পুনর্জন্ম
পুলককান্তি কর
আলোটা নিভিয়ে বিছানায় শোওয়া মাত্রই আমার মনটা যেন অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠল। একেবারে ছোট অবস্থায় দাদাই আমাকে উপরে ছুঁড়ে ছুঁড়ে যেমন লোফালুফি খেলতেন, শরীরটা যেন তখনকার মতোই হাল্কা বোধ হতে লাগলো আমার। একেবারে যেন তুলোর মতো হাল্কা। যেন আমি উড়তে পারি পেঁজা তুলোর মতো। ভাসতে পারি শূন্যে। সত্যি সত্যি পারি কি? দেখি তো চেষ্টা করে! ওমা। সত্যিই আমি উঠতে শুরু করলাম চাওয়া মাত্রই। দেখলাম, আমার চেনা দেহটা উঠতে পারছে না। ও এখনও পড়ে রয়েছে খাটে। রোজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যে মুখটা দেখি – ঝলঝলে নাইটির মধ্যে শীর্ন একখানা দেহ, চোখের কোণে কালি, চুলের সামনের দিকটায় খাবলা সিঁদুর, ঠোঁটের তলাটায় একটু ফুলো– সেই দেহটা এখনও পড়ে আছে, মুখে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি নিয়ে। বড্ড মায়া হল দেহটার জন্য। মনে হল ফিরে যাই ওর মধ্যে। হঠাৎ একটা ঝাপটা হওয়া এসে যেন এই ভাবনার সাথে সাথে আমাকেও ঠেলে দিল মহাশূন্যে। উড়ছি তো উড়ছি পরীদের মতো, আমার পাখা নেই তবুও উড়ে যাচ্ছি, চারপাশে মিটিমিটি তারারা হাসতে হাসতে পেছনে থেকে যাচ্ছে আর আমি শোঁ শোঁ করে উঠে যাচ্ছি শূন্য থেকে আরও গভীর এক মহাশূন্যে। হঠাৎ দাদাই কোথা থেকে এসে বললেন ‘মুনাই, তোকে সেই যে ছোটবেলায় লুব্ধক দেখিয়েছিলাম, এই দ্যাখ ওই কোণে কালপুরুষের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বলেই হারিয়ে গেলেন দাদাই। ধ্রুবতারা টা কোথায় গেল? দূর ছাই, কোন দিকই তো ঠাওর করতে পারছি না। দিক জ্ঞান বরাবরই আমার কাঁচা। ও দাদাই, ধ্রুবতারাটাকে চিনতে পারছি না কেন? ওকে কি ছাড়িয়ে চলে এসেছি? বড় অন্ধকার কেন এখানে? মরতে কেন এখানে এলাম? এত অন্ধকার, তবু ওড়া তো থেমে নেই। দূরের তারাদের আলো বড় বিন্দুবৎ মনে হচ্ছে। হে ঠাকুর, কোথায় পাঠাচ্ছ আমাকে? হঠাৎ দেখি একটা নরম হাত এসে আমায় ছুঁয়ে বলল, ‘ভয় করো না। আর একটুখানি গেলেই আলোর সুড়ঙ্গ পাবে।’
– কে তুমি? তোমায় দেখতে পাচ্ছি না যে!
– এত অন্ধকারে আমায় দেখবে কী করে মুনাই?
– তুমি আমার নাম জানো বুঝি।
– জানিই তো। নাম জানি, তোমার বাড়ী কোথায় জানি, তোমার কষ্টগুলোও জানি।
– তুমি কী করে জানো?
– ছোটবেলা থেকে তোমার মা তো আমায় ডেকেই তোমায় ঘুম পাড়াতো সোনা।
– তুমি বুঝি ঘুমপাড়ানি মাসি- পিসি।
– আমি মাসি হইগো। পিসি গেছে তোমার দেহখানা পাহারা দিতে। আমি তোমার সাথে সাথে আছি, ভয় পেয়ো না। এই তারাদের বসতি ফুরোলেই সুড়ঙ্গ দেখতে পাবে।
🍂
– আরও কতদূর মাসি?
– এখানে তো সব আলোকবর্ষে মাপ হয় মুনাই। তবে আমাদের অত সময় লাগে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাব।
তারপর বেশ খানিকক্ষণ চলছি তো চলছি। অভ্যাস হয়ে গেছে আঁধার। চোখও সয়ে গেছে। আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছি দূরে দূরে পরীদের ওড়াউড়ি। মাসি কখন হাত ছাড়িয়ে চলে গেছে দূরে। শুধু অভয় দিয়ে গেছে, পথ হারাবার ভয় নেই, সব পথই ওই আলোর সুড়ঙ্গে যাবে। মাসিও জানে অল রোডস লিড টু রোম। হঠাৎ হাসি পেল আমার। বহুদিন আমি হাসি নি। আমার হাসি পায় না। স্থূল, সূক্ষ কোনও অনুভূতি নেই আমার শরীরে। থাক থাক, ওসব কথা থাক। এখন শুধু আনন্দ হচ্ছে আমার। হোক অন্ধকার, তবু মুক্তি পাবার আনন্দ আমাকে শক্তি দিচ্ছে আরও বেশী করে ওড়ার। হঠাৎ যেন চোখটা ঝলসে গেল। নিকষ কালো আঁধারের মাঝখানে একটা বিরাট আলোর সুড়ঙ্গ। বৃষ্টি হলে রাস্তার জল যেমন কোন এক ড্রেনের ঝাঁঝরির মুখে প্রবল বেগে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে যায়, কে যেন আমাকে প্রবল আকর্ষণে ওই সুড়ঙ্গের মধ্যে টেনে নিয়ে গেল। সেই সুড়ঙ্গের মধ্যে দেখি আরও কত লোক। দু একখানা পরী, আর অরুন্ধতি। আমায় দেখে ইশারায় ঠোঁটে আঙুল রেখে বোঝালো, এখন কথা নয়। পরে কথা বলা যাবে।
সত্যিই তো, বশিষ্ঠের পাশেই তো থাকার কথা ছিল অরুন্ধতীর! কালপুরুষের ঠিক পাশেই তো ছিল সপ্তর্ষি মন্ডল। আমি কি ইচ্ছে করেই তাকাইনি ওখানে? অরুন্ধতী আছে বলে? ও ঠিক আমাকে নজর করে চলে এসেছে।
সুড়ঙ্গের ওপারেই আছে মস্ত এক আলোর জগৎ। আমরা যাকে আলোর ভূবন বলি, ঠিক তেমনি। এত আলো আর সব কিছু এত স্পষ্ট যে কিছুক্ষণ বিহবলতা কাটে না। দূরে দেখতে পাচ্ছি মা চোখ বুজে গাইছেন ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ, মৃত্যোরমা-অমৃতং গময়ঃ- এখনও কী সুন্দর গলা! রীতিমত গান শেখা মহিলা। সংসারের জাঁতাকলে অভাবে অনটনে শুধু বাচ্চা বিইয়ে দিন কেটে গেছিল তাঁর। জীবিত মৃত আটখানা বাচ্চা। আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আয় মা কতদিন তোর পথ চেয়ে বসে আছি। দেখবি এবার সব কষ্ট জুড়োবে। দেখছিস না আমার কেমন স্বাস্থ্য ফিরে গেছে। এখনকার জল হাওয়া খুব ভালো।’
– বাপি কোথায় মা?
– ঘুরছে কোথায় কোন গাছের খোঁজে।
– বাপি জানে আমি আসছি?
– এখানে সবাই সব খবর টের পেয়ে যায় মুনাই। জানে নিশ্চয়ই। আমার সাথে যদিও কথা হয় নি। জানিস তোর জন্মের আগে তোর যে দাদা দিদিরা মারা গেছিল, তারা সব এখানে খেলে বেড়াচ্ছে।
– কই মা?
– ওই দ্যাখ, ওই যে দূরে খেলা করছে, ওরা।
– ও মা, ওরা তো এখনও বাচ্চা গো!
– এখানে কারোর বয়স বাড়ে না মনাই।
– মা, আমারটা কই? ওকে দেখছি না কেন?
– তোর বাচ্চা এখানে কী করতে আসবে?
– ওঃ। তুমি তো জানো না, পাঁচ মাসে আমার একটা বাচ্চা খসে গেছিল। মা, আমি একবার ওকে দেখতে চাই। ওকে কী করে খুঁজবো?
– এখানে তো কেউ কাউকে খোঁজেনা বাছা, সবাই নিজে নিজে চলে আসে। ওই তোর বাপি আসছে, দ্যাখ ওদিকটায়।
বাপি এখনও সুন্দর করে ধূতি পাঞ্জাবী পরে। এতদিন পরেও আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না সংকোচে। কোনও মতে এসে বলল, 'ফিরে যা মুনাই। তোর দেহটা অনেকক্ষণ পড়ে আছে নীচে।'
মা বাধা দিয়ে বলল, 'না না, কী দরকার যাবার?'
বাবা প্রায় ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘বলছি না, ওর দেহটা নীচে পড়ে আছে অনেকক্ষণ। ওর বর হাসপাতালে ওকে ভর্তি করে দিয়েছে। সবাই মিলে অনেক চেষ্টা চরিত্র করেছে। ওকে তুমি আটকে রাখতে পারবে না।’
লেখাটা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে ডাক্তার মৈত্র বললেন, ‘খুবই চমৎকার লিখেছেন মিসেস দাশগুপ্ত। আমি বহু পেশেন্টের থেকে নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্সের হিস্ট্রি নিয়েছি আমার রিসার্চ এর জন্য; কিন্তু এত ভালো, এত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা কেউ দিতে পারেন নি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এবার একটা ফর্ম ফিলাপ করব, আপনি আমায়, কিছু কিছু জায়গায় সাহায্য করবেন। আপনার ফাইলটা তো নার্সিংহোমে আছেই, তার থেকে আপনার অনেক ডাটা পাব, কিন্তু সেগুলো সম্পর্কে আমার যেখানে যেখানে প্রশ্ন থাকবে আপনি আশা করি আমায় সঠিক উত্তরটা দেবেন।’
– নিশ্চই।
– আপনার নাম তো দেখছি উদিতা দাশগুপ্ত। তা নামটা আপনার কে দিয়েছিলেন?
– দাদাই। মানে আমার ঠাকুরদা।
– মুনা, মুনাই এগুলো কি ডাকনাম?
– ডাকনাম আমার বুল্টি। মা শুধু মুনাই বলতেন। দাদাই বুড়ি বলে ডাকতেন। বাপি পারত পক্ষে ডাকতেন না। দরকার পড়লে যে কোনও একটা নামেই কাজ চালিয়ে নিতেন।
– আপনার বয়স তেত্রিশ দেখছি। এটা কি ঠিক বয়স?
– হ্যাঁ স্যার।
– আপনার ফাইলে দেখছি, আপনি ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন। ঠিক কটা খেয়েছিলেন?
– বিয়াল্লিশটা। আচ্ছা ডাক্তার বাবু আরও কটা খেলে আমি মরে যেতাম?
– এখনও মরার শখ বুঝি?
চুপ করে রইল উদিতা। ডাক্তার বাবু বললেন, ‘চেয়ে দেখুন না, পৃথিবীটা কত সুন্দর। চারিদিকের এই আলো কি আপনার মহাশূন্যের ওই আলোর বলয় থেকে কম মায়াময়? আপনার লেখা দেখে মনে হচ্ছে আপনি লিটারেচার ভালোবাসেন।’
– আমি ইংলিশ এ এম.এ করেছি।
– বাঃ। রবি ঠাকুরের ওই কবিতা তো নিশ্চই পড়েছেন– ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভবনে …’
পড়েছি ডাক্তারবাবু। এ সব তাদের জন্য যারা জীবন যন্ত্রণায় ভোগে না, যাদের কাছে প্রতিটা মুহূর্ত বাঁচা নরক যন্ত্রণার সমান নয়।
– এগুলো জীবনের একেকটা পরীক্ষা মিসেস দাশগুপ্ত। আপনি কতটা ভালো এই পরীক্ষাটা উতরাতে পারছেন, জীবন আপনার কাছে ততখানিই ধরা দেবে। বাই দা বাই যে গল্পটা আপনি লিখেছেন ততখানি পরিষ্কার করে কি আপনি সব দেখেছেন বা মনে রাখতে পেরেছেন?
– আরও অনেক কিছুই দেখেছিলাম ডাক্তারবাবু। ছোটবেলা থেকে আমার বেড়ে ওঠা, দেবাঙ্গন, কলেজ, খেলাধূলো, বিয়ে এগুলোর কিছু কিছু ঝলক দেখেছি মাঝে মাঝে। তেমন ভাবে মনে করতে পারিনি। যেগুলো আবঝা আবছা মনে ছিল, সেগুলোকে গুছিয়ে লিখেছি।
– আপনার বাবা আপনাকে জোর করে ফেরৎ পাঠিয়ে দিলেন এই পর্যন্ত আপনার মনে আছে। ফেরার পথের কোনও বর্ণনা তো দেন নি আপনি।
– ওটা আমি কিছু দেখিনি। বা হয়তো মনে নেই। আমি কতদিন অজ্ঞান হয়ে ছিলাম ডাক্তারবাবু?
– দু’দিন। আচ্ছা আপনি গল্পে অরুন্ধতীর নাম বলেছেন। এটা কি সপ্তর্ষিমণ্ডলের অরুন্ধতী, না কি সত্যি সত্যি এই নামের কেউ ছিল আপনার জীবনে?
– অরুন্ধতী আমার ছেলেবেলার বান্ধবী ছিল ডাক্তারবাবু।
– ছিল কেন?
– ও মারা গেছে। সুইসাইড করেছিল।
– সেও কি ঘুমের ওষুধ খেয়ে? আই মিন, আপনি কি ওনাকে দেখেই ইনসপায়ার্ড?
– ঠিক তা নয়। হয়তো মনের মধ্যে অবচেতনে ওটা থাকতেও পারে।
– আপনি সুইসাইডের জন্য অন্য কোনও উপায় কেন বাছলেন না? যেমন ধরুন গলায় ফাঁস?
– ও বড় কষ্টের। তাছাড়া জিভ টিভ বেরিয়ে এমন কদর্য হয়ে যায় মুখখানা, বড় বাজে লাগে।
– আপনি সাজগোজ করতে ভালোবাসেন?
– বাসতাম। বিয়ের পরে সে রুচি হত না।
– বেশ। আপনি অরুন্ধতীর কথা বলুন। ওকে আর উপরে দেখেন নি?
– না। সুড়ঙ্গের পর ওকে আর দেখিনি।
– আমার মনে হয় আপনি ওকে দেখতেও চাইছিলেন না। ব্যাপারটা কি?
– অরুন্ধতী একেবারেই আমার ছোট কালের বন্ধু। এক স্কুলে এক টিউশনির টিচারের কাছে আমরা একসাথে পড়েছি ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত। তারপর ও সায়েন্স নিয়ে পড়ে, আমি ইংলিশ নিয়ে পড়ি।
– ওনার সাথে সমস্যাটা হল কী ভাবে?
উদিতা একটু মাথা নিচু করে বলল, তখন আমার একজন ভালো বন্ধু ছিল, আশিস নাম ছিল ওর। আমাদের পাশের পাড়ারই ছেলে। আমার সাথে ওর বেশ ঘনিষ্ঠতাই ছিল। হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করা গেল আশিসের সাথে অরুন্ধতী তলায় তলায় প্রেম চালাচ্ছে, আমাকে বলে পর্যন্ত নি।
– আশিসের সাথেই কি ওনার বিয়ে হয়েছিল?
– হ্যাঁ।
– আপনার সাথে কি ওনাদের আর যোগাযোগ ছিল?
– না।
– দেবাঙ্গন কে?
– কলেজে আমরা একসাথে পড়তাম। আমাদের ঘনিষ্ঠতা অনেকদূর গড়িয়েছিল। তবে বিয়েটা হয়নি।
– কেন?
– বাপি মানে নি। ছেলেটি আমাদের থেকে নীচু জাতের। আমার বিয়ের সময় ও একটা চাকরীও জুটিয়ে ফেলতে পেরেছিল। কিন্তু আমার বাড়ীর অমতে পালিয়ে বিয়ে করার হিম্মত হয়নি। তখন যদি ওই সাহসটা দেখাতে পারতাম!
– আপনার বিয়েটা কবে হল?
– আমার এম.এর রেজাল্ট তখনও বেরোয় নি। আমার বাবার আর্থিক সমর্থ্য ছিল না। দেখতে শুনতে ভালো ছিলাম বলে অনেক সম্বন্ধ আসতো। বাপি একজন বেশ বড়লোক দেখে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর মাতাল ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিলেন।
– আপনার কি সত্যি সত্যি পাঁচ মাসে গর্ভপাত হয়ে গেছিল?
– হ্যাঁ। আমার শাশুড়ী আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলেন।
– আপনার স্বামী কিছু বলেন নি?
– ও সমানে আমাকে মুখ বন্ধ রাখার জন্য চাপাচাপি করত। এমন কি আমার বাপের বাড়ীর লোকজনও কেউ বিষয়টা জানে না।
– বধূ নির্যাতনের কেস করেন নি?
– যার বাপের বাড়ী বলে কিছু নেই, তাদের কি ওসব কেস টেস মানায় ডাক্তার বাবু? আমার পাশে কে দাঁড়াত? কে কেস লড়তো? সর্বোপরি পুলিশে কেস করলে তো ও বাড়ীতে থাকতে পারতাম না? থাকতাম কোথায়?
– আপনার গায়ে এত চাকা চাকা দাগ কেন?
– আমার স্বামীর দান ওসব।
– উনি কি মারধর করেন?
– না ডাক্তারবাবু। উনি স্যাডিষ্ট।
– উনি আপনাকে ভালবাসেন? ডাঃ দত্ত বলেছিলেন আপনার স্বামী এ ক'দিন যে ভাবে ছুটা দৌড়া করছেন, তা সচরাচর দেখা যায় না। খুবই নাকি উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে থাকতেন আপনার পাশে। ওঁরা তো ভাবছিলেন আপনি হঠাৎ এমনটা করে বসলেন কেন?
উদিতা চুপ করে রইল। মনে মনে ভাবলো নির্ঘাত থানা পুলিশের ভয়ে। মরে গেলে তো কেস হত নিশ্চিত। বাড়ী ফিরে গেলে পুরোটাই সুদে আসলে উসুল করবে সন্দেহ নেই।
ডাক্তার মৈত্র আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী? বললেন না তো?’
– কী বলবো ডাক্তার বাবু?
– এই আপনার স্বামীর ব্যাপারে। উনি ভালোবাসেন কিনা?
– বুঝি না ডাক্তারবাবু। প্রতিরাতে ওর এক দুবার আমাকে দরকার পড়ে। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা, শরীর খারাপ– কোনও কিছুর প্রতি ওর ভ্রুক্ষেপ নেই।
– আপনার ছেলেপুলে?
– এক ছেলে, এক মেয়ে।
– ঘুমের ওষুধ খাওয়ার আগে ওদের কথা একবারও মনে পড়ল না আপনার?
– তাহলে বুঝুন ডাক্তার বাবু, যন্ত্রণাটা আরও কত তীব্র, যাতে সন্তানদের চিন্তা থেকেও পিছু হটতে হয়।
– দেবাঙ্গন কী করেন এখন?
– চাকরী করে, স্টেট ব্যাঙ্কে।
– বিয়ে করেছেন উনি?
– না আশায় বসে আছে এখনও।
– যোগাযোগ আছে আপনার সাথে?
– লুকিয়ে চুরিয়ে ফোন করি মাঝে মাঝে। ওকে ফোন করতে বারণ করে দিয়েছি। শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে ঘর। কে কখন ধরতে পারবে, তখন অনর্থ বাধবে।
– দেবাঙ্গন কি জানতেন, আপনি সুইসাইড অ্যাটেম্প করবেন?
– না। তবে আকারে ইঙ্গিতে মৃত্যুর কথা বলতাম। ও বলত, ‘সেই ভালো, আমরা বরং স্বর্গরাজ্যেই ঘর বাঁধবো মুনাই।’ আমি বলতাম, 'তবে তো তোমাকেও মরতে হয়।' ও হেসে মিঃ নটোবরলালের ডায়ালগটা বলত, ‘এ জীনা ভি কোই জীনা হ্যায় লাল্লু?’
– মরাটা কোনও সলিউশন নয় মিসেস দাশগুপ্ত। দেখুন বয়সে আমি আপনার থেকে অনেকটাই বড়। আমার কথাটা মেনে চলুন। তেমন মনে হলে আপনি স্যাডিজমের উপর ভিত্তি করে ডিভোর্স ফাইল করুন। কোর্ট আপনার ফর এ রায় দিতে পারে। তখন আপনি দেবাঙ্গনের সাথে আবার রিলেশন কনটিনিউ করতে পারবেন।
– না ডাক্তারবাবু। আমার ছেলে মেয়েদের জন্য সেটা খুব খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
– সুইসাইড করলে বুঝি সেটা হত না?
– হ'ত নিশ্চই, তবে ততটা নয়। বড় হলে হয়তো বা বুঝতে পারতো মায়ের সিদ্ধান্তটা। কিন্তু দেবাঙ্গনের সাথে সংসার পাতলে তারা ব্যাপারটা হয়তো বুঝতো, কিন্তু মেনে নিতে পারতো না।
– মিসেস দাশগুপ্ত, আপনি ঈশ্বরের বিশ্বাস করেন?
– আমি ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিশ্বাস করি, কিন্তু ঈশ্বরকে বিশ্বাস করিনা ডাক্তারবাবু। তাঁর চিন্তাভাবনা, তাঁর বিচারের পদ্ধতির উপর আমার কোনও আস্থা নেই।
– আপনি আপনার এই মৃত্যু পথে যাত্রা কালীন অভিজ্ঞতায় ঈশ্বরকে দেখেছেন?
– ডাক্তারবাবু, আপনিও কিন্তু লিটারেচারে বেশ স্ট্রং। নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্সের কী সুন্দর বাংলা মানেটা করেছেন। অনেকদিন পরে একটা ভালো শব্দ শুনে ভালো লাগলো ডাক্তারবাবু।
– থ্যাংকস। যাইহোক, আপনি কি কোনও ঈশ্বরের কোনও প্রতিমূর্তি দেখেছেন?
– না। আচ্ছা ডাক্তারবাবু আমাদের শাস্ত্রে যে বিভিন্ন লোক বলা আছে যেমন ধরুন বিষ্ণুলোক, স্বর্গলোক– আমি কি সেরকম কোনও লোকে পৌঁছে গিয়েছিলাম?
– এ প্রশ্নের উত্তর আমি ঠিক দিতে পারব না মিসেস দাশগুপ্ত।
– আমার এই দাশগুপ্ত পরিচয়টাই আর বইতে ইচ্ছে করে না ডাক্তার বাবু। এটা বললেই আমি বড় ফর্মাল হয়ে যাই। আপনি আমাকে উদিতা বলেই ডাকুন না।
– বেশ। আসল কথা হিন্দু শাস্ত্রেকাররা এই সব লোককে কিসের সাথে তুলনা করতে চেয়েছেন তা যেমন আমার কাছে পরিষ্কার নয়, তেমনি পরিস্কার নয় এই জার্নি টা।
– ঠিক বুঝলাম না ডাক্তারবাবু।
– এই নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স বিষয়টা নিয়ে সারা পৃথিবী জুড়ে অনেক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছে, আর্টিফিসিয়াল অনেক মডেল তৈরী করা হয়েছে, কিন্তু সবাই সহমত হতে পারেন নি। অনেকের ধারণা পুরোটাই মস্তিষ্কের খেলা। যে যে ধর্ম বিশ্বাসী, বা যার মনে মৃত্যুর পরের জগৎ নিয়ে যে ধরনের সংস্কার রয়েছে, মস্তিষ্ক শুধু কিছুক্ষণের জন্য সেই জিনিসের এক্সপিরিয়েন্সই আপনাকে দেয়।
– তাহলে মুসলিম খ্রীষ্টানদের অনুভব কি আলাদা রকম হবে?
– কিছুটা। তবে সব ধর্মের মানুষদের কাছেই কিছু কিছু ফ্যাক্টর কমন। যেমন বেহেস্ত, হেভেন এগুলো আমাদের স্বর্গ বা বিভিন্ন লোকের প্রতিরূপ। আপনি যেমন ঘুম পাড়ানী মাসিকে দেখেছেন, কোনও খ্রিস্টান হয়তো অ্যাঞ্জেল দেখবেন।
– আর এই আত্মীয় পরিজনদের দেখতে পাওয়াটা?
– অনেক বিজ্ঞানী বলেন আমাদের মস্তিষ্ক আসলে আমাদের জন্মের আগের মুহূর্ত থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের একটা ছোট ট্রেলর দেখায়। গর্ভে শিশুর সামনে থাকে অন্ধকার। সেখান থেকে পৃথিবীর আলো দেখাটা আপনার অন্ধকার থেকে আলোর সুড়ঙ্গে যাবার মতো। এবার জীবনে যারা যারা আপনার কাছে প্রাসঙ্গিক বলে আপনার মস্তিষ্ক মনে করেছে, তাদেরই কেবল আপনি এই জার্নিতে দেখতে পাবেন।
– যাঃ। ভেবেছিলাম মরার আগে একটা লোক দর্শন হয়ে গেল।
– সে ভাবলে ভাবুন না। আপত্তি কি? তবে বিজ্ঞান বলেছে এমন অনুভূতি কৃত্রিম ভাবে কিছু ইঞ্জেকশন দিয়েও মানুষকে দেওয়া যায়। আমাদের মুনি ঋষিরা ধ্যান করতে করতে যখন সমাধিস্থ হতেন, তখন তাঁরা এই স্টেটে থাকতে পারতেন। অভ্যাসের বসে তাঁরা আবারও শরীরে ফিরেও আসতে পারতেন। তাঁদের এসব কৃত্রিম উপকরণের প্রয়োজন পড়ত না।
– ডাক্তার বাবু আমার নষ্ট হওয়া বাচ্চাটাকে আমি কি সেই কারণে দেখতে পাইনি?
– খুব সম্ভবত তাই।
– হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল উদিতা। ডাক্তার মৈত্র আলতো করে ওর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘জীবন একটাই উদিতা, এভাবে নষ্ট করো না।’
কাঁদতে কাঁদতে উদিতা বলল, ‘কী করব ডাক্তারবাবু? আমার যে জীবনটা নরক যন্ত্রণা মনে হয়।’
– তুমি ‘না’ বলতে শেখ। তোমার ইচ্ছে না হলে পরিষ্কার করে তোমার স্বামীকে ‘না’ বল। বল প্রয়োগ করলে রুখে দাঁড়াও। পরিষ্কার করে বল, দরকার পড়লে তুমি থানায় যাবে।’
– কী করে বলব ডাক্তারবাবু। আপনাকে তো সমস্যার কথাটা আগেই বললাম।
– এতদিন সবাই তোমার উপর অত্যাচার করার সুযোগ পেয়েছে এই ভেবে যে তোমার কেউ নেই। বাপের বাড়ীর আশ্রয় নেই, পাশে দাঁড়ানোর ভাই নেই, দুঃখ পেলে সান্ত্বনা দেওয়ার কেউ নেই। ওদের এই ধারণা ভেঙ্গে দাও।
– ভাঙবো কী করে ডাক্তারবাবু? সত্যিই তো কেউ নেই।
– কে বলল নেই! তুমি চাইলে সরকার তোমাকে হোমে শেন্টার দিতে পারে। অবশ্য সে হোম গুলির অবস্থা ভালো নয়।
– পেপারে যা দেখি, তার চেয়ে এই নরকে ভালো। এখানে তাও চেনা লোক।
– সেটা ঠিক কথা। কিন্তু তুমি ভয়টা তো দেখাও। আর একটা কথা মনে রেখো, এটা তোমার পুনর্জন্ম। এখন তুমি নতুন উদিতা। তুমি আর কোনও কিছুতে আপোষ করো না আগের মতো। সব সময় মনে রাখবে, সারা পৃথিবীতে কেউ না থাকলেও তোমার জন্য দেবাঙ্গন আছে। পৃথিবীতে চরম স্থির কিছু নেই। তুমিও এমনটা ভেবো না যে, যাই হোক না কেন দেবাঙ্গনের কাছে ফেরা যাবে না।
– এটা কি দেবাঙ্গনের উপর অন্যায় করা হবে না ডাক্তারবাবু? আমি কেবল তাকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করব?
– এভাবে ভাবছো কেন? এই অধিকার আছে বলেই না ভালোবাসা টিকে আছে। নইলে সেই বা এতদিন তোমার জন্য বসে আছে কেন? সে জানে তোমাকে পাওয়া হবে না, তবুও তার ভালোবাসায় কোনও খামতি নেই।
– আমি সংসার ভেঙেও যেতে চাইনা ডাক্তারবাবু।
– তোমাকে তো আমি ভাঙতে বলিনি। আমি শুধু বলেছি, এক্সট্রিম কিছু হলে তোমার কেউ আছে এই ধারণা বা বিশ্বাসটা মনের মধ্যে রাখা। তাহলে দেখবে তোমার প্রতিরোধ দৃঢ়তর হবে। আর একটা কথা মনে রাখবে, যে কোনও সমস্যায় তুমি নির্দ্বিধায় আমার সাথে দেখা করবে। নার্সিংহোম থেকে ছুটি পাওয়ার সময় আমার চেম্বারের ঠিকানা নিয়ে যেও।
উদিতা উঠে ডাক্তার মৈত্র কে প্রণাম করে বলল, 'আশীর্বাদ করুন ডাক্তারবাবু। আমি যেন ফেরৎ পাওয়া জীবনটায় কষ্ট কম পাই।'
– কষ্ট পাওয়া বা না পাওয়াটা তো তোমার হাতে উদিতা। এই নতুন অর্দ্ধে তুমি আর ওটা ঈশ্বরের হাতে ছেড়ো না। শিক্ষিত মেয়ে তুমি। নিজের আমিত্বটাকে জাগিয়ে তোলো। উদিতা হয়ে বাঁচো। মিসেস দাশগুপ্ত হয়ে নয়।
ডাক্তার বাবু চলে গেলেন। উদিতা নার্সিংহোমের জানালার পাল্লা খুলে দেখল বাইরের রাস্তায় অসংখ্য লোক, বাস সাইকেল অটোর ভিড়।
বিকেলের নরম রোদ আস্তে আস্তে ঢলে পড়েছে বাড়ীগুলোর কার্নিশে। লোকদের ওদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রকৃতির পটভূমিতেই জীবন বয়ে যাচ্ছে স্রোতের মত।
বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করতে পারেন 👇
0 Comments