জ্বলদর্চি

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি (চতুর্দশপর্ব) চিত্রা ভট্টাচার্য্য


ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি  
(চতুর্দশপর্ব) 
চিত্রা  ভট্টাচার্য্য

প্রকৃতির সর্বত্র বিরাজিত হয়ে বিরহী কবি জন্ম জন্মান্তর ব্যাপী প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছেন চিরজন্মের সাথী’র একটুকু প্রাণের পরশ পাবার আশায়। তাঁর যুগযুগান্তরের অপেক্ষা সর্বসমক্ষে নয়, নিজেকে আড়ালে রেখে তিনি তাঁর কাঙ্খিত -আরাধ্যকে প্রেম নিবেদন করেন সঙ্গোপনে ,অন্তরালে থেকে।যৌবনের দূত ঋতু বসন্তের প্রকৃতির সাথে বিলীন হয়ে বরণের মালাগাঁথেন সকলের অলক্ষ্যে থাকা অবহেলিত সন্ধ্যামালতীর মত। কিন্তু তাঁর স্বপন চারিনী কে না পাওয়ার বেদনায় কবির ব্যাকুল হৃদয়ের সেই মনোবেদনা ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র প্রকৃতির বুকে। মানুষের জীবন যেন একটি দুর্গম ভ্রমণ পথ। পথের সন্ধানে বেরিয়ে সে গোলোক ধাঁধাঁয় পড়ে শুধু  পথ খুঁজে মরলে ও  আসল পথের হদিস পায়না । পশ্চাতে পড়ে থাকে  অসংখ্য স্মৃতির বোঝা।  
“আমি সন্ধ্যামালতী বনছায়া অঞ্চলে
লুকাইয়া রই ঘন পল্লব তলে ॥
বিহগের গীতি ভ্রমরের গুঞ্জন নীরব হয় যখন
আমি চাঁদেরে তখন পূজা করি আঁখি জলে। ‘
  সমগ্র প্রকৃতি আজ স্তব্ধ , কবির সাথে শোকবিহুল। অতীতের স্মৃতির বিধুরতা নিয়ে জীবনের পথে তার পরিক্রমার যাত্রা অনন্ত কালের ।' 
' বনের ছায়া গভীর ভালোবেসে 
আঁধার মাখায় দিগবধুদের কেশে
ডাকতে বুঝি শ্যামল মেঘের দেশে 
শৈলমূলে শৈলবালা নামে 
উদাস পথিক ভাবে। '' (পথহারা : দোলন-চাঁপা)

  পরমাত্মার প্রতি জীবাত্মার আকর্ষণ, যা কবিকে করে তোলে পার্থিব জীবনে বিরাগী। এমনই আবিষ্ট চিত্তে কবি চন্দ্রালোকিত পুর্ণিমারাতে লতার দোলনায় বাঁধা তাদের দোলনা দোলন-চাঁপা ফুলের সৌন্দর্যে দেখতে পেলেন শ্রীকৃষ্ণের লীলার ইঙ্গিত। চাঁদের উপস্থিতিতে যেন শ্যাম পল্লবরূপী কৃষ্ণের কোলে রাধার মিলন-  একই সঙ্গে অনেকগুলি স্বর্গীয় উপমা এনেছেন কবি দোলন চাঁপার রূপবর্ণনায় –
‘যেন দেব কুমারীর শুভ্র হাসি
ফুল হয়ে দোলে ধরায় আসি,
আরতির মৃদু জ্যোতি-প্রদীপ-কলি
দোলে যেন দেউল আঙ্গিনাতে ॥
… … …
ও যেন মুঠিভরা চন্দন গন্ধ
দোলেরে গোপিনীর গোপন আনন্দ
ও কিরে চুরি করা শ্যামের নূপুর
তন্দ্রা যামিনীর মোহন হাতে ॥’

