এসকেপ
পুলককান্তি কর
রাউন্ড থেকে বেরিয়ে নমিতা অদ্রিজাকে বলল, 'দেখলে দিদি বউটার সাজগোজ! হাসপাতালে বরকে দেখতে এসেছে, নাকি পার্টিতে, বোঝা মুশকিল।’
অদ্রিজা বলল, ‘ওর সাথে লোকটা কে রে?’
-- ওটা তো ফর্টি থ্রি'র ভাই! মুখের আদল দেখে বোঝো না?
-- কিছুটা একরকম লাগে বটে। ওকেই বরং পেশেন্ট নিয়ে একটু উদ্বিগ্ন মনে হল, খোঁজ খবরও খুঁটিয়ে নিল। ফর্টি থ্রি বলছিল, ওর চিকিৎসার খরচ নাকি ওই চালায়।
-- আচ্ছা দিদি, এই পেশেন্ট সারবে?
-- স্যার তো বলেছিলেন চান্স কম। দোতলা থেকে পড়ে ঘাড়ে ইনজুরি। স্পাইন্যাল কর্ড ফ্র্যাকচার- অপারেশন করে প্লেট বসানো। দুটো পা ই অসাড় হয়ে আছে। এক বছর হল।
-- কিন্তু আমাদের থেরাপীতে তো ইনপ্রুভ করেছে।
-- খুবই স্লো। যতদিনে চোখে পড়ার মতো উন্নতি হবে, ততদিন পেশেন্ট পার্টি ধৈর্য ধরে থাকবে বলে তো মনে হয় না। গ্রামের দিকের লোক, জমি জমা বিক্রি করে কতদিন চলবে?
-- বৌটার কী হবে দিদি? এইটুকু বয়স, জীবনের সাধ আহলাদ...
অদ্রিজা একটু হেসে বলল, ‘এইতো তুই ওর সাজগোজ নিয়ে খেপেছিলি, হঠাৎ নরম হয়ে গেলি যে। সদ্য সদ্য লিভ ইন শুরু করেছিস বলে কি দরদ উথলে উঠলো?’
নমিতা একটু ব্লাশ করলো। বলল, ‘জানো দিদি, আমার মনে হয় বৌটার সাথে ঐ লোকটার মানে ওর দেওরের সাথে একটা ইয়ে আছে।’
-- দেওরদের সাথে বৌদিদের একটু 'ইয়েই' থাকে নমিতা, ওটা নিয়ে তোর এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই।
-- এটা একটু বেশি ডিপ ইয়ে দিদি।
-- কী করে বুঝলি?
-- ও বোঝা যায়।
-- কই, আমি তো বুঝি নি!
-- তুমি একটা হাঁদারাম – বলেই অদ্রিজার গালটা একটু টিপে দিল নমিতা। একটু থেমে বলল, ‘তোমার এমন খাপ খোলা তলোয়ারের মতো চেহারা – এমন ধারালো চোখ মুখ নিয়ে কী করলে দিদি?’
-- তুই থাম। ভাষাটা কী বললি?
-- কোনটা?
-- ওই তলোয়ার?
-- খাপ খোলা তরোয়াল।
-- ওটা আবার কি?
-- মানে 'শার্প' – তোমাদের ইংলিশ মিডিয়ামের এই এক সমস্যা। ভালো ভালো বাংলার মানে বোঝ না। একটা 'শার্প' শব্দের যা ধার, তার থেকে হাজার গুণ ধার এই কথাটার। দীপক তো মাঝে মাঝেই বলে তোমার দিদি এইরকম খাপ খোলা তলোয়ার – শুধু বুড়োদের আহলাদ দেখেই খুশি।
অদ্রিজা একটু কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘বুড়োটা কে?’
-- কেন স্যার। তোমাকে দেখলে কেমন গদগদ হয়ে যায় বোঝো না?
-- তোর মুখে কি কিছুই আটকায় না নমিতা? স্যারকে নিয়েও তোর ইয়ারকি? স্যার তোকে কম ভালোবাসে?
-- বুড়ো বয়েসটাই এরকম দিদি। কচি কচি সব মেয়েদেরই ভালো লাগে।
অদ্রিজা এবার বেশ রাগ করেই বললো, ‘আমার সাথে এসব কথা বলবি না নমিতা। স্যার আমাদের যথেষ্ট স্নেহ করেন, যত্ন নিয়ে শেখান– এমন অশ্রদ্ধার কথা আমার সামনে উচ্চারণ করবি না।’
-- স্যরি দিদি! ওই তো স্যার রাউন্ডে আসছেন– আগে কি মেল থেকে শুরু করবে, নাকি ফিমেল?
-- চল মেলেই আজ ইমারজেন্সী বেশী। ওটা দিয়েই শুরু করি।
২
ডাঃ দাশগুপ্তের কেবিনে বসে নিজের মনে নখ খুঁটছিল অদ্রিজা। ডাঃ দাশগুপ্ত নিজেই কল করে ডেকেছিলেন, মাঝে মাঝেই ডাকেন মুড খুব ভালো থাকলে, কখনও কখনও খুব খারাপ থাকলেও। আজ কী মুড কে জানে। অদ্রিজা এসে দেখলো উনি ঘরে নেই, বাইরে কোনও কাজে গেছেন বুঝি। ঢুকেই আলতো হাতে স্যারের টেবিলটা গুছিয়ে দিল সে – এটা ওর একটা অলিখিত কাজ। ডাঃ দাশগুপ্ত টেবিলটা ভীষণ অগোছালো করে রাখেন। একবার গুছিয়ে দিলে উনি খুশি হয়ে বলেন, 'দেখবে এবার আর নোংরা হবে না, পরিষ্কার রাখবো', কিন্তু এক দু দিন গেলে যে কে সেই। হঠাৎ পায়ের শব্দে অদ্রিজা ঘুরে দেখলো ডাঃ দাশগুপ্ত ঘরে ঢুকলেন। ঢুকেই বললেন, 'ফর্টি থ্রি এর ব্যাপারেই তোমাকে ডাকলাম অদ্রিজা'।
-- হ্যাঁ স্যার বলুন। ওনার ভাই তো ছুটি দেওয়ার কথা বলছিলেন, কী করব?
-- তোমার কী ইচ্ছা?
-- আমার আর কী ইচ্ছা হবে স্যার? পার্টি চাইলে ছুটি তো দিয়ে দেওয়া উচিৎ।
-- কিন্তু ফর্টি থ্রি নিজে তো যেতে চাইছে না। শুনলে তো সেদিন বলছিল না, 'ডাক্তারবাবু আমাকে ছেড়ে দেবেন না যেন। মরি বা বাঁচি এখানেই থাকবো।'
-- পেশেন্টের তো নিজের কোনও বক্তব্য থাকা জাস্টিফায়েড হয় না স্যার। আমাদের তো পার্টির কথা শুনে চলতে হবে। বিশেষ করে ফর্টি থ্রি যখন ওদের উপর ফিনান্সিয়ালি ডিপেন্ডেন্ট।
-- তোমার কী মনে হয় অদ্রিজা, পেশেন্ট বাড়ী ফিরতে চাইছে না কেন?
-- পেশেন্ট তো স্যার মনে মনে আশাবাদী হবেই। সে ভাবছে হয়তো এখানে থাকলে যদিও বা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা, বাড়ী গেলে তার ছিটে ফোঁটাও থাকবে না – এভাবেই জীবন কাটাতে হবে।
-- তোমার কি মনে হয় ফর্টি থ্রি আদৌ পেসিমিস্টিক?
-- তা অবশ্য মনে হয় না।
-- তোমার কি অন্য কোনও রকম অবজার্ভেশন আছে অদ্রিজা?
-- অবজার্ভেশন বলতে?
-- এই ধর পেশেন্টের স্ত্রী, তার ভাই...
অদ্রিজা কিছুটা লজ্জা পাওয়ার ঢঙে মুখ নিচু করে বলল, ‘আমার নিজের কিছু ধারণা না হলেও নমিতা একটা ইল্লিসিট রিলেশনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল, আমি পাত্তা দিই নি।’
ডাঃ দাশগুপ্ত একটু উৎসাহিত গলায় বললেন, 'ভেরি গুড অবজার্ভেশন।’
-- কিন্তু স্যার, এটা কি ফর্টি থ্রি নিজে বুঝতে পারছে?
-- সার্টেনলি।
-- এটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না স্যার। হিউম্যান সাইকোলজি বলে, হাজবেন্ড যদি বোঝে তার অবর্তমানে তার স্ত্রী নিজের ভাই এর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে, তবে সে গ্যাঁট হয়ে নিজের জায়গায় উপস্থিত থাকতে চাইবে।
-- মানুষের সাইকোলজি কি সব সময় একই রেখায় চলে অদ্রিজা? এর জন্যই তো মন এত জটিল। এর উল্টোটা হওয়াও একই ভাবে সম্ভব।
-- এটা কী করে সম্ভব? কোনও পুরুষ পৃথিবীতে এটা মেনে নিতে পারবে?
-- পারবে, পারবে। অনেক ফ্যাক্টর এর সাথে জড়িয়ে থাকে অদ্রিজা। বলো দেখি এরকম একটা ফ্যাক্টর।
-- কি স্যার। মানি? অনেক গল্পে পড়েছি, সিনেমায় ও দেখেছি, হাজব্যান্ড অর্থের জন্য ওয়াইফকে রেড লাইট এ পাঠাচ্ছে, কিন্তু বাস্তব জীবনে কি সত্যিই এমন হয়?
-- হান্ড্রেড পার্সেন্ট হয় অদ্রিজা! মানি অলওয়েজ ম্যাটার্স, বাট থ্যাঙ্ক টু গড, ইট ইজ নট অ্যাপ্লিকেবল ফর অল।
-- কিন্তু এই ক্ষেত্রে এটা কী ভাবে ফিট করছে স্যার? নিজেরই তো ভাই, দাদা পঙ্গু হলে সেই তো দেখবে।
-- দাদা-ভাই ততক্ষণ, যতক্ষণ বিয়ে না হয়েছে। সংসার তো তোমরা এখনও চেনো নি। এক্ষেত্রে ফর্টি থ্রি'র স্ত্রী ভাবছে দেওর কে যদি ও কোনওভাবে তার মোহ জালে ফাঁসিয়ে রাখতে পারে তবে তাদের ইউনিটটা বেঁচে থাকবে। ওর একটা ছোট্ট মেয়ে আছে – তার লেখাপড়া – অসুস্থ স্বামী– ফর্টিথ্রিও মনে মনে এটার সাথে আপোষ করে নিয়েছে।
-- কিন্তু স্যার ওর ভাই আজ বিয়ে করেনি – ঠিক আছে। দুদিন বাদে তো করবে।
-- যতদিন না করে ততদিন নিশ্চিন্ত। যদি আদৌ কোনও দিন না করে তবে তো কথাই নেই। তবে সে সম্ভাবনা কম। কিছুদিন বাদেই ওর মোহভঙ্গ হবে।
-- নমিতা বলছিল, ফর্টি থ্রি'র ওয়াইফ নাকি ওকে এক্ষুনি বাড়ী নিয়ে যেতে চাচ্ছে না।
-- সেটা তো স্বাভাবিক। হাজব্যান্ড বাড়ীতে থাকলে ওর কিছুটা হলেও আড়াল বাঁচিয়ে চলতে হবে। এই পার্টিকুলার কেসটায় আরও একটা ফ্যাক্টর আছে অদ্রিজা। ওটা কিন্তু সিরিয়াস এবং প্যাথোলজিক্যাল।
-- কী স্যার?
-- ইমপোটেন্সি। পেশেন্টের চোট এমন একটা জায়গায় লেগেছে এবং ওর এই মুহূর্তে যা সিচুয়েশন ও কোনওদিনই বোধ হয় স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক চালাতে পারবে না। ফর্টি থ্রি'র নিজের এই আপারগতার জন্য গিল্ট ফিল করে। সুতরাং সে যদি দূরে দূরে থাকে, সে নিজেকে এজন্য দোষারোপ করবে না এবং মনে মনে ভাববে ওর স্ত্রীও ডাইরেক্ট ওকে দোষী ঠাওরাবার পয়েন্ট পাবে না – এটা এক এসকেপ প্লেজার বলতে পারো।
-- এ তো অনেকটা সেই খরগোশের মতো, পেছনে শিকারী কে আসতে দেখে যে গর্ত্তে নিজের মাথা ঢুকিয়ে দেয় আর ভাবে তাকে শিকারী দেখতে পাচ্ছে না।
-- ঠিক কথা। মানুষের সাইকোলজি দ্যাখো কী অদ্ভুত, এর মধ্যেও মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে নেওয়ার আর এক ধরনের একসকিউস পেয়ে যাচ্ছে।
-- কী রকম?
-- ফর্টি থ্রি'র মনে দাম্পত্য রক্ষা করতে না পারার জন্য যে স্ট্রেস ছিল, সেটা অনেকটা রিলিফ হচ্ছে কোথাও; মনে মনে সে এর জন্য নিজেকে উদার বা মহান ভেবে হয়তো খুশীও হচ্ছে।
-- কিন্তু স্যার আমার তো মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। সবাই কি এরকম হিসেব-নিকেষ করে চলে?
-- ডোন্ট বি সো আপসেট ডিয়ার। সব মানুষ এমন নয়! সব মানুষ স্বার্থের জন্য এরকম করে না। তাহলে পৃথিবীটা চলতো না অদ্রিজা। বাট, বিইং এ ডক্টর ইউ শুড নো ইচ এন্ড এভরি অ্যাসপেক্ট অফ হিউম্যান সাইকোলজি। ইট উইল হেল্প টু অ্যাসেস ইওর পেশেন্ট অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ দেয়ার মোটিভস।
-- আপনি তো স্যার অনেক অভিজ্ঞ। আমাকে শুধু একটা কথা বলুন, ফর্টি থ্রি হয়তো এসকেপ খুঁজছে, হয়তো সে এসব মেনে নিয়েছে, কিন্তু একজন পুরুষ হিসেবে কি তার কখনও এই নিয়ে খারাপ লাগা কাজ করবে না?
-- তুমি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'আরোগ্য' গল্পটি পড়েছো?
-- না স্যার।
-- গল্পটার মধ্যে তোমার উত্তর পেয়ে যাবে আশা করি। শান্তশীল নামের একটি লোক ছিল যে সারাদিন কোনও এক কর্পোরেট চাকরীর কারণে ব্যস্ত থাকতো। তার শান্ত চুপচাপ সর্বোপরী সব কিছুতে উদাসীন স্বভাব তার দাম্পত্যে ছায়া ফেলেছিল। তার স্ত্রী মধুশ্রী স্বাভাবিক কারণেই দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছিল। তা একদিন হার্ট অ্যাটাক হয়ে শান্তশীল ভর্তি হল নার্সিংহোমে। মধুশ্রী সেখানে নিয়ম করে ওকে দেখতে যেত, ভালো-মন্দ খবর নিত – ওখানে নার্স আয়াদের ভিড়ে সে যে একটুখানি যত্ন করতে পারেনা সে নিয়ে খেদও জানাতো।
-- সব কিছু কি স্যার শো অফ?
-- হয়তো হ্যাঁ, হয়তো না। মানুষ সম্পর্কের অভ্যাসেও অনেক কিছু করে। তা একদিন শান্তশীল দেখল মধুশ্রী ওকে দেখতে এসেছে। এ কথা ও কথা বলছে। শান্তশীলও কথাবার্তার মাঝখানের জানালা দিয়ে চড়াই পাখি দেখছে, এটা ওটা ভাবছে – চোখ বুজে নিজের গভীরে উঁকি দিচ্ছে – একসময় সে চোখ খুলে দেখল মধুশ্রী কখন উঠে চলে গেছে।
-- ভদ্রলোক সত্যিই আবেগহীন, নিষ্ঠুর টাইপ স্যার। ওর সাথে সংসার করা যায় না।
মৃদু হাসলেন ডাঃ দাশগুপ্ত। একটু থেমে বললেন, ‘স্বয়ং লেখকও বলেছেন – শান্তশীল এমনই আবেগহীন যে ওর বাপ মরার সময় এক ফোঁটা চোখের জল সে ফেলেনি। বরং এমন স্বাভাবিক আচরণ করছিল যে ওর মা পর্যন্ত রেগে উঠেছিল।’
-- মধুশ্রী উঠে চলে গিয়ে উচিৎ কাজ করেছে স্যার।
-- বলছো? হাসলেন ডাঃ দাশগুপ্ত। 'জানো অদ্রিজা, এর কিছু পরে শান্তশীল নিজের বেড থেকে নেমে পড়লো; সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছল নিজের বাড়ীতে।'
-- এ মা! অ্যাবস্কন্ডেড – পুলিশ বাড়ীতে যাবে তো!
-- তুমি এখনও ডাক্তার সেজে বসে আছ অদ্রিজা। গল্পে এসো। পুলিশকে বাড়ী পাঠাতে নার্স দিদিদের দু'ঘণ্টা লাগবে – সেই দু ঘন্টার গল্প শোন।
-- বলুন স্যার।
-- তা বাড়ীর কলিংবেলে চাপ দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল শান্তশীল। খানিক পরে আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে শান্তশীল আবিষ্কার করলো মধুশ্রীর ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখ, এলোমেলো পোশাক – তাড়াহুড়োয় হাউসকোটের বোতাম অন্য ঘাটে আঁটা, গালে টাটকা কামড়ের দাগ...
শান্তশীল ঘরে ঢুকে অনুভব করলো ওর বেডরুমের দরজা কেউ লাগিয়ে দিল নিঃশব্দে ভেতর থেকে। শান্তশীল তখনও শান্ত, শুধু বলল, সে বাথরুমে যাবে, দশ মিনিটে মধুশ্রী সবকিছু ম্যানেজ করে নিতে পারবে কিনা।
🍂
দশ মিনিটের বেশ কিছুক্ষণ পরে শান্ত শীল বাইরে এসে সোফায় বসল। ওর মুখে রাগ নেই, ক্ষোভ নেই, অপমান নেই। শান্ত গলায় শুধু বলল, 'বিছানার চাদরটা বদলে দাও।' মধুশ্রী তখন যেন পালাতে পারলেই বাঁচে। হঠাৎ শান্তশীল অনুভব করল, তার বুকে আবার কষ্ট হচ্ছে, দরদর করে ঘামছে, শরীর এড়িয়ে পড়েছে।
-- স্বাভাবিক স্যার। সেকেন্ড অ্যাটাক। ফাস্ট অ্যাটাকের রেশ না মিটতেই এতখানি স্ট্রেস – ইমিডিয়েট হাসপাতালে শিফ্ট করা দরকার।
-- মধুশ্রী ও সেই কথা বলল। শান্তশীল শান্ত গলায় বলল, 'ডাক্তার ডাকার দরকার নেই। আমি ভালো আছি; তুমি বরং কিছু খেতে দাও।
চুপ করে শুনছিল অদ্রিজা। ডাঃ দাশগুপ্ত বললেন, 'কী হে! বুঝলে কিছু?’
-- জীবন বড় জটিল স্যার। এখন বরং ভালো আছি।
-- তা আছো, কিন্তু জীবন তোমাকে এভাবে বেশীদিন থাকতে তো দেবে না। সব কিছুরই নির্দিষ্ট টাইম প্ল্যান আছে।
-- তাহলে ফর্টি থ্রির কী করবো? ছুটি দেবো কী?
-- ওদের বলে দাও স্যার বলেছেন নতুন একটা থেরাপি চালু করবেন। আরও কিছুদিন থাক।
-- কী থেরাপি হবে স্যার?
-- তোমার মুণ্ডু। ওটা আই ওয়াশ। যা চলছিল তাই হবে। এটা না বললে, প্রেশেন্ট পার্টি রোগীকে রাখবে কেন?
-- আমাদের এটা করে লাভ?
-- অদ্রিজা, জীবনে ভুলো না তুমি একজন ডাক্তার। ডাক্তারের কাজ একটা মানুষের শুধু রোগের চিকিৎসা করা নয়, তার মনের রোগের চিকিৎসাটাও তোমার এক্তিয়ার। ঐ মানুষটার জীবন, তার পরিবেশ, তার সমাজ, কোনও কিছুকে বাদ দিয়েই সে লোকটা নয়। চিকিৎসা মানেই তো 'আরোগ্য' নয়, আরোগ্যের চেষ্টা করাটাও চিকিৎসা।
-- কিন্তু একটা সামাজিক অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে না কি এতে?
-- আমরা প্রশ্রয় দেওয়া না দেওয়ার কে অদ্রিজা? মানুষের রিপু বড় সাংঘাতিক। আমরা ছুটি করে দিলে যে সব অন্যায় থেমে যাবে তা কিন্তু নয়।
-- কিন্তু স্যার ফর্টিথ্রির ব্যাপারে আপনিও তো বিষয়টা মেনে নিচ্ছেন। ঘটনাটা যাতে চলতে পারে আপনি তাতে সাহায্য করছেন। করছেন না কি? এটাও কি স্যার আমাদের এসকেপ এক্সকিউস হয়ে যাচ্ছে না? আমরা পেশেন্টকে সারাতে পারছিনা বলেই কি ...
একটু চুপ হয়ে গেলেন ডাঃ দাশগুপ্ত। উঠে এসে অদ্রিজার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন 'আমি নিজেকে কখনও সমাজ সংস্কারক হিসাবে দাবি করি না অদ্রিজা। তোমাকেও বলব চিকিৎসক হিসেবে তুমি সমাজের ন্যায়-নীতির বিচারে নিজেকে আবদ্ধ ক'রো না। তুমি শুধু রোগীর অসহায়াতাটা দেখ। আমি ডাক্তার হিসেবে ফর্টিথ্রির সেই অসহায়তার পক্ষ নিচ্ছি অদ্রিজা। আমি জানি এটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হবে না; বেশীদিন আমি আটকেও রাখতে পারবো না। যতদিন পারি বরং ওর মনের প্রটেক্টিভ মেকানিজম কে এসকেপ করতে সাহায্য করি। বাদবাকী শান্তশীলের মতো ওর মনের গভীরে কষ্টকে দূর করার ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। ঈশ্বর করুন সবকিছু সইতে সইতে সে যেন রক্ত মাংসের বাইরে অন্য কিছুতে গড়া মানুষ হতে পারে। সে সত্যিকারের শান্তশীল হয়ে যেতে পারে।
0 Comments