শব্দে গাঁথা মণি-মালা : ৪৬ / সালেহা খাতুন
অন্য আমি-র প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল, হোক তার কথা। সে মাঝে মাঝে দুঃসাহসী হয়ে উঠতো। কিছুদিন আগে খুব “মি টু” প্রসঙ্গ চলছিল না? আসলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে কেউই আর বেশিদিন চুপ থাকতে পারে না। গোবেচারা নিরীহ সাত চড়ে রা কাড়ে না এমন মেয়ে হয়েও হাওড়া স্টেশনের চোদ্দো নম্বর প্ল্যাটফর্মে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালীনই একজনকে সপাটে চড় মেরে ছিলাম। যাকে চড় মেরে ছিলাম সে আমাকে অপমান বা অসম্মান করে নি। কিন্তু আমি চোখের সামনে দেখতে পাই ভীড়ের মধ্যে সে একটি মেয়েকে আপত্তিজনক ভাবে স্পর্শ করছে। আমার ব্রেন তখন থাপ্পড় মারার সিগন্যালই দিয়েছিল। মস্তিষ্ক মহাশয়ের কথা আজ পর্যন্ত কজন অমান্য করতে পেরেছেন?
তারপর পেয়েছিলাম ভয়। আর এই ভয় যে জীবনে কতকিছু থেকে বঞ্চিত করেছে তার তালিকা অনেক বিস্তৃত। যাকে থাপ্পড় দিয়েছিলাম সে এবং তার নির্লজ্জ সহযাত্রীরা চিৎকার করে একটি লোকাল ট্রেনের নাম ঘোষণা করে বলে ঐ ট্রেনে ফিরবে তো দেখে নেবো। আমি কয়েকদিন ফেরার ট্রেন বদলে দিলাম। উলুবেড়িয়া লোকাল ছেড়ে বাগনান লোকালে ফিরতে লাগলাম। সে বিপদ গেল কেটে। অনেক রকম প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে আমাদের রোজকার যাত্রা চলতো। আমাদের সিন্থেটিক শাড়ির আঁচলগুলোতে ইচ্ছে করে জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে কেউ কেউ ছুঁয়ে দিত। আমরা জানতেই পারতাম না। পরে শাড়ি কাচতে গিয়ে গোল গোল ফুটো গুলো দেখতে পেতাম। শুধু আঁচল নয় ওড়নাতেও একই হাল হতো।
বুটসুদ্ধ পা কতবার যে আমাদের পায়ে উঠে এসেছে! মানছি হাওড়া স্টেশনে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে যাত্রা করতে গিয়ে অনেকে এটা অনিচ্ছাকৃত ভাবে ঘটিয়ে ফেলতো। কিন্তু শাস্তি পেতাম আমরা। ভুগতে হতো আমাদের। আমার বন্ধু তনুজার পায়ের আঙুল ভেঙে যায়। তিনমাস গৃহবন্দি থাকতে হয় ওকে। একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে এটা কী দুঃসহ ব্যাপার ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন। অ্যাটেনডেন্সের অভাবের জন্য ও ননকলিজিয়েট হয়ে যায়। পরীক্ষার ফর্ম ফিলআপের জন্য পঞ্চাশটাকা ফাইন দিতে হয়। আমি ক্লাসনোটস প্রায় দিনই বাড়ি ফেরার সময় ওর কাছে পৌঁছে দিয়ে আসতাম। নলপুরে ট্রেন থেকে নেমে মাঠের মাঝখান দিয়ে ওর বাড়িতে যেতাম। পরে আবার ট্রেন ধরে একটা স্টেশন এসে বাউড়িয়ায় নেমে নিজের ঘরে ফিরতাম।
ওর জন্য ওর মা যে খাবার বানিয়ে রাখতেন তাতে আমার অংশও যোগ করে নিতেন। বন্ধুকে সাহায্য করতে গিয়ে খানিকটা পড়াশোনাও হয়ে যেতো। কলেজ স্ট্রিটের পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে ও আমাকে একবার পরশুরামের ‘কজ্জলী’ কিনে দেয়। দে’জ থেকে সন্তোষ কুমার ঘোষের ‘রবির কর’ কিনে দিয়েছিল রুমা। অনিতা আর বিতান কিনে দিয়েছিল ‘প্রিয় প্রেমের কবিতা’। আমাদের সামর্থ্য অনেক কম থাকলেও অল্পের মধ্যেই অসাধ্য সাধন করতাম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে সব বন্ধুরা বিভিন্ন স্টেশনে নেমে যাওয়ার পর তনুজা আর আমি একবার নিজেদের ঘরে ফেরার স্টেশনে না নেমে চোখ বন্ধ করে কোলাঘাট পেরিয়ে চলে গেলাম মেচেদা। ট্রেনটি মেচেদা লোকাল ছিল।ওটিই আবার হাওড়া ফিরছে যখন বাউড়িয়া আর নলপুরে ফিরে এলাম দুজনে।
🍂
