শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা--৫২/প্রীতম সেনগুপ্ত

পর্ব ৫২

শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা

প্রীতম সেনগুপ্ত

 শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে হরিপ্রসন্ন দ্বিতীয়বার দর্শন করেছিলেন বেলঘড়িয়ায় দেওয়ান গোবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের গৃহে, সমাধিস্থ অবস্থায়। পরবর্তী সময়ে এই দর্শনের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা এইরকম -- “এক যুবক ( নরেন্দ্রনাথ ) ভক্তিগীতি পরিবেশন করছিলেন --‘জয়, জয় দয়াময়, জয় দয়াময়।’ সকলের মধ্যস্থলে সমাধিস্থ অবস্থায় দাঁড়িয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, অপর এক যুবা ( বাবুরাম ) তাঁকে ধরে দাঁড়িয়েছিলেন যাতে তিনি না পড়ে যান। পরিপার্শ্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিস্মৃত ঠাকুরের পরনে ছিল সাদা পোশাক। সমগ্র মুখমণ্ডলে বিরাজ করছিল স্বর্গীয় স্মিত হাস্য। দেখা যাচ্ছিল তাঁর দন্তরাজি, আনন্দে সমগ্র মুখমণ্ডল যেন ফেটে পড়ছে, মনে হচ্ছিল ফাটা তরমুজ ফল। তাঁর নয়নদ্বয় দেখে মনে হচ্ছিল কোন এক আনন্দসাগরে মগ্ন! অপর একটি ঘটনা আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থেকেছে চিরকালের জন্য। সেটি হল -- ঠাকুরের মেরুদণ্ড একেবারে নিম্নাংশ থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত স্থূল দড়ির আকার নিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে এক মহাশক্তির ঊর্ধ্বগমন লক্ষ্য করেছিলাম, দেখে মনে হচ্ছিল ফণা বিস্তৃত করে এক সর্প যেন মহানন্দে নৃত্য করতে করতে ঊর্ধ্বগামী।”
 ১৮৮৩ সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হলেন হরিপ্রসন্ন। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন শরৎ চক্রবর্তী ( পরবর্তীকালে স্বামী সারদানন্দ ) এবং রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ( পরবর্তীকালে প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক ) প্রমুখ। ১৮৮৩ সালের ২৬ নভেম্বর তিনি এবং শরৎ অপর এক সহপাঠী বরদা পালের সঙ্গে নৌকাযোগে দক্ষিণেশ্বরের দিকে রওনা দেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দর্শনের আশায়। বিকেলের দিকে সেখানে পৌঁছে তাঁরা দেখেন ঠাকুর তখন কলকাতায় মণি মল্লিকের গৃহে গমনের জন্য প্রস্তুত, রওনা হওয়ার অপেক্ষায়। ঠাকুর তাঁদের মণি মল্লিকের গৃহে আসবার আমন্ত্রণ জানালেন। তিন সহপাঠী পুনরায় নৌকাযোগে কলকাতায় ফিরলেন। হরিপ্রসন্ন মণি মল্লিকের গৃহে এসে উৎসবে যোগদান করেন। এরপর একটু রাতের দিকে নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। সেই বিষয়ে তাঁর দেওয়া বর্ণনাটি এইরকম --“আমার মা আমায় বকাবকি ‌শুরু করে দিলেন। বললেন -- ‘হায় ভগবান! তুই ওই পাগল বামুনটার কাছে গিয়েছিলি? লোকটা সাড়ে তিনশো ছেলের মাথা বিগড়ে দিয়েছে!’ সত্যিই মাথা বিগড়োনোই বটে! এমনকী এখনও আমার মাথা গরম হয়ে আছে। মায়ের বকাবকি আমলই দিলাম না।”
 কলেজের দিনগুলিতে দক্ষিণেশ্বরে মন্দির উদ্যানে বেশ কয়েকবার শ্রীরামকৃষ্ণ সন্নিধানে আসেন হরিপ্রসন্ন। এই বিষয়ে কতিপয় ভক্তের কাছে অপূর্ব স্মৃতিচারণ করেছেন পরবর্তীকালে। ১৮৮৪ সালের ১৮ অগাস্ট শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনে হরিপ্রসন্ন ঠাকুরকে দর্শন করতে দক্ষিণেশ্বরে যান। সেদিন সেখানে রাত্রিবাস করবেন বলে স্থির করেন। সেইদিনের অভিজ্ঞতা বিষয়ে বলছেন --“মাঝে মাঝে ঠাকুর আমায় মা ভবতারিণীর লুচি-মিষ্টান্নাদি প্রসাদ খেতে দিতেন। আমার জন্য বিছানা করে মশারি টাঙিয়ে দিলেন। শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়লাম। মধ্যরাত্রিতে ঘুম ভেঙে গেল, দেখলাম ঠাকুর আমার বিছানার চারপাশে ‘মা’, ‘মা’ বলে ঘুরছেন। আমি বুঝে উঠতে পারলাম না ঠিক কী হচ্ছে। সেই রাত্রে শ্রীরামকৃষ্ণ আমায় কৃপা করেছিলেন।”
 ঠাকুরের সন্তানেরা তাঁদের গুরুর প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বোধ করতেন। ঠাকুরের অনুপম জীবন দেখে ও তাঁর কথামৃত শ্রবণ করে যে শিক্ষালাভ করতেন তাঁরা, তা পুস্তক থেকে আহৃত জ্ঞানের তুলনায় নিশ্চিতভাবেই অধিক ছিল। ঠাকুরের সঙ্গে আরেক নিশিযাপনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন হরিপ্রসন্ন এইরকম --“ এক সন্ধ্যায় ঠাকুরের কাছে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে সেদিন সেখানে রাত্রিবাসের ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। ঠাকুরও খুশি হয়ে সম্মতি দিলেন। দক্ষিণেশ্বরে তেমন যথোপযুক্ত খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত ছিল না। প্রতি রাতে তাঁকে জগজ্জননীর প্রসাদ পাঠিয়ে দেওয়া হত। সেসবের অতি সামান্যই তিনি গ্রহণ করতেন। বাকিটা তাঁর সঙ্গে যাঁরা রাত্রিবাস করতেন তাঁদের দিতেন। ঠাকুরের রাতের খাওয়া ছিল অতি অল্প -- পাখির আহারের মতো। কয়েকটি লুচি, সামান্য মিষ্টান্নাদি ইত্যাদি। অতি সামান্য পরিমাণ প্রসাদ দেখে আমি বেশ হতাশই হলাম। বুঝলাম রাত্রে উপবাসই করতে হবে। সেইসময় আমি সুগঠিত দেহের যুবা, প্রচুর খেতাম। ওই সামান্য পরিমাণ প্রসাদ আমার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। আমার মনের অবস্থা বুঝে ঠাকুর কাউকে নহবত থেকে কিছু রুটি ও তরকারি নিয়ে আসতে বললেন। সেই খাবারও আমার কাছে যথেষ্ট ছিল না, তবু খেয়ে নিলাম। তারপর ঠাকুরের ঘরের মেঝেতে শুয়ে পড়লাম।
 মধ্যরাত্রে হঠাৎই আমার ঘুম ভেঙে গেল, দেখলাম ঠাকুর ঘরের মধ্যে দ্রুত পায়চারি করছেন। আবার কখনও কখনও বারান্দায় চলে যাচ্ছেন। কী যেন বিড়বিড় করে বলছেন অথবা হাততালি সহযোগে বিভিন্ন দেবদেবীর নাম করছেন। দিনের বেলায় ভক্তদের সঙ্গে নানা কথা বলেন, রঙ্গরসিকতা করেন কিন্তু এখন এই নিশাকালে তিনি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আমার ভয়ে মরে যাওয়ার মতো অবস্থা। বিছানায় শুয়ে থেকে চুপচাপ ঠাকুরের উন্মত্ত ক্রিয়াকলাপ লক্ষ্য করতে থাকলাম। তিনি কখনও নৃত্য বা সঙ্গীতে মেতে উঠছেন। কখনওবা কারোর সঙ্গে বাক্যালাপ করছেন। অবশেষে নিশাকালের অবসানে স্বস্তি পেলাম। দিনের বেলায় ঠাকুর আবার স্বাভাবিক!

 বাড়ি ফেরার পর আমার ভগিনী জিজ্ঞাসা করল, ‘গত রাতে কোথায় ছিলি?’ ‘দক্ষিণেশ্বরে মন্দির উদ্যানে‘, উত্তর দিলাম। সে বিস্মিত হয়ে বলল, ‘তুই কি দক্ষিণেশ্বরের সেই পাগল বামুনের সঙ্গে রাত কাটিয়েছিস? ওই লোকটার কাছে আর যাস না। লোকটা সত্যিই পাগল। আমি সেখানে কখনও কখনও গঙ্গায় নাইতে যাই। তাঁকে দেখেছি। ওঁর পাগলামি সম্পর্কে আমি জানি।’ আমি ওর কথা শুনলাম ও হাসলাম।” ( God Lived With Them -- Swami Chetanananda, Advaita Ashrama, Kolkata )
 শ্রীরামকৃষ্ণ সন্নিধান বিষয়ে বিজ্ঞানানন্দজীর স্মৃতিচারণ ভক্তমনকে উদ্বেল করে তোলে। তেমনই এক স্মৃতিচারণায় তিনি বলছেন --“একদিন ঠাকুরের পা টিপে দিচ্ছিলুম। এমন সময় কোন্নগর থেকে এক ভদ্রলোক এলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি চলে যাওয়ার পরে আমায় বললেন,‘দেখ, আমি মানুষের মনের ভিতরটা সব দেখতে পাই, যেমন কাচের কেসের ভিতরের জিনিস বাইরে থেকে দেখা যায়। আমি মনে মনে ভাবলাম -- ‘তাহলে তো আমার মনের ভিতরের সবই উনি দেখতে পান! কী সাঙ্ঘাতিক লোক!’ কিন্তু ঠাকুর সকলের ভালো দিকটা নিয়েই বলতেন, খারাপগুলোকে নিয়ে নয়।”
 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন