বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ৮৮
বাজা ঘাস
ভাস্করব্রত পতি
'সাজা, বাজা, কেশ
বাংলা দেশে বেশ।'
এই প্রবাদটি থেকে অনুমিত বাংলা দেশের বুকে এই তিনটির প্রাচুর্যতা। তবে কখনো কখনো প্রবাদটিতে 'সাজা'র পরিবর্তে 'ছাজা' শব্দ ব্যবহৃত হয়। যার অর্থ ঘর ছাওয়া। বাজা ঘাসের প্রসার এই বঙ্গে রয়েছে, তা এতেই প্রমাণিত। এটিকে অবশ্য বলা হয় "The World's Worst Weed" তথা বিশ্বের সবচেয়ে বাজে আগাছা। এই 'বাজে' থেকেই সম্ভবত এসেছে 'বাজা'। কৃষিজমির প্রভূত ক্ষতি করে।
এর বিজ্ঞানসম্মত নাম Cyperus rotundus। Cyperaceae পরিবারের অন্তর্গত। গ্রামাঞ্চলে এটি বাজা ঘাস বা বাজামুথা ঘাস নামেই পরিচিত। বিশ্বজুড়ে এর দেখা পাওয়া যায়। এর আদি বাসস্থান দক্ষিণ ও মধ্য ইউরোপ, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়া। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকাতেও জন্মায়।
এদের মাংসল রাইজোম (২৫ মিলিমিটার) চেনের মতো থাকে। মাটির তলায় সমান্তরাল ভাবে বিন্যস্ত হয়। এটি একটি বহুবর্ষজীবী রাইজোম ঘাস। ছোট ছোট গুচ্ছ আকারে জন্মায় জমিতে। এর মূল বৈশিষ্ট্য হল এটি স্টোলনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সহজে ধ্বংস করা যায়না। মাটির তলাতেই শিকড় প্রসারিত হয় বহুলভাবে।
প্রায় ১৪০ সেন্টিমিটার (৫৫ ইঞ্চি) উচ্চতা হয় গাছগুলি। ফুল ধারণকারী কাণ্ডটি ত্রিভূজাকার। এই ফুলের দণ্ড দিয়ে ছেলে মেয়েরা খেলাচ্ছলে মশারি বানাতো। পুরুষ এবং স্ত্রী পুষ্পবিন্যাস আলাদা আলাদা পরিলক্ষিত হয়।
এটি পরিচিত Java Grass, Nut Grass, Khmer Kravanh Chruk, Purple Nut Sedge, Coco Grass, Purple Nutsedge, Red Nut Sedge নামেও। তবে উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞরা অবশ্য আরেকটি ভিন্ন ঘাসকে বাজা ঘাস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেই বাজা ঘাসের বিজ্ঞানসম্মত নাম Distichilis bajaensis। এটি Poaceae পরিবারের অন্তর্গত। এই গাছের পাতার ব্লেডগুলি ১.৫ সেন্টিমিটারের বেশি লম্বা হয় না এবং সামান্য বাঁকানো হয়। বাজা ঘাস দ্বিজাতিক।
গ্রামাঞ্চলে একসময় খুব দেখা যেত এই গাছটি। ধানের জমিতে এটি জন্মায়। কিন্তু চাষীদের কাছে বিরক্তিকর গাছ। ফলে ধানের জমি থেকে উপড়ে ফেলতে ফেলতে জেরবার হয় চাষীরা। আসলে ধানের গাছের জন্য প্রয়োগ করা সারের যাবতীয় পুষ্টি এই ঘাস শোষণ করে খেয়ে নিত। ফলে ধানের বৃদ্ধি হতনা। বলতে গেলে একসময় ধান জমির ত্রাস ছিল এই বাজা ঘাস। যদিও ইদানিং তেমন একটা দেখা যায়না কৃষি জমিতে। উচ্চ ফলনশীল ধানচাষ শুরুর পর থেকেই কমে গিয়েছে এহেন ঘাসের বাড়বাড়ন্ত।
একসময় গ্রামাঞ্চলে এই বাজা ঘাসের শিকড়ের সাথে লেগে থাকা গুটি আকৃতির মুথা (ছোট বলের মতো) ছাড়িয়ে খেত ছেলেমেয়েরা। বেশ মিস্টি মিস্টি লাগতো। এগুলোকেই বাড়ির লোকেরা শিল নোড়ায় বেটে জলে ভিজিয়ে রাখতো সারারাত। সাথে মেশানো থাকতো ঘুঁটের ছাই এবং অর্জুন গাছের ছাল। সকালে এটি ছেঁকে খাওয়ানো হত। এটি খেলে নাকি পেটের রোগের উপশম হয়।
চরক সংহিতাতেও এই গাছের উপকারিতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। চিনদেশেও এটি আয়ুর্বেদিক ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা এটিকে মুস্তা মূল চূর্ণ হিসেবে নাম দিয়েছে। মূলত হজমের গণ্ডগোল সহ পেটের রোগের উপশমকারী গাছ এটি। তাছাড়া শরীরের প্রদাহ, জ্বর ইত্যাদির ক্ষেত্রেও এটির ব্যবহার হয়। শুকনো বাজা ঘাস দিয়ে বিশেষ ধরনের মাদুর তৈরি হচ্ছে ইদানিং।
🍂
0 Comments