দূর দেশের লোকগল্প— প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ (অস্ট্রেলিয়া)ক্যাঙারুর বাচ্চারা হারিয়ে যায় না /চিন্ময় দাশ


দূর দেশের লোকগল্প— প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ (অস্ট্রেলিয়া)

ক্যাঙারুর বাচ্চারা হারিয়ে যায় না

চিন্ময় দাশ


[ ক্যাঙারু— প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টি এক জীব। পেছনের ইয়াব্বড় দুটো পায়ের চেয়ে, সামনের পা দুটো এই একটুকুন মাত্র তার। সেই বেঢপ দু’জোড়া পা নিয়ে, লাফিয়ে লাফিয়ে তার চলা। 

তো, এই চলাফেরার সময় ছোট বাচ্চাকে কোথায় রেখে যাবে বেচারা? দেখা যায়, তার নিজের পেটের সাথেই আছে একটা থলে। থলেটার মুখখানা বেশ বড়সড়, আর খোলা। সেই থলের মধ্যে বাচ্চাকে ভরে নিয়ে চলাফেরা করে ক্যাঙারু। অন্য সব জীবেরা তখন হাঁ করে চেয়ে চেয়ে দ্যাখে ক্যাঙারুকে। 

এমন অদ্ভূত একটা কাণ্ড হোল কী করে? কে দিল ক্যাঙারুকে এই দরকারী জিনিষটা? যদি বা দিল, আর কাউকে না দিয়ে, বেছে বেছে কেবল ক্যাঙারুকেই দিতে গেল কেন?

এমন হাজারো প্রশ্ন আর কৌতুহল আছে মানুষজনের মনে। 

প্রশান্ত মহাসাগর এলাকাতেই দেখা যায় এই জীবটিকে। সেই এলাকার দেশে দেশে নানান কাহিনী প্রচলিত আছে ক্যাঙারুর থলে পাওয়া নিয়ে। হাজার হাজার বছর ধরে, মানুষের মুখে মুখে চলে আসছে গল্পগুলো।

আমরা এই গল্পটি নিয়েছি অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশ থেকে।

গোড়ার কথা অনেক হোল। এবার গল্পটা শোনা যাক বরং। ]


সে কোন এক সুদূর অতীত কালের কথা। একটা ক্যাঙারু তার বচ্চাকে নিয়ে বসে আছে নদীর পাড়ে। ছোট্ট নদী। কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে। মা-ছেলে দুজনেরই ভারি ভালো লাগছে জলের গান শুনতে। 

প্রায় দিনই এখানে আসে তারা মায়ে-পোয়ে। আজও এসেছে। মা বসে বসে লোম আঁচড়ে দিচ্ছে বাচ্চাটার। আদর খেতে খেতে, ঢুলুনি এসেছে বাচ্চাটার।

হঠাতই একটা খরগোশ এসে হাজির। যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হোল তার! না কি, আকাশ থেকে এসে পড়ল ঝুপ করে! ধীরে সুস্থে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। 

ক্যাঙারু ফিসফিস করে তার বাচ্চাটাকে বলল—দ্যাখরে, বাছা। কী বুড়োসুড়ো একটা খরগোশ। অনেক নাতিপুতিও হয়ে গেছে নিশ্চয়ই ওর।

খরগোশটা আরও কাছাকাছি হতে, তার গলা শুনতে পেল ক্যাঙারু—অকম্মা আর আপদ, আপদ আর অকম্মা। 

বলছেটা কী ও? মানেই বা কী এসব কথার? ক্যাঙারু বলল—কী হয়েছে গো তোমার? কী বলছো অমন করে? 

খরগোশ একটু চমকে গিয়ে বলল—কে? কে কথা বললে?

--আমি গো, একটা ক্যাঙারু আর আমার বাচ্চা। 

খরগোশ বলল—আসলে আমি তো অন্ধ হয়ে গেছি। কিছু দেখতে পাই না চোখে। আর তাতেই সকলের চক্ষুশূল আমি। কেউ কাছে রাখতেও চায় না। কেউই । তাড়িয়ে দিয়েছে দূর দূর করে। খাওয়া জোটে না। মাথাটুকু গুঁজবার ঠাঁইও নাই একটুকু। 

ক্যাঙারু চিরকাল ভারি দয়ালু। অন্যের কষ্ট দেখলে, মন কেঁদে ওঠে তার। সে বলল—নাগো, না। এভাবে বোল না। দুনিয়ার সবাই খারাপ নয়। এসো, আমি তোমার বন্ধু হবো। কোথায় নরম সবুজ ঘাস পাওয়া যায়, দেখিয়ে দেব তোমাকে। মিষ্টি জলের নদীর কাছে নিয়ে যাব। চিন্তা কোর না। চলো, নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে।

বাচ্চাটাকে নিয়ে উঠে পড়ল ক্যাঙারু। খরগোশকে বলল—নাওগো, আমার লেজটা ধরে থাকো। পেছন পেছন চলতে থাকো। তাহলে আর পথ হারাবে না।

এমন মিষ্টি কথা কতদিন শোনেনি খরগোশ। ভারি ভালো লাগল তার। তার খুশি দেখে, ক্যাঙারুও খুশি। 

সামনে চলেছে ক্যাঙারু। তার ঠিক পিছনটাতে বুড়ো খরগোশ। বাচ্চাটা চলেছে সবার পিছনে। খানিক দূর গিয়েছে, পিছন ফিরে ক্যাঙারু দ্যাখে, বাচ্চাটা নাই তো! কোথায় উধাও হয়ে গেল? ঠিক কোথায় সরে পড়েছে দুষ্টুটা। খরগোশকে দাঁড় করিয়ে, পিছনে দৌড় লাগালো ক্যাঙারু।

এক বার নয়। দু’বার নয়। হতেই থাকল এমনটা। কিছু দূর যায়, আর বাচ্চাটা সরে পড়ে পিছিন থেকে। খুব ভয় করতে লাগল ক্যাঙারুর।

একবার বাচ্চাকে খুঁজতে গিয়েছে। দ্যাখে, একটা রাবার গাছের নীচে শুয়ে আছে সে। দিব্বি ঘুমিয়ে পড়েছে। মায়ের মন। বুঝতে বাকি রইল না, অতটা পথ চলে, কাহিল হয়ে গেছে বেচারা। ঠিক আছে, থাক, ঘুমোক। 

খরগোশের কাছে ফিরে চলল ক্যাঙারু। কাছাকাছি না হতেই, ঝোপের আড়ালে একটা ছায়া-শরীর দেখতে পেয়ে গেল। আদিবাসী শিকারী একজন। হাতে বুমেরাঙ। খরগোশটার দিকে তাক করছে। বুকটা ছাঁত করে উঠল তার। এখুনিই চালিয়ে দেবে অস্ত্রটা। বাতাসে শিস কেটে উড়ে আসবে ধারালো জিনিষটা। চোখের পলকটিও পড়বে না। কাটা পড়বে বেচারা! 

ভয়ে বুক ঢিপঢিপ। দম আটকে আসছে বুকের ভিতর। ভাবল, আর দেরী নয়। শিকারীর চোখে পড়ে গেল, আর রেহাই নাই। প্রাণ বাঁচাতে হলে, পালাই এখান থেকে। অমনি মনে হোল-- না, না। তা হয় না। হোক না বুড়ো, এই অন্ধ খরগোশটা তো তার বাচ্চাটার মতই। তাকে ফেলে নিজে পালিয়ে যাওয়া? মোটেই ঠিক কাজ নয়। ওকেও বাঁচাতে হবে। 