কবি নজরুল ইসলামের প্রকৃতির প্রতি বস্তুলী বা বাহ্যিক দৃষ্টির পাশাপাশি আত্মলীন বা অন্তর্নিহিত দৃষ্টিভঙ্গিও আরোপ করেছেন, যেখানে তিনি প্রকৃতিকে কেবল সৌন্দর্যের আধার হিসেবেই দেখেননি, বরং এর প্রতি এক গভীর প্রেম ও মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন, এবং কখনও কখনও প্রকৃতির উপর নিজের প্রেম বা বেদনাকে আরোপ করেছেন, যেমনটি তার 'দোলন-চাঁপা' কাব্যগ্রন্থের কিছু কবিতায় দেখা যায়।  কিন্তু বাহ্যিক দৃষ্টির কারণেই প্রকৃতির বর্ণনা তাঁর কবিতায় এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। মানুষের আশা বেদনা ও জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছে তাঁর বস্তুলী দৃষ্টিভঙ্গির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।  

  প্রেম ও প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা রচনার ক্ষেত্রে কবি নজরুল অনন্য। চেয়েছিলেন গ্লানিমুক্ত ব্যবহারিক জীবন তাঁর অন্তবৃত্তিগুলোকে বিকশিত ও সুষমামণ্ডিত করে তুলবে। বহিজীবনের আনন্দ অন্তবৃক্ষের মূলে রস যোগাবে-ডালেডালে লতায়পাতায় ; প্রাণের সঞ্চারে আত্মাকে করবে মহিমান্বিত। মানুষের ব্যবহারিক জীবনকে রাষ্ট্রিক পেষণ ও সামাজিক কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে সহজ মনুষ্যত্বের আলোকে সুন্দর ও আনন্দপূর্ণ করে তোলাই ছিল নজরুলের সাধনা। তিনি আদর্শ ও নীতি প্রচার করেছেন, কোথাও তত্ত্ব প্রচার করেননি।শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে বলেছেন '' যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ। –
দেশমাতৃকার শৃঙ্খলিত অবহেলিত রূপে গভীর শোকাহত কবি জীবন উৎসর্গ করলেন স্বদেশের মুক্তির সাধনার  ।  শান্ত সমাহিত নিশ্চিন্ত ধারায় অন্তৰ্জীবনকে অতিবাহিত করার কথা কখোনো ভাবেন নি।যে স্পর্শ-চঞ্চলতা ও ভাবালুতা তাঁকে বিপ্লবী করেছিল, সে-প্রাণময়তাই তাঁকে প্রণয় ব্যাপারেও উচ্ছ্বাসী এবং হৃদয়ধর্মী করে রেখেছিল। গ্লানিমুক্ত ব্যবহারিক জীবন অন্তবৃত্তিগুলোকে বিকশিত ও সুষমামণ্ডিত করে তুলবে, বহিজীবনের আনন্দ অন্তবৃক্ষের মূলে রস যোগাবে-কাণ্ডে ফোঁটাবে ফুল; দেহকে করবে পুষ্ট, আত্মাকে করবে মহিমান্বিত।
 
