জ্বলদর্চি

ডিওডোরান্ট /কমলিকা ভট্টাচার্য

ডিওডোরান্ট

কমলিকা ভট্টাচার্য

অঙ্কন ফোন তুলেই স্নেহাকে জিজ্ঞেস করল,
“আর কতজন? আমি ভীষণ ক্লান্ত।”

স্নেহা বলল, “আর একজন।”

অঙ্কন মুখ কুঁচকে বলল,
“কোথা থেকে এরা সব আসে—তুমি তো জানো, এই চিকন জেন্টলম্যান আর স্মার্ট উওমেন—we don’t need in our company. তোমার তো জানাই আছে, কেবিনে পাঠানোর আগে একটু ছেঁটে দিতে পারো। লাস্ট ক্যান্ডিডেট যদি এইরকম হয়, পাঠিও না। Today I’m really in a very bad mood.”

স্নেহা বলল, “এই ক্যান্ডিডেটটা একটু অন্যরকম। তবে ফ্যাক্টরি ম্যানেজারের পোস্টের জন্য আসেনি। বারবার বলছে—যে কোনো একটা কাজ দিলেই হবে। সিভি বলে কিছুই নেই। তবে কথা শুনে মনে হলো বিশ্বস্ত, তাই বসতে বলেছি।”

অঙ্কন বলল, “তুমি যদি ঠিক মনে করো, দাসবাবুকে বলে কোনো কাজে লাগিয়ে দাও। আমার কাছে জিজ্ঞেস করার কিছু নেই—এই অধিকার তো তোমার আছে।”

স্নেহা হেসে বলল, “অফিসে তোমার কথা শেষ, আর বাড়িতে আমার।”

স্নেহা আসলে অঙ্কনের স্ত্রী—সাথে ব্যবসায়িক উপদেষ্টাও।
অঙ্কন হেসে বলল, “মহারানীর যা হুকুম—পাঠিয়ে দাও।”

ছেলেটি ভিতরে ঢুকতেই অঙ্কন একবার পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বোলাল।
খুব সাধারণ পোশাক—শার্টে হলুদের দাগ, হাঁটুর কাছে প্যান্টে ফুটো, পায়ে হাওয়াই চটি। অভাবের ছাপ স্পষ্ট।

ছেলেটি বসতে ইতস্তত করছে দেখে অঙ্কন বলল,
“বসো, কোনো সমস্যা নেই।”
ছেলেটি ধীরে চেয়ারে বসল।

অঙ্কন জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কতদূর পড়েছ? আগে কোথাও কাজ করেছ? কী কাজ করতে পারবে?”

ছেলেটি লজ্জা পেয়ে বলল,
“ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছি। পেট চালানোর জন্য যখন যা কাজ পেয়েছি করেছি—হোটেল, কারখানা, সিকিউরিটি… যা বলবেন, করব স্যার। বললে শিখে নেব।”

অঙ্কন বলল, “ঠিক আছে। কাল থেকে আসো। আমি আমার ম্যানেজারকে বলছি—তোমাকে প্যাকিং বিভাগে লাগাতে পারে কি না দেখা যাবে। আজ তুমি এসো।”

ছেলেটি উঠতে যাবে, অঙ্কন থামিয়ে বলল, “তোমার নামটা তো জানা হল না।”

ছেলেটি বলল, “সুরজ, স্যার।”

উঠে দাঁড়িয়ে সে যে চেয়ারে বসেছিল, সেটি দু’হাত দিয়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করে দিল—মনে হলো, যেন তার নোংরা প্যান্টের জন্য দামী চেয়ারটি নোংরা হয়ে গেছে। তারপর বলল, “অনেক ধন্যবাদ স্যার।”

অঙ্কন বলল, “ঠিক আছে।”

সুরজ পিছন ঘুরে বেরোতে যাবে, অঙ্কন আবার বলল,
“সুরজ, তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি—আমাদের কোম্পানিতে একটা পলিসি আছে। ডিওডরেন্ট বা সেন্ট লাগিয়ে অফিসে আসা যাবে না।”

সুরজ মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে স্যার।”

অঙ্কন অবাক হলো।
এত বড় পারফিউম কোম্পানিতে পারফিউম লাগানো বারণ কেন—এ প্রশ্ন কেউ কোনোদিন না করে থাকতে পারে না। আজ প্রথম এই মানুষটি সে প্রশ্ন করল না।

অঙ্কন বলল, “সুরজ, একটু বসো। তোমার কাছে কিছু জানতে চাই।”
সুরজ বসল।

“এই কোম্পানিটা পারফিউম কোম্পানি—তুমি জানো?”
“জানি স্যার, নিচে সিকিউরিটি বলেছিল,” উত্তর দিল সুরজ।

অঙ্কন বলল, “তাহলে জানতে চাইলে না কেন—পারফিউম লাগিয়ে আসা বারণ কেন?”

সুরজ শান্ত গলায় বলল,
“হয়তো স্যার, পারফিউমের সাথে আপনার কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি আছে। আর সব কোম্পানিরই কিছু নিয়ম থাকে—এমপ্লয়ি হিসাবে সেটা মানা উচিত।”

অঙ্কন তাকিয়ে রইল।
এত ম্যানেজমেন্ট পাস করা ক্যান্ডিডেটও এভাবে কোনোদিন উত্তর দেয়নি…
স্নেহার পর প্রথম কেউ তার মন ছুঁয়ে গেল।

অঙ্কন বলল, “আমি যদি তোমাকে সেই গল্পটা নিজে বলি—শুনবে?”
“নিশ্চয়ই স্যার,” সুরজ বলল।

অঙ্কন তার ন'তলা অফিসের কাঁচের জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল।
শহরটা দেখা যায়—ব্যস্ত, ধুলো, ভিড়, শব্দ।
সে বলতে শুরু করল—

“এই শহরটা আমার নয়। তবে সব শহরেই গরিবদের অবস্থা এক।

মা খুব ছোটবেলায় মারা যায়—বেশি মনে নেই। জ্ঞান হবার পর থেকেই বাবা-ই আমার ভরসা। তিনি বড় মার্কেটের একটি স্টেশনারি দোকানে কাজ করতেন। আমাদের বাবা-ছেলের সংসার কোনো মতে চলত।

আমি ভালো পড়াশুনায়—বাবা বলত, ‘মন দিয়ে পড়া কর, অনেক বড় হতে হবে।’

ক্লাস নাইন-এ একদিন সরকারি স্কিমে গরিব পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের নামী স্কুলে পড়ার সুযোগ এল। হেডমাস্টার আমার নাম পাঠিয়ে দিলেন—তিনি খুব ভালোবাসতেন আমাকে। আমাকে ডেকে বললেন,
‘ঐ সব স্কুলে অনেক পড়াশোনার সুযোগ, বই… তোর মত ছেলে এই সুযোগ পেলে অনেক বড় হতে পারবে—আর আমি তাই চাই।’

সেই স্কুলে ভর্তি হলাম। কিন্তু খুব দ্রুত বুঝলাম—নিয়ম বানালেই গরিবের উপকার হয় না; চাই সমাজের সুস্থ মন।
🍂

পুরোনো স্কুলের স্যারই স্কুলের এক প্রাক্তন ছাত্রের কাছ থেকে বই ও একসেট জামা জোগাড় করে দিয়েছিলেন।
আমার পোশাক, ভাষা, আচরণ—কিছুই সেই স্কুলের ছাঁচে মানাত না। রোজই কটাক্ষ, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ শুনতে হতো।
সবাই না হলেও কিছু শিক্ষক প্রায়ই আমাকে ফ্রি পড়ার সুযোগের কথা মনে করিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করিয়ে নিতেন—যেন তাদের দয়াতেই আমি সুবিধা পাচ্ছি।

একদিন ক্লাস টিচার বললেন,
‘ছেলে-মেয়েরা কমপ্লেইন করছে—তোর গা থেকে বাজে গন্ধ আসে। পরিষ্কার জামা পরে, ডিওডোরান্ট লাগিয়ে আসবি।’

আমি জানতাম আমাদের ক্লাসের এক মেয়েই কমপ্লেইনটা করেছিল। তার বাবা ছিল স্কুলের ম্যানেজিং বোর্ডে,পয়সাবালা মানুষ—সবার উপর প্রভাব।
ছেলে-মেয়েরা পিছনে বলত, ‘দেখ ডাস্টবিনটা আসছে।’

কিন্তু পাঁচশ টাকার ডিওডোরান্ট কেনা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না—সেই টাকায় এক সপ্তাহ ডালভাত খেতে পারতাম আমরা বাবা -ছেলে।

একদিন সব চরম হলো।
মেয়েটি সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ক্লাসে ভীষণ গন্ধ বেরোচ্ছে, আমার বমি পাচ্ছে।’

সবাই আমার দিকে তাকালো।
টিচার আমাকে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন।

কিছুদিন স্কুলই যাইনি।
বাবাকে বলিনি—বাবা কষ্ট পাবেন ভেবে।

স্কুল থেকে বাবাকে ডেকে পাঠানো হল বলা হলো ফ্রী তে স্কুলে পড়ে স্কুল কামাই করে ফেল করলে স্কুলের বদনাম,সারাদিন কোথায় কি করে বেড়ায় খোজ খবর করুন।
বাবা বললেন, ‘অঙ্কন সে রকম ছেলে নয়…’

সেদিন রাতে আমি সব খুলে বললাম বাবাকে।
বাবা বললেন, ‘কালই শেঠকে বলব—একটা ডিওডোরান্ট দেবেই। তুই তো শেঠের কত কাজ হাতে হাতে করে দিস।’

জানি না বাবা বলেছিলেন কি না…
সেদিনই বাবা রাস্তা পার হতে গিয়ে বাসে চাপা পড়ে মারা গেলেন।

পরে শুনলাম—বাবা নাকি দোকান থেকে একটা ডিওডোরান্ট চুরি করেছিলেন।
আমি জানি বাবা চুরি করেননি…
আমি সেই শহর ছাড়লাম।

আজ আমি যা তোমার সামনে—ভাগ্য, পরিশ্রম আর কয়েকজন ভালো মানুষের জন্য।

এই ডিওডোরান্ট আমার বাবাকে কেড়ে নিয়েছে…
তাই এত বড় পারফিউম কোম্পানি বানিয়েও আমি কাউকে সেন্ট লাগিয়ে আসতে দিই না আর আমি নিজেও জীবনে ইউজ করিনা।
গন্ধটা নাকে এলে অপমানের দিনটার কথা মনে পড়ে যায়।

সুরজ উঠে জানলার ধারে অঙ্কনের পাশে দাঁড়াল।
বলল,
“কাকু সেদিন চুরি করেননি।”

অঙ্কন অবাক।

সুরজ বলল—

“সেদিন কাকু বাবার কাছে ডিওডোরান্ট চেয়েছিলেন।
বাবা হেসে অপমান করে বলেছিল,
‘সেন্ট মেখে কি দোকানে মুটেগিরি করবে? ছেলেকে বল পড়াশোনা ছেড়ে দোকানে কাজ করুক!’

কাকু খুব লজ্জা পেয়েছিলেন।
আমি সব দেখেছিলাম।

আমি লুকিয়ে একটা ডিওডোরান্ট কাকুকে দিই।
কাকু নিতে চাননি।
আমি বলেছিলাম,
‘অঙ্কন দাদা পড়াশোনা খুব ভালোবাসে—এটা না থাকলে স্কুল যেতে পারবে না।’

কাকু নিতে না চাইলেও আমি চুপিচুপি সেটা তাঁর ব্যাগে রেখে দিই—যেন বাড়ি গিয়ে তোমাকে দিতে পারেন।

কিন্তু বাবা কাকুর ব্যাগে ওটা দেখে ফেলে কাকুকে চোর বলেছিলেন।
কাকু অপমান সহ্য করে মাথা নীচু করে চলে যান— কিন্তু আমার নাম বলেননি যাতে আমি বকুনি না খাই।
হয়ত সেই অপমানের ধাক্কায় কাকু...

আমি বাড়ি ফিরে বাবাকে সত্যি বলি।
বাবা আমাকে খুব মারেন।

আর সেদিনই আমিও বাড়ি ছেড়ে দিই।
সেই শহরে আর ফিরিনি…”

অঙ্কনের গলা কেঁপে ওঠে।
“তুই সেই ছোটবাবু সুরজ…!”
সে সুরজকে জড়িয়ে ধরে।

সুরজ বলে,
“আমাকে ক্ষমা করে দিও অঙ্কন দাদা।”

বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়।
মেঘের ফাঁক দিয়ে ডুবন্ত সূর্য আকাশে রামধনু আঁকে।
দুজনে তাকিয়ে থাকে—
মনের সুগন্ধে ভরে ওঠে চারদিক ...

বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারেন 👇

Post a Comment

0 Comments