সোমনাথ দাস অধিকারী (প্রকৃতিপ্রেমী, অমরপুর, পটাশপুর) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ৫৫
সোমনাথ দাস অধিকারী (প্রকৃতিপ্রেমী, অমরপুর, পটাশপুর) 

ভাস্করব্রত পতি

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণীবিদ্যা নিয়ে একসময় পড়াশোনা করতে ভর্তি হয়েছিলেন। ছিলেন অন্যতম স্কলার ছাত্র। লক্ষ্য ছিল প্রাণী বিশারদ হয়ে ওঠা। কিন্তু নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে পড়া ছাড়তে হয়। নিজেকে বাঁচাতে এবং পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারী এড়াতে  লুকিয়ে পড়েন বেলপাহাড়ির জঙ্গল ঘেরা এলাকায়। লাল মাটির জঙ্গলে কাটাতেন কুরচি, শাল, মহুয়া গাছের ঘেরাটোপে। জঙ্গলের জনজাতির জনজীবনের সাথে জড়িয়ে ফেলেন নিজের জীবন যৌবন। আর সেখান থেকেই বন্যপ্রাণ এবং পরিবেশ সম্পর্কে ভালোবাসা জন্মায় সোমনাথ দাস অধিকারীর। সেই ভালোবাসা থেকেই আজ নিজেকে যুক্ত রেখেছেন বন্যপ্রাণী, পরিবেশ এবং সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের সাথে। আর নিজের এলাকাকে জীববৈচিত্র্যের তীর্থক্ষেত্র বানিয়েছেন। 
এহেন মানুষ আজ মেদিনীপুরের ক্ষেত্রে গর্ব। তাঁর এই অলাভজনক অন্য ধারার কাজের নিরিখে হয়ে উঠেছেন 'মেদিনীপুরের মানুষ রতন'। পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর ১ নং ব্লকের অমরপুর গ্রামের ভূমিপুত্র সোমনাথ দাস অধিকারীর পরিচয় আজ তাই জেলা জুড়ে। ১৯৪৭ এর ২ রা ফেব্রুয়ারি জন্ম। ভালোবাসেন পাখপাখালি, ভালোবাসেন গাছগাছালি। ভালোবাসেন এই পৃথিবীর জনজীববৈচিত্র্য। তাই নিজের বসতভিটা এবং বাস্তু জমিকে তৈরি করেছেন বায়োডাইভার্সিটির অন্যতম নিদর্শন হিসেবে। যা কিনা পরিবেশ রক্ষার এক অন্যতম কর্মকাণ্ড সম্বলিত দৃষ্টান্ত। 
নৈপুর স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে কাঁথি কলেজে প্রাণীবিদ্যা নিয়ে ভর্তি হন। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন ১৯৬৭-৬৮ তে এস এফ আইয়ের কমন রুম সেক্রেটারি হন। ১৯৬৯ থেকে শুরু করেন নকশাল আন্দোলন। পড়া ছেড়ে লুকিয়ে পড়েন পশ্চিমের জঙ্গলে।  জারি করা হয় হুলিয়া -- জীবিত বা মৃত ধরে দিতে হবে! অবশেষে ধরা পড়েন গোপীবল্লভপুরে। সাত মাস জেলে থাকতে হয়। বাড়িতে এলেন ১৯৭২-৭৩ এ। একসময় ঠিকাদারীর কাজে মেদিনীপুরে কংসাবতীর তীরে ম্যানেজারি করতেন। ১৯৭৭-৭৮ সালে মোরারজি দেশাইয়ের কাছে 'বন্দী মুক্তি আন্দোলনে' তাঁর নাম ছিল। ১৯৮৩-৮৪ থেকে পাকাপাকি ভাবে বাড়িতে চলে আসেন। চাষবাস নিয়েই থাকেন। ১। ১৯৮৪ তে কংগ্রেসের পঞ্চায়েত প্রার্থী ছিলেন এলাকায়। ২০০৫-২০১০ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের পটাশপুর ব্লক সভাপতি ছিলেন। এরপর রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নিয়ে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন বন, পরিবেশ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে। একসময় বাবা রাধানাথ দাস অধিকারী ছিলেন পটাশপুরের বিধায়ক (১৯৬২-১৯৬৭)। রাজনীতি তাঁর রক্তেই ছিল। কিন্তু মননে, চিন্তনে রয়েছে বনজ সম্পদের প্রতি অমোঘ ভালোবাসা। 
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে গিয়ে তিনি জেলায় শুরু করেছেন বিকল্প অর্থনীতি। জোর দিয়েছেন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের ওপর। পরিবেশ বাঁচিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে এলাকার মানুষজনকে যুক্ত করেছেন। পটাশপুরের বাঘুই নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার নদীর পরিবেশকে বাঁচিয়ে প্রান্তিক নারীকূলকে স্বনির্ভর করে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন জনজীববৈচিত্র্য রক্ষার অঙ্গ হিসেবেই। ঐ মহিলারাই নানা গাছ লাগাচ্ছেন। গাছপালা, মাছ, পশুপাখি, জীবজন্তু সংরক্ষণ করছেন ঐ মহিলারা। অনেকটা ঠিক JFM তথা Joint Forest Management এর মতো পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন এলাকার  প্রাকৃতিক সম্পদ বাঁচাতে এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি করতে। সম্পূর্ণ নিজের খরচেই ১৫০০ টি স্বনির্ভর গোষ্ঠী বানিয়েছেন পটাশপুর এলাকার নদী তীরবর্তী গ্রামগুলিতে। যা আজ বহু গরিব মানুষের কিছুটা হলেও গ্রাসাচ্ছাদনের উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

তাঁর বাড়ির বাগানের গাছে হাজার হাজার বাদুড় ঝুলে থাকে। তাঁদের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছে প্রতিটি গাছ। সেইসাথে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্ধার হওয়া বিপন্ন চন্দ্রবোড়া, গোখরো, কেউটে, কালাজদের নতুন বসতভূমি  হয় সোমনাথবাবুর এই উন্মুক্ত বাগান। সেইসাথে কচ্ছপ, বাঘরোল, শেয়াল, গন্ধগোকুলেরও নিরাপদ আস্তানা করে তুলেছেন নিজের বাসস্থান। তাঁর বাগানে মিলবে ৭০০ র বেশি প্রজাতির গাছ। কোনো দিন কাটা হয়না এখানকার গাছগাছালি। ঠিক যেন Sacred Forest! প্রচুর হারিয়ে যাওয়া এবং বিলুপ্তপ্রায় গাছের সম্ভার মিলবে এখানে। ছত্রাক রয়েছে ১৪ রকমের। রয়েছে ৬ ধরনের ব্যাঙ। ফ্ল্যাপশেল টার্টল আছে বহাল তবিয়তে। এখানে তৈরি করেছেন চৌবাচ্চা। সেখানে তারা থাকে। পরে তা ছেড়ে দেওয়া হয় বন দপ্তরের নির্ধারিত জায়গায়। বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে পরিবেশ শিক্ষা এবং প্রকৃতি শিক্ষার পাঠশালা হয়ে উঠেছে অচিরেই। তাঁরা এখানে আসে গাছ চিনতে আর ফিরে যায় পরিবেশ বাঁচানোর মন্ত্র নিয়ে। 
শুধু নিজের চারপাশ নয়, সেইসাথে গোটা ব্লক জুড়ে জনজীববৈচিত্রের নথি সংগ্রহ করেছেন এখানকার জীবকূলকে বাঁচানোর জন্য। সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার লড়াইতে তিনি সামিল। এজন্য সম্প্রতি আই বি এ থেকে পেয়েছেন 'ইণ্ডিয়া বায়োডাইভার্সিটি অ্যাওয়ার্ড ২০২১'। তিনি ২০১২ তে বায়োডাইভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে প্রথম অন্তর্ভুক্ত হন। তখন থেকেই বেড়ে যায় কাজের গতিবেগ। ওয়েস্ট বেঙ্গল বায়োডাইভার্সিটি বোর্ড থেকে ২০১৫ তে পান YEAR OF THE AWARD সম্মান। ২০২২ তে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুচি পন্থ, মনিপুরের চোংরি এবং মেঘালয়ের দাহিও মিকা এসেছিলেন তাঁর এই আজব বাসস্থানে। তাঁর কাজের পরিসর দেখতে। সবদিক বিবেচনা করে তাঁরা পটাশপুর ১ বায়োডাইভার্সিটি ব্লককে ভারতের সেরা পাঁচের মধ্যে নির্বাচিত করে। 

অসাধারণ সুন্দর দারুভাস্কর্য তৈরি করেন এই আপাদমস্তক পরিবেশপ্রেমী মানুষটি। একসময় ডাক্তারি পড়তে চেয়েছিলেন। তাই মানব শরীরের অ্যানটমিক্যাল জ্ঞান তাঁর অজানা নয়। সেই জ্ঞানকে পাথেয় করে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন লেনিন, ইটারনাল কিস, লজ্জা, ওলিম্পিকের কুমারী কন্যা, ষাঁড়ের লড়াই, শকুন্তলা, মরনঝাঁপ ইত্যাদি। যেকোনো শিল্প রসিক মানুষের কাছে এগুলি রীতিমতো সমীহ আদায় করে নেবেই।

তাঁর সৌজন্যে অসংখ্য পাখি আজ উড়ে বেড়ায় মনের সুখে। বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার করা আহত পশুপাখিদের পৌঁছে দেওয়া হয় সোমনাথবাবুর জিম্মায়। তিনি সেসব সুস্থ করে তুলে দেন জেলা বনদপ্তরের হাতে। উদ্ধার করা বিষধর সাপ ছেড়ে দেন নিজের বাগানে। কোথাও কোনো গাছ কেটে নেওয়ার খবর পেলেই ছুটে যান অকুস্থলে। সাধ্যমতো বাধা দিয়ে রোধ করেন বৃক্ষনিধন। বিভিন্ন স্কুল, কলেজে গিয়ে প্রকৃতি শিক্ষার পাঠ দেন ছাত্র ছাত্রীদের। বিলি করেন পরিবেশ বাঁচানোর পোস্টার, ফ্লেক্স, লিফলেট। তাঁর এই কর্মকাণ্ডে বদলে গিয়েছে এলাকার মানুষের মানসিকতাও। তাঁরাও আজ দিক্ষিত পরিবেশ বাঁচানোর যুদ্ধে মন্ত্রপূত সমীধ হয়ে।
জ্বলদর্চি অ্যাপ ডাউনলোড করে নিন।👇




Post a Comment

0 Comments