সেকেণ্ড ইনিংস
পুলককান্তি কর
বড় অকালেই চলে গেল হরিধন। মিনিট দশ হল ওর শবদেহ নিয়ে বেরিয়ে গেল দুজন কর্মচারী। ওটাই ওদের বাঁধা কাজ। সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি যেন শীতটাকে আরো জাঁকিয়ে ধরেছে। বেলা এগারোটায় এমন অন্ধকার হয়ে আছে যে আর মনটা কোনওমতে স্থির হচ্ছে না।
ফোন করে কস্তুরীকে ঘরে ডেকে নিল ব্রজেন। তাও ওর সাথে দুটো কথা বললে হয়তো মনের ভারটা কাটবে। অবশ্য মনের আর দোষ কি! হরিধন কে নিয়ে এই মাসে পাঁচটা মৃত্যু হল ওদের এই আবাসনে। আবাসনটা আসলে একটা বৃদ্ধাবাস, কিন্তু অন্যরকম কনসেপ্টে গড়া। ছোট ছোট অনেকগুলো কটেজ এবং কিছু ফ্ল্যাট নিয়ে প্রায় পঞ্চাশ জনের মতো করে তৈরী এই আবাসন। এখানে ঠিক অন্যান্য বৃদ্ধাবাসের মতো বোর্ডিং সিস্টেমে সিট পাওয়া যায় না। কোনও না কোনও ফ্ল্যাট বা কটেজ কিনে নিতে হয় পুরোপুরি, মালিকানা ভিত্তিক। কিন্তু এর মেয়াদ হল ঐ আবাসিকের মৃত্যু পর্যন্ত। তারপর ওই ফ্ল্যাট বা কটেজটি আবার প্রমোটারের দখলে চলে যাবে; সে এবার ওটা অন্য কাউকে বিক্রি করতে পারবে। উত্তরাধিকার সূত্রে বা অন্য কোনও নমিনি এই দখলদারি পাবে না।
প্রমোটারের বুদ্ধিটা ভীষণই ভালো। ফ্ল্যাট বিক্রির সাথে সাথে একটা মান্থলি রোজগারের ভালো ব্যবস্থাই করেছিল লোকটি – কিন্তু গ্রহের ফের। এখানকার সমস্ত ফ্ল্যাট বিক্রি হয়ে গেলেও আবাসিকের সংখ্যা বড় কম। কেউ হয়তো ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিনে রেখেছে কিন্তু এখনও আসেনি। ফলে ফুডিং বা ডাক্তার, পরিচারকদের মাইনে ইত্যাদি মিটিয়ে বিরাট এক প্রফিট হয় না বলে প্রমোটার ভদ্রলোকটিও ধীরে ধীরে এখান থেকে মুখ ফিরিয়েছে। এখন কোনও মতে টিমটিম করে চলে যদিও, কিন্তু আর কতদিন এভাবে চলবে, বলা বড় মুশকিল। তার উপর যেন মৃত্যুর ঢল নেমেছে এখানকার সংসারে। বারো জন থেকে আজকে সাতজনে এসে দাঁড়াল সংখ্যাটা।
ভোলা মানে প্রমোটার বলছিল, এমাস থেকে খাওয়ারটা কোনও হোম ডেলিভারি সংস্থাকে দিয়ে দেবে। ওকে দোষও দেওয়া যায় না। এই বাজারে সাত জন লোকের রান্নার জন্য চারটে লোক পোষা সম্ভব নয়, সত্যি। হঠাৎ ডোর বেল বাজল ঘরে। দরজা খুলে ব্রজেন দেখল কস্তুরী, চোখ মুখ ফোলা ফোলা, কেঁদে টেঁদে এল বোধ হয়।
– কী হল, এখন ডাকলে কেন? কস্তুরী ধরা ধরা গলায় বলল।
– মনটা ভালো লাগছিল না, তাই ভাবলাম তোমায় ডাকি। একটু কফি খেলে হতো। বানাবে একটু? না কি কোমরের ব্যথাটা বেড়েছে?
– সে বানাচ্ছি। কী খাবে ব্ল্যাক, নাকি দুধ দিয়ে?
– দুধ দিয়ে চিনি দিয়ে কড়া করে বানাও তো কালকের মতো। এই ঠান্ডায় বেশ জমবে।
– এত জমার চিন্তা করো না ব্রজদা। তোমার সুগারটা তো অনেক বেড়েছে। তারপর যা যাচ্ছে এ ক’দিন!
– সে ঠিক কথা বলেছে। তবু আজ ওরকমই বানাও। বিকেল থেকে আবার রেস্ট্রিকশন মানবো।
– তরী, তোমার কোমরের ব্যথা কেমন আছে আজ? এই শীতে যা টিপটিপ বৃষ্টি পড়েছে, ব্যথা তো নির্ঘাত বাড়ার কথা।
– সকালে উঠে ভালো করে সেঁক টেঁক করে নিয়েছি। ব্যথা একটু বেড়েছিল। তবে আজকাল এসব বাড়া-কমাটা আর গায়ে মাখি না। এ সব জীবনের অঙ্গ করে নিয়েছি।
কস্তুরী কফি বানাতে গেল ভেতরে। ব্রজেন পিছন পিছন ওর সঙ্গে রান্নাঘরে গেল। ব্রজেনের বাড়িটা কটেজ সিস্টেমের । ছোট দেড়তলা। রান্নাঘর, ডাইনিং, ড্রয়িং সবই আছে। কেউ চাইলে সংসারও পাততে পারে। তবে কিনা, সবাই সংসারে ক্লান্ত হয়েই ঠাঁই নেয় এখানে– তাই টুকটাক চা-কফিতেই রান্নাঘর খুশী থাকে।
ব্রজেন বললো, ‘জানো তরী, হরিধন এই সহজ কথাটাই মানতে চাইতো না।’
– ঠিক বলেছ। সব সময় আফসোস। এই করলে ওই হতো, ছেলেকে কম পড়ালেই ভালো হত, বিদেশে যেতে না দিলেই হত – কত কথা। আজকাল এভাবে ভাবলে চলে? আরে বাবা, তুমি না বললে তোমার ছেলে শুনতো?
– শোনাশুনির কিছু নেই তরী। গাছ তার শাখা প্রশাখা মেলবে, এটাই স্বাভাবিক। তার ফলের বীজ পাখি ঠোঁটে করে নিয়ে গিয়ে কোথায় নতুন চারা বানাবে – তার লাগাম কি গাছের থাকে? তুই তোর জীবন তোর মত করে কাটা না! সারা জীবন শুধু হাপিত্যেশ!
– আসল কথা কি ব্রজদা, ও তো নিজের বাবা মাকে কখনও অবহেলা করেনি। বাবা-মা কে দেখতে হতো বলে প্রমোশন ছেড়ে দিয়েছে; ফলে তার মনে হতো ছেলে কেন সেই মূল্যবোধ পেল না!
– দাও তরী, কফিটা আমি বসার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি।
– চল না, আমি নিয়ে যেতে পারবো।
– আরে দাওই না। জোর করে ট্রেতে দুটো কাপ চড়িয়ে ব্রজেন এসে বসলো ওর শোবার ঘরের বিছানায়।
– কী হলো? ড্রয়িং-এ বসবে বললে যে?
– বড় ঠান্ডা। চল, লেপ মুড়ি দিয়ে বসি গে।
কফি খেতে খেতে কস্তুরী জিজ্ঞেস করল, ‘কী গো কফিটা কেমন হয়েছে বললে না তো?’
– তুমি বানালে সেটা সব সময় বেস্ট-ই হয় তরী। আলাদা করে বলতে লাগে না। যেদিন খারাপ হবে, সেদিনই বলবো।
– বা,বা। ওটা কী রকম কথা? একেই বলে ছিদ্র সন্ধানী। ভালো বলতে পারো না, মন্দটা ঠিক বলবে।
– অত চাপ নিচ্ছ কেন তরী। সে অবসর কোনওদিনও আসবে না। তুমি ভালোবেসে বানাচ্ছ যখন, সেই যত্ন ভালবাসাটাই তো আমি সবচেয়ে আগে পাই গো। তার স্বাদ খারাপ হবে কী করে?
– এই দ্যাখো না ব্রজদা, হরিদার বিড়ালটা কেমন করে বসে আছে!
হরিধনের কটেজটা ব্রজনের ঠিক উল্টোদিকে। মাঝে শুধু একটা আট ফুটের রাস্তা। জানালার কাচের ভেতর দিয়ে ব্রজেন দেখে বলল, ‘ওরাও বোঝে স্বজন হারানোর ব্যথা।’
– জানো তো, ওর বাচ্চা হবে।
– তাই নাকি? দেখে মনে হয় না তো।
– ও তোমরা বুঝবে কী করে? দেখো, পরে মিলিয়ে নিও আমার কথা।
– পেট তো বড় হয়নি, তুমি বুঝলে কী করে?
– মেয়েরা পারে।
– তরী, ওর খাওয়া দাওয়া কী হবে? তাছাড়া ওই নেড়িটাও তো আছে।
– ব্রজদা, আমি এসব 'পেট' দুচোক্ষে দেখতে পারি না। আমি কিন্তু ওদের খেতে টেতে দিতে পারবো না।
– ও ঠিক আছে। আমিই দিয়ে দেব। কিন্তু নেড়িটা গেল কোথায় বলতো? ও কি জানে না, হরি বেঁচে নেই?
– জানে না নিশ্চই।
– কুকুরের নাকি তীব্র সিক্সথ সেন্স হয়!
– তা হলেই বা। তুমি কি জানতে, হরি’দা সকালে উঠে তোমার বাড়ী পেপার পড়তে আসবে না? কোনও রোগ ব্যাধিতে ভোগা নেই, আগাম কোনও লক্ষণ নেই– রাত্রে শুতে গেল, আর মরল। কুকুরের সেন্সেরই বা কী দোষ!
– জানো তো তরী, শ্যামলদার কন্ডিশনটাও কিন্তু ভালো নয়। যা হাঁপের টান বেড়েছে, এই শীত কাটাতে পারলে হয়!
– শুভ শুভ বলো ব্রজদা। মৃত্যুটা এখানে একদম প্যানিক হয়ে গেছে। ওই তো কুমু আজকে বলছিল, ‘দ্যাখো এ নির্ঘাত প্রমোটারের চক্রান্ত। খাবার দাবারে গোপনে কিছু মেশাচ্ছে নিশ্চই, নইলে এত লোক পরপর মরছে কেন?
– তুমিও একথায় বিশ্বাস করে ফেললে নাকি তরী?
– ব্রজদা, কুমুর একটু কুটিল বুদ্ধি আমি জানি। কিন্তু ব্যাপারটা এমন হওয়াটা কি অস্বাভাবিক? আমরা মরলে তো প্রমোটারেরই লাভ! এইসবের মালিকানা ওর হয়ে যাবে, ও আবার ডাবল মুনাফায় বিক্রি করতে পারবে।
– জানো তো, রামকৃষ্ণ দেব একটা কথা বলতেন, 'যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ'? নিজের মনটাকে ছোট করো না তরী। এ চিন্তা মাথায় ঢুকলে দেখবে মনে অশান্তি হচ্ছে। আয়ুক্ষয় হওয়া ছাড়া লাভ হবে না কিছুই।
– তা ঠিক। কিন্তু ভাবো, এক মাসে এতগুলো মৃত্যু হলে মানুষ এমনটা না ভেবেই বা যাবে কোথায়?
– হরি তো হার্ট অ্যাটাকে মরলো। তার মৃত্যুর পেছনে প্রমোটারের হাত কীভাবে ভাববে?
– রাত্রে ঘুমের ঘোরে ভয়টয় দেখতে পারে!
– কী সিরিয়ালের ভাষায় কথা বলছো তরী? তুমি আজকাল খুব টিভি দেখছ নাকি?
– সন্ধ্যায় তোমার এখান থেকে গিয়ে একটু দেখি বই কি।
– আর দেখো না। আজ থেকে আমরা এখানে রাতের খাবার একসাথে খাবো।
– না, না। তার দরকার নেই।
– কেন সমস্যাটা কি? কুমু কী ভাববে?
– সেটাও তো একটা ব্যাপার।
– তরী, এখন আমাদের সে বয়স গেছে। মৃত্যুর আগের কিছুদিন একটু যদি নিজেদের চাহিদা মত বাঁচি, তাতে কাকে কী জবাবদিহি করার আছে?
– ঠিক আছে, তুমি উত্তেজিত হয়ো না। পরে এসব দিয়ে ভাবা যাবে।
দুজনে একটুক্ষণ চুপ করে রইল। হঠাৎ কস্তুরী বলল, ‘দ্যাখো ব্রজদা, নেড়িটা এল। এই দেখো, ঘরের ভেতরটা দেখেই যাচ্ছে। পুষিটার সাথে তো ওর বনে না, দেখলেই তাড়া করে। আজ দ্যাখো, পুষিটা নড়ছে না।
– হ্যাঁ। নেড়ির প্রেজেন্সটা অবজ্ঞা করছে।
– হ্যাঁ ব্রজদা। দ্যাখো না, হাই তুলে কী একটা বোঝাচ্ছে। বোধহয় হরিদার মৃত্যুর ব্যাপারটা ন্যারেট করছে।
– জানো তরী, আমার একটা বিষয় জানতে খুব ইচ্ছে করে। ধরো কুকুরের ভাষা কুকুর বোঝে, কিন্তু কুকুরের ভাষা কি বেড়াল বোঝে?
– ভাষাটা হয়তো বোঝে না, তবে ভাব নিশ্চই বোঝে। নইলে আমাদের কথা জন্তু জানোয়ার বোঝে কী করে? যারা পোষ মানায়, এরকমই কিছু একটা অভ্যাস করায় নিশ্চই।
– দ্যাখো না তরী, নেড়িটা আজ গিয়ে বেড়ালটার গা শুঁকছে। দুঃখের আবহটাই বোধহয় সঠিক সমাজতন্ত্র আনে।
– ঠিক কথা। অন্ন চিন্তাটাই হচ্ছে বেসিক প্রায়োরিটি। দ্যাখো নেড়িটা গিয়ে ওর পাশে শুয়ে পড়লো।
– এখন একটু মুড়ি টুড়ি দিয়ে আসবো? আচ্ছা তরী, তুমি কি কখনও কুকুর বেড়ালকে মুড়ি খেতে দেখেছো?
– আমার এসব বিষয়ে জ্ঞান-গম্যি কম ব্রজদা। খায় নিশ্চই। অন্তত মাছ-মাংস না পেলে, খেতে বাধ্য। খিদে কখনও অপশনের চিন্তা করে না, অপরচুনিটির কথাই ভাবে।
– তাহলে একবার নিয়ে গিয়ে ট্রাই করি?
– করো।
ব্রজেন একটা বড় মতো বাটিতে মুড়ি নিয়ে গিয়ে হরিধনের উঠোনে ঢেলে দিল, কুকুরটা বা বেড়াল কেউ খুব একটা গা করল না। ব্রজেন মুখে টুকটাক শব্দ টব্দ করেও ওদের নড়াতে পারলো না এক চুলও। হতাশ হয়ে ফিরে এসে বলল, 'বেকার গেলাম গো।’
কস্তুরী বলল, 'কোনও কাজই নিষ্ফলা হয় না ব্রজদা।'
– এতে কোন ফল দেখতে পেলে তুমি?
– ওরা আশ্বত হল, ওদের খেতে দেওয়ার একজন লোক জুটেছে। হয়তো আজ ওদের মন ভালো নেই, কিন্তু দেখবে এরপর ওরা তোমার বাড়ীর দুয়ারেই লেজ নাড়বে খাবার সময়। তোমাকে আর কষ্ট করে হরিদার বাড়ী পর্যন্ত যেতে হবে না। এখান থেকেই ডাক পেড়ো, ওরা হাজির হবে।
– কুকুরকে কী বলে ডাকে যেন?
– বললাম না, আমার ওসব বিষয়ে জ্ঞান নেই। দাঁড়াও দাঁড়াও আমার ঠাম্মি ডাকতো। কুকুরটার নাম নিয়ে আতুউউউ করে ডাকতো।
– আর বেড়াল? কুকুরকে ডাকতো যখন বেড়ালও নিশ্চই পুষ্যি ছিল?
