জ্বলদর্চি

আমার গোপাল /কমলিকা ভট্টাচার্য


আমার গোপাল

কমলিকা ভট্টাচার্য

আজ এমন একটা ঘটনা ঘটল, যার ফলে হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল ও. হেনরির সেই বিখ্যাত গল্প "The Gift of the Magi"। অনেক ছোটবেলায় পড়েছিলাম সেই গল্প। জানি, আপনাদের অনেকেরই পরিচিত হবে সেই কাহিনী, যেখানে জিম আর ডেলা নামে এক দম্পতি ছিল, যাদের কাছে একে অপরের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা ছিল, কিন্তু আর্থিক স্বাচ্ছল্য ছিল না। একে অপরকে সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে তারা নিজেদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস বিক্রি করে দেয়। জিম তার পকেট ঘড়ি বিক্রি করে ডেলার জন্য একটি চিরুনি কিনে আনে, আর ডেলা তার সুন্দর চুল বিক্রি করে জিমের ঘড়ির জন্য চেইন। কিন্তু যখন তারা একে অপরকে উপহার দেয়, তখন বুঝতে পারে যে তাদের জন্য কেনা উপহার আর ব্যবহার উপযোগী নেই, তবুও তাদের ভালোবাসা আর বন্ধন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।

সত্যি বলতে, উপহার বলতে আমরা যা বুঝি, তার আসল মানে হলো একে অপরের প্রতি স্নেহ, যত্ন, আর ভালবাসা। আর আজকের ঘটনায় সেই সত্যি উপহারটাই যেন অনুভব করলাম।

আজ জন্মাষ্টমী। আমি মন্দিরে গিয়েছিলাম, সঙ্গে আমার ছেলে। মন্দিরে অনেক ভিড়, আর গাড়ির লম্বা জ্যাম। তাই গাড়ি অনেক দূরে পার্ক করতে হল। জুতো জোড়া খুলে খালি পায়ে হাঁটতে হবে ভেবে আমি খুব অস্বস্তি বোধ করছিলাম। তাই জুতো পরে হাঁটতে শুরু করলাম। মন্দিরের কাছাকাছি এসে জুতো খুলে রাখতে হলো। মন্দিরে তখন কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছিল, পাথরের কাঁকর ভরা রাস্তায় হাঁটা খুবই কষ্টকর ছিল। মনে মনে ভাবলাম, "সবই তো ভগবানের লীলা, কষ্ট না করলে কেষ্টর দেখা কি মেলে?"
🍂

মন্দিরে পৌঁছে শ্রীকৃষ্ণের মোহিনী রূপ দেখে সব কষ্ট ভুলে গেলাম। দর্শনের পর প্রসাদ খেলাম। আমার ছেলে বলল, "ও হাত ধুয়ে আসছে।" আমি একটু অপেক্ষা করার পর ভাবলাম, আবার খালি পায়ে ফিরে গিয়ে জুতো পরতে হবে, তার চেয়ে আগে গিয়ে জুতো পরি। মেলাও বসেছে, একটু ঘুরে দেখব। ছেলে ফোনটা গাড়িতে রেখে এসেছে, তাই যে জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলে খুঁজে পেতে সুবিধা হবে কেননা ভীষণ ভিড়।

কষ্ট করে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন জুতোর কাছে পৌঁছালাম, তখন দেখি সেখানে আমার জুতো নেই। ছেলের জুতো ঠিকই আছে। মন্দিরে জুতো হারানো নতুন কিছু নয়, কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে পড়ল আমার স্বামীর কথাগুলো। তিনি আমাদেরও বারবার সতর্ক করেছিলেন, আর এখন এই অবস্থায় তাকে কী বলতে হবে সেটা ভাবতেই ভয় পেলাম।

অন্য কারোর জুতো নিয়ে চলে যাওয়া যেত, কিন্তু আমার নীতিবোধ সেই কাজটি করতে বাধা দিল। ছেলের জুতোটা নতুন ও সেটা পছন্দ করে কিনেছিল। আমি ভাবলাম, আমার জুতো তো গেলই, ওরটা গেলে ওর কষ্ট হবে। তাই ওর জুতো পরে যেদিকে দাঁড়ানোর কথা, সেদিকে রওনা দিলাম। যেতে যেতে খালি পায়ে গাড়ি পর্যন্ত ফেরার কথা ভাবছিলাম আর মনের মধ্যে হাজবেন্ডের বকুনি কল্পনা করছিলাম। মনে মনে দু-একটা জবাবও ভেবে রেখেছিলাম।

কিন্তু সেখানে যা হলো, সেটা সত্যিই ভগবানের লীলা। আমি একটু দূর থেকেই বললাম, "আমার জুতো চুরি হয়ে গেছে।" ছেলে একবার আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, "মাম্মী, তোমার জুতো চুরি হয়নি। তোমার কষ্ট হবে ভেবে আমি তোমার জুতোটা পড়ে এখানে নিয়ে এসেছি।"

আমি চমকে গিয়ে বললাম, "আর আমি ভাবলাম আমারটা গেছে, তোরটাও গেলে তুই কষ্ট পাবি!" ছেলেকে জড়িয়ে ধরলাম।

আমার হাজব্যান্ড বললেন, "তোমরা কিছুতেই জীবনে শিক্ষা নেবে না।"
আমি কিছু বললাম না, শুধু ভগবানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালাম, যিনি আমাকে এমন একখানি ভালোবাসার  গোপাল দিয়েছেন।

জানি না, এই ঘটনার সঙ্গে "The Gift of the Magi" গল্পের কোন মিল পাচ্ছেন কিনা আপনারা। তবে বিশ্বাস করুন, সেই মুহূর্তে আমার মনে সেই গল্পটাই ভেসে উঠেছিল। হয়ত, নিজের খুশির চেয়েও অপরের জন্য চিন্তা বা ত্যাগ করার মধ্যেই সত্যিকারের ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে।

Post a Comment

0 Comments