নজরুল বিপ্লবের কবি, প্রাণপ্রাচুর্যের কবি, জীবনবাদের কবি! তাঁর কাব্যে  পৌরুষ-ব্যঞ্জনা ও দৃঢ়তার অপরিমেয়,  কিন্তু প্রেম প্রণয়ে শিশুর মতো অবুঝ ,অসহায় কবি,মনোবেদনায়  অশ্রুর আবেদন ছাড়া তাঁর আর গতি নেই। যে-কবি শক্তির পূজারী, মনোবলের উদ্গাতা, আপনার সীমাহীন শক্তির উত্তেজনায় যিনি সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে নতুন করে গড়ার প্রয়াসী: সে-কবির প্রণয় রাজ্যে অসহায়তা ও রিক্ততার সকরুণ হাহাকার পরমাশ্চর্যের দাবি রাখে! এই অদ্ভুত অসামঞ্জস্যের কারণ খুঁজলে বোঝা যাবে–কবির হৃদয় উচ্ছ্বাসপ্রবণ ও কোমল। ব্যবহারিক জীবনের ঘনঘটায় যে-উত্তেজনা যে রক্ত ক্ষরণ নিরন্তর হয়ে চলে, তাঁর প্রণয়ের ব্যাপারে সে ব্যর্থতার কান্না ও হাহাকার এনে দেয়। একই হৃদয় বৃত্তির দুটো দিক : উচ্ছ্বাস-উত্তেজনায় ঝাঁপিয়ে পড়া আর কেঁদে লুটানো আগুন জ্বালানো আর অশ্রু-ঝরানো। এজন্যেই তাঁকে একান্তভাবেই হৃদয়ধর্মী বলাযায়। হৃদয়-উদ্ভুত সত্যনিষ্ঠাই তাঁর রচনার প্রাণ। তাই বিপ্লবী কবির রচনায় ভাঙ্গার গান আছে, গড়ার পরিকল্পনা নেই।
তাঁর  প্রণয়-কাব্যে তিনি শেলী, ব্রাউনিং বা রবীন্দ্রনাথের মতো সূক্ষ্ণ দার্শনিক তত্ত্বের বিশ্লেষণ রেখে যাননি , এক অতীন্দ্রিয় প্রেমরাজ্যে বিহার প্রয়াসী নন।  
যা কিছু সুন্দর হেরি করেছি চুম্বন,
যা কিছু চুম্বন দিয়া করেছি সুন্দর–
সে সবার মাঝে যেন তব হরষ…
অনুভব করেছেন, এবং—
কথা কও কথা কও প্রিয়া
হে আমার যুগে যুগে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া  
—[অনামিকা]
 কবি দেহনিষ্ঠ মানবীয় ভালোবাসার প্রধান সপ্রতিভ স্তুতিকার। মানুষের দেহ, মন, প্রাণ, কর্ম সবকিছু যে-দেশে দেবতার নামে উৎসর্গীকৃত; অধ্যাত্মপ্রেম ছাড়া যে-দেশে অন্য প্রেমের কোনো স্বীকৃতি নেই, সে-দেশে সে-সমাজে নিয়ম ভেঙে এমন প্রণয়সাধনার দুঃসাহস তাঁরই কাব্যধারায় এক নতুন দিগন্তের দিক নির্ণয় করলো। কাব্য সাহিত্যের আকাশে ঝড় তুলেছিল।  
কিন্তু কবির শরীরনিষ্ঠ সে সাধনায়  অসংযম ,ক্লেদ-পঙ্কিল বীভৎসতা কোথাও প্রকট হয়ে উঠেনি। এ দেহসর্বস্ব প্রণয়েও পবিত্রতা এবং সুষমা কোথাও অস্বীকৃত হয়নি। তাঁর দোলন চাঁপা, ছায়ানট পূবের হাওয়া ও বুলবুলের কবিতা ও গানগুলোতে এবং আরো অনেক গানে এই উক্তির সমর্থন পাওয়া যায়।  নজরুল প্রেমের সাধক হলেও আত্মার অস্তিত্ব ও প্রভাব অস্বীকার করেননি। এজন্যেই উদ্বেল ভাবাবেগে কবি এখানে-সেখানে শরীরের সঙ্গে আত্মাকে এবং আত্মার সঙ্গে দেহকে মিলিয়েছেন । ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য অস্পষ্ট হয়েছে , অসংগতি দেখা গেলে ও প্রকৃত ভাব অটুট রয়েগেছে  ।
নজরুলের গবেষকদের মতে তাঁর কাব্যে প্রণয়তৃষ্ণার গভীরতার  এবং বিপুলতা নেই প্রণয়-সাধনা বিচিত্ররূপে ও প্রকাশিত হয়নি। মর্মভেদী অশ্রুর আবেদন ছাড়া দ্বিতীয় সম্বল নেই তাঁর। নারীর হৃদয় জয় করবার জন্যে তিনি সচেষ্ট মরীয়া।তবু সর্বত্র ব্যর্থতার মর্মভেদী হাহাকার ও গাঢ় বেদনার মূৰ্ছনা প্রকট হয়ে উঠেছে। যে-কবির হৃদয় ও বাণী অগ্নিক্ষরা এবং যাকে বলদৃপ্ত, দৃঢ়চিত্ত, দাম্ভিক ও সীমাহীন ব্যক্তিত্বশীল বলে মনে হত, তিনিই ব্যর্থ প্রেমের আঘাতে মুহ্যমান হয়ে  নিতান্ত অসহায়ের মত এক ব্যথিত চিত্ত ।এতে বোঝা যায়, কবি যা ই বলুন না কেন, আসলে তাঁর হৃদয় যে কঠিন কঠোরের আবরণে বড় দুর্বল, বড়ই কোমল।     
 বুকে বাজে হাহাকার করতালি,
কে বিরহী কেঁদে যায় খালি সব খালি
ঐ নভ, এই ধরা, এই সন্ধ্যালোক
নিখিলের করুণার যা, কিছু তোর তরে 
তাহাদের অশ্রুহীন চোখে।
—(বেলা শেষে)
 অথবা
কান্নাহাসির খেলার মোহে অনেক আমার কাটল বেলা,
আজকে বড় শ্রান্ত আমি আশার আশায় মিথ্যা ঘুরে।
—(উপেক্ষিত)
 অথবা-
 চাই যারে মা তায় দেখিনে।
ফিরে এনু তাই একেলা
পরাজয়ের লজ্জা নিয়ে বক্ষে বিঁধে অবহেলা
 বিশ্বজয়ের গর্ব আমার জয় করেছে ঐ পরাজয়
ছিন্ন আশা নেতিয়ে পড়ে ওমা এসে দাও বরাভয়।
হৃদয়-জগতে অহঙ্কার থাকলে আর যাই হোক প্রণয়ে সিদ্ধি নেই। তাই কবির অহঙ্কারের এমন ধূল্যবলুণ্ঠিত অবস্থা–এমন লাঞ্ছনা। আমিত্ব ও ব্যক্তিত্বের বিলোপ সাধনের দ্বারাই প্রণয়ে সাফল্য সম্ভব। তিনি অনুভব করেন পূর্ণ আত্মসমর্পণের দ্বারাই প্রণয়ের মূল্য দিতে হয়।নজরুলের প্রণয়-সাধনা একটানা ব্যর্থতার ইতিহাস, তবু সেখানে  আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন তাঁর সহধর্মিনী। তবে যে-সুর তাঁর কাব্যে প্রবল ভাবে বেজেছে তা হতাশার–ব্যর্থতার–নৈরাশ্যের ও বেদনার সুর , সে সুরে ক্ষোভও কম নয়।
বায়ু শুধু ফোঁটায় কালিকা
অলি এসে হরে নেয় ফুল।
এই ব্যর্থতাও–স্মৃতি সুখময় হয়ে হৃদয় ভরে রইল। কারণ–
না চাহিতে বেসেছিলে ভালো মোরে
তুমি শুধু তুমি
সেই সুখে মৃত্যু-কৃষ্ণ অধর ভরিয়া
আজ আমি শতবার করে
তব প্রিয় নাম চুমি।
শুধু তাই নয়, কবির উপলব্ধির জগৎ ও প্রশস্ততর হয়েছে। প্রেয়সীকে পাওয়া নাই-বা গেল, কিন্তু প্রণয়ানুভূতি তো চিরন্তন হয়ে রইল, তাই-তার চরম পাওয়া ?
মরিয়াছে অশান্ত অতৃপ্ত চির স্বার্থপর লোভী
অমর হইয়া আছে, রবে চিরদিন,
তব প্রেমে মৃত্যুঞ্জয়ী
ব্যথা-বিষে নীলকণ্ঠ কবি।–(পূজারিণী)
এবং
যেদিন আমায় ভুলতে গিয়ে
করবে মনে, সেদিন প্রিয়ে।
ভোলোর মাঝে উঠব বেঁচে সেইতো আমার প্রাণ
নাইবা পেলাম চেয়ে 
 গেয়ে গেলাম গান।
—(গোপন প্রিয়া)
 
নজরুলের পূজারিণী এ কাব্যের শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা। কবির প্রেমানুভূতির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন তাঁর জীবন্ত মানস প্রতিমা। কবি প্রেয়সীকে পূজারিণী কল্পনা  করাতে প্রেমের একটা পবিত্র রূপ ফুটে ওঠেছে। কবিতাটিকে তাঁর প্রণয়-দর্শনের প্রতীকরূপে বর্ণনা করাযায় । এ কবিতায় প্রেম রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে কবি দুজনের জন্ম-জন্মান্তরের মিলন-বিরহ, আশা-নৈরাশ্য, মান-অভিমান প্রভৃতির দ্বন্দ্বমুখর ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। কারণ কবিতায় তাঁর প্রণয়াদর্শের স্বরূপ পূর্ণরূপে উদঘাটিত হয়েছে । এখানে প্রেমের আদি, মধ্য ও পরিণতির একটা স্পষ্টরূপ ধরা পড়েছে। দেহ-কামনা এবং কাম-বিরহিত প্রণয়ানুভূতির সুন্দর সুষ্ঠু প্রকাশ এমনি করে আর কোনো কবিতায় বা গানে দেখা যায়নি। শুধু এ কবিতাটিও কবিকে অমরতা দান করতে পারে। এ প্রসঙ্গে সমর্পণ পুবের চাতক চপল সাথী কবি-বাণী, অভিশাপ, অবেলার ডাক প্রভৃতি কবিতাও স্মরণীয়। অনামিকায় কবি পরমের সঙ্গে অনন্ত প্রেমের সন্ধান পেয়েছেন।  
🍂

পূজারিণীর পরিচয়ে কবি বলেন,
'চিরপরিচিতা তুমি জন্ম জন্ম ধরে মোর অনাদৃতা সীতা।"
অথবা 
প্রেম সত্য প্রেম-পাত্র বহু অগণন;
 তাই চাই বুকে পাই, তবু কেঁদে উঠে মন,
মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়,
যে পাত্রে ঢালিয়া খাও, সেই নেশা হয়।
     এ কবিতায় কবির নারীপ্রেম ও প্রকৃতি প্রেম দিব্যরাগে বিভাসিত।  আপন হৃদয়াবেগ ব্যক্ত করতে গিয়ে কবি  বলেন, ---                 খুঁজে ফিরি কোথা হতে 
                                     এই ব্যথা ভারাতুর মদগন্ধ আসে 
                                         আকাশ, বাতাস, ধরা কেঁপে কেঁপে ওঠে 
                                                    শুধু মোর  তপ্ত ঘন দীর্ঘশ্বাসে।
                                             'আশান্বিতা' কবিতায় প্রেমের চিরন্তন  আশ্বাসের সুর ধ্বনিত।প্রেমিকা জানে তাঁর নাথ একদিন ডাকে সাড়া দেবেই। তাই প্রত্যাশার  দরজা খুলে অন্তহীন তাঁর পথ চাওয়া  আশায় আশায় উদ্বেল।  এ আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে  প্রকৃতির আশ্রয়ে—
"আসবে  আবার পদ্মা নদী, দুলবে তরী ঢেউদোলায়  
তেমনি করে দুলবো আমি তোমার বুকের পরকোলায় । 
'কবি-রাণী 'কবিতায় নজরুল তাঁর কবিতার উৎস সন্ধানে তৎপর । কবি-রাণী কবি -প্রেমের  অমৃতময় মানসী। যার সংস্পর্শে কবিতার উৎসমুখ খুলে যায়।  বিদ্রোহের  কঠোর অসিতে জাগে বাঁশির ললিতমোহন মূর্ছনা । একই সাথে  প্রকৃতির সাথেও কবি গভীর  একাত্মতা খুঁজে  পান। তাঁর মনে হয়,
"আপন জেনে হাত বাড়ালো
আকাশ, বাতাস  প্রভাত আলো
বিদায় বেলার সন্ধ্যাতারা পুবের অরুণ রবি
তুমি ভালোবাসো বলে ভালোবাসে সবি। 
 এখানে মানসীর প্রেমদর্পণে কবি আত্মস্বরূপের প্রতিফলন দেখতে পান। নজরুল কাব্যে এসব অংশে তার প্রকৃতি প্রীতি শতধারায় উৎসারিত। 
  
কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যে প্রেম বা রোমান্টিসিজম সম্পর্কে বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেছেন, ‘‘প্রকৃতির মাঝে আত্মভাবের বিস্তার এবং একই সাথে প্রকৃতির উপাদান সান্নিধ্যে অন্তর ভাবনার উন্মোচন রোমান্টিক কবির সহজাত বৈশিষ্ট্য। ‘চক্রবাক’ কাব্যে নজরুলের এই রোমান্টিক সত্তার প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইতোপূর্বের কাব্যগুলোয়ও আমরা নজরুলের প্রকৃতি চেতনার পরিচয় পেয়েছি কিন্তু ‘চক্রবাক’-এ এসে লক্ষ করছি, এখানে প্রকৃতি নজরুলের প্রজ্ঞাশাসিত ও অভিজ্ঞতালব্ধ মানসতার স্পর্শে এসে হয়ে উঠেছে সংযত, সংহত এবং শূন্যতা তথা বেদনার প্রতীকী ধারক।’’ 
নজরুলের ব্যক্তিজীবনে যেমন একধরনের চাঞ্চল্য, অস্থিরতা, অস্বস্তি ও অতৃপ্তি ছিল; তাঁর সাহিত্যিক জীবনেও ছিল তেমনি একপ্রকারের ক্ষোভ, তৃষ্ণা, অতৃপ্তি ও বেদনাবোধ। প্রথম জীবনের বাউণ্ডেলের আত্মকথা, রিক্তের বেদন থেকে তাঁর শেষ রচনায় অবধি তা প্রায় অবিচ্ছিন্নভাবে উপস্থিত। কোনো পাওয়াতেই যেন তাঁর মন ওঠে না। না পাওয়ার ক্ষোভ আর পেয়ে হারানোর বেদনাই যেন তাঁর জীবনব্যাপী একটা আর্তনাদ—একটা হাহাকার রূপে অবয়ব নিয়েছে। তাই নজরুল বেদনা-বিক্ষুব্ধ ঔপন্যাসিক, বিপ্লবী সংগ্রামী কবি এবং প্রত্যাখ্যান-বিক্ষুব্ধ ও বিরহী প্রেমিক।
  তাঁর জীবনের স্বরূপ, তার অন্তর ও কবি-জীবনের পরিচয়, তাঁর সাধনা ও জীবনোপভোগের পদ্ধতি, তার অন্তর্জগৎ ও বাহ্যজগতের দিগদর্শন একটিমাত্র কথায় যথার্থভাবে প্রকাশ পেয়েছে।পরিশেষে সহজেই বলা যায়  নজরুল সংগ্রামে যেমন তেজস্বী কঠিন কঠোরতার পরিচয় দিয়েছেন  প্রণয়ে তেমনি কোমল কুসুমের মত নরম ।

Post a Comment

0 Comments