বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১১১
দোপাটি (হরগৌরী)
ভাস্করব্রত পতি
'তোমার নীল দোপাটি চোখ
শ্বেত দোপাটি হাসি,
আর খোপাটিতে লাল দোপাটি
দেখতে ভালবাসি....।'
দোপাটি ফুল সমধিক পরিচিত 'হরগৌরী' নামেও। ইংরেজিতে একে Garden Balsam, Touch Me Not, Rose Balsam, Spotted Snapweed বলে। এছাড়াও একে সংস্কৃতে দ্বিপুট, হিন্দিতে গুলমেন্দি, ওড়িয়াতে হরগৌরা নামে ডাকা হয়। কোথাও কোথাও এটি পরিচিত দোপুটী, দোমটো, দুপাটি নামেও। বাংলা ছড়ায় পাই --
'দোল দোল দোলনী, রাঙা মাথার চিরুনী
এনে দেব হাট থেকে মান তুমি মরো না।
নতুন নতুন খোপাটি, তুলে এনে দোপাটি
নীল দোপাটি
একবর্ষজীবী উদ্ভিদটি মূলতঃ বর্ষাকালের ফুল। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম Impatiens balsamina। এটি Balsaminaceae পরিবারের অন্তর্গত। ভারত ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, মায়ানমারে প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। ছোটদের মুখে প্রায়ই শোনা যায় দোপাটিকে নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা কবিতা -
'ট্যাঁপা দোপাটি, তুমি দোপাটি
তোফা খোপাটি, বা:!
বাঁকানো শুঁটি, বিনুনি দু'টি
সাদা দোপাটি
খুব একটা বড় গাছ হয়না। মোটামুটি দু'ফুট উচ্চতার হয়। গাছের মূল কাণ্ড বেশ মোটা হলেও আদপে খুবই নরম এবং কোমল লোমযুক্ত প্রকৃতির। তেমন একটা শাখা প্রশাখা হয়না। পাতাগুলো ২.৫ - ৯ সেমি লম্বা, ১ - ২.৫ সেমি চওড়া। সর্পিল এবং গভীরভাবে দাগযুক্ত।
এদের ফুলের দলমণ্ডলগুলি অসমান। বিচিত্র রঙের তথা সাদা, গোলাপী, লাল, ফিকে লাল, নীল, বেগুনি রঙের ফুল ফোটে। এদের ফুলের ব্যাস ২.৫ - ৫ সেমি পর্যন্ত হয়। ছদ দলের মত রঙ্গিন হওয়ার জন্য একে বলা হয় 'দ্বিপট'। কাজী নজরুল ইসলামের গানেও পাই এই ফুলের কথা -
'দোপাটি লো, লো করবী, নেই সুরভি, রূপ আছে। ।
রঙের পাগল রূপ পিয়াসি সেই ভালো আমার কাছে।।
গন্ধ ফুলের জলসাতে তোর
গুণীর সভায় নেইকো আদর
দোপাটির পাতার রস সাপের কামড়নো স্থানে ও ফুলের রস শরীরে পোড়া অংশে লাগালে জ্বালা যন্ত্রনা থেকে উপশম দেয়। ত্বকের নানা সমস্যার প্রতিকারেও দোপাটির ফুলের রস ব্যবহৃত হয়। ইদানিং বহু মানুষ এই ফুলের চাষ করছেন বানিজ্যিকভাবে। পূজার্চনায় দোপাটির চাহিদা ভালোই। তাছাড়া বাড়ির টবে বা জমিতে লাগানো হয় সৌন্দর্যবর্ধক গাছ হিসেবে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখাতেও মেলে দোপাটির উজ্জ্বল উপস্থিতি --
'লাজুক মেয়ে পল্লীবধু
জল নিতে যায় একলাটি।
করবী নেয় কবরীতে
বেনীর শেষে দোপাটি।'
🍂
0 Comments