চিত্র- শুভম দাস
নকুলদানা
পুলককান্তি কর
নন্দিতা বেশ রেগেই নকুলদানা
বলল, ‘মা এতবার তো ‘না, না’ই শুনলাম। এবার ঝেড়ে কাসো তো, তুমি আমাদের সাথে দার্জিলিং যাবে না কেন?
– আমার ভালো লাগছে না।
– ভালো লাগছে না বলেই তো তোমার জামাই এবার তোমাকে সাথে নিতে বলল। সদ্য সদ্য একটা শোক থেকে উঠেছো, বাইরে বেরোলে তবেই না মনটা ভালো লাগবে।
– সে তোরা যা না! কিছুটা বিরক্তি গলায় এনে বললেন গীতশ্রী।
– আমরা তো যাবোই মা। সেটা নিয়ে কথা হচ্ছে না। বিষয়টা তোমার যাওয়া নিয়ে। তুমি আমাদের সাথে যাচ্ছো ব্যস। এটাই ফাইন্যাল।
– তুই কি আমার উপর জোর ফলাবি কুটুস?
– দরকার পড়লে ফলাবো। 'ভালো লাগছে না' এর বাইরে যদি কোনও যুক্তি সঙ্গত কারণ দেখাতে পারো তবেই মানবো, আদার-ওয়াইজ তুমি যাবে আমাদের সাথে।
খানিকক্ষণ চুপ থেকে গীতশ্রী বললেন, ‘তোর বাবার কষ্ট হবে ওখানে।’
– মানে? তুমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছো মা? বাবা বেঁচে নেই– এটা কি তোমার মনে থাকছে না আজকাল, নাকি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে?
– না রে, ভুলবো কেন? মারা গেছে সে তো জানি। তাই বলে তোর বাবা কি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে? সে তো থাকে আমার আশেপাশেই।
পাশ থেকে নন্দিতার তেরো চোদ্দ বছরের মেয়ে ইলা বলল, ‘জানো মা আমি এ কদিন আম্মার সাথে আছি তো! আমি দেখেছি, আম্মা দাদুকে সকালে চা খাওয়ায়, দুপুরে স্নান করিয়ে দেয়, কোলে বসিয়ে খাইয়ে দেয়।
– মানে? নন্দিতা যেন চমকে উঠলো।
– হ্যাঁ মা।
– কী করে? বাবা তো মারা গেছে।
– আরে সে কি আমি জানি না? দাদুকে মানে দাদুর ফটোকে খাওয়ায়। তারপর জানো তো, দুপুরে খাটে শুইয়ে দেয়। বিকেলে তো দাদুর হাঁটতে যাওয়ার অভ্যাস ছিল। আম্মা এই ব্যথা পা নিয়ে দাদুর ফটো নিয়ে হাঁটতে বেরোয়।
– বাবার জীবদ্দশাতেই তো মা তুমি কত বলাবলি করেও হাঁটতে যেতে না। বাবা কত বকাবকি করত এই নিয়ে। কতবার অনুনয় বিনয় পর্যন্ত করেছে। তখন তো কই শোননি? নন্দিতা কিছুটা যেন কৈফিয়ৎ চাইলো।
গীতশ্রী চুপ করে রইলেন। নন্দিতা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তারপর?’
– কী তারপর? ইলা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল।
– আম্মা তারপর কী করে?
– ওই তো– ঠিক দেড় ঘণ্টা বাইরে হেঁটে এসে চা খাওয়ায়। দাদু মারা যাওয়ার আগে ডাক্তার কী একটা খাবার দিয়েছিল না, সেইটা বানিয়ে খাওয়ায়। তারপর ওই যে চেয়ারটা– ওতে ফটোটা রেখে টিভির দিকে মুখ করিয়ে টিভি চালিয়ে দেয়।
– কি দ্যাখে? সিরিয়াল?
– না, না। দাদু যে সব জিনিস দেখতে ভালোবাসতো, সেসব। বেশীরভাগ খবরের চ্যানেল। তারপর বিজনেস ওয়ার্ল্ড না কি একটা রয়েছে– শেয়ার বাজারের ওঠাপড়া দেখায় না– ওটা!
নন্দিতার মনে পড়ল, বাবা বেঁচে থাকতে এই টিভি দেখা নিয়ে মায়ের সাথে বাবার কী অশান্তিটাই না হ'ত। মাও সারাদিন কাজ টাজ করে একটু সিরিয়াল দেখতে চাইতো, বাবা কিছুতেই দিত না। বাবা বাজার টাজার গেলে বা হাঁটতে বেরোলেই কেবল টিভির রিমোটের অধিকার মায়ের হাতে থাকতো। মাঝে মাঝে এমন হত, মা রাগ করে ফোন করে নন্দিতাকে বলতো– ‘হ্যাঁরে কুটুস, একটা ছোট টিভির দাম কত?’
– কী হবে মা?
– ঘরে আর একটা টিভি লাগাবো ভাবছি। তোর বাবার জ্বালায় একটা সিরিয়াল দেখার জো নেই। এখন রানী রাসমণি নিয়ে কী ভালো সিরিয়ালটাই না হচ্ছে। সেসব না দেখে খালি খবর– এই পার্টি এই বলল, ওই পার্টি ওই– ছাতার মাথা, ও সব শুনে কী করব বল দেখি সারাদিন!
মা এমনিতেই শান্ত মানুষ। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তার দাবী দাওয়া চাহিদা ভারী কম। নন্দিতা একবার ভেবেছিল একটা টিভি কিনেই দেবে। তবে ওই যা হয়, সারাদিন এটা ওটায় আর কিনে দেওয়া হয়নি। তারপরে তো বাবার কিডনি ফেলিওর ধরা পড়ল। চিকিৎসা-হসপিটাল-চিন্তা– সব মিলিয়ে হয়ে ওঠেনি আর কি। মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'একটু সিরিয়াল ফিরিয়ালও তো দেখতে পারো মা!'
