জ্বলদর্চি

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি —২৫তম পর্ব /চিত্রা ভট্টাচার্য্য

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি 
২৫তম পর্ব 

চিত্রা ভট্টাচার্য্য 

(শ্যামা সঙ্গীতে নজরুল)

'' শূন্য এ-বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয় ফিরে আয়!
তোরে না হেরিয়া সকালের ফুল অকালে ঝরিয়া যায়॥
  তুই নাই ব'লে ওরে উন্মাদ
     পাণ্ডুর হ'ল আকাশের চাঁদ,
      কেঁদে নদী-জল করুণ বিষাদ 
   ডাকে : 'আয় ফিরে আয়' ''॥
      শোকার্ত হৃদয়ের ব্যাকুল কবি । প্রাণ প্রিয় আদরের আত্মজ ছোট্ট বুলবুল কে  চিরতরে হারিয়েছেন। শিশুটির অকাল প্রয়াণে কবির পিতৃহৃদয় সর্বস্ব হারানোর বেদনায় নিঃস্ব অশান্ত। বুকে অজস্র জ্বালা নিয়ে গানে যেন আর্তনাদ করে উঠলেন।

 ''ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি।
করুণ চোখে চেয়ে আছে সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি।'' 
তার আদরের ছোট্ট শিশুটি কোথাও নেই , কোনোদিন কখোনো ও কোথাও ফিরে পাবেন না জেনেও উন্মাদের মত সন্তান হারা কবি তাকেই  খুঁজে বেড়ান । 
 ''গানের পাখি গেছে উড়ে শূণ্য নীড়,
কন্ঠে আমার নেই যে আগের কথার ভিড়,
আলেয়ার এই আলোতে আর আসবে না
 কেউ কুল ভুলি। '' 

 পুত্রহারা  কবি শান্তি খুঁজে বেড়ান কিন্তু কোথায় শান্তি ? অবশেষে আধ্যাত্মিক সাধনার পথে শান্তি পাবার আশায়  মুর্শিদাবাদে লালগোলা বিদ্যালয়ের নিষ্ঠাবান কালীভক্ত হেডমাস্টার তন্ত্রসাধক যোগী বরদাচরণ মজুমদারের সান্নিধ্যে আসেন। পারিবারিক নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা যেমন দীর্ঘদিনের অসুস্থ স্ত্রী প্রমীলার স্থায়ি আরোগ্যলাভ  এবং পুত্র বুলবুলের অকাল মুত্যু , তাঁর মনকে অশান্ত ও দুর্বলতর করায়  নজরুল ক্রমশ তন্ত্রসাধকের সাধনার প্রতি সম্পূর্ণ আস্থাবান ও মা কালীনির্ভর হয়ে উঠেছিলেন।পুত্র শোকে অধীর কবির পোড়া মন মানেনা শুধুই প্রিয় সন্তান কে কাছে পেতে চান --তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস একমাত্র যোগী বরদাচরণ পারবেন যোগবলে বুলবুলকে দেখাতে। নজরুল তাঁর কাছেই  দীক্ষা নিলেন। 
 এই সময় কবি দেবী কালী বা শ্যামামার বন্দনায়  শাক্তপদ রচনায় মনপ্রাণ ঢেলে দিলেন। স্ত্রীর শারীরিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য কবির ছিল নানাবিধ আন্তরিক প্রয়াশ, কখনো পীরের দরগায়  ঘুরে ওষুধ সংগ্রহ করেছেন  , কখনো বা বিভিন্ন মন্দির থেকেও দৈব্ ওষুধ আনতেন। এমন কি তিনি স্বনামধন্য কথা সাহিত্যিক তন্ত্রসাধক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গিয়ে ও স্ত্রীর আরোগ্যের ওষুধ এনেছিলেন।  
🍂

 '' 'তাঁর শ্যামা সংগীতে শ্যামা দেবীর মাতৃরূপ, প্রেমময়ী সত্তা এবং একই সাথে তাঁর ভয়ঙ্কর রূপ—এই দুইয়েরই প্রকাশ দেখা যায়। নজরুল তাঁর গানে কেবল ভক্তি নয়, বরং শ্যামা দেবীর প্রতি ভক্তের আকুতি, অভিযোগ, এবং আত্মনিবেদনের এক মানবিক আবেদন যুক্ত করেছেন। তাঁর এই রচনাগুলি শুধু ভক্তিমূলকই নয়, বরং গভীর দার্শনিকতা ও সাম্যবাদী মানসিকতার পরিচায়ক, যা তাঁকে এক অনন্য সাহিত্যিক ও সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তার সাহিত্যে গঙ্গা যমুনার মতো হিন্দু ও ইসলাম ঐতিহ্যর মিলন যেমন ঘটেছে তেমনি বাংলার সাধনার তিনটি ধারা শক্তি, বৈষ্ণব, লোকায়ত অর্থাৎ আউল বাউল ধারাও মিশে একাকার হয়ে গেছে।' (বাংলা সাহিত্য নজরুল / আজহারউদ্দীন খান).

  মাকালী ভক্ত কবি রচনা করলেন  -নজরুলের শ্যামাসংগীতে যে ভক্তি ও আবেগ মিশে গেছে, সহজেই তা শ্রোতার মন ও হৃদয়ে প্রবেশ করে। বলেছেন, ‘ ভক্তি আমার ধূমের  মত উর্দ্ধে ওঠে অবিরত’ বা ‘মার হাসি মুখ চিত্তে ভাসে চন্দ্রসম নীলাকাশে’। 
.যা কিছু মোর পুড়ে কবে চিরতরে ভস্ম হবে 
মার ললাটে আঁকবো তিলক সেই ভস্ম বিভূতিতে।''

প্রতিটি গানের এমন অসাধারণ শব্দবিন্যাস মন কে প্লাবিত করে।  হালিশহরের সাধক-কবি রামপ্রসাদ সেনের পরে বাংলা ভক্তি গীতের জগতে নজরুল ই  একমাত্র কবি যিনি প্রায় ২৪৭টির মত শ্যামাসংগীত রচনা করেছেন। কৌতূহলী মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে -- 'অন্য এক সম্প্রদায়ের মানুষ হয়েও হিন্দুর আরাধ্যা একজন দেবীর গুণকীর্তণ করার জন্য কেমন করে  তিনি এত ভক্তিসংগীত রচনা করলেন।.'                   

কবি  জন্মসূত্রে যদিও মুসলিম ছিলেন কিন্তু হিন্দুদের সঙ্গে ওঠাবসা এবং অন্তরঙ্গভাবে মেশা ছিল তাঁর ছোটোবেলা থেকেই। মক্তবে শিখেছেন ইসলাম ধর্মের যাপন। লেটো গানের দলে যোগ দিয়ে জেনেছেন হিন্দু ধর্মের নানা ঐতিহ্য।  কবির জীবনীকার আজহারউদ্দীনের মতে, নজরুল তার গানে হৃদয়ের দরদ এমন করে মিশিয়েছেন যে, রসের নিবিড়তায় তার গান ও রামপ্রসাদের গান প্রায় একাত্ম হয়ে গিয়েছে ।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দেখা যায়  বৈষ্ণবধর্মের পাশাপাশি শাক্তধর্মের উদ্ভব ঘটে খ্রিস্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে এবং তাকে কেন্দ্র করেই শাক্তগীতি চর্চার একটি ক্ষীণ ধারা প্রচলিত হয়ে আসছিল। এই সময় বঙ্গদেশে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বৈষ্ণবধর্মের চেয়ে শাক্তদর্শন ও শক্তিপূজা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং শ্যামা সঙ্গীতের ধারাটি বিকাশ লাভ করে।  আঠারো শতকের মধ্যভাগে সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন এতে প্রাণ সঞ্চার করে বাংলা গানের জগতে শাক্ত পদাবলি বা শ্যামা সঙ্গীত নামে একটি বিশেষ সঙ্গীতধারা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। শাক্তসাহিত্য একদিকে তমাশ্রিত তাত্ত্বিক, অন্যদিকে বাৎসল্যরসে ভরা থাকায় ভক্তেরা সেখানে বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষত মাতৃভাব  শাক্তপদাবলির মূল সুর। রামপ্রসাদ ও কমলাকান্ত শ্রেষ্ঠ শাক্ত গীতিকার, যাদের গানে আধ্যাত্মিকতা ও সমকাল মিলে মিশে একাকার হয়েগেছে, এবং কবি নজরুল ও সেই পথের অনুসারী হয়ে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ শ্যামা সঙ্গীতকার রূপে খ্যাত হয়েছিলেন।  

নজরুল গবেষকদের মতে , সুরের দিক থেকে তিনি রামপ্রসাদী রূপটিকে অক্ষুণ্ণ রাখেননি বটে, কিন্তু ছন্দ ও শব্দচয়নের দিক থেকে তিনি শ্যামা সঙ্গীতের ভাবগত দিকটিকে অবিকৃত রেখেছেন। শ্যামা-উমাকে অবলম্বন করে তিনি ভক্তের আকুতি ও আবদারকে একদিকে যেমন ফুটিয়েছেন, অপরদিকে তাঁদের স্থান দিয়েছন পারিবারিক জীবনের মধুময় বন্ধনের মধ্যে।  শাক্তগীতি তে শব্দচয়নের বেলায় তিনি ঘরোয়া ও পরিচিত শব্দকেই প্রাধান্য দিয়েছেন ; এমন কি, ছন্দের ক্ষেত্রেও তিনি বাঙালির প্রিয় ও পরিচিত শ্বাসাঘাত-প্রধান ছন্দকেই মুখ্য করে তুলেছেন। আমরা অনুভব করেছি কখনো তার আঁখি জল হয়েছে জবাফুল। মুক্তির আশা ‘এলোকেশ হয়ে পায়ে লুটায়।’ তাই মা এলোকেশী। অভিন্ন ভাবনায় এও বলেন, ‘আমার মনের দোতারাতে শ্যাম ও শ্যামা দুটি তার।’ বলেন, ‘মা যে আমার শবের মাঝে শিব জাগায়।’

ভক্তিবাদী কবির অন্তরের অনুভব ছিল , 
“তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার, 
  তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার। 
 কেন খুঁজে ফেরো দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি-কঙ্কালে? /
 হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!” –  

বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একক সত্যকে প্রেমিক কবি  উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন, যা সব রকম ভেদাভেদের ঊর্দ্ধে।পুজোর বাহ্যিক আড়ম্বরে কবির বিশ্বাস ছিল না। তাঁর হৃদয়ে সব ধর্ম মতেরই সহাবস্থান ঘটেছিল। তাই সহজ সাবলীলভাবেই সৃষ্টি করে গিয়েছেন একের পর এক দেশাত্মবোধক গান, গজল, ইসলামি গান, শ্যামাসংগীত, ভজন, কীর্তন ও আরও নানা ধরনের গানের বৈচিত্রময় সমাহার।   

 কবি নজরুলের একটি বিখ্যাত শ্যামাসঙ্গীতে তিনি অনুভব করেছেন,---
 ‘আমার মা আছে রে সকল নামে’  
মা যে আমার সর্বনাম।যেনামে ডাক শ্যামা মাকে
পুরবে তাতেই মনস্কাম॥
ভালোবেসে আমার শ্যামা মাকে
যার যাহা সাধ সেই নামে সে ডাকে,
সেই নামে মা দেয় রে ধরা-''--
 যে গানের মূল ভাব হলো মা সর্বত্র বিরাজিত রয়েছেন  তিনি শ্যামা বা কালী,ভক্তের পছন্দসই  বিভিন্ন নামে  পরিচিত।এটি মূলত ঈশ্বর বা মায়ের বহুমুখী রূপের প্রতি ভক্তির  প্রকাশ  , যেখানে মা এক এবং অদ্বিতীয় সত্তা হলেও বিভিন্ন রূপ ও নামে তিনি পূজিত হন। শ্যামা বা কালী,তাদের পছন্দসই যে নামেই  ভক্তরা তাদের আরাধ্যা দেবী মা কে  ডাকুক না কেন  সে নামেই মা সাড়া দিয়ে ভক্তের মনস্কামনা পূর্ণ করেন।। তিনি সর্বনামের মতো সবকিছুকে নির্দেশ করেন।কিংবা কখনো বলেন,
 ‘মাগো আজ বেঁচে আছি তোরই প্রসাদ পেয়ে।’ 

কবির কাতর আকুতি , ‘মাগো, চিন্ময়ী রূপ ধরে আয় ।
মৃন্ময়ী রূপ তোর পূজি শ্রী দুর্গা তাই দুর্গতি কাটিল না হায়॥
            যে মহা-শক্তির হয় না বিসর্জন
            অন্তরে বাহিরে প্রকাশ যার অনুখন
মন্দিরে দুর্গে রহে না যে বন্দী সেই দুর্গারে দেশ চায়॥
                                                                               কবি মনে করেন আদ্যা মহাশক্তির বিনাস নেই।  চিত্তের বাইরে এবং অন্তরে যার অনুক্ষণ প্রকাশ।যাকে কখোনো ত্যাগ করা যায় না। তিনি মনে করেন মন্দিরে বন্দী দেবী দেশের দুর্গতি রোধে অক্ষম। তাই সেই মহাশক্তি সকলের অন্তরকে উদ্দীপ্ত করুক এবং জগৎ-সংসারের সকল অকল্যাণকে ধ্বংস করুক। এর জন্য মৃন্ময়ী দশভুজা দুর্গার দরকার নেই। কবির কামনা- দেশমাতৃকার প্রতিটি সৈনিকের দুটি হাতই দশভুজার শক্তিতে  প্রবলতর হয়ে উঠুক। মৃন্ময়ীমূর্তিতে যে শক্তিপূজা করা হয়, তাতে ভক্তি প্রকাশ পায়। কিন্তু দেশের দুর্গতি দূর হয় না। কবির জিজ্ঞাসা ভক্ত কি শুধু ভক্তিতেই সন্তুষ্ট থাকবে? বিশ্বকে জয় করার সৌভাগ্য কি তার কপালে জুটবে না? কবির ব্যাকুল  মন বলে মূর্তিপূজায় পূজা-বিলাস   সংহার করে, প্রতিটি ভক্ত হয়ে উঠুক চিন্ময়ীরূপী দুর্গার কল্যাণ-সৈনিক।

  কখনো তার আঁখি জল জবাফুল হয়। মুক্তির আশা ‘এলোকেশ হয়ে পায়ে লুটায়।’ তাই মা এলোকেশী। অভিন্ন ভাবনায় এও বলেন, ‘আমার মনের দোতারাতে শ্যাম ও শ্যামা দুটি তার।’ বলেন, ‘মা যে আমার শবের মাঝে শিব জাগায়।

’শ্যামা মাকে রামপ্রসাদ কন্যারূপে দেখেছেন, নজরুলও। লিখেছেন, ‘আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে, তারে কে দিয়েছে গালি? রাগ করে সে সারামুখে মেখেছে আজ কালি।’ কখনো প্রশ্ন করেছেন, ‘মা হবি না মেয়ে হবি।’ বলেছেন, ‘আদরিনী মোর শ্যামা মেয়ে।’ কখনো অভিমানে গেয়েছেন—বলরে জবা বল কোন সাধনায় পেলি রে তুই শ্যামা মায়ের চরণতল?
নজরুল গবেষক করুণাময় গোস্বামী বলেছেন, ... শ্যামা সংগীত রচয়িতা রূপে রামপ্রসাদ সেন বা কমলাকান্ত ভট্টাচার্য সাংগীতিক নান্দনিকতায় যে স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, নজরুল তদপেক্ষা উচ্চস্তরে পৌঁছেছিলেন, তিনি পূর্ববর্তী সংগীত রচয়িতাদের চেয়ে মহৎ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। " অন্যান্য লেখক দের মতে তার এই উক্তিতে আতিশয্য আছে, সন্দেহ নেই, তবে নজরুলের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা কতখানি তাও খুব স্পষ্ট বোঝা যায়।            ক্রমশঃ 
তথ্য সূত্র /বাংলা সাহিত্য নজরুল / আজহারউদ্দীন খান) 
নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য

Post a Comment

0 Comments