– হ্যাঁ। ওকে ডাকতো ‘আ পুষ ষষ’
– তোমার তো অনেক জ্ঞান তরী! এমন কি জানোয়ারদের সাইকোলজিটাও বোঝো।
– ওটা আমার প্রিয় সাবজেক্ট ব্রজদা।
– এটা কি এখন প্রিয় হয়েছে, না আগেও ছিল? মিটিমিটি হাসতে লাগলো ব্রজেন?
– কী মিন করতে চাইছো?
– মানে, ছোটবেলা থেকেই কি মন বুঝতে শিখেছ অন্যের?
– ফের ফাজলামি? যাও স্নানে যাও।
২
মাঝরাতে হঠাৎ মোবাইলের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল ব্রজনের। ওপারে কস্তুরী। ধড়মড় করে উঠে বসল সে। 'কী হল তরী? এত রাত্রে?
– জানো তো একটু আগে শ্যামলদাকে নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে হল।
– কেন? কী হয়েছে ওর?
– ওই হাঁপের টানটা খুব বেড়েছে। বিকেলে তো ডক্টর গুহ এসেছিলেন দেখলাম। অক্সিজেনের ব্যবস্থা ঘরেই করে গেছিলেন। এখন এত বাড়াবাড়ি হচ্ছিল নাকি, যে সবাই নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়াই মনস্থ করল।
– সবাইটা কে?
– এই ম্যানেজারবাবু। ভোলাও এসেছিল, শুনলাম। ব্রজদা, শ্যামলদা নার্সিংহোম থেকে ফিরবে তো?
– এভাবে ভেবো না তরী। আমরা তো সদর্থক চিন্তাই করবো।
– আমার খুব ভয় করছে গো।
– আমি যাবো তোমার ঘরে?
– থাক। একটু ঘুমোও এখন। সকাল হলে এসো।
– কেন বাধা দাও তরী? যাই না এখন?
– থাক ব্রজদা। একটু বাদেই তো সকাল হবে।
– বেশ। ওকে নিয়ে যাওয়ার আগে ডাকলে না কেন? একবার চোখের দেখা হয়ে যেত।
– আমিও জানতাম না। এত রাতে অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ পেয়ে ঘুম ভেঙে গেল। বেরিয়ে দেখি আমাদের কমপ্লেক্সেই অ্যাম্বুলেন্স এসেছে।
– ডাকতে পারতে।
– আসলে ব্যাপারটা বুঝে উঠতে না উঠতেই ভোলা শ্যামলদাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। বলে গেছে অবশ্য, আজ বা কাল বিকেলে আমাদের নিয়ে গিয়ে ওকে দেখিয়ে আনবে। তাই আর তোমাকে ডাকলাম না। ঠিক আছে শুয়ে পড়ো গিয়ে।
– তরী, জানোই তো, রাতে আমার ঘুম ভাঙলে আর আসতে চায় না। বরং ফোনেই একটু গল্প করি।
– এখন সবে দেড়টা বাজে ব্রজদা। শুয়ে পড়ো। ঠিক ঘুম এসে যাবে।
মোবাইলটা রেখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা এসে গ্রাস করল ব্রজেনকে। হয়তো ‘হারাধনের দশটি ছেলে’র অবস্থা। এক এক করে ক্রমশ কমছে। এই শীতে সত্যি সত্যি টিকবে তো শ্যামল দা? এই মানুষটা বেশ অদ্ভুত। খুব বড় সরকারী চাকরী করতো। খুব পড়াশোনা। লেখালেখি, গান-বাজনা নিয়েই চলছিল সবকিছু। হঠাৎ স্ত্রী বিয়োগ হতে ওরই এক অধস্তন বিধবা মহিলাকে বিবাহ করার বাসনা প্রকাশ করলো। ছেলেমেয়ে ভেটো দিল। তারপর বাড়ীঘর, কিছু টাকা-পয়সা ছেলে মেয়ের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে সে আস্তানা গড়েছিল গড়িয়ার দিকে কোনও এক ভাড়া বাড়ীতে। ছেলে মেয়েকে ঠিকানা দেয়নি। বিধবা মহিলাটিকেও ঘরে তোলে নি। রিটেয়ারমেন্টের পর এখানেই ঠিকানা। কোনওদিন ছেলে মেয়ের কথা মুখেও আনতো না, বিগত দিন নিয়ে কোনকোনও ক্ষোভ বিক্ষ্যোভবিক্ষোভ নেই। লেখাপড়া নিয়েই থাকতো। আজকাল অবশ্য রোগের ব্যারাম এমনই বেড়েচ্ছিল যে, ঠিকমতো ওতেও মন দিতে পারতো না। তবু মানুষটা বেশ ভালো। ব্রজেনের এমন মানুষই ভালো লাগে। সারাক্ষণ যে নিজের ক্ষ্যোভক্ষোভ হতাশা নিয়ে নাকে কাঁদে, ওর তাকে একদমই ভালো লাগে না। আরে বাবা প্রতিটি মানুষ জীবনকে তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে এটা ঠিক, কিন্তু তাই বলে অন্যের দৃষ্টি কোনটাদৃষ্টিকোণটা একবারও তলিয়ে দেখবো না– এটা ভালো কথা না। ওর নিজের জীবনেই বা কী সমস্যা ছিল? ছেলে- বৌমা কি ওকে দেখতো না, নাসকি না কি খেতে দিত না? স্বাধীনভাবে বাঁচার ইচ্ছেটা বেশ কিছুদিন ধরে চাগাড় দিচ্ছিল, একদিন হুট করে ডিসিশন নিয়ে নিল। নাতনি টা অবশ্য বড় মায়ার জায়গা ছিল। সে থাক গে। কিছু পেতে হলে কিছু তো ছাড়তে হয়ই। শ্যামল দারশ্যামলদার এতক্ষণে কী হলো, কে জানে। ভোলাকে এখন ফোন করা কি ঠিক হবে? ভর্তি টর্তি করানো নিয়ে ঘেঁটে আছে নিশ্চই। থাক, সকালে খবর নিলেই হবে।
সকালে ঘুম ভাঙলো কলিং বেলের শব্দে। কস্তুরী! নিশ্চই খারাপ খবর। এত সকালে তো সে আসে না। দরজা খুলেই প্রথম প্রশ্ন তার, 'কী হল শ্যামলদার? নেই?
– জানি না। কোনও খবর পাইনি।
– তবে? তুমি এত সকালে কেন?
– তুমি সকাল সকাল যাবে বলেছিলে। এলে না বলে ভাবলাম, আমিই যাই। আমার সেই রাত থেকেই না ঘুমিয়ে কেটে গেছে।
– এসো, শোবার ঘরেটায় এসো। তুমি কি এখানে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করবে তরী?
– না। এখন ঘুমোলে উঠতে দেরি হয়ে যাবে। চা খেতে ইচ্ছে করছে খুব। তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি চা বানাচ্ছি।
চা খেতে খেতে কস্তুরী বলল, 'ব্রজদা, আমার মনে হয় আমাদের কিছু একটা কাজে নিজেদের ব্যস্ত না রাখলে এই ধরনের মৃত্যুভয় আমাদের পিছু ছাড়বে না'।
– কী ধরনের কাজ তুমি বলতে চাইছো তরী?
– আমরা যে ধরনের কাজ ভালো পারি।
– সে সব তো এতদিন করে এসেছি। সেখান থেকে বিরতি চাই বলেই তো এই দ্বিতীয় ইনিংসের তোড়জোড়।
– না ব্রজদা, সবাই যে তার জীবনের পছন্দের কাজ করতে পারতো, তা তো নয়। এই যেমন ধরো শ্যামলদা। ও ছিল সরকারী আমলা। কিন্তু ওর প্যাশানটা ছিল লেখালেখি।
– সেরকমটা না হয় তোমার আছে তরী। তুমি নাচ ভালবাসতে। একসময় শিখেছোও। কিন্তু আমি? আমি তো ঠেকবাজি ছাড়া আর কিছু করিনি। ওটাই আমার প্যাশান ছিল।
– হ্যাঁ। রকে বসে নানা বয়সের মেয়ে দেখা। তোমাদের জ্বালায় রাস্তায় বেরোনোর উপায় ছিল?
– তরী, দেখতাম ঠিক কথা, তবে জ্বালাতাম না কখনও। তোমাকে জ্বালিয়েছি কোনওদিন?
– সব জ্বালানো কি একরকম? ওরও রকম ফের আছে।
– আমারটা কী রকম ছিল?
– তোমারটা ঠিক পীড়া দিত না, বরং আরাম দিত। এমন মুগ্ধ ভাবে চেয়ে থাকতে, নিজেকে বেশ কেউকেটা লাগতো। তবে অস্বস্তি হত না, এমন নয়।
– তুমি তো আমাদের পাড়ার মেয়ে, আবার পাড়ারই বউ। বিয়ে হবার পর আমি তেমন দৃষ্টি দিতাম না তরী, মিথ্যে বলো না।
– দিতে না আবার! প্রথম প্রথম দৃষ্টিতে ঈর্ষার জ্বলুনি ছিল। কিছুদিন পরে সেটা মিটে গিয়ে আবার পুরাতন মুগ্ধতা ফিরে এল।
– তুমি কি সেটা উপভোগ করতে তরী?
– সব কথার উত্তর দিতে নেই। মিষ্টি করে হাসলো কস্তুরী।
ব্রজেন আবার বলল, ‘যাই হোক, আমি কিন্তু আমার প্রিয় কাজ এখনও করে যাচ্ছি। সুতরাং তোমার কথা মতো আমাকে আর নতুন করে কিছু করার দরকার নেই।’
– কী প্রিয় কাজ করে যাচ্ছ এখনও?
– কেন, তোমায় মুগ্ধ চোখে দেখা।
– বাজে কথা রাখো, ব্রজদা। আমি কিন্তু সিরিয়াসলি বলছি।
– আমিও সিরিয়াস তরী। তুমি সাজেস্ট করো। তবে এমন কিছু বলো, যেটা আমি তোমার সাথে করতে পারি। তাহলে করার মজাটা দ্বিগুণ হবে।
– তাহলে তো তোমায় নাচ শিখতে হয়।
– শিখবো। কী নাচ শেখাবে?
– বাঁদর নাচ।
– সে তো আজ পঁয়ষট্টি বছর ধরে নাচছি, তরী।
– দ্যাখো না, তোমার ফোন বাজছে তো!
– ওঃ। রিঙটোনটা এত আস্তে বাজে! আরে, এ তো ভোলার ফোন। হ্যালো!
– হ্যাঁ ভোলা। কী হল?
– শ্যামল জেঠুর অবস্থা ভালো নয়। ডাক্তারবাবু বলেছেন এখুনি ভেন্টিলেটরে দিতে। কী করবো? ওঁর ছেলেমেয়েদের কারুর ফোন নম্বরও তো নেই আমার কাছে। এসব সিদ্ধান্ত কি আমি নিতে পারি?
– দ্যাখো ভোলা, শ্যামলদা তো তার বাড়ীর লোকদের সাথে যোগাযোগ রাখতে চাইতো না। তার মৃত্যুশয্যায়, যখন তার জ্ঞান নেই, আমরাই বা তার ইচ্ছার অমর্যাদা করবো কেন? আমরা যখন ওর এখনকার পরিবার, তখন আমাদেরই মত দিতে হবে।
– সে না হয় হল জেঠু, কিন্তু খারাপটাই ধরুন। এখন যদি খারাপ কিছু ঘটে যায়, মুখাগ্নি করবে কে?
– কেন ভোলা, তোমার মনে নেই ওর বডি ডোনেট করা আছে? সে সব কাগজপত্র তো তোমাকেই দিয়ে রেখেছে।
– ও হ্যাঁ। একদম ভুলে গিয়েছিলাম জেঠু। তাহলে ভেন্টিলেটারে দিয়ে দিতে বলি?
– হ্যাঁ। রাখি এখন?
কস্তুরী পাশ থেকে বলল, ‘ভেন্টিলেটারে কেন? ওসব টাকা খেঁচার ফল ব্রজদা। ভেন্টিলেশনে থাকলে কেউ আর বেঁচে ফেরে না।’
– কী করবে তরী? যার কাছে দিয়েছ তাকে ভরসা করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় আছে কি?
– অন্য কোনও নার্সিংহোমে নিয়ে গেলে হয় না?
– দ্যাখো এদের আবাসনের সাথে যে নার্সিংহোমের টাই-আপ সেখানেই তো নিয়ে যাবে। আর তাছাড়া মেডিক্লেম ফ্লেমের অনেক ব্যাপার আছে।
– কিন্তু যদি সত্যিই এদের সাথে নার্সিংহোমের গট আপ হয়, তবে শ্যামলদাকে মেরেও তো ফেলতে পারে ব্রজদা?
– কী আবোল তাবোল বকছো তরী! এত নেগেটিভ ভেবো না।
– মোটিভটা তো পরিষ্কার।
– ভোলা সেই রাত থেকে নার্সিংহোমে পড়ে আছে। তাকে দেখলে কি মনে হয়, সে এসব অভিনয় করে যাচ্ছে?
– বিচিত্র নয়। টাকা-পয়সার লোভ মানুষকে অনেক নীচে নামিয়ে দেয়।
– কিন্তু তরী, তোমার অনুমান যদি ভুল হয়, তোমার এই বিচার ধারায় তুমি অনেক নীচে নেমে যাচ্ছো না কি?
– তাই বলে সাবধান থাকবো না? যুক্তির চর্চা করবো না?
– এটা যুক্তির চর্চা হচ্ছে না তরী। তুমি অন্যজনের সন্দেহকে শুধুমাত্র নিজের মনের মধ্যে লালন করছো। আজ পরিস্থিতির নিরিখে সে সব সন্দেহকে জল সার দিয়ে তাজা করছো। তুমি তো এমন ছিলে না!
– মনে আসছে যে।
– ঠিকই বলেছ তুমি। তুমি আবার নাচের চর্চা শুরু করো।
হঠাৎ কস্তুরী পা টা চেয়ারে তুলে আঁতকে উঠলো, 'আরে পায়ের কাছে কী?’
‘ম্যাঁও।’ পায়ের কাছে আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠলো দুজনেই।
– ও বাবা। বিড়ালটা এখন তোমার এখানেই বাসা বেঁধেছে নাকি ব্রজদা?
– না, না। হরিধনের ঘরেই থাকে। খেতে এসেছে বোধ হয়।
– দ্যাখো, এবার ওর পেটটা দ্যাখো মন দিয়ে। ফোলা লাগছে?
– হ্যাঁ।
– বলেছিলাম না, বাচ্চা হবে? দেখেছো তো আমার ইনটিউশন?
– সেটা নিয়ে আমি কবে সন্দেহ প্রকাশ করেছি তরী? তুমি বলছো যখন সেটা অলওয়েজ রাইট।
৩
আজ শ্যামল রায়চৌধুরীর জন্য ছোট্ট একটা স্মরণসভার ব্যবস্থা করেছে ভোলা। সবাই যে যার মতো বক্তব্য রাখছে। মনীশ বলল, 'ভোলা, তুমি এই বৃদ্ধাশ্রম তুলে দাও। তুমি বরং এখন সম্ভ্রান্ত লোক দেখে ফ্ল্যাট গুলো বেচে দাও, যাদের পরিবার আছে। অন্তত পরিবারের মাঝে থাকলে এত মৃত্যু দেখতে হবে না।'
– আপনার কথাটা ঠিক কাকু। কিন্তু আমি অলরেডি এই মর্মে সমস্ত ফ্ল্যাট তো বেচে ফেলেছি। তারা আজ এখানে আসছে না মানে ভবিষ্যতে আসবে না এমন নয়। ধরুন যে ছয় জন মারা গেছেন, সেই ছটা ফ্ল্যাট আমি কোনও পরিবারকে বেচতে পারি– কিন্তু তারাই বা এর মধ্যে এসে ঘর গড়তে চাইবে কেন?
ভোলার বক্তব্যটা পরিষ্কার। এবং এটা উড়িয়ে দেবার মতোও নয়। সুরেশের বয়স এখানকার সবার থেকে বেশী। সাতাত্তর। সবার দৃষ্টি এখন ওঁর দিকে। সুরেশ এর মধ্যে একটু মজা করে বললেন, ‘কী গো। তোমরা সব শকুনের দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছ কেন? আমার পরিবারের সবাই নব্বই এর ঘরে পৃথিবী ছেড়েছে। সুতরাং তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো। আমি এখনও ব্যাটিং করে যাবো।’
ব্রজেন বলল, ‘বালাই ষাট। আপনি শতায়ু হবেন সুরেশদা। তবে আমার মনে হয় আমাদের কোনওভাবে নিজেদের এই ভাবনা থেকে বেরোনো উচিৎ। আমাদের কিছু করা উচিৎ। সেদিন কস্তুরী এই পরামর্শই দিচ্ছিলো।’
মনীশ বলল, ‘কিন্তু কী করতে পারি আমরা? ভোলা, তোমার তো অনেক রকম ব্যবসা আছে? আমরা বুড়ো বুড়িরা সে সব কাজে কি আসতে পারবো?’
– না না কাকু। আপনারা আমাকে বুদ্ধি দেন, সে সব ঠিক আছে। কিন্তু আপনাদের দিয়ে কোনও কায়িক শ্রম আমি করাতে পারবো না। আমার রেপুটেশনের দফা রফা হয়ে যাবে।
– আরে, আমরা তো স্বেচ্ছায় করছি।
– না না কাকু, আপনি বুঝবেন না। অপোনেন্টরা সব খুঁত ধরতে বসে আছে চারদিকে।
কস্তুরী বলল, ‘ভোলা, খালপাড়ের বস্তিটায় তো তোমার বেশ বোলবালা। একটা কাজ করলে হয় না, ওখানকার বাচ্চাদের লেখাপড়া, গান-বাজনা শেখানোর ভার যদি আমরা নিই?’
কুমু বলল, ‘ভার নেওয়া মানে কি কস্তুরী? তুই কি দত্তক নেওয়ার কথা বলছিস?’
মনীশ বলল, ‘বাড়ীতে তো ওইসব বায়নাক্কা ছেড়ে এলাম। আবার খাল কেটে ওসব কুমির কেন?’
কস্তুরী বলল, ‘বাড়ীর বায়নাক্কায় তো আপনার ভালোবাসা ছিল না মনিদা, ওটা আপনার দায় ছিল। নাতি-নাতনিদের ভালোবেসে না, কে? কিন্তু আপনার পরিবার সেই ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে আপনাকে বেবি সিটার করে রেখেছিল– আপনি সেটাতে আপত্তি করেছিলেন। ওদের কোনওকিছুতে আপনার বলার কিছু অধিকার ছিল না, অথচ ওদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসা, দুপুরে খাওয়ানো, চান করানোর কর্ত্তব্যটুকু ছিল। এখানে তো তা নয়। আমরা যে যে জিনিসটা ভালো পারি সেগুলোই শেখাবো।’
– আর যেগুলো পারি না? সেগুলো কে দেখাবে? কুমুর কৌতুহল।
– ক্লাস নাইন টেন পর্যন্ত সাবজেক্ট আমরা কে পারবো না কুমু? যদি না পারি, অন্য টীচার রেখে দেবো। আমি সে টাকা বিয়ার করবো। কস্তুরী বলল।
ব্রজেন বলল, ‘ব্যাপারটা তুমি বিয়ার করবে কিনা সেটা নয়, ব্যাপারটা হল বিষয়টা মেটিরিয়ালাইজড করা যাবে কিনা? ভোলা, তুমি কি ব্যাপারটা অ্যারেঞ্জ করতে পারবে?’
– আপনারা নিজেরা আলোচনা করে দেখুন। আমার এখানে তো ক্লাবরুম আছে, সেখানেই করা যেতে পারে। বিশ পঁচিশটা ছেলে মেয়ে জোটানো তেমন কোনও ব্যাপারই নয়।
– আচ্ছা ভোলা, ধরো আমরা একটা ফান্ড করলাম। তোমার তো রান্নার লোক আছে। যদি বাচ্চাদের জন্য একটু টিফিনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে বেশ হয়। সুরেশ মন্তব্য করলেন।
– এটা কি মিড ডে মিল এর মতো টোপ দেওয়া – নয় কি, সুরেশ দা? ব্রজেনের সহাস্য মন্তব্য।
সবাই একথায় হেসে উঠলো। সুরেশ দা বললেন, ‘খানিকটা তো তাই।’
ভোলা বলল, ‘ঠিক আছে, খাওয়া দাওয়া করে আজ সবাই বিশ্রাম করুন। আমাকে পরে জানাবেন। কস্তুরী মাসীর প্ল্যানটা চাইলে করা যাবে না, এমন নয়। দরকার পড়লে আমিও কিছু কনট্রিবিউট করবো। আমিও চাই, এখানে প্রাণ ফিরে আসুক। বাচ্চারা খেলুক। সামনে দোকান হবে, খাওয়ার ঠেলা লাগবে। আপনারাও চেষ্টা করুন ভালো থাকার। বাকীটা আমি দেখছি।’
রাত্রে যে যার ঘরে যাবার মুখে ব্রজেন বলল, ‘তরী, একটু আমার ঘরে এসো না!’
– রাত হল যে।
– কটা আর হলো? এই তো সাড়ে ন’টা। গিয়ে তো সিরিয়াল গিলবে।
– তুমি কী গেলাবে শুনি?
– চল না। কী গেলাই দ্যাখো।
– আচ্ছা চলো।
ঘরে এসে বিছানায় লেপ মুড়ি দিয়ে বসলো দুজন। বহুক্ষণ কথা বলল না কেউ। খানিক পরে কস্তুরী বলল, ‘কী হলো, চুপ করে আছো যে?’
– তরী, আজ আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
– তবে ডাকলে যে!
– কথা বলতে ইচ্ছে করলেই কি শুধু তোমায় ডাকা যায় তরী? তোমার সামনে চুপ করে বসে থাকতেই ইচ্ছে করছে আজ।
– তোমাকেও মৃত্যু ভয় গ্রাস করলো?
– ঠিক ভয় না। তবু মৃত্যুর ঘটনাটাকেও তো অস্বীকার করতে পারছি না। এই নিয়ে ছটা হ'ল এক মাসে।
– এ হিসেব তো আমি করি। তোমার স্বভাব তো নয়, ব্রজদা?
– আসলে সংখ্যাটা যে একদম ছয়ে নেমে এল তরী। নতুন যদি আবাসিক না আসে, সবারই এখন প্যানিক লাগবে।
– সে তো লাগবেই।
– জানো তো, খুব ছোটবেলায় একটা গল্প পড়েছিলাম, কার লেখা জানি না, সম্ভবত বিদেশী গল্প…
– বলো না, শুনি।
– একজন মধ্যবয়স্ক লোক কোনও একটা দুরারোগ্য রোগে ভুগছিল। দিনে দিনে তার শারীরিক অবক্ষয় বেড়েই চলছিল। কালের নিয়মে শীতের থাবা বসলো চারিদিকে। বরফ পড়লো গাছে, কাছে দূরের সীমানায়। পর্ণমোচী গাছেরা ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিল পাতা খসানোর। লোকটির বাড়ীর উঠোনে একটি ম্যাপল ট্রি ছিল। তারও পাতা খসতে থাকলো কালের নিয়ম মেনে। একটা সময় লোকটি দেখলো, অল্প ক'টি পাতা আর আছে গাছটায়। ওর মনে হল, গাছটির পাতা যতদিন, ওর আয়ুও ততদিন। দিন যায় রাত যায়। লোকটি গোনেগোণে ওর আর সাত দিন আয়ু, ছদিন আয়ু। একদিন ওর এক আর্টিস্ট বন্ধু এসে ওকে দেখে বলল, ‘কী ব্যাপার, তুই এত বিমর্ষ কেন?’
লোকটি বলল- 'জানিস তো আমার আর চারদিন আয়ু।'
'তুই কী করে জানলি?'
'এই যে দেখছিস চারটে পাতা আর গাছে। যেদিন ওরা ঝরে যাবে, আমিও সেদিন ঝরে যাবো'।যাবো।’
– তারপর?
– তখন সেই আর্টিস্ট বুঝলো, ব্যাপারটা ওর বন্ধুর মনে গেঁথে গেছে। ও তখন ওকে কিছু না বলে কৃত্রিম একটি পাতা বানালো। রাত্রে যখন ওর বন্ধু ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন সারারাত ওই বরফের মধ্যে ঠান্ডায় কুঁকড়ে, ও ঐ পাতাটিকে এমন করে গাছে গেঁথে এলো যাতে ওটাকে স্বাভাবিক মনে হয়। আরও দু-তিন দিন গেল। লোকটি দেখলো এখন একটা পাতাই গাছে আটকে। নিশ্চিত হল ও, এই পাতাটি খসলেই ওর মৃত্যু হবে। রোজ সকালে উঠে সে দেখে ওই পাতাটা এখনও গাছে। দেখতে দেখতে শীত কমল, বসন্ত এল। নতুন নতুন পাতা গজালো গাছে। লোকটিও নতুন উদ্যম ফিরে পেল। বেঁচে গেল সে।
– আর ওই আর্টিস্ট বন্ধুটা?
– ওর কথা কি এখনই জিজ্ঞাসা করবার ছিল তরী? ও তো গল্পটার সাবজেক্ট নয়?
– তবুও …
– ওই প্রখর ঠান্ডায় সারারাত বাইরে থেকে ও নিউমোনিয়ায় ভুগে মারা গেল।
– আমাদের এখানে আর্টিস্ট কে হবে ব্রজদা?
– সব গল্পেই যে ক্লাইম্যাক্স থাকবে, এমন তো নয় তরী। আর্টিস্ট আমরাই হবো। কিন্তু ওর মতো ভবিতব্য আমাদের হবে না।
– আমার খুব ভয় করে ব্রজদা। ঈশ্বর করুন, আমি যেন তোমার আগে মরি।
– আমিও তাই চাই তরী। শূন্যতরী একা একা ভেসে থাকতে পারে না।
– আমি আজ যাই?
– থাকো না এখানে। নাইবা গেলে আজ।
৪
ভালো করে সকাল হয়নি। এত সকালে বাটিতে কী নিয়ে কস্তুরী আসছে এদিকে? ব্রজেন বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠলো। না না, এদিকে তো আসছে না, হরিধনের বাড়ীর দিকে চলেছে। কী ব্যাপার? একটা মোটা চাদর জড়িয়ে ব্রজেন দরজাটা খুলে বাