|| স্মৃতির সরণি বেয়ে ||
পুতুল নাচ দেখা
অমর সাহা
ছোটবেলার স্মৃতি সবটুকু মনে না পড়লেও কিছু কিছু স্মৃতি চির জাগরূক হয়ে আছে। ১৯৭২ সালে তিন সাড়ে তিন বছরের শিশু আমি । দাদাদের সঙ্গে পাশের গ্রামে (পাঁচশো থেকে সাতশো মিটারের মধ্যে) পুতুল নাচ দেখতে গিয়েছিলাম। সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতা দাদাদের কাছে যত শুনি তত রোমাঞ্চ লাগে ।
১৯৭২ সাল। আজকের মতো এতো লোক গিজগিজ করতো না । কিন্তু আজ পঁচিশ – সাতাশ বছর পর দেশের লোকসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি। আমার জন্মস্থান জলহরি গ্রাম। চারিদিকে জলাশয় আর পুকুর বাঁধ দিয়ে ঘেরা। জঙ্গলাকীর্ণ এই গ্রামটির ওপর দিয়ে সবে মেদিনীপুর শহরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে পিচরাস্তার বা পাকারাস্তার মাধ্যমে। তার আগে রাস্তা ছিল মাটির-লাল ধুলোয় ঘরবাড়ি সব ভরে যেতো। দু’তিনটি বাস চলতো। কিন্তু চারপাশে জঙ্গল পরিপূর্ণ ও গাছপালায় ভর্তি ছিল। ছিল বামুনদের আমবাগান, জামবাগান। বিশ্বাসদের ছিল লালপুকুর, মাহাতোদের মাহাতোপুকুর। বামুনদের ছিল তালপুকুর। গ্রামের দক্ষিণদিকে একটি খাল। জলহরির বাঁধ থেকে চাতাল দিয়ে যেটুকু জল গড়িয়ে যেতো তা এই খাল দিয়ে বয়ে যেতো। মিশতো পারাং নদীতে কাশী জোড়ার ঘাটে। উত্তরদিকে বিস্তীর্ণ জলহরি মৌজার মাঠ এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত খালি চোখে দেখা যায় না। পূর্বদিকে জাড়া গ্রাম এবং পশ্চিম দিকে মৌপালগ্রাম। যেখানে মৌপাল দেশপ্রাণ হাইস্কুল অবস্থিত। তখনও হাতে খড়ি হয়নি বলে বিদ্যালয়ে যাওয়া হইনি।তিন-চার বছরের শিশু। পাঁচ হলে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আশা।
🍂
যাইহোক সে প্রসঙ্গে বলা জাড়া বধির্ষ্ণু গ্রাম। আমার বাবার বন্ধুর গ্রাম। এই গ্রামেই তখন পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন রামচন্দ্র সাউ। কোনও কিছু শংসাপত্র চাইতে গেলে পঁচিশ পয়সা-পঞ্চাশ পয়সা ঘুষ চাইতেন। এই গ্রামে আমি খুব ছোটো থেকে হেঁটে হোক, দাদাদের কোলে চেপে হোক ফুটবল খেলা দেখতে যেতাম তিন বছরের পর থেকে। কী ভীড় ! বিভিন্ন জায়গা থেকে ফুটবল খেলা দেখতে আসতেন ছোটো বড়ো বহু মানুষ। পরে বিভিন্ন কারণে এখানে ফুটবল খেলা বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু সেদিনকার ঘটনা দাদাদের চর্বিতচর্বনের জন্য পরবর্তীকালে আমার খুব মনে পড়ে। যত বড় হয়েছি ততই ভেবেছি মানুষের সেই লোভ-লালসা, হিংসা রিরংসার করাল রূপ। এক শ্রেণির মানুষ দেখছি বাইরেটা মিষ্টি, মুখে সরস ভাব-মিষ্টতা। কিন্তু ভেতরটা কী কঠোর ! লালসার ভরা। অর্থউপার্জনের জন্য যেন তেন প্রকারেণ ভিখারিদের চেয়ে বড়ো ভিখারি।
রামচন্দ্র সাহু ছিলেন জমিদার। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়। রামচন্দ্র সাউ ছিলেন কংগ্রেসের পঞ্চায়েত প্রধান। প্রচুর জমির মালিক। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তিনি শীতের সময় পুতুল নাচের আসর বসালেন একসপ্তাহে। সাধারণ মানুষেরা সবাই দলে দলে দেখতে যাচ্ছে পাশাপাশি গ্রাম থেকে। তৃতীয় দিনে বড়দার কাঁধে চড়ে পুতুলনাচ দেখতে পেলাম। শীতকাল বলে আঁধার নেমেছে তাড়াতাড়ি। সন্ধে সাড়ে ছ’টার সময় শুরু হোল পুতুল নাচ। পুতুল নাচ কী বিষয়ে হচ্ছিল তা মনে নেই। বোধ হয় ‘কালিদাসের বুদ্ধি’।
হঠাৎ হৈ হৈ রৈ রৈ শব্দ। চারদিকে ছুটোছুটি, লাফালাফি। দুই দাদা আমাকে ঘিরে ধরে রেখেছে। আমি ভয়ে থর থর করছি। চারপাশে পুলিশ। খাকি পোশাক পরে জনা পঞ্চাশ পুলিশ। ওই জায়গাটা ঘিরে ফেলেছে। চারপাশে বাঁদর লাফালাফি করছে মানুষ। এওর ঘাড়ে করছে ঝাঁপাঝাঁপি করছে।
ঘটনাটি হোল-রামচন্দ্র সাউ গোপনে জুয়ার খেলা আসর বসিয়েছিলেন মোটা টাকার বিনিময়ে। শালবনি থানায় সেই ঘটনাটি কেউ গোপনে জানিয়ে দিয়েছিলেন। সেইজন্য থানার অফিসার ইনচার্জ নিজে থেকে রেড করেছে। জুয়াড়িরা সাপ সাপ বলে লাফালাফি করে লোকজনের উপরে ঝাঁপিয়ে দৌড়ে পালায়। কিন্তু পাশে জঙ্গল থাকায় সকলে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। কথায় বলে, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। তখনও ওই এলাকায় ইলেকট্রিসিটির চল শুরু হয়নি। শুক্লপক্ষ হওয়ায় চাঁদের আলোয় চারপাশ ঝলমল করছে। দু’চার জনের ঘড়ে মাথায় পা পড়ায় তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে।
তারপর পুতুল নাচের আসর আর হোল না। পুলিও রামচন্দ্র সাউয়ের ওপর কোন অ্যাকশন নিলো না।
পুতুল নাচ নিয়ে আমার আর কোনদিন আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি।
বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারেন 👇
0 Comments