দূরদেশের লোক গল্প—ব্রাজিল (দক্ষিণ আমেরিকা)/বানরের খিচুড়ি ভোজন /চিন্ময় দাশ


দূরদেশের লোক গল্প—ব্রাজিল (দক্ষিণ আমেরিকা)
বানরের খিচুড়ি ভোজন

চিন্ময় দাশ


একদিন ভারি খিদে লেগেছে বানরের। এমনিতে তো খাবারের কোন অভাব নাই বানরের। বনে পাহাড়ে কি আর তার খাবারের অভাব? একটি বার এগাছ ওগাছ ঘুরে এলেই, পেট ভরে যায়। 

হয়েছে কী, কাঁচা ফল-পাকুড় খেয়ে খেয়ে, মুখ ধরে গেছে বানরের। সেদিন সকাল থেকে মনে ভারি সাধ হয়েছে, একটু খিচুড়ি খেতে পেলে, মুখটা ছাড়তো।
কিন্তু খিচুড়ি খাবো বললেই তো আর হোল না। খিচুড়ি বানাবার হাজার ঝামেলা। চালরে, ডালরে, আলুরে, মটরশুঁটিরে—খিচুড়ি বানাবার অনেক কসরত। 
কিন্তু মন যখন চেয়েছে, যেভাবেই হোক, যোগাড়যন্ত্র করতেই হবে। বসে থাকলে হবে না। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল বানর।

প্রথমে মোরগের বাড়ি গিয়ে হাজির হোল বানর—আমাকে খানিকটা চাল দেবে, মোরগ ভায়া? বড্ড খিচুড়ি খাওয়ার সাধ হয়েছে। 
মোরগ কোন প্রশ্ন করল না। খানিকটা চাল তুলে দিল বানরকে। বানর বলল—অনেক ধন্যবাদ, বন্ধু। আগামীকাল বেলা ১টা নাগাদ আমার বাড়ি এসো। পেট ভরে খিচুড়ি খাওয়াব। ধার শোধ করে দেব তোমার। এসো কিন্তু। 
বানর এবার চলল শেয়ালের বাড়ি—শেয়াল ভায়া, আমাকে খানিকটা ডাল দাও। খিচুড়ি বানাবো। 
শেয়াল তাকে ডাল দিয়ে দিল। বানর বলল—আগামীকাল বেলা ২টা নাগাদ এসো আমার বাড়ি। পেট ভরে খিচুড়ি খাবে। ধার শোধ হয়ে যাবে তোমার। 
এবার কুকুরের বাড়ি গেল বানর। বলল—কুকুর ভায়া! কিছুটা মটরশুঁটি দিতে পারো আমাকে? খিচুড়ি রাঁধবো।
কুকুর তাকে কিছুটা মটরশুঁটি তুলে দিতে, বানর বলল—এমনি এমনি নিলাম না কিন্তু। আগামীকাল বেলা ৩টে নাগাদ আমার বাড়ি চলে এসো। খিচুড়ি খাইয়ে তোমার দেনা শোধ করে দেব। 
এবার বানরের সাধ হোল, আচ্ছা,দু’-চার টুকরো মাংসের কুচি যদি ফেলে দেওয়া যায় খিচুড়িতে! জমে যাবে একদম। ভেবে চিন্তে সোজা রাজার বাড়ি গিয়ে হাজির হোল বানর।
বাঘ তখন খাওয়া-দাওয়া সেরে, আয়েস করে গড়িয়ে নিচ্ছে। বানর হাজির হয়ে বলল—পেন্নাম হই, রাজা মশাই।
বাঘ ভারি বিরক্ত। এই আপদ এখানে কেন? চোখের কোণে বানরকে দেখল একটু। গম্ভীর হয়ে বলল—হোলটা কী? জ্বালাতে এলি কেন? 
--বলছিলাম কী, দু’ টুকরো মাংস হবে? খিচুড়িতে দেব। আর সব পেয়ে গেছি। একটু মাংস হলে জমতো ভালো। 
বাঘ বলল—এই ভর দূপুরে জ্বালাতে চলে এলি? ভিতরে আছে। দরকার মতো নিয়ে যা। নিয়ে কেটে পড়। আর একটি কথাও নয়। ভাগ এখান থেকে। একটু ঘুমোতে দে আমাকে।
মাংস নিয়ে বানর বলল—বলছিলাম কি, আগামীকাল একবার বাড়িতে আসবেন। খিচুড়ি রেঁধে রাখব। পেট ভরে খাবেন। মুখটা ছাড়বে তাতে। বাঘ চোখ খুলল না। বলল—সে পরে দেখা যাবে। কালকের কথা কালকে। এখন কেটে পড়।
বানরের তো ফূর্তি ধরে না। সব কিছু জোগাড় হয়ে গেছে। জম্পেশ করে খিচুড়ি খাওয়া যাবে এবার।
এক হাঁড়ি খিচুড়ি রেঁধেছে বানর। গন্ধে ম-ম করছে এলাকাটা। বানর বসল খিচুড়ি খেতে। 
আহা, কী স্বাদ! বানর খাচ্ছে তো খাচ্ছেই। খাওয়া আর তার থামে না। যখন একেবারে গলা পর্যন্ত ভরে উঠল, তখন থামল তার খাওয়া।

তাকিয়ে দেখল, হাঁড়ির অর্ধেক খিচুড়ি সাবাড় হয়ে গেছে। মনে ভারি ফূর্তি। হাঁড়িটা যত্ন করে শিকেয় তুলে রেখে, ঘুমিয়ে পড়ল বানর। 
সেদিন ঘুম বলে ঘুম! কখন সকাল হয়েছে। সূজ্জিঠাকুর কতটা উঠে গেছে। আলোয় ঝলমল করছে বাইরেটা—কিছুই জানতে পারেনি সে।
আড়মোড়া ভেঙে উঠে, প্রথম যেটা খেয়াল হোল বানরের, সেটা আর কিছু নয়। খিচুড়ির গন্ধ। মিষ্টি গন্ধে ভরে আছে জায়গাটা। আর তর সইল না বানরের। হাঁড়ি নামিয়ে চটপট আবার খানিকটা খিচুড়ি পেটে চালান করে দিল।
তখন খেয়াল হোল, চার চারজনকে নেমন্তন্ন করা আছে। তার কী হবে? এইটুকু খিচুড়ি তো কুলোবে না চারজনের।
তখনি মনে পড়ল, নেমন্তন্ন খাইয়েই যদি বিলিয়ে দিই, দূপুরবেলা নিজে কী পেটে দেব? মহা মুশকিলে পড়া গেল তো!   
অমনি একটা ভাবনা এসে গেল মাথায়। দুষ্টবুদ্ধিতে বানরের জুড়ি নাই। একটা ফন্দি ছকে নিল মনে মনে। 
সূর্য মাথার ওপর ওঠেনি তখনও। শিকে থেকে হাঁড়ি নামিয়ে, বাকি খিচুড়িটাও চেটেপুটে খেয়ে নিল বানর। যত্ন করে হাঁড়িটাকে আবার শিকেয় তুলে রেখে দিল। 
এবার মাথায় একটা কাপড়ের ফেট্টি বেঁধে, গুটিশুটি মেরে পড়ে রইল বিছানায়। এক সময় মোরগ এসে হাজির—বানর ভায়া, বাড়ি আছো তো?
বানরের গলা দিয়ে যেন স্বর বেরোয় না। কোন রকমে চিঁ-চিঁ করে বলল—ভেতরে এসো ভাই। মরতে বসেছি আমি। কাল থেকেই শরীর একেবারে বিগড়ে আছে। নড়াচড়াটুকুও করতে পারছি না। 
হায় হায় করে উঠল মোরগ—সে কী গো? হোল কী করে এমনটা? 
আর বোল না ভাই। কপালের দুর্ভোগ। কে এড়াতে পারে? যাকগে, আমি তো খবর দিতে পারিনি। এসে যখন পড়েছ, একটু কষ্ট করে নিজেই হাঁড়িটা নামিয়ে নাও শিকে থেকে।
মোরগ বলল—সে ঠিক আছে। হবে’খন। যাওয়ার আগে খেয়ে নেব।
দুজনে গল্প চলছে। এমন সময় শেয়াল এসে হাঁক পাড়ল—কই হে, বানর ভায়া, বাড়ি আছো?
শেয়ালের গলা পেয়ে মোরগের তো প্রাণ যাওয়ার জোগাড়। সে আঁতকে উঠল—সর্বনাশ! শেয়াল? আমাকে তো ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে এখুনি। 
--তুমি চটপট আমার বিছানার তলায় ঢুকে পড়ো। শেয়াল টেরটিও পাবে না। 
মোরগ ভিতরে সেঁধিয়ে যেতে, বানর চিঁ-চিঁ করে শেয়ালকে ডাকল—নিজেই ভেতরে চলে এসো, বন্ধু। উঠবার ক্ষমতা নাই আমার।
শেয়াল ভিতরে এসে দেখল, হাত পা মুড়ে, মাথা গুঁজে শুয়ে আছে বানর। গলা দিয়ে কথা সরছে না। 
--হোলটা কী গো? এই কালও তো দিব্বি ভালো ছিলে। এক দিনে কী এমন হয়ে গেল?
--শরীরটা ভীষণ খারাপ, বন্ধু। বুক ধড়ফড়। মাথা তুলতে পারছি না। তা ভাই, এসে যখন পড়েছ, ভালোই হয়েছে। খিচুড়ি রান্না করাই আছে। কষ্ট করে নামিয়ে খেয়ে নিতে হবে। 
শেয়াল বলল—খাবার জন্য তাড়া নাই। যাবার আগে, ঠিক খেয়ে নেব।
দুজনে কথাবার্তা চলছে, কুকুর এসে হাজির। বানরভায়া, আছো তো? 
কুকুরের গলা কানে যেতেই, শেয়ালের আক্কেল গুড়ুম। সে আঁতকে উঠল—কুকুর এসে গেছে। হায়, হায়! আমার কী হবে?
বানর বলল—কিচ্ছু ভয় নাই। আমার বিছানার তলায় ঢুকে পড়ো তাড়াতাড়ি।
কুকুরের কান সব সময় খুব খাড়া। এখন কুকুরের কানেও যায় না, এমন আস্তে করে কথা বলছে বানর। যেন স্বর বেরুতে পারছে না গলা দিয়ে। 
কুকুরকেও একই গল্প শোনাল বানর। কাল থেকেই শরীরটা এক্কেবারে বেহাল। উঠে বসবার ক্ষমতাটাও নাই। 
--ঐ শিকেতেই খিচুড়ি তোলা আছে। কষ্ট করে নামিয়ে খেয়ে নাও,ভাই। 
কুকুর বলল—খাবারের জন্য ব্যস্ত হতে হবে না। সে পরে হবে তখন। 
গল্পসল্প চলছে দুজনের। খানিক বাদেই, বাইরে বিকট আওয়াজ—হালুম! 
আর যায় কোথায়? কুকুরের মাথা খারাপের জোগাড়। কী করবে, বুঝে উঠতে পারছেনা। বাঘ এসে গেছে। সামনে পেলেই, ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে। 
বানর কুকুরকেও বলল—তাড়াতাড়ি আমার বিছানার নীচে ঢুকে পড়ো।
সকলের সাথে কথা বলছে বটে, বানরের কিন্তু নড়াচড়াটিও নাই। সেই যে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে, পাশটিও যেন ফিরতে পারছে না বেচারা। বাঘ এসে যেতে একটু ভয় বানরও পেয়েছে। রাজার সাথে চালাকি সোজা কথা তো নয়। 
বানর আগের মতোই চিঁ-চিঁ করে বাঘকে ঠিক কী বলল, বাঘের কানে পৌঁছল না কথাগুলো। সে গটগট করে ভেতরে ঢুকে, হাঁক পাড়ল—কোথায় গেলি রে? সাড়াশব্দ নাই কেন?
বানরের গলা কাতর—কোথাও যাবার কি আর ক্ষমতা আছে আমার? সকাল থেকেই বিছানায় পড়ে আছি। আপনি নিজে এসেছেন। উঠে বসে সেলাম ঠুকব, গায়ে সে জোরটুকুও তো নাই আমার।
বানরের কথা শেষ হতে পেল না। বিশাল এক গর্জন বাঘের—তবে রে, হতভাগা! দেনা শোধ না করবার ফন্দি। আর লোক পেলি না? রাজার সাথে মস্করা। দাঁড়া, ব্যাটা। দেখাচ্ছি মজা। বলেই এক লাফ। 
বানর বুঝে ফেলেছে, কী হতে যাচ্ছে। বাঘ তার ঘাড়ে এসে পড়বার আগেই, বানরও দিয়েছে এক লাফ। সোজা গাছের ডালে উঠে পড়েছে। 
বাঘের ওজন তো কম নয়। ধপাস করে এসে পড়তেই বানরের বিছানাটা গেল ভেঙে। নীচে লুকিয়ে থাকা তিন মূর্তি প্রকাশ হয়ে পড়ল। 
সামনে মোরগকে পেয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়ল শেয়াল। সবে মোরগ খাওয়া শেষ হয়েছে, কুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ল শেয়ালের ওপর। খানিক বাদে তারিয়ে তারিয়ে শেয়াল খাওয়া শেষ হোল কুকুরের। 
বাঘ বসে বসে কাণ্ডকারখানা দেখছিল। এবার বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ল কুকুরের ওপর। লম্বা জিভ বাঘের। খাওয়া শেষ করে, ঠোঁটের রক্ত চাটতে চাটতে, ঘরে ফিরে গেল রাজামশাই।

সেই থেকে, বানরকে দেখলেই, রাগে গরগর করে ওঠে বাঘ। তবে, বানর সদা সতর্ক। বাঘ চোখে পড়লেই, সোজা গাছের মগডালে চড়ে বসতে দেরি করে না।

পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন