অনেকেই জীবনের নানান চড়াই -উৎরাই পেরিয়ে আজকের কবি সাহিত্যিক হয়ে ওঠার অসম্ভব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন, অনেকে তাঁদের প্রথম লেখা কবিতা অথবা চিৎকার করে  বলা নাটকের প্রথম সংলাপ নির্দ্বিধায় ও  নিঃসংকোচে তুলে ধরেছেন তাঁদের লেখার মধ্যে ; যা পড়ে অদ্ভুত এক ভালোলাগায় মন ভরে গেল। 'কেন লিখি' ছাড়া আরও অনেক শিরোনামে ব্যক্ত করেছেন তাঁদের 'কেন লিখি'র অভিমত। যেমন --সাহিত্যিক সমরেশ বসুর লেখার শিরোনাম --কেন লিখি,না কেন লেখো?, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের --স্বগত সংলাপ,ঝাড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের--রেখাময় আলোছায়ায় লিখি.. ,প্রভাত মিশ্রের লেখার শিরোনাম --কবিতা লেখার শুনানি,আবুল বাশারের--কেন এই লিখিলেখা,সুরভি বন্দোপাধ্যায়ের --আমার লেখালেখি,বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের --কেন লিখি,আদৌ লিখি কি ?, সুধীর দত্তের --কবিতা,চারপাশ ও আত্মখনন, অচিন্ত্য বিশ্বাসের --বোবা কুচকাওয়াজ, অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের --সংশয়ের বিচিত্র আকর্ষণ, চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের --সুখ দুঃখের কথা,ইন্দ্রনীল সান্যালের--হাউই,সুমন গুণের --ব্যক্তিগত অপহরণের পাঠক্রম, তৃষ্ণা বসাকের --যে কোথাও ফেরে না,হিন্দোল ভট্টাচার্যের --প্রশ্নই উত্তর ,সুবর্ণ বসুর--আত্মমোক্ষণের একমাত্র রাস্তা... ইত্যাদি অপূর্ব সব শিরোনামে লেখা আছে 'কেন লিখি'র উত্তর এই বইয়ের পাতায় পাতায়।

       এবার আসি সম্পাদনা ও প্রচ্ছদের প্রসঙ্গে। সম্পাদকের কলমে লেখা আছে 'আত্মজিজ্ঞাসা'। যেহেতু  ঋত্বিক ত্রিপাঠী সম্পাদকের পাশাপাশি নিজে একজন গভীর ও প্রতিষ্ঠিত কবি, স্বভাবতই 'কেন লিখি ' তাঁর নিজের অন্তরের কবিসত্তার কাছে সর্বপ্রথম জিজ্ঞাসা। তাই এখানে 'আত্মজিজ্ঞাসা ' শব্দটি অত্যন্ত সুপ্রযুক্ত এবং কবি ও সম্পাদকের অনুসন্ধিৎসু হৃদয়ের প্রকাশ। ছ'জন বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকের অত্যন্ত মূল্যবান লেখার পুণমুদ্রণের পাশাপাশি তিপান্ন জন বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক শিল্পীর সুচিন্তিত মতামত সংগ্রহ করে, ২৬৮ পৃষ্ঠার বিশেষ সংখ্যা ২০২২("কেন লিখি"র তৃতীয় খণ্ড) এর নির্ভুল এবং উন্নত মানের পৃষ্ঠা ও ছাপাসহ প্রকাশ খুব একটা সহজ কথা নয়।আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো যে, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটি লেখা সাজানো হয়েছে লেখকদের বয়সের ক্রম অনুযায়ী, অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে প্রবীন থেকে নবীন লেখকের নামের পাশে তাঁদের জন্মসাল (১৮৯৮ থেকে ১৯৮৪) উল্লেখসহ। একজনের ক্ষেত্রেও এই ক্রমের বিচ্যুতি ঘটেনি। দীর্ঘ তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জ্বলদর্চির একনিষ্ঠ সম্পাদকের পক্ষেই সম্ভব এমন সুন্দর একটি সংখ্যা প্রকাশ। জ্বলদর্চির নিয়মিত পাঠক হিসেবে তাঁকে আমার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই। শ্রদ্ধা জানাই প্রচ্ছদশিল্পী শ্যামল জানাকে,যিনি এই সংখ্যার সব লেখকের স্বাক্ষর একত্রিত করে, সুদক্ষ শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গিতেই সেই স্বাক্ষরগুলো সাজিয়ে ,এই বইয়ের প্রচ্ছদ নির্মাণ করেছেন। বইটি হাতে পেয়েই বিশিষ্ট কবি লেখকের স্বাক্ষর সমন্বিত এমন স্নিগ্ধ প্রচ্ছদ দেখেই মন জুড়িয়ে যাবে। তারপর পাতা উল্টে পড়তে শুরু করলেই , উৎসাহী সব পাঠকের এবং সৃষ্টিশীল প্রত্যেকের আমার মতো অবস্থা হবে , অর্থাৎ  যতক্ষন না শেষ হচ্ছে  ততক্ষণ উঠতেই ইচ্ছে করবে না এই বই ছেড়ে -- একথা বলতেই পারি। 

         এত গুণীজনের লেখায় সমৃদ্ধ এই বই পড়ে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে যে অনুভব হল, তার যতটুকু পারলাম প্রকাশ করলাম। যা ব্যক্ত করতে পারলাম না , তার জন্য আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন কবি সাহিত্যিক শিল্পী ও সম্পাদকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে থাকলাম এবং 'কেন লিখি'র চতুর্থ খণ্ডের প্রত্যাশা নিয়ে শেষ করলাম 'কেন লিখি'র তৃতীয় খণ্ডের এই পাঠ প্রতিক্রিয়া। সবাইকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন