মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র

প্রসূন কাঞ্জিলাল

১) বর্বরিক  ------

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের কথা। দ্বাপর যুগ শেষ হতে আর দেরি নেই বেশি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আয়োজন চলছে জোরকদমে। সারা দেশের সব রাজারা হয় পাণ্ডব অথবা কৌরবদের পক্ষে নাম লিখিয়ে ফেলেছে। সবাই মহাব্যস্ত, তবে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ধর্মের জয় সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে সারাক্ষণ আকাশ-পাতাল চিন্তা মাথায় ঘুরছে তাঁর। যুযুধান দুই পক্ষের সব মহারথীদের সাথে আলাদা আলাদা করে কথা বলেছেন তিনি। ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কর্ণ, অর্জুন – একটাই প্রশ্ন করেছেন সকলকে… একলা লড়াই করে কে কতদিনে এই যুদ্ধ শেষ করতে পারবে বলে মনে হয়? আর কিছু না… আন্দাজ করার চেষ্টা করছেন প্রত্যেকের আত্মবিশ্বাস, এবং বিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে ধারণা। কেউ বললেন কুড়ি দিন, কেউ বা পঁচিশ অথবা আঠাশ। খুব একটা ফারাক নেই এই সব মহাযোদ্ধাদের এস্টিমেটে। এখন একজনকেই জিজ্ঞেস করা বাকি রয়ে গেছে শুধু। ঘটোৎকচের ছেলে, দ্বিতীয় পান্ডবের পৌত্র – নাম তার বর্বরিক। এই যুদ্ধে যোগ দেওয়ার কোনোরকম ইচ্ছাই সে প্রকাশ করেনি এখনো পর্যন্ত।

তবু তার কথা মাথায় আসার কারণ? শুনেছেন যে এই বয়সেই সে মহাবীর … কর্ণার্জুনের থেকে কম নয় কোনো অংশে। তাছাড়া তার কাছে আছে একটি বিশেষ ধনুক, আর মহাশক্তিশালী তিনটি বাণ – স্বয়ং শিবঠাকুরের সুপারিশে অগ্নিদেবের দেওয়া। ‘তিন বাণধারী’ নামেই সুপরিচিত সে। বাচ্চা ছেলেটার ক্ষমতা একটু যাচাই করে নেওয়া দরকার – ভাবলেন শ্রীকৃষ্ণ ।

বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে দেখা করলেন বর্বরিকের সাথে। একথা সেকথার পর কায়দা করে প্রশ্নটা করলেন তাঁকে।

‘এক মুহূর্তেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ করতে পারি আমি’ – উত্তর শুনে স্তম্ভিত শ্রীকৃষ্ণ। কী করে তা সম্ভব, জানতে চান তিনি। তার সেই বিশেষ ধনুর্বাণ দেখিয়ে বর্বরিক বোঝায় সেগুলোর ক্ষমতার কথা। প্রথম তীরটি নিক্ষেপ করলে তা গিয়ে যাদের নিধন করতে চাই তাদের চিহ্নিত করে ফিরে আসবে। দ্বিতীয়টি এর ঠিক উল্টো – যাদের মারতে চাই না তাদের চিহ্নিত করবে সেটা। আর তৃতীয়টাই আসল কাজ করবে – প্রথমটির দ্বারা মার্কা মারা সবাইকে, অথবা দ্বিতীয়টির দ্বারা মার্কা দেওয়াদের বাদ দিয়ে বাকি সব্বাইকে মেরে আবার তূণীরে ফিরে আসবে। বিশুদ্ধ সেট থিওরির হিসেব! সুতরাং শুধুমাত্র দুবার তীরনিক্ষেপ করলেই শত্রুপক্ষ নিঃশেষ হবে এক নিমেষে! কেবল কথায় ভোলার লোক নন শ্রীকৃষ্ণ। উদ্ভিন্নযৌবন বালকের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়তো পুরোটাই ?

২) বিকর্ণ ----

 মহাভারতের একটি ছোট কিন্তু নজরকাড়া চরিত্র ইনি। ব্যাসদেবের আশীর্বাদে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর যে শতপুত্র জন্মগ্রহণ করে তাদের মধ্যে সবথেকে ধার্মিক ছিলেন বিকর্ণ। দুর্যোধনের ভাই হলেও তিনি তাঁর বাকি ভাইদের মত বদমেজাজি ও অহংকারী ছিলেন না। পান্ডবদের পাশাখেলায় পরাজয়হেতু সভামধ্যে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের একমাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন তিনিই। এর প্রতিবাদে এমনকি তিনি সেই সভাস্থল ত্যাগও করেন।

পরবর্তীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও তিনি কৌরব পক্ষের হয়ে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেন। ভীম কৌরবদের একশ ভাইকে বধ করবার পণ নিয়ে যখন কুরুক্ষেত্রকে প্রায় শ্মশানে পরিণত করেছেন তখন বিকর্ণ তার সম্নুখে দাঁড়িয়ে দ্বন্দের আহ্বান জানান, ভীম কিছুকাল ভাবেন , তার সভার কথা মনে হতে তিনি বিকর্ণকে বলেন তুমি একমাত্র কৌরব যে জানে ধর্ম কি? তুমি সরে দাঁড়াও আমি তোমাকে বধ করতে চাই না। তুমি একমাত্র যে সেই সভায় দুর্যোধনের প্রতিবাদ করেছিলে।কিন্তু বিকর্ণ বলেন আজ আমার সরে যাওয়াটাও অধর্ম হবে, আমি জানি কৌরবদের এই যুদ্ধে জয়লাভ কোনোদিনিই হবে না যেহেতু বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ পান্ডব পক্ষে আছে, কিন্তু আমি আমার বাকি ভাই দের এবং জ্যেষ্ঠ ভাই দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করতে পারব না। আমি ধার্মিক কিন্তু বিভীষণ নই। আমাকে যুদ্ধ করতেই হবে। তিনি বীর বিক্রমে বলেছিলেন  " সেই সভাস্হলে আমার যা কর্তব্য ছিল করেছি কিন্তু এখন আমার কর্তব্য আমার ভাইদের রক্ষা করা তাই এসো আমার সাথে দ্বন্দ্ব কর বৃকদর ভীম"। যুদ্ধে ভীমের হাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

৩) ইরাবন --------

আরাবন অথবা ইরাবন। ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র। তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের পুত্র ছিলেন রূপান্তরকামী আরাবন। অর্জুন এবং নাগকন্যা উলুপির সন্তান ছিলেন তিনি। বাবার মতোই তিনি ছিলেন শস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী। পাণ্ডবদের হয় কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে যোগ দেন আরাবন।

মহাভারতের ৯-এর শতকের তামিল অনুবাদে পাওয়া যায় কালাপ্পালি নামে এক প্রথার উল্লেখ। এই প্রথা অনুসারে যুদ্ধে যদি কোনও বীরপুরুষ দেবী কালীর সামনে নিজেকে বলি দেন, তো যুদ্ধে সেই পক্ষের জয় অবশ্যম্ভাবী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয় সুনিশ্চিত করতে নিজেকে উত্‍সর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন আরাবন। রূপান্তরকামী আরাবন শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে ৩টি বর লাভ করেন। একটি হল যুদ্ধে বীরের মৃত্যু বরণ করা, দ্বিতীয়টি হল ১৮ দিনের যুদ্ধ পুরোটা দেখার সৌভাগ্য লাভ করা এবং তৃতীয়টি হল মৃত্যুর পর তাঁকে যেন দাহ করা হয়।
আসলে সেই সময়ের রীতি অনুযায়ী অবিবাহিতদের মৃত্যুর পর দাহ না করে কবর দেওয়া হত। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় পর্যন্ত আরাবন ছিলেন অবিবাহিত। যুদ্ধে তিনি নিজেকে দেবী কালীর কাছে উত্‍সর্গ করবেন, এটা জানার পর কোনও নারী তাঁকে বিয়ে করতে চাইছিলেন না। তাই শ্রীকৃষ্ণ নারী শরীর ধারণ করে মোহিনী নাম নিয়ে আরাবনকে বিয়ে করেন এবং মৃত্যুর আগে তাঁরা এক রাত একসঙ্গে কাটান। আরাবনের মৃত্যুর পর নারীরূপী শ্রীকৃষ্ণ বৈধব্য বেশ ধারণ করে শোক পালন করেন। পরের দিন তিনি আবার নিজের আসল চেহারায় ফিরে আসেন।

তামিলনাড়ুতে আরাবন ও মোহিনীর পুজো হয়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যতদিন চলেছিল, সেই ১৮ দিন ধরে চলে উত্‍সব। তামিস মাস সিট্টিরাই-তে এই উত্‍সব হয়। স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী, রূপান্তরকামীরা এই উত্‍সবের মধ্যে দিয়ে আরাবনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং আরাবনের উত্‍সর্গের পরে রূপন্তরকামীরা বৈধব্যবেশ ধারণ করে শোক পালন করেন।


৪) গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণ ----

 বারণাবত নগরে জতুগৃহ দাহ পর্বের পরে, রক্ষা পেয়ে পঞ্চপাণ্ডবরা গঙ্গা নদীর তীরে এসে পৌঁছান  ও সোজা দক্ষিণ দিকে চলতে লাগলেন।শুরু হোলো তাদের অঞ্জাতবাস।এই অঞ্জাতবাসের  কালে হিড়িম্ব বধ,  ভীমের হিড়িম্বাকে বিবাহ, বকরাক্ষস বধ ইত্যাদির পর তারা এক চারণ ব্রাম্ভণের কাছ থেকে শুনলেন পাঞ্চালরাজ ধ্রুপদ এর পুত্রার্থে যজ্ঞ ও সেই যজ্ঞাগ্নি খেকে যাঞ্জসেন ( ধৃষ্টদ্যুম্ন ) ও যাঞ্জসেনীর ( দ্রৌপদী ) আবির্ভাব বৃত্তান্ত । তখন মাতৃ আজ্ঞায় তারা পাঞ্চাল দেশের দিকে রওনা হলেন। এই পথে এক রাতে তাদের সাথে দেখা হয় গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণের যাঁর অপর নাম ছিল চিত্ররথ। সোমাশ্রয়ণ তীর্থে গঙ্গাতীরে অঙ্গারপর্ণ যখন তাঁর ভার্যা কুম্ভীনসী ও অন্যান্য স্ত্রীদের নিয়ে জলক্রীড়া করতে এসেছিলেন, তখন পাণ্ডবদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। পাণ্ডবরা বারণাবতে জতুগৃহদাহের পর নানান জায়গা ঘুরে তখন পাঞ্চাল দেশের দিকে যাচ্ছিলেন। অঙ্গারপর্ণ পাণ্ডবদের স্থানত্যাগ করতে বললে, অর্জুন সন্মত হন না। তখন অর্জুনের সঙ্গে অঙ্গারপর্ণের যুদ্ধ হয়। অর্জুন দ্রোণ প্রদত্ত এক আগ্নেয় অস্ত্র নিক্ষেপ করতে অঙ্গারপর্ণের রথ দগ্ধ হয় এবং অঙ্গারপর্ণ হতচেতন হয়ে পড়ে যান। পরাজিত অঙ্গারপর্ণ পরে চেতনা ফিরে পেয়ে অর্জুনকে তাঁর চাক্ষুষী বিদ্যা (ত্রিলোকের যা কিছু এই বিদ্যাবলে দেখতে পাওয়া যায়) দান করেন। অঙ্গারপর্ণের পরামর্শে পাণ্ডবরা দেবল ঋষির কনিষ্ঠ ভ্রাতা ধৌম্যকে কুল-পুরোহিত হিসেবে নিযুক্ত করেন।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন