নন্দবাবুর মন্দ কপাল
বাসুদেব গুপ্ত
-আপনি বললেন না মায়ামার ফাইলস সিনেমাটা দেখতে, বললেন দেখো অনেক শিক্ষণীয় আছে।
-বললাম তো। কেন ভালো লাগে নি? ভালো নাও লাগতে পারে, কিন্তু আজকাল সব ছবিতে অনেক শেখার থাকে, মন দিয়ে দেখতে হবে।
-দেখতে আর পারলাম কই। রাস্তায় ঝমঝম করে বৃষ্টি এলো, ভিজে জ্বর এলো, সেই জ্বর সাতদিনেও যাচ্ছে না, আমার ডাক্তার ক্লাসমেট বলল ছোট কোভিড হচ্ছে, দেরী হবে।
-খুব সাবধানে থেকো, কাশি হলে গারগল করো দুবার,
-দূর আবার আপনার কথা শুনি, আর গলায় জল আটকে মরি আর কি। আপনি না বললে তো সিনেমা দেখতেই যেতাম না। আপনার জন্য এসব হোলো।
-যত দোষ -
-নন্দদা কি আর করবেন, নামটা তো আপনার হাতে নয়।
শ্রী নন্দ দুলাল ঘোষ এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। কাউকে ভয়ে কিছু পরামর্শ দিতে চান না। কি একটা হয়ে যাবে, এসে বলবে নন্দদা এটা আপনার জন্যই হল সব আপনার দোষ।
সেই ছোটবেলা থেকে চলছে। তাঁর খাতা থেকে পরীক্ষায় টুকে ফেল করল পিছনে বসা সুশান্ত দত্ত। অথচ তিনি পেলেন ৯০। তারপর রাস্তায় কলার ধরে কি ভড়কানি। নন্দ যে অঙ্কগুলো পড়তে ভুল করেছিল, পরে রিভিশানের সময় আবার ঠিক করেছে, সেটা তো আর টোকেনি সে।
🍂
-তোর দোষেই আমি ফেল করলাম অঙ্কে। বাড়ীতে বাবা প্যাঁদানি দিল। তুই ভুল অঙ্ক টোকার জন্য রেখেছিলি কেন? সব তোর দোষ। পরের দিন ক্লাসে বোর্ডে বড় বড় করে লেখা যত দোষ নন্দ ঘোষ। অঙ্কের স্যারও খুব হাসলেন। নব্বই পেয়ে অঙ্কে টপ হলেন ন্তু সম্মান পেলেন না নন্দ।
ক্রিকেট কোচিং চলছে, একটা করে বল করছেন আর ব্যাটার অর্জুন ছাতু করছে। কোচ এসে ধাতানি দিলেন, বললেন স্পীড তোলো, কি লেডিস ক্রিকেটের মত বল করছ। তাই শুনে নন্দ একেবার তিরিশ পা মেপে মেপে দৌড়ে এসে প্রাণপণ জোরে বল করলেন, বল বাউন্স করল, আর ব্যাটারের একটা দাঁত ছিটকে গেল। অর্জুনের বাবা সরকারী অফিসার। নন্দের বাবার কাছে ক্ষতি পূরণ আদায় করলেন। বাবা এসে কানটি ধরে বললেন,
-খুন করার লগে তরে খেলতে পাঠাইসি?
নন্দ যত বোঝাতে যায়, কে শোনে। চোখ মুছে শুতে যাবার সময় বালিশের নীচে খড়মড় করে উঠল একটা কাগজ। তাতে লেখা ঐ, যত দোষ নন্দ ঘোষ। শয়তান ছোট ভাইএর কাজ।
এমন নামের লোক যে প্রেমে ব্যর্থ হবেন এ আর আশ্চর্য কি। দেখতে শুনতে ভাল, খেলোয়াড়ী চেহারা। গলাটা হেঁড়ে, ঠাকুমা ছাদে পাঠাতেন কাক তাড়াবার জন্য। একবার জলদপাড়া বেড়াতে যাবার সময় বন্ধুরাও বলেছিল, চল, বাঘ এলে তুই হাঁক দিবি, বাঘ পালাবে। সব মিলিয়ে মেয়েদের সঙ্গে সুবিধে করে উঠতে পারেন নি নন্দ। সবাই আড্ডা দিচ্ছে ক্যান্টিনে, উনিও বসে পড়লেন হাসি হাসি মুখ করে। সেখানে মিলিও আছে। সেটাই মূল কারণ। উৎসাহ পেয়ে গুল মারলেন,
-আজ আমার জন্মদিন। আমি সবাইকে চা খাওয়াবো।
ও তাই নাকি, হ্যাপী বারথডে বলে সবাই গান গেয়ে উঠল। মিলি কেমন গম্ভীর মুখ করে আমার কাজ আছে বলে উঠে গেল। নন্দের গুল মারাটাই বৃথা গেল। বেজার মুখে চা খেয়ে ক্লাসে ঢুকতেই পিছন থেকে মিলির গলার শব্দ। রোমাঞ্চকর বললে কম বলা হয় না।
-নন্দদা, হ্যাপী বারথডে। আমার কটা অঙ্ক পারছি না একটু দেখিয়ে দেবেন?
নন্দের গায়ে তখন একশো ভোল্টের অল্টারনেটিং কারেন্ট মলয়পবনের মত বয়ে যাচ্ছে। হেঁড়ে গলা যত সম্ভব নরম করে বলল,
-থ্যাঙ্ক ইউ। নিশ্চয়ই দেব। তোমার খাতাটা দিও, করে দেব।
সেদিন ক্রিকেট প্র্যাক্টিস বন্ধ করে নন্দ চলে গেল বাড়ী, মন দিয়ে অঙ্কগুলো করল, তারপর কি খেয়াল হল, ছোট্ট করে এক কোণে লিখে দিল I LU.
মিলির বাবা রাজনৈতিক নেতা, দাপুটে, এবং তোলাবাজ। মিলি খুবই নরম স্বভাবের, কিন্তু তোলাবাজিটা তার স্বভাবে। এভাবে একে তাকে দিয়ে সে হোম টাস্ক করিয়ে নিয়েই থাকে। এই খাতাটাই ও সাবমিট করে দিল স্যারের কাছে।
সেই খাতা গেল মিলির বাবার কাছে। তাঁর কড়া অরডার ছিল, মেয়ে যেন কোন ছেলের সঙ্গে মাখামাখি না করে, কোন সন্দেহ হলেই যেন জানানো হয়।
মিলি আর কলেজে এলো না। অনেক দিন পরে নিউ মার্কেটে বাজার করতে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা । চোখ মুখ বসে গেছে। বলল, বাড়ী থেকে বিয়ে দিয়েছিল, বর পেটায়, তাই আবার বাড়ী চলে এসেছে। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে যাবার সময় বলে গেল, সব দোষ আপনার নন্দদা, কেন ওসব ছাইপাঁশ লিখতে গেলেন।
যত দোষ---- সত্যিই কি ভীষণ অভিশাপ এই নাম আর সারনেমের কমবো। অথচ কিছু করার নেই। এই কমবো তাঁর গায়ে কাঁটাফ্লের মত লেগে থাকবে, বা পিছন পিছন ঘুরবে পাড়ার কুকুরের মত, এর থেকে ছাড়ান নেই। আজ এই মাঝচল্লিশে পৌঁছে মাঝে মাঝে কাঁদতে ইচ্ছে করে। মেয়ে পালিয়ে গেছে এক ক্লাসমেটের হাত ধরে, বৌ সুমিত্রার মতে নীচু জাতের, বিয়েতে তার ছিল ভীষণ আপত্তি। প্রথম দেখেই বলেছিল, ভুরুগুলো জোড়া, আর চোখ আর নাকের পজিশান দেখ, এ নিশ্চয়ই ঐ বিসিফিসি কিছু হবে।
নন্দ নিজের নাম নিয়ে এত কষ্ট সত্বেও খুব উদার প্রগতিশীল বলে তাঁর খুব গর্ব। তিনি উদার হেসে বললেন একটু এগোও সুমিত্রা কতদিন আর পড়ে থাকবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে।
সেই মেয়ে বি এ পাস না করেই বিয়ে করার আবদার ধরল, ছেলে নাকি যাবে বাঙ্গালোরে, বড় আইটি কম্পানীর কাজে। মার প্রবল আপত্তি। অগত্যা একদিন ডুব, মেসেজ এল, উই আর ম্যারেড অ্যান্ড হ্যাপী। লাভ ইউ ড্যাডি।
সুমিত্রা পা ছড়িয়ে কাঁদল, তারপর বলল এত বললাম তুমি ওদের আটকালে না, মেয়েকে আস্কারা দিয়ে মাথায় তুলেছ। সব দোষ তোমার, নামটা দেখেছ?
তা আর দেখেন নি। কিন্তু কিই বা করা। চিরকাল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েই কাটিয়ে গেলেন।
আজ তাঁর খুব মন খারাপ। একটা টেন্ডারের কোটেশান দেওয়া নিয়ে কেচাল। নিজের দক্ষতা নিয়ে চিরকাল গর্ব, চটপট এক্সেল বানিয়ে হিসেব টিসেব করে দারুণ একটা কোটেশান লিখে দিলেন। লাভও হবে আবার এল ওয়ান থাকবে, অরডার পাওয়া নিশ্চিন্ত। পাঠিয়ে দেওয়ার পরেই ডিভিশনাল ম্যানেজারের ফোন।
-‘এত তাড়াহুড়োর কি হল। আমরা ভিতরে নেগো করছিলাম, দাম অনেকটা বাড়িয়ে নেওয়ার, বোঝেন তো কমিশানের ব্যাপার। আপনি দিলেন সব কেলো করে। ‘
সেই অরডার এক্সেপ্টও হয়ে গেল, কম্পানীর ডাহা লস। ডিভিশনাল ম্যানেজার ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করে দিলেন। কাজল তাঁর চিঠি মুসাবিদা করে দেয়, এ আই দিয়ে, তাকে দুখের কথা বলতে গেলেন। সে বলল, কি আর করবেন স্যার, আপনার যা নাম আর সারনেম। আপনি গোমেদ পরে দেখতে পারেন। কিন্তু গরুর মেদে কি আর তাঁর নাম বিপত্তি ঘুচবে? তিনি তো আর ভোটে দাঁড়াচ্ছেন না।
সবাই বাড়ী চলে গেছে, সন্ধ্যে থেকে আই পি এল ম্যাচ, তিনি একা ক্যান্টিনে বসে আছেন আর চা খেয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় আবির্ভাব উকিল কুণাল সেনের। আগে অফিসের কেসের ব্যাপারে পরিচয় ছিল, আজ একলা বসে থাকতে দেখে উনি এগিয়ে এসে বসলেন, উলটো দিকে। চেয়ারটা টানলেন খড়খড় করে, দু তিন বার হুস হুস করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“কি ব্যাপার একলা বসে যে, বাড়িতে কোন সমস্যা নাকি? ওয়াইফের সঙ্গে সংঘর্ষ? এই বয়সে এটা আকছার হয়, একেই তো বলে মিডোয়াইফ, আই মিন মিডলাইফ ক্রাইসিস। বলুন তো ডিভোর্স দিই একটা ঠুকে।“
মুখ ব্যাজার করে নন্দ বললেন, “আর মিডলাইফ, ফিফটি ফাইভ হবে সেপ্টেম্বরে, বলুন লাইফ এন্ডিং ক্রাইসিস।
উকিল মানুষ ফেলুদা না হোন, চোর জালিয়াত ঘেঁটে অভ্যেস, ঠিক বার করে ফেললেন কেসটা কি। শুনে খুব সমবেদনার সঙ্গে বললেন,
‘ আর বলবেন না, আমার আর কিছু ক্লায়েন্টেরও একই অবস্থা। তবে তাঁদের সমস্যা নানারকম, দোষের ভাগী হওয়া নয়, নামের জন্যই কেউ পাত্তা পায় না, কাউকে দেখলেই লোকে হাসতে থাকে, যাই হোক সেসব মক্কেলের সিক্রেট, আপনাকে বলা যায় না। একটা আইডিয়া এসেছে। কেস করতে হবে। ক্লাস একশান সুট’
‘না না ক্লাস স্ট্রাগল আপনাকে করতে হবে না, আর গোলাগুলি চালানো এখন আর কেউ করে না, সে সব সত্তরের দশকে অনেক হয়েছে।‘ শুনে কুণাল একটু বেজার হলেন, তিনি আবার বামপন্থী আইনজীবি হিসেবে পরিচিত।
‘ক্লাস স্ট্রাগল না, ক্লাস একশান, মানে একই অবিচারের শিকার অনেক মানুষ, তাই সবাইকে নিয়ে বিচারব্যবস্থার কাছে আবেদন, এর একটা বিহিত করার জন্য’
কেসের কথায় নন্দর ভয় ধরল, “কিসের কেস, কেন কেস। আমাকে কি ঐ ডিভিশনাল ম্যানেজারের এগেন্সটে কেস করতে হবে নাকি? দূর, ইনক্রিমেন্ট গেছে, এবার চাকরিটা যাবে, পাগল নাকি?”
-ঘাবড়াবেন না, আমি কুণাল উকিল, অবিচারের চোয়াল থেকে বিচার টেনে বাইরে নিয়ে আসাই আমার কাজ। যা না মুমকিন, তাই আমি মুমকিন করি।
একটা সিগারেট বার করুন দেখি। ও আপনার আবার এসব চলে টলে না। ঠিক আছে, চলুন একটা বারে গিয়ে একটু বসা যাক। ব্রেন স্ট্রমিং করতে হবে।“
উকিল যাকে ধরেছে একবার, সহজে ছাড়ে না। উকিলরা নিশ্চয়ই মানুষের ভালোর জন্যই কাজ করেন। তাঁদের পেশাও পবিত্র। লোকে পাঁচ বছর ধরে হাজতে পচতে থাকে, কেস ওঠে না, সেটা তো আর উকিলদের জন্য না, আমলাতান্ত্রিক ব্রিটিশদের যত নিয়মকানুন এখনো চলছে, তাই। সবার মত নন্দও মেনে নেন এসব, তিনি তো আর ট্রাম্পভক্ত না যে জজ ধরবেন আর ছাঁটাই করবেন।
বারে বসে দুটো বিয়ারের অরডার দিয়ে অনেক কথা হল, প্ল্যান হল, কুণাল বললেন দেখুন এক মাসের মধ্যেই আমি একটা ঠুকে দিচ্ছি।
নন্দের বৌ সুমিত্রা মুখে বিয়ারের গন্ধ দেখে রেগে কাঁই। তার একটাই প্রশ্ন কার সঙ্গে বসে মদ খেতে গেলে, একবার খালি তার নামটা বল, আমি এমন ধাতানি দেব, জীবনে আর তোমায় মদ খেতে নিয়ে যাবে না। মেয়েরা এই মদ কথাটার ওপর একটা অদ্ভুত জোর দিয়ে বলে, তখন মনে হয় সত্যিই একটা নোংরা পাপ করে ফেলেছি। কিন্তু নন্দ কিছুতেই উকিলের নাম বললেন না, তারপর সুমিত্রা ওকে ফোন করে ঝাড় দেবে- উকিল রেগে গেলে কি যে হতে পারে ভাবলেই শিউরে ওঠেন। আমতা আমতা করে বললেন, -ক্লায়েন্ট বলল, কি করব, নিয়ে গেলাম।
কেসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ও চারদিকে দোষের ভাগী হতে হতে, অবশেষে একদিন ডেট পড়ল মামলার।
আজ সেই দিন। কাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছে, আজ কি করে কোর্টে যাবেন সেটা নিয়ে খুব চিন্তা ছিল। কিন্তু সকাল থেকে সব পরিষ্কার। ঠিক ৭টায় ফোন এলো কুণাল সেনের। সুমিত্রা তখন চা করতে ব্যস্ত, তাও ফোনের আওয়াজ ঠিক শুনেছে, চা খেতে খেতে প্রশ্ন
‘কি ব্যাপার সকালে কার ফোন, কোন সহকরমিণীর নাকি? তোমার তো ঐ গুণধর মেয়ের ছাড়া কোন ফোন আসে বলে জানতাম না।‘
‘সকাল বেলাতেই জেরা শুরু করলে, সারা দিন আজ’, বলেই খেয়াল হল, ব্যাপারটা গোপনীয়। তাড়াতাড়ি কথা ঘোরালেন,
‘ঠিক বলেছ, অফিস থেকে কাজলের ফোন। একটা ইন্টারভিউ আছে, বৃষ্টির জন্য আবার অফিস কেটে না দি, তাই মনে করাচ্ছিল।‘
পাপ স্বীকার করেছে , মাপ করে দিলাম এমন একটা ভাব করে সুমিত্রা কথা ঘোরালো, নন্দও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
কোর্টে গিয়ে তেমন কিছু ঘাবড়াবার মত দেখলেন না নন্দ। যেমনটা ভেবেছিলেন ঠিক তেমনি লাগলো, কত নিউজে, টিভিতে বিচারক এই অব্জারভ করেছেন, একে বকে দিয়েছেন, আর এই পুরনো ইট উঠতে থাকা বিশাল বাড়ীর উঁচু উঁচু ঘর, তাতে পুরনো বাংলা সিনেমার মত ঘটাং ঘটাং করে চার ব্লেডের পাখা ঘুরছে, এই ছবি তো মনে ছিল। তার সঙ্গে জানা ছিল গট গট করে পেঙ্গুইনের মত প্রচুর মানুষ এদিকে ওদিকে ঘুরছেন, একটা ধারে অনেকে টেবিল পেতে বসে, তারা নানা রকম কাজ করে দেয়, এপিঠওপিঠ থেকে নোটারী, তার সঙ্গে জেরক্স কি নেই।
কুণাল ঢুকলেন গেট দিয়ে, ততক্ষণ নন্দ লোক দেখছিলেন মন দিয়ে। কুণাল ঢুকলেন আর পিছনে ঢুকলেন আরো চারজন, বিভিন্ন বয়সের লোক। নন্দ এগিয়ে গিয়ে সামনে বোকার মত দাঁড়িয়ে কি বলবেন ভাবছেন, কুণালই বললেন,
‘আসুন পরিচয় করিয়ে দিই আমাদের কেসের আর চারজনের সঙ্গে।
হরিদাস পাল, গোপাললাল ভড়,ষষ্ঠীচরণ মাল, বিরিঞ্চিকৃপা সরখেল। আর ইনি হলেন শ্রী নন্দ কুমার ঘোষ।
বেশি বলতে হল না, সবাই বুঝে নিলেন ব্যাপারটা। কুণাল বললেন,
‘আপাতত আপনারা পাঁচজন। যদি আরো মানুষ পাই যারা বিনা দোষে নাম বিভ্রাটের জন্য সারা জীবন কষ্ট পান, তাহলে তাদেরো ঢুকিয়ে দেব।
‘ঢুকিয়ে দেবেন মানে, জেলে টেলে।।
‘ না না ঐ লিস্টে এড করে দেব। এখন চলুন ঐ চা-ওলার কাছে চা খেতে খেতে একটু চর্চা করা যাক। ব্যাপারটা বোঝাই, কি হবে, আপনাদের কি বলতে হবে, সব শিখিয়ে দেব। আপনারা তো আর দোষী নন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
চাটা শেষ হলে, কুণাল ঘোষণা করলেন
-চলুন, ভেতরে যাই, ১১টায় আমাদের কেস উঠবে।
দুরু দুরু বুকে নন্দ ধীরে ধীরে এগোতে থাকলেন। কুণাল একটা করে পারমিটের ধরিয়ে দিয়েছেন, সাক্ষী দিতে ডাকলে এইটা দেখিয়ে তবে ঢুকতে হবে। সিকিউরিটি একবার উলটে পালটে দেখল, স্ক্যান করল, বিরক্ত মুখে বলল যান, ভিতরে ঐ ওয়েট করার জায়গা আছে, সেখানে বসুন, ঘুর ঘুর করবেন না। ব্যবহারটা সুবিধের নয়, তবু ওর চোখে যে ওনাদের নামগুলো পড়লো না, তাই নিয়ে একটু হাঁফ ছেড়ে পাঁচজন টুক টুক করে ঢুকে গিয়ে বসে পড়লেন বেঞ্চে। কুণাল ওদের বসতে বলে এক ক্লারকের মত দেখতে লোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কোথায় চলে গেলেন, এই বিশাল চত্বরে চোখের আড়ালে বড় বড় ছাদের মধ্যে যেন হারিয়ে গেলেন।
বসে আছেন তো বসেই আছেন, কোরট আবার মুলতুবী হয়ে যাবার একটা ব্যারাম আছে, এই চলছে এই মুলতুবী। তারপর জজ সাহেবরা রেগে যান মাঝে মাঝে, আবার কেস ছেড়ে চলে যান, এসব আকছার হচ্ছে। নন্দ ভাবতে ভাবতে ঢুলে পড়েছিলেন হঠাৎ ঘুম ভাঙল কেউ যেন বলছে, ‘কেস নাম্বার ৪০৩৩ স্ল্যাশ ২০ স্ল্যাশ ২০২৫, কুণাল সেন স্পেশাল পিটিশান চলে আসুন।
‘আরে শুরু হয়ে যাবে, উঠুন উঠুন, মুখটুখ ভাল করে রুমাল দিয়ে মুছে, চুল আঁচড়ে আর ড্রেস ঠিক ঠাক করে নিন, দেখবেন ভুঁড়ি আবার না বেরিয়ে থাকে বেল্টের ওপরে।‘
উকিলকে দিয়ে অপমানের শুরু এরপর জজ সাহেব কি বলবেন কে জানে। এই কোর্টের জজ সাহেবদের খুব সুনাম আছে, পছন্দ না হলে পারটিকে বকে ঝকে ঝেড়ে কাপড় পরিয়ে দেন।
কুণাল ঢুকলেন, পিছনে পিছনে পাঁচজন লাইন দিয়ে ঢুকলেন আদালত কক্ষে।
কক্ষই বলতে হবে, আরো ভাল বললে মনে হল, যেন এক কাঠের ফারনিচারের দোকানে ঢুকে পড়েছেন, পার্ক স্ট্রীটে নন্দিতা একবার নিয়ে গিয়েছিল, দাম দেখে তখনি পিটটান। চারদিকে কাঠ, কাঠের চেয়ার, কাঠের বিশাল টেবিল, কাঠের বেঞ্ছি, কাঠের কাঠগড়া, কাঠের দেওয়াল, সব এককালে মনে হয় চক চক করত পালিশে, এখন একটু কালের প্রভাবে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে।
ফিসফিস করে কুণাল বেঞ্চির দিকে আঙ্গুল দেখালেন,
- ওখানে বসুন, ডাকলে আসবেন। ভয়ের কিছু নেই। এই জাজ খুব ভাল, সহানুভূতিশীল, তবে রেগে গেলে একটু যাতা বলে দেন, ভাববেন না, আমি ম্যানেজ করে নেব।
যা ভেবেছিলেন প্রথমেই ডাক
-আবেদনকারী নন্দ ঘোষ হাজির?
একটা চাপা হাসির শব্দ উঠলো কি? বিচারক ঠকাস করে টেবিলে ঠুকলেন।
-অর্ডার, অর্ডার।
আগে যদি কেউ উঠতো উনি ব্যাপারটা একটু বুঝে নিয়ে উত্তর দিতেন, এমন ভাগ্য বাঘের মুখে প্রথমেই তিনি। কাঁচুমাচু মুখে কাঠগড়ার দিকে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেলেন, কোনমতে সামলালেন, আবার একটা যেন চাপা হাসির ঢেউ উঠল, এবারে আর বিচারপতি কিছু বললেন না, মনে হল উনিও মজা পেয়ে গেছেন।
-আপনার নাম?
-আজ্ঞে মিলরড, শ্রী নন্দ কুমার ঘোষ
-আপনার নামে এক বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন জানেন তো
-হ্যাঁ স্যার, মহারাজা নন্দকুমার। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন তাই তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।
-তাহলে দোষটা কার?
-ব্রিটিশের স্যার
-কিন্তু ফাঁসি গেল কে?
-নন্দ
বলতে বলতে গলা ধরে এলো নন্দ ঘোষের,
-স্যার চিরকাল এই একই অবিচার। এই নামটাই খারাপ। শ্রী কৃষ্ণের সব দুষ্টুমির দোষ এই নন্দ ঘোষের।
-আচ্ছা ঠিক আছে যান, বেঞ্চে গিয়ে বসুন।
একে একে ডাক পড়ল হরিদাস পাল, গোপাললাল ভড়,ষষ্ঠীচরণ মাল, বিরিঞ্চিকৃপা সরখেলের।
-হরিদাস পাল? আপনার নামে বিখ্যাত ব্যক্তির নাম বলুন
-স্যার হরিদাস পাল ছিলেন বিখ্যাত ব্যবসায়ী, কাঁচের ও লন্ঠনের বিরাট ব্যবসা ছিল, তাঁর নামে স্কুল হয়েছিল, একটা রাস্তার নামো আছে,
গড়্গড় করে বলে গেলেন হরিদাস।
গোপাললাল ভড়কে সবাই গোপাল ভাঁড় বলে খেপায়, দেখা গেল, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় নবরত্নের একজন ছিলেন, বিদূষক হিসেবে অনেকে তাঁকে রাজা বীরবলের সমকক্ষ মনে করেন, তাঁর নামে রাজপ্রাসাদে একটি মূর্তি পর্যন্ত আছে।
ষষ্ঠীচরণ মাল খুবই নিরীহ দেখতে, তাঁর খ্যাতি সুকুমার রায়ের ছড়ার জন্য।
-আপনি কি হাতী লুফতে পারেন?
এক হল হাসির মধ্যে ষষ্টী কবুল করলেন
-না স্যার পারি না।
- কি করেন তাহলে?
-আজ্ঞে আমাদের বংশের ব্যবসা স্টিভেডরের। আমরা জাহাজে লোড আনলোডের ব্যবসা করি,
=হাতি পাঠিয়েছেন কখনো?
-হ্যা মিলর্ড , এই তো সেদিনই আফ্রিকা থেকে এলো দুটো হাতি, গুজরাট গেল, সেখানে নাকি ওদের শেল্টার হয়েছে।
বিরিঞ্চি সরখেলের চেহারাটা দেখলে ভক্তি আসে, একমুখ দাড়ি, চোখ দুটো রক্তবর্ণ, কিন্তু তিনি সাধু নয়, যাত্রা পালা লেখেন।
বিচারক জানতে চাইলেন,
-আপনার না কি বয়সের গাছ পাথর নেই, আপনি কি বায়োলজিকাল? সূর্য চন্দ্র সব আপনার কথায় চলে? আপনি মিসাইল থামাতে পারবেন হাত দিয়ে?
প্রচুর হাসির রোলের মধ্যে বিচারক আবার হাতুড়ি ঠুকলেন, এবং বললেন আপাতত কোর্ট মুলতুবী, লাঞ্চের পরে তিনি রায় দেবেন।
খাওয়া দাওয়া কোনমতে ঝুপড়িতে সারলেন কজন, মাছের ঝোল ভাত, বাঙ্গালীর সিস্টেম অস্থির হলে তারা এটাই খেয়ে থাকে চিরদিন।
ঠিক ২-৩০ বাজতে বিচারক এসে বসলেন আসনে। সামনের বেঞ্চে কুনাল আর পিছনে দুরু দুরু বুকে পাঁচজন।
- ৪০৩৩ স্ল্যাশ ২০ স্ল্যাশ ২০২৫ সামাজিক মানহানির মামলা ও তার জন্য ক্ষতিপূরণের আবেদন জানিয়েছেন পাঁচজন। আদালত তাদের আবেদন শুনেছেন ও তাদের মানসিক অশান্তির জন্য আদালতের সমবেদনা আছে।
-আদালত লক্ষ্য করেছে এই পাঁচজনের নামই বিখ্যাত ব্যক্তিদের বা সফল ব্যবসাবাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। এই নামের জন্য তাঁদের গর্বিত হবার পরামর্শ দেবার বদলে আমাদের বুদ্ধিমান আইনজীবি তাঁদের নামে মামলা করে আদালতের সময় নষ্ট করেছেন।
=তাই আমি কুণাল সেনের হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দিলাম। কেস ডিসমিস।
কুণাল নামে ‘কু’ একটা ছিল, নাল মানে শূন্য হয়। বাস্তুর গোলমাল একটা আছেই। কুণাল ঠিক করলেন আইন ছেড়ে দিয়ে এবার রাজনীতিতে ঢুকবেন।
নন্দ বাড়ী ঢুকতেই সুমিত্রার আর্তনাদ। কোথায় ছিলে সারা দিন? অফিসেও নেই, কাজল বলল জানে না। ওদিকে মেয়ে জামাই এসে ঘুরে গেল, জামাই ছেলেটা কিন্তু খুব ভালো আর তুমিই উধাও। আশ্চর্য!
1 Comments
হি হি হি
ReplyDelete