– দূর! যখন দেখতে ইচ্ছে করতো, তখনই দেখতে পারিনি। আর তাছাড়া রান্না করতে করতে এত বছর খবরই তো শুনে আসছি, আজকাল ওসব শুনতে ভালোই লাগে।
– তোমার জামাইকে বলতে হবে দেখছি। ভালো একটা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার।
– তুই কি আমায় পাগল ভাবছিস কুটুস?
– যদি ভাবি, সেটা অন্যায় হবে কি? একটা মৃত মানুষকে নিয়ে এমনটা কোনও স্বাভাবিক মানুষ করে?
– তা নয় রে। আসলে তোদের বিয়ে হয়ে যাবার পর আমি আর তোর বাবা– দুজনেই তো থাকতাম ঘরে। নবুও বিদেশ চলে গেল। একসাথে চা খাওয়া, টিভি দেখা কথা বলাতেই আমাদের জীবন কাটতো। সেই অভ্যাসটা থেকে গেছে। নিজে চা খেতে গেলে মনে হয়, দিই তোর বাবাকে একটু।
– কিন্তু মা, বাবা তো মারা গেছে। সে তো এসে আর খায় না।
– এটা তো ফিলিংস এর ব্যাপার কুটুস। ঠাকুরও তো নকুল দানা চিনি খায় না। আমরা নিত্য পূজোয় তাই বলে কি প্রসাদ দেখাই না ঠাকুরকে?
– কিন্তু মা ওটা তো এক প্রকার নিবেদন।
– এটাও তাই।
– এভাবে কেন করছো মা? তুমি এভাবে করলে বাবার আত্মার কি মুক্তি হবে? এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে কি বাবা যেতে পারবে অন্য লোকে?
– অতশত জানিনা কুটুস। তোর বাবার তো আর অপঘাতে মৃত্যু নয় যে ভূত হয়ে ঘুরবে। এতদিনে আত্মার নিশ্চই মুক্তি হয়ে গেছে।
– তাহলে তো ল্যাঠাই চুকে গেল মা। যে আত্মা নেই, তাকে আর এত রকম মোহ দেখানো কেন?
– তুই কোথাও গেলে কি এখনও তোর বাবার ছবিতে প্রণাম করে যাস না?
– হ্যাঁ।
– কেন করিস?
– মা, তার সাথে এর কী সম্পর্ক?
– তুই বুঝবি না কুটুস। আমার আর কীই বা আছে বল, এইটুকু ছাড়া। এটাতে আর না বলিস না।
– বেশ। তুমি দার্জিলিং এ বাবার ফটো নিয়েই চলো না! ওখানেও না হয় ফটোর সামনে চা জল খাবার দিও।
– আসলে তোর বাবার অ্যাজমার সমস্যা ছিল তো। ঠান্ডার দেশে কষ্ট হবে।
– মা এরকম কথা বললে কিন্তু এবার সত্যি সত্যি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব তোমায়। যে মারা গেছে তার কি ঠান্ডা লাগে, নাকি অ্যাজমার টান হয়? লজিকটা ঠিকঠাক লাগাও। বেশ, ফাইন্যাল তবে– তুমি যাচ্ছো আমাদের সাথে। ইলা, তুমি তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। বাপি আসবে ন'টা সাড়ে নটায় গাড়ী নিয়ে। আমরা তখন বেরিয়ে যাবো।
– আমি আর দু চার দিন এখানে থাকি না, মা?
– না। তোমার টিউশন কামাই হচ্ছে। তাছাড়া বেড়াতে গেলে সাত আট দিন এমনিতেই কামাই হবে। নন্দিতা গীতশ্রীর দিকে ফিরে বলল, ‘মা আগামী সপ্তাহের ন' তারিখ যাওয়া। আমার হয়তো আর আসা হবে না। সাত তারিখে ইলার বাবা এসে তোমাকে নিয়ে যাবে। তোমার জিনিসপত্র সব গুছিয়ে রেখো। আর তোমার ওষুধ পত্রের লিস্টটা দাও। কিনে রাখবো। দয়া করে আবার বাবার ওষুধের ফর্দটা ধরিয়ে দিও না। হাসলো নন্দিতা।
– কী যে ভাবিস না আমায় তুই। হাসলেন গীতশ্রীও।
দার্জিলিং বেড়াতে এসে নন্দিতার জীবনে বেশ কিছু নতুন অভিজ্ঞতা হল। গীতশ্রী তাঁর ব্যাগে নন্দদুলাল মানে তার মৃত স্বামীর ফটোটা নিয়ে সবসময় ঘুরতেন বটে, তবে সবার চোখ এড়িয়ে চা-ফা খাওয়াতেন। ইলা আম্মার সাথে এক রুমে থাকতো বলে ওই দেখতে পেত। টাইগার হিলের সূর্যোদয়ও নন্দদুলালকে মানে ওনার ফটোকে দেখিয়েছেন গীতশ্রী। জীবদ্দশায় এত জায়গায় বেড়াতে যাওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু বাড়ীর পাশের দার্জিলিংটা কখনও আসা হয়ে উঠেছিল না। নন্দদুলাল যদিও সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের চাকরী করতেন, তবে তখন তো এত মাইনে ছিল না। নন্দিতা আর নব্যেন্দুর পড়াশুনা সামলে যা বাঁচতো পার্টির জন্য খরচ করে দিতেন নন্দদুলাল। যৌবনে নকশাল করতেন; কিন্তু অতি বাম যে কখন অতি দক্ষিণ পন্থা নিয়ে নিল, গীতশ্রীর মাথায় ঢোকেনি কোনওদিন। উনি এমনিতেই রাজনীতি-ফীতি বুঝতেন না। নন্দিতার মুখ থেকে ওর স্বামী দেবল যদিও গীতশ্রীর ইদানিং কাণ্ডকারখানাগুলো শুনেছিল, কিন্তু এর সাক্ষাৎ পরিচয় পেল টাইগার হিলে। মজা করে বলল, 'কুটুস আমি মরলে তুমি এমন করে আমার ফটো নিয়ে ঘুরবে?'
– কী সব কথার ছিরি! ঝাঁঝিয়ে উঠলো নন্দিতা।
– আরে বলোই না। কেউ তো আগে মরবে। ধরো যদি আমি আগে মরি।
– এই বিদেশ বিভুঁই এ এসে তোমার মুখে ভালো কোনও কথা জোগাচ্ছে না, না?
– যাই বলো কুটুস, ব্যাপারটা বেশ রোমান্টিক। তবে জীবদ্দশায় তো এমন প্রীতি মধুর সম্পর্ক দেখিনি কখনও! বরং সব সময় তো দেখতাম তোমার বাবা তোমার মাকে ধমকেই যাচ্ছেন। মরার আগের দিনও হাসপাতালে তোমার মাকে কী ধমকটাই না দিলেন। আর তোমার মা হাসিমুখে মেনেও নিতেন সব। তুমি হলে তো আমার পিন্ডি চটকে দিতে। অবশ্য আমার তোমাকে ধমকাবার সাহসই হতো না। একটু মায়ের গুণটাও তো পেতে পারতে, কুটুস?
– কেন, তোমার কি ধমক দেওয়ার খুব শখ?
– না তা নয়। তবে তোমার বাবার মতো পুরুষ সিংহ হতে সব বিবাহিত পুরুষেরই সাধ জাগে। তোমার বাবা সত্যি সত্যিই মহাপুরুষ ছিলেন। নইলে এত ধমক চমকের পরও এত প্রেম থাকে? তোমাদের মতো মেয়ে হলে তো বলতে– যাক বাবা, মরে আপদ বিদায় হয়েছে।
– তোমার আজকে কী হয়েছে বলতো দেব?
– তোমায় কতবার বলেছি না আমাকে নাম ধরে ডাকবে না। এই নাম ধরে ডাকো বলেই ‘স্বামী স্বামী’ ব্যাপারটা আসে না। তোমার মা-দের আমলে দ্যাখো তো, স্বামী মানে কেমন একটা দেবতা দেবতা ব্যাপার ছিল! দ্যাখো না তোমার মা এখনও তোমার বাবাকে কেমন দেবতা বানিয়ে রেখেছেন! বলেই দেবল নিজের হৃদয়ে আঙুল ঠেকিয়ে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে গেয়ে উঠলো– 'নিভৃত প্রাণের দেবতা এখানে জাগেন একা …’
ইলা হঠাৎ ওদের ঘরে এসে বলল, ‘বাপি তোমার কাছে বমির কোনও ওষুধ আছে?’
– হ্যাঁ। কেন? কার কী হয়েছে?
– আজকে টাইগার হিল থেকে ফেরার পর থেকেই আমার অনেকবার বমি হয়েছে।
– আগে বলিস নি কেন?
– আম্মা বলল দাদুকে পূজোতে দেওয়া নকুলদানা থেকে একটা নিয়ে মুখে দিতে। এতে নাকি বমি কমে যাবে।
– মানে? হোয়াট ননসেন্স! দেবল চিৎকার করে উঠলো।
– আ বাপি। চিৎকার করছো কেন? আম্মা শুনতে পাবে তো। আর তাছাড়া ওটা খেয়ে আমার বমি বন্ধ হয়ে গেছে।
– মানে? তাহলে ওষুধ চাইতে এসেছিস কেন?
– ভাবলাম রাতে যদি বাই চান্স দরকার হয়। তখন তোমাকে ডিস্টার্ব করবো না বলে আগেভাগে নিয়ে রাখলাম।
দেবল নন্দিতার দিকে ফিরে বলল, ‘বাই দা বাই নকুল দানার ব্যাপারটা কী? তুমি তো বলতে চা খাবার– এসব দিত ফটোর সামনে। নকুল দানাটা কিভাবে এল? সত্যি সত্যি দেবতা বানিয়ে নৈবেদ্য দিচ্ছে না কি?
ইলা বলল, ‘না বাপি। টাইগার হিলে যাবার জন্য তো ভোর চারটেতে বেরিয়ে গেছি আমরা। ফিরতেও দেরী হয়েছে। দাদুর খেতে দেরী হয়ে যাবে বলে আম্মা ঠাকুরকে দেবার নকুলদানা নিয়ে গিয়েছিল সাথে করে।’
– ঠিক আছে, তুই গিয়ে শুয়ে পড়। দেবল বলল।
একটুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘কুটুস ব্যাপারটা কী বলতো? বাবার প্রসাদ খেয়ে বমি ঠিক হয়ে গেল?’
– কাকতালীয়। এটা নিয়ে ভাবার কী আছে?
– সেটা তো বুঝলাম। অন্য অ্যাসপেক্টটা ভাবো। কাকতালীয় ভাবে না হয় কমলো, কিন্তু তোমার মা বিষয়টি বিশ্বাস করেছেন এবং কনফিডেন্টলি সাজেস্ট করেছেন– এটা কিন্তু চিন্তার বিষয়।
– তুমি কি মায়ের সাথে এই নিয়ে কথা বলবে, দেব?
– কী বলব? একটা সেন্টিমেন্ট নিয়ে তিনি আছেন, এমন নয় যে অন্য কোনও ব্যাপারে ওনার কোনও অসংলগ্নতাও ধরা পড়েছে– এটা নিয়ে কী বলার থাকতে পারে?
– কোনও ডাক্তার কনসান্ট করা কি উচিৎ হবে?
– সে নিশ্চই করা যাবে। তবে আমি যদ্দূর জানি, লাভ কিছু হয় না এসবে। আমার এক বন্ধুর ঠাকুমা ছিলেন, তাঁর উপর নাকি ঈশ্বরের ভর হ'ত। আমি নিজের চোখে দেখেছি সেই ভর হওয়া। কেমন চুলগুলো উস্কো খুস্কো হয়ে দাঁড়িয়ে যেত; অজ্ঞানের মতো একটা সিচুয়েশন– আর সে সময় ভক্তরা সমানে কাঁসর বাজাতো আর শঙ্খ বাজাতো– একেবারে মেসমেরাইজিং! ওই ঠাকুমা তখন বিভিন্ন ভক্তকে বিভিন্ন রকম উপদেশ দিয়ে নানান সমস্যার উপায় বাতলাতেন। ঘন্টা খানেক পরে উনি আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতেন। তখন একদম অন্য লোক।
– চিকিৎসা করায় নি?
– প্রথম দিকে তো কিছু বাকী রাখেনি। তবে শেষ দিকে ওরা নিজেরাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। এবং এতে কিঞ্চিৎ অর্থ লাভের বিষয়টিও বিশ্বাসের প্রতি অনুরাগ বাড়িয়ে দিয়েছিল কিনা বলা মুশকিল।
– সেটা তো অনেক বড় বিষয়। মা'র তো সবে সবে ধরা পড়েছে। চিকিৎসা করালে সেরেও তো যেতে পারে।
– আচ্ছা। কলকাতায় ফিরে না হয় একবার চেকআপ করিয়ে নেওয়া যাবে।
গীতশ্রী যে স্বামীর ফটো নিয়ে তাঁর প্রতি সেবা মনোভাব লোক দেখিয়ে করতেন, তা কিন্তু একদমই নয়। যতটা সম্ভব সবাইকে লুকিয়েই করতেন। তবু এসব বিষয় বড় ছোঁয়াচে। কথা চাপা থাকে না। ধীরে ধীরে কাছের মানুষজনেরা এবং পাড়া পড়শীরা ছোট বড় সমস্যায় গীতশ্রীর শরণাপন্ন হতে লাগলেন। যে যেমন সম্বোধন করেন তার সাথে আব্দার– যদি নন্দদুলালের স্বর্গীয় আত্মাকে বলে সমস্যার সুরাহা করে দেন গীতশ্রী, তবে বড় উপকার হয়। গীতশ্রী যে এদের এন্টারটেইন করতেন এমনও নয়, তবে কিনা সম্পর্ক বড় বালাই। বেশী অনুরোধ উপরোধ করলে এড়িয়েও যাওয়া যায় না; আবার 'না' বলে তিক্তটা বাড়ানোর মতো শক্ত মনের মানুষ কোনও কালেই ছিলেন না গীতশ্রী। টুকটাক ডাক্তার বদ্যি করানো হয়েছিল কিছুদিন, তবে কেউই গীতশ্রীর মনের মধ্যে পাগলামি বা অন্য কিছু রোগ সংক্রান্ত লক্ষণ টের পাননি। দু একবার কাউন্সিলিং করানোর জন্য নিয়েও গিয়েছিল দেবল, সব জায়গায় তিনি পরিষ্কার যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন স্বামীর ফটো কে চা জল খাবার দেওয়াটা তাঁর এতদিনকার অভ্যাস বই আর কিছু নয়। ফটোর সামনে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তিনি কিভাবে বিহিত করেন জিজ্ঞাসা করলে তিনি হেসে উড়িয়ে দিতেন। পাড়া পড়শীরাও ভাবতে লাগলো, জীবদ্দশায় নন্দদুলাল কী এতখানি মহাপুরুষ ছিলেন? ভদ্রলোক পাশেই থাকতেন অথচ তাঁর মহিমা এতদিন চাপা পড়েছিল কীভাবে– এটাই এখন বড় প্রশ্ন। একদিন নন্দিতা এসে বলল, 'মা দেবলের গ্রামের বাড়ীতে কিছু জায়গা জমি বিক্রির ব্যাপার আছে, কয়েকদিন থাকতে হবে। তুমিও চল আমাদের সাথে।'
– না রে কুটুস। যাব না। তোরা যা না। আমার জন্য চিন্তা করিস না, কোনও অসুবিধা হবে না।
– যাবে না কেন? বাবার সেবা যত্নের সমস্যা?
– না না, তা নয়।
– বেড়াতে গেলে যেমন করতে, সেভাবেই করবে না হয়। চলো।
– না রে কুটুস। আমার আজকাল আর এ বাড়ী ছেড়ে অন্যত্র যেতে ভালো লাগে না।
– সত্যি বলো তো মা, এজন্যই যাবে না, না কি আশেপাশের লোক মাঝে মাঝে এটা ওটা বিহিত করতে আসে– পাছে তারা ফিরে যায়, এজন্য যাবে না?
– সেটা এমন কোনও ব্যাপার নয় রে।
– আচ্ছা মা বলো তো, বাবার কি সত্যি কোনও অলৌকিক ক্ষমতা ছিল? এই যে এত লোকজন আসে, তারা সত্যি সত্যি উপকৃত হয়?
– তাই তো বলে রে। তবে আগে এমন কোনও শক্তি ছিল বলে আমি জানি না।
– ইদানিং ইলার কিছু হলেই তো বলে, আম্মাকে বলো, দাদু ঠিক করে দেবে। জ্বর ঠান্ডা হাঁচি কাশি– সব বাবা সারিয়ে দিচ্ছে কী করে?
– হয়তো মরার পর কোনও শক্তি কাজ করে রে।
– কী বলছ মা! এই একুশ শতকে এসব কেউ বিশ্বাস করবে?
– আমি কাউকে তো বিশ্বাস করতে বলিনি কুটুস।
– তুমি তো বিশ্বাস করছ!
– আমি তো সব সময় ফিল করি তোর বাবা আশে পাশেই আছে।
– মা তুমি যদি ঠাকুর দেবতা মানো, তাহলে পুনর্জন্ম বা আত্মা-টাত্মাও মানা উচিৎ।
– মানি না কে বললো?
– তবে বাবা যদি ভূতপ্রেত না হয়ে থাকে, তবে তার হয় আবার জন্ম হয়ে গেছে কোথাও। না হয়ে থাকলে পরমাত্মায় মিশে গেছে নিশ্চিত। তা হলে তোমার এই ফিল করাটা ঠিক নয়। আর দ্বিতীয় কথা, যে নেই সে এসব সুরাহা করে দেয় কী করে?
– আমরা মৃত্যুর পরের বিষয়টা কতটুকু জানি কুটুস? হয়তো এমন কোনও ক্ষমতা কারোর কারোর থাকে।
– পুরোটাই মনের ভ্রম মা। আমি আগেও বলেছি, আবার বলছি– বাবাকে এবার মুক্তি দাও। চলো, ভাই এবার বিদেশ থেকে আসুক– গয়াতে গিয়ে পিণ্ড দিয়ে আসি।
– সে দে না। আত্মাকে কে বাঁধতে চায়। আর তোর বাবা কি ভূত হয়ে ঘুরছে নাকি? তাহলে তো নানান উপদ্রব করতো আমার সাথে। বেঁচে থাকতে কম জ্বালিয়েছে?
– আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না মা। ইলার মনেও এসব অদ্ভুতুড়ে বিষয় গেঁথে যাচ্ছে। ওর অ্যাডোলেসেন্সে এসব কি ঠিক?
– অতশত বুঝি না রে। তবে ইলার ব্যাপারটা বুঝি। তোর বাবা ওকে খুব ভালোবাসতো তো। তাই আমি যখন মনে মনে ওকে জানাই, ইলার কোন রোগ হয়েছে, সে নিশ্চই কোনও ক্ষমতা বলে সেটা সারিয়ে দেয়।
– আর অন্যদের?
– হয়তো আমার কথা ফেরাতে পারে না। তাই করে দেয়। আর তাছাড়া পার্টি করতো তো। জনসাধারণের প্রতি দরদও একটা কারণ হতে পারে।
– যাক গে, তুমি তাহলে যাবে না?
– না রে! তোরা চিন্তা করিস না। আর তাছাড়া তোর বাবা আছে। ভয় পাস না।
নন্দিতা খেয়াল করলো এই ধরনের কথা মা আগে বলতো না। 'বাবা দেখে রাখবে'- এই বিশ্বাসটাও এখন মা রপ্ত করে ফেলেছে। বিষয়টা আর নিজের কন্ট্রোলে নেই বুঝে নন্দিতা বাড়ী ফিরে গেল।
দেবলের বাড়ী দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভেতরের দিকে একটা গ্রামে। গ্রামটির নাম কৈখালি l মাতলা নদীর পাশেই। ভারী চমৎকার লাগে এখানে। নন্দিতা যখনই আসে এখানে, ওর বড় ভালো লাগে। কলকাতার মেয়ে, এভাবে গ্রাম, গ্রামের নদী দেখার অভ্যেস বড় একটা নেই। বিয়ে হয়ে গেছে তার প্রায় ষোল বছর, অথচ সে বার দুয়েকই এসেছে এখানে। এবার তার মনটা খারাপই হয়ে গেল– এই জমি জমা সব এবার বিক্রিবাটা হয়ে যাবে ওদের অংশের। দেবল মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। সারা বছরের ট্যুর লেগে থাকে। গ্রামের বাড়ী আসার বড় একটা সময় সে পায় না। তিন-চার দিন যেতে না যেতেই মা এর ফোন পেল, 'কুটুস তোরা শিগগিরি কলকাতায় আয়।?’ বলেই কেঁদে উঠলেন গীতশ্রী।
– কী হয়েছে মা?
– অ্যাম্বাসি থেকে ফোন করেছে, নবু নাকি মারা গেছে।
– কী করে? আঁতকে উঠল নন্দিতা।
– ও যেখানে পোস্ট ডক্টরেট করছিল, তার ক্যাম্পাসে নাকি কোনও এক ছেলে গুলি করে দিয়েছে?
– কেন?
– এ কথা জানি না, বোধহয় বর্ণ বিদ্বেষের বিষয়, পুলিশ দুজনকে অ্যারেস্ট করেছে।
– ঠিক আছে মা, আমরা আসছি।
পুরো বিষয়টা মিটতে দিন কয়েক গেল। নন্দিতা যতখানি ভেবেছিল, মা ততটা ভেঙে পড়েনি। বরং বাবার ছবি নিয়ে আদিখ্যেতাগুলো আগের মতোই আছে। দেবল বলছিল, ‘দ্যাখো তোমার মা এর ফটো তালিকায় এবার নবুও ঢোকে কিনা।’ আদতে কিন্তু তেমনটা হল না। নব্যেন্দুর ছবি টেবিলে বড় করে বাঁধানো। রোজ তাতে মালা চড়ে। কিন্তু সকালের চা জল খাবার বা দুপুরের খাওয়া ওর জন্য বরাদ্দ হয় না। কয়েকদিন এসব দেখে নন্দিতা বললো– 'মা ভাই এর জন্য চা জল খাবার দাও না কেন?
– ওকে তো আশেপাশে ফিল করি না রে। বহুদিন বাইরে থাকতো তো। তাই বোধহয় ওদেশেই মন থেকে গেছে ওর। এখানে আসে না।
– আচ্ছা মা, তোমার মনে হয় না, বাবার তো এত অলৌকিক শক্তি, বাবা ভাইকে রক্ষা করতে পারতো না?
– দ্যাখ হয়তো তোর বাবাই মনে মনে ওকে কাছে ডেকে নিল।
– কী বলছ মা। কোনও বাবা মা তার সন্তানের মৃত্যু হোক– এমনটা চাইতে পারে?
– জানিস তো কুটুস, তোর বাবা মনে মনে নবুকেই বেশী ভালোবাসতো। পুরুষ মানুষ বাইরে প্রকাশ করতো না কোনওদিন। অন্যান্য ঘরে দেখবি বাবা মেয়েকেই ভালোবাসে বেশী, কিন্তু আমার কেন জানি না মনে হ'ত, কোথাও যেন তোর বাবার ভেতরে নবুর প্রতি টানটা বেশী ছিল।
গীতশ্রী দেখলেন, নন্দিতার মুখটা অভিমানে ভারী হল একটু। তবু সেটা সাময়িক, একটু বাদেই সে বলল, ‘কিন্তু মা, আমি কিন্তু উল্টোটাই ভাবতাম। তুমি আমাকে সব সময় মারতে, আমি তো বাবার কাছেই প্রশ্রয় এবং ভালোবাসা দুইই বেশী পেয়েছি। বাবা বরং নবুকে অনেক মারতো।’
গীতশ্রী মুচকি হাসলেন। একটু পরে বললেন, ‘তোর বাবা এক সময় নকশাল করতো তো। ছেলের বিদেশ চলে যাওয়া একদম মেনে নিতে পারেনি। ছেলে ফোন করলে হুঁ- হ্যাঁ করে জবাব দিত। অবশ্য নবু বুঝতো কিনা জানিনা, তোর বাবা সামনাসামনি ওকে বিদেশ যেতে কোনওদিন বাধা দেয়নি। হয়তো সেই অভিমানেই কাছে টেনে নিল।’
– তোমার যুক্তিটা ঠিক বোঝা গেল না মা। বাবার যদি কাউকে কাছে টানতে হ'ত, তাহলে তোমাকেই টানা সবচেয়ে ভালো হত তার পক্ষে।
– পাগল! তাহলে এত সেবা যত্ন করতো কে তাকে! সারা জীবন আমাকে কেমন ঘোড়ায় জিন পরিয়ে রেখেছিল দেখিস নি?
– দিনরাত তোমাকে দাঁত মুখ খিঁচাতো বটে, তবে ভালোও তো বাসতো। তুমি বাই চান্স আমাদের ওখানে গেলে দিনে কতবার ফোন লাগতো বলোতো! বা, তুমি কখনও বাইরে গেলে সব সময় আমাদের বলতো, দ্যাখ না ফোন করে, মা কোথায় গেল?
– সব খালি সেবা পাওয়ার ধান্দা রে কুটুস? বাইরে গেলে ক্ষণে ক্ষণে চা টা, পানটা, খাবারটা কে সাধবে? দু হাত দূরে জলের বোতলটা পর্যন্ত উঠে নিত না। শুধু হাঁক পাড়তো গীতু গীতু করে। একটু শান্তিতে বাথরুমে সাবান শ্যাম্পু করার উপায় ছিল না, দশবার ডাক আসতো।
– তাই যদি হয় মা, তুমিই বা এত ভালবাসো কেন?
– ভালোবাসি কিনা জানিনা রে, এটা আমার কর্তব্য। এটাই করে এসেছি আজ প্রায় তেতাল্লিশ বছর, মরার আগে পর্যন্ত এর থেকে মুক্তি নেই।
– কিন্তু ভাবো তো, যদি সত্যি আত্মা বলে কিছু থাকে, ভাই এর খারাপ লাগবে না? তুমি পাশেই বাবার ফটো কে স্নান করাচ্ছ, খাওয়াচ্ছ– আর ভাইকে কিছু করছো না!
– এত যে মানুষ মরছে, সবার ফটোকে কি কেউ স্নান করাচ্ছে, খাওয়াচ্ছে? আত্মাদের এসব নিয়ে কোনও কষ্ট হয় না বোধ হয়। আত্মাদের জাগতিক কষ্ট হয় না বলেই তো শুনি। তাদের এসব ঈর্ষা, গ্লানি হয় না।
– তাই যদি হয় মা, এই একই লজিক বাবার বেলায় কেন খাটাও না?
– তুই রোজ দিন আমাকে একই কথা বলে কেন নিবৃত্ত করতে চাস কুটুস? ও তুই বুঝবি না।
নন্দিতা আর কথা বাড়ালো না। রাতে সব শুনেটুনে দেবল বলল, ‘বেচারা নব্যেন্দু। একেই বলে কর্মফল।’
– মানে?
– মানে হল– এই জন্মের পাপ পূণ্যের হিসেব। তোমার বাবা মরে ভগবান হয়ে গেল, ও বেচারার আর ভগবান হওয়া হল না।
– মানুষ সত্যি বড় আশ্চর্য জীব, দেব। মা হয়ে বরং সন্তানের অকাল মৃত্যুর জন্য এইসব নাটক– অনেক বেশী যুক্তি-গ্রাহ্য এবং লোকপ্রিয় হত।
– কুটুস, আমি তো ভেবেছিলাম এবার এক বাড়ীতে দুই দেবতার সেবা হবে। কম্পিটিশন হবে কোন ঠাকুরের যশ বেশী, এই নিয়ে। দ্যাখো সে গুড়ে বালি।
– ইয়ারকি মেরো না।
– কুটুস, তুমি 'দেবতার জন্ম' বলে একটা গল্প পড়েছ?
– কার লেখা? পড়িনি মনে হয়।
– বোধহয় শিব্রাম চক্রবর্তী। ছোটবেলায় পড়েছিলাম। একটা গাছের তলায় একটা পাথরের নুড়ি পড়েছিল। ধীরে ধীরে তার দেবতা হয়ে ওঠার গল্প নিয়েই ওটা লেখা। তোমাদের বাড়ীর ব্যাপারটা অনেকটা একরকম।
গত তেরো চৌদ্দ দিন ধরে ইলার জ্বর কাটছে না। লোকাল ডাক্তার একশ পাঁচ জ্বর উঠতেই হাসপাতালের বিধান দিলেন। দক্ষিণ কলকাতার বড় একটা নার্সিংহোমে– তাও হয়ে গেল আজ ন'দিন। জ্বর এখনও নামেনি। সারাদিন পাঁচ ছটা ইঞ্জেকশন, হাজারো রকমের পরীক্ষা নিরীক্ষা স্ক্যান। জিজ্ঞেস করতে ডাক্তারবাবু বললেন, পাইরেক্সিয়া আননোন অরিজিন। কী গাল ভরা নাম। জর অজ্ঞাত কারণে। দেবল বাইরে ছিল। খবর পেয়েই চলে এসেছে। নন্দিতার একেবারে নাভিশ্বাস অবস্থা। চিন্তায় চিন্তায় রাতে ওদের ঘুম উড়ে গেছে। এতদিন গীতশ্রীকে ওরা জানায়নি। তবু দেবল বলল ‘এবারে তোমার মাকে জানাও।’ তাও হয়ে গেল তিন চার দিন। গীতশ্রী সব শুনে বললেন, ‘চিন্তা করিস না কুটুস, তোর বাবা আছেন। কিছু হবে না।’ তারপর তিন-চারদিন কেটে গেছে, জ্বর তবু ছাড়েনি। নন্দিতা সেদিন রাতে ফোন করে বলল, 'কী গো মা, বাবাকে বলো নি? জ্বর যে ছাড়ছে না।’ কেঁদে ফেলল সে।
– আমার বলার কী আছে কুটুস? তোরও তো বাবা। তুইও তো বলতে পারিস!
– বাবা কি আমার কথা শুনবে? ঠাকুর দেবতাকে প্রার্থনা জানানোর জন্য একজন মিডিয়াম লাগে। যেমন পুরোহিত, ফাদার বা ধরো আত্মাদের জন্য মিডিয়া। বাবার জন্য তেমনি তুমি।
– কী বোকার মত কথা বলিস কুটুস? তোর মেয়ে, তুই নিজের বাবাকে বলবি না? তোর বাবারও তো অভিমান হতে পারে, কই মেয়ে আমাকে তো বললো না?
নন্দিতার মনে হল বলে ‘আত্মাদের নাকি ঈর্ষা অভিমান হয় না!' তবু সে আজ ঐ পথ মাড়ালো না। বলল, 'মা তুমি কালকে বাবাকে একটু নকুল দানা প্রসাদ দিও তো, ইলার ওতেই কাজ হয়, আমি দেখেছি।
– সে না হয় হয় দেবো। তুই এক কাজ কর, কাল নার্সিংহোমে যাওয়ার সময় আমাকে একবার নিয়ে যাস। দিদিভাইকে আমি নিজের হাতে ওর প্রসাদ খাইয়ে আসবো।
কাকতালীয় এমনই হয়। রাত থেকেই জ্বর নামতে শুরু করল ইলার। দু-তিনদিনের মধ্যেই কমপ্লিট রেমিশন হয়ে গেল। কাল বাড়ী ফিরে আসবে ইলা। নন্দিতা দেবলকে বলল ‘আজ বিকেলে অবশ্য করে বাবার ছবিতে প্রণাম করে এসো।’
– কেন, আমাদের ঘরে তোমার বাবার যে ছবিটা আছে, তাতে করলে হবে না?
– এত কথা বলো কেন দেব? সব সময় খালি রসিকতা। এরপরেও আমার বাবার ক্ষমতা নিয়ে তুমি টিটকিরি করছ? দেখলে না, এত টাকা খরচা করে এত বড় বড় ডাক্তার দেখাবার ফল? মেয়ে তো মরতে বসেছিল।
দেবল আর কথা না বাড়িয়ে বলল, ‘সঙ্গে কি মিষ্টি ফিষ্টি কিছু নিয়ে যাবো ভোগ হিসেবে?’
নন্দিতা ভ্রু কুঁচকে অনুমান করার চেষ্টা করল দেবলের এই কথাতেও উপহাসের গন্ধ আছে কিনা। হয়তো ছিল, তবে দেবল এমন পাকা অভিনেতার মতো বলেছে, বোঝার উপায় নেই। তবু স্ত্রী হওয়ার নৈতিক অধিকারেই খিঁচিয়ে উঠে বলল, ‘শ্বশুরবাড়ীতে জামাই কি খালি হাতেই যাবে? একটাও কমন সেন্স যদি থাকতো!’
দেবল বললো, ‘তুমিও চলো না সাথে।’
– আমি গেলে বিকেলে হাসপাতালে কে যাবে আর রাতের খাবার দাবারের বা কী বন্দোবস্ত হবে! এখন তোমার জন্য সব ফ্রেশ খাবার করতে হবে। তোমার পেটটা ঠিক নেই বলছিলে কাল।
– সে হবে'খন। আজ নরেনদা বিকেলে যাবে হাসপাতালে। তোমার না গেলেও চলবে। তাছাড়া তাড়াতাড়ি চলে আসবো। আমার আজকাল তোমার মা কে দেখলে কেমন ভয় ভয় করে।
– ইয়ারকি মারা হচ্ছে। আমার মা'কে তোমার ভয় লাগে? কী ভাবে ভয় দেখায় শুনি? বঁটি নিয়ে তাড়া করে?
– আহা, চটছো কেন? চলোই না।
– আচ্ছা। চলো, তাহলে একটু আগেই যাই। আড়াইটে তিনটেতে বেরিয়ে যাবো।
ওরা যখন বিকেলে গীতশ্রীর বাড়ীতে পৌঁছালো, তখন প্রায় সাড়ে চারটে। ওদের বাড়ী থেকে ঘন্টা দেড়েক লাগে যেতে। দু-তিন বার কলিং বেল টিপেও যখন দরজা খুললেন না গীতশ্রী, নন্দিতার ভয় হল– শরীর টরীর খারাপ হয়নি তো! বা স্ট্রোক ফ্রোক? সব সময় খারাপ চিন্তাটাই মাথায় আগে আসে। এই ভয়ে সে দরজায় নাইট ল্যাচ লাগিয়েছে মা এর ঘরে। মা কে বলে রেখেছে ভেতরের ছিটকিনি না লাগাতে। তাতে সে নিজের চাবি দিয়ে ঘরে ঢুকতে পারে। চাবি দিয়ে দরজা খুলতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়লো তার। গীতশ্রী আল্লু থাল্লু হয়ে চেয়ারে বসে। সামনে ওর বাবার ফটোটা মাটিতে ফেলা। কাঁচ টুকরো টুকরো হয়ে চারপাশে ছিটিয়ে। নন্দিতা ছুঁটে গিয়ে মা কে জড়িয়ে ধরে বলল, 'কী হয়েছে মা? ফটোটা ভাঙলো কী করে?
– আমি ভেঙে ফেলেছি?
প্রায় আঁতকে উঠে নন্দিতা বললো, ‘কেন?’
– সব বুজরুকি। তুই ঠিক বলতিস। কোনও ক্ষমতা নেই তোর বাবার। কোনও ক্ষমতা নেই। ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন গীতশ্রী।
– মা, বলবে তো, কী হয়েছে?
– বোস তোরা এখানে। দিদিভাই এখন ঠিক আছে তো?
– হ্যাঁ। তোমাকে সকালে বললাম তো, কালকে ছুটি দিয়ে দেবে।
গীতশ্রী উঠে গিয়ে একটা ছোট ডায়রি নিয়ে এসে রাখলেন ওদের সামনে। দেবল বলল, ‘এটা কী?’
– এটা দিদিভাই এর ডায়েরী। তোমরা তো বলেছিলে ওকে রোজ ডায়েরী লিখতে। এটা সেটা।
– তুমি এনেছ কেন? অন্যের ডায়েরী পড়া কি ঠিক মা? নন্দিতা ঈষৎ বিরক্তির সুরে বললো।
– আমি নিজে থেকে আনিনি কুটুস। যেদিন দিদিভাই এর জ্বর এলো, মনে আছে সেদিন আমি তোদের বাড়ী গিয়েছিলাম। সম্ভবত ইলাই কখন আমার ব্যাগে তার ডায়েরীটা ঢুকিয়ে দিয়েছে যাতে আমি পড়ি।
– তো? তার সাথে এখনকার কী সম্পর্ক? অসহিষ্ণু গলায় বলল নন্দিতা।
– শান্ত হয়ে শোন-ই না। খালি বাপের মতো অস্থির চরিত্রটাই পেয়েছিস তুই। ঝাঁঝিয়ে উঠলেন গীতশ্রী।
মা কে এমনভাবে ওকে বকতে শেষ পঁচিশ বছরে দেখেনি নন্দিতা। খানিকক্ষণ চুপ করে বলল, ‘তুমি কি বলবে, নাকি আমি পড়ে নেবো?’
– তোরাই পড়। আচ্ছা ছাড়, এসব পড়তে ভালো লাগবে না। আমি বলে দিচ্ছি ছোট করে। গত দশ-পনেরো দিন ধরে দিদিভাই এর স্কুলের কোনও টিচার ওকে মলেস্ট করছে। নানা রকম ভয় দেখিয়েছে যাতে বাড়ীতে না বলে, এমনকি কন্ট্রাসেপটিভ পিলও খাইয়েছে দু-তিন বার। ওই ই-পিল না কী বলে, ওই সব। দিদিভাই তোদের না বলতে পেরে বোধ হয় আমাকে জানানোর জন্য ডায়রীতে লিখে দিয়েছে।
– তুমি এতদিন পড়োনি? চেঁচিয়ে উঠলো নন্দিতা।
– এতদিন তো দেখিই নি। ওর জ্বর নিয়ে দিনরাত চিন্তা করতাম। তোর বাড়ী থেকে আসার পর ব্যাগেই তো হাত দিই নি। সকালে যখন তুই বললি ও সুস্থ হয়ে গেছে, কাল বাড়ী ফিরবে– তখনই ভাবলাম সব জামাকাপড় বের করি, ওয়াশিং মেশিনটা চালাবো– তখনই তো বের হল।
নন্দিতা আর দেবল– দুজনের মুখ থেকেই যেন কেউ ব্লটিং পেপার দিয়ে রক্ত শুষে নিয়েছে। কোনওমতে নন্দিতা বলল, 'এতে বাবার দোষ কী?'
– তোর বাবার আর নাম নিস না আমার কাছে। আগা পাশতলা ভন্ড! এত যদি ক্ষমতা, দিদিভাইকে দেখে রাখতে পারতো না? ওই মাস্টারটার গালে দু-চারটে চড় কষাতে পারতো না? দিদিভাই না ওর নয়নের মণি ছিল! ওই মণিতে দুষ্টু পোকা কেটে দিল, ও টের পেল না? খালি বউ এর হাতে সেবা পাওয়ার ধান্দা! আজ থেকে সব বন্ধ।
নন্দিতা আমতা আমতা করে কিছু বলতে গেল। হঠাৎ অনুভব করলো, দেবল ওর পায়ের পাতার ওপর নিজের পা রেখে চাপ দিয়ে বারণ করছে। নন্দিতা লক্ষ্য করলো ওর বাবার রাগী রাগী মুখ করা ফটোটা অসহায়ের মতো সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে, বরং নব্যেন্দুর ফটোটা নতুন মালা পরে বেশ দুষ্টু মিষ্টি হাসি দিয়ে চারিদিকটা তারিয়ে তারিয়ে দেখছে।
২০২৬ বইমেলা সংখ্যা প্রকাশ
0 Comments