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের অলি গলিতে ঘুরতে ঘুরতে আমরা বন্ধুরা মিলে দ্বারভাঙা বিল্ডিংয়ের একটি আশ্চর্য ঘরে একবার পৌঁছে যাই। আকাশ যেমন দিগন্তে মিশে যায় তেমনি একেবারে উপরের তলার একটি ঘর উঁচু দেওয়াল থেকে চালার মতো মেঝেতে মিশে ছিল। আর ঘরটি পুরোনো উত্তরপত্রে ভর্তি ছিল। আমাদের পূর্বসূরিদের মেধা যাচাই এগুলোর মাধ্যমেই হয়েছিল। কত বিনিদ্র রজনী আর কঠোর পরিশ্রমের ফল ছিল সেগুলি। আমাদের চলার পথ তাঁরা অনেকটাই মসৃণ করে গেছেন।
বন্ধু নমনা বাস থেকে নামতে গিয়ে একবার পা স্লিপ করে কলেজ স্ট্রিট মোড়ে পড়ে যায়। কোনোক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে ফার্স্ট এইডের ব্যবস্থা করতে ক্যাম্পাসের কোয়ার্টারে গিয়ে আমরা সহায়তা নিলাম। আর সেন্টিনারি বিল্ডিংয়ের নিচের তলায় আশুতোষ মিউজিয়ামে মাঝে মাঝেই আমরা ঢুঁ মারতাম। বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গেও দেখা হতো। গণেশের হাতে লাড্ডুসহ একটি মূর্তি দেখে এক বিদেশি পর্যটকের কৌতূহল মেটাতে বিশাখা বলেছিল, “দিস ইজ লর্ড গণেশ অ্যাণ্ড দিস ইজ লাড্ডু”।
আর বিখ্যাত রাখালদার ক্যান্টিন!! যেখানে লোভনীয় জিবে গজা খাওয়া আর বাড়ির জন্য নিয়ে আসা প্রায় দিনই অব্যাহত থাকতো। একটা সুস্থ আড্ডা চলতো বন্ধুদের মধ্যে। তবে বাড়ি থেকে টিফিন আমরা প্রায় সবাই নিয়ে যেতাম। বিতান নিয়ে যেতো কালো জিরে দেওয়া সাদা আলুর তরকারি। বিচিত্র সব খাবারে ভরে যেতো আমাদের টিফিন বক্স। প্রত্যেকের খাবার ভাগাভাগি করে সাজিয়ে একদিন দেখি শুধু ভাতটাই নেই বাকি সব আছে। ওটিও একটু অন্য পদ্ধতিতে আনার ব্যবস্থা করে অনিতা। ও আনা শুরু করলো চাল ভাঁপা। হাঁড়িতে ফুটন্ত জলের উপর সাদা কাপড়ে চাল ডাল গাজর ইত্যাদি দিয়ে অসাধারণ স্বাদের চাল ভাঁপা আমরা সবাই শিখে নিলাম।
দিলখুশা, যেখানে বন্ধুরা কবিরাজি কাটলেট ভাগাভাগি করে খেতাম
বসন্ত কেবিন, দিলখুশা, পুঁটিরাম, মৌচাক, কফি হাউস যাবো না তা কখনো হয়? কিন্তু ঐ যে সামর্থ্য কম। মেনু কার্ড দেখতে হতো। সস্তার খাবার অর্ডার দিতে হতো। কোন খাবারটার কম দাম এটা দেখতে দেখতে বসন্ত কেবিনে তনুজা একদিন বললো, আরে দেখ যদি শুধুমাত্র ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ নিস তাহলে কোনো দাম দিতে হবে না। মেনুকার্ডে একমাত্র এই জিনিসটারই দাম লেখা নেই। ওর এইরকম আরো নানান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাক্যে আমরা হেসে লুটিয়ে পড়তাম। হাস্যরসের প্রধান উৎস ওর কাছেই থাকতো।কফি হাউসে চিকেন পকোড়ায় একবার এমন ছুরি চালিয়ে ছিল যে একটি টুকরো পাশের টেবিলের প্লেটের উপর পড়ে। নো লজ্জা। শুধুই হাসির রোল। দিলখুশায় একটা কবিরাজি কাটলেট নিয়ে সবাই মিলে ভাগাভাগি করে কতবার খেয়েছি। কে দেখলো আর কে হাসাহাসি করলো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
ভাগাভাগি প্রসঙ্গে আর একটি কথা বলি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন টুকু আর ওবাইকে একবার বলি তোদের নন্দনে “চরাচর” দেখাবো। তোরা টাকা জমা। সেবার ফুলবাগানের সুমনাসহ আরো সব বন্ধুদের সঙ্গে মিলে ভাইবোনকে “চরাচর” চলচ্চিত্রটি দেখাই। ফেরার পথে বাউড়িয়া নেমে একটি মিষ্টির দোকান থেকে ভাইকে একটিই রসগোল্লা কিনে খাওয়াই। তখন রসগোল্লার দাম ছিল এক টাকা পঁচিশ পয়সা। দোকানদার বলে, “একটা রসগোল্লা তিন ভাইবোনে খাবে?” আমরা বললাম না শুধু ভাই খাবে। ভাই এখনো ঐ ব্যাপারটা নিয়ে খোঁটা দেয়। কিছুতেই বোঝাতে পারি না, ওরে আজকের আমি আর সেদিনের আমি এক নই।
( ক্রমশ)
বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারেন 👇
0 Comments