সামনেই একটা ঝোপ। তার ডাল ঝাঁকাতে লাগল ক্যাঙারু। মাটি আঁচড়াতে লাগল পা দিয়ে। ঝড়-ঝড়, খর-খর আওয়াজ শুনে, চোখ ঘুরিয়ে শব্দটার দিকে তাকালো শিকারী। অমনি ক্যাঙারু চেঁচিয়ে উঠল—পালাও। সামনে শিকারী। 

চমকে গিয়ে ছিটকে উঠল খরগোশ। চোখে কিছুই দেখা যায় না তার। যেদিকে পারল, দৌড় লাগিয়ে দিল সে। 

শিকারীর আর মন নাই সে দিকে। আস্ত একটা ক্যাঙারু সামনে পেয়ে গেলে, হাড় জিরজিরে একটা খরগোশের দিকে কে আর চেয়ে দেখে। ক্যাঙারুটাই এখন তার শিকার।

খরগোশের দৌড় শুরু হতেই, লাফ দিতে শুরু করল ক্যাঙারু। সে কী লাফ! প্রাণ বাঁচাতে হবে। সরে পড়তে হবে শিকারীর দৃষ্টি থেকে। ঝোপঝাড়ের আড়াল রেখে রেখে ছুটে পালাচ্ছে ক্যাঙারু। রাবার গাছটার উদ্দেশ্যে চলেছে সে। বাচ্চাটা ঘুমোচ্ছে যে সেখানে। 

কিন্তু বাচ্চার কাছে পৌঁছানো হোল না তার। ভয়ানক হাঁপিয়ে উঠেছে। বুক ধড়ফড়, ফেটে যাবে মনে হচ্ছে ছাতিটা। পা চলছে না আর। একেবারে কাহিল অবস্থা। 

কপাল ভালো বেচারার। পাথরের গায়ে একটা খোঁদল দেখতে পেয়ে গেল সামনে। ধড়ে প্রাণ পেল যেন। টুক করে গর্তটার ভিতর সেঁধিয়ে গেল ক্যাঙারু। 

শিকারী কিন্তু ঠিক তার পিছন পিছন চলে এসেছে। হতচ্ছাড়াটা যে গর্তে এসে ঢুকে পড়ল, তার চোখ এড়ায়নি। গর্তটার মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল শিকারী। 

কিন্তু ঐ পর্যন্তই। দাঁড়িয়ে থাকাই সার। কিছুই করবার নাই। ভিতর থেকে চোখ পিটপিট করে দেখছে ক্যাঙারু। তারও বুক ঢিপঢিপ করছে ভিতরে বসে। এবার কী হবে , কে জানে! এখানেই বসে থাকতে হবে তাকে। সরে পড়বার কোন উপায় নাই আর। 

সময় যেন কাটতেই চায় না। কতক্ষণ পরে দেখল, হতাশ হয়ে ফিরে চলে যাচ্ছে শিকারী। যখন বেশ নিরাপদ দূরত্বে চলে গিয়েছে, বাইরে বেরিয়ে এল ক্যাঙারু। এবার কী করবে? বাচ্চাটা ঘুমিয়ে রয়েছে গাছের তলায়। তাকে নিতে হবে। এদিকে অন্ধ খরগোশটা যে কোন দিকে গেল! তাকেও তো খুঁজে বের করতে হবে। 

ক্যাঙারু প্রথমে এল গাছটার কাছে। বাচ্চাটা আর ঘুমিয়ে নাই। একা একা খেলা করছে গাছের নীচে। বাচ্চাটার কোন বিপদ হয়নি দেখে, ভারি নিশ্চিন্ত!

এবার দু’জন মিলে বেরুলো খরগোশের খোঁজে। অন্ধ জীবটাকে ফেলে তো আর চলে যাওয়া যায় না। কোথায় কী বিপদে পড়ে, তার ঠিক নাই। 

ঘরের মুখো না হয়ে, ক্যাঙারু চলল খরগোশ খুঁজতে। 

কিন্তু এ দিক গেল। ও দিক গেল। নদীর ধারে নাই। বনের দিকে নাই। ঘাসের মাঠ, সেদিকেও নাই তো! 

কোথায় পাবে তাকে ক্যাঙারু? সে কি আর আছে এই দুনিয়ায়? তাকে পাওয়ার কথাই নয়। 

হয়েছে কী, ক্যাঙারু জানে না, আদৌ ওটা খরগোশই নয়। আসলে,সে হোল ছদ্মবেশী বিধাতা পুরুষ। খরগোশের ছদ্মবেশে পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছিল, যাতে কেউ চিনে ফেলতে না পারে।

আকাশের ঘরে বাস বিধাতার। সেখান থেকেই চেয়ে চেয়ে দেখেন নীচের পৃথিবীকে। একদিন বিধাতার মনে হোল-- একবার নীচে যাই। দেখে আসি, কোন জীবের মনে দয়া বেশি। কে বেশি দয়ালু? 

এখন এইমাত্র ওপরে ফিরে গেছেন বিধাতা। বসে বসে দেখছেন, প্রথমে ছুটে ছুটে ফেলে আসা বাচ্চাটার খোঁজে গেল ক্যাঙারু। তারপর বাচ্চাটাকে পেয়ে, ঘরে পালিয়ে গেল না সে। খরগোশের খোঁজে বেরিয়েছে এখন। নদী, বন, মাঠ-- চারদিক ঢুঁড়ে ফেলছে। নেহাতই অপরিচিত একটা বুড়োকে খুঁজতে খুঁজতে, একেবারে হয়রাণ বেচারা! দেখে, একটু মৃদু হাসি ফুটে উঠল বিধাতার মুখে।

তাঁর মনে হোল, এ সব দেখে তো কিছু না করাটা ঠিক নয়। ভালো কাজ করলে, তার প্রতিদান পাওনা হয়। পুরষ্কার দিতে হবে ক্যাঙারুকে। 

চারজন অনুচরকে ডেকে বললেন—নীচে যাও তোমরা। পুরাতন ইউক্যালপটাস গাছ খুঁজে বের করবে। সূতো পাবে তার ছাল থেকে। সেই সূতো দিয়ে, হালকা অথচ মজবুত করে, থলে বুনবে একটা। থলেটা ক্যাঙারুকে দিয়ে বলবে, সেটা যেন বুকে ঝুলিয়ে রাখে সে। তাহলে আর বাচ্চাটাকে হারিয়ে ফেলতে হবে না।

যেমন কথা, তেমন কাজ।  

এমন একটা থলে পেয়ে ক্যাঙারু তো যারপরনাই খুশি। থলেটা ছাতিতে বেঁধে, তার ভিতর বাচ্চাটাকে ভরে যাতায়াত করতে ভারি সুবিধাই হয়েছে তার। বাচ্চাটা তো থলের ভেতর ঘুমিয়েও পড়ে যখন তখন। ক্যাঙারুর বাচ্চা কোন দিন হারায় না।  

কিছুদিন না যেতে, শরীরের সাথে জুড়েই গেল থলেটা। যেদিন আর খোলাই গেল না থলেটা, সেদিন ক্যাঙারুর সে কী আনন্দ। মহানন্দে লাফালাফি জুড়ে দিয়েছিল সে। 

সেই তখন থেকেই ব্যবস্থাটা চলে আসছে। একজন ক্যাঙারু দয়া দেখিয়েছিল। সব ক্যাঙারুই ভোগ করে চলেছে তার প্রতিদান। তখন থেকে, একটা করে থলে জুড়ে থাকে সব ক্যাঙারুর পেটেই।

ক্যাঙারুর পেটের এই থলে আর কিছুই নয়। বিধাতা পুরুষের দান। অন্য পীড়িতকে দয়া দেখাবার জন্য পুরস্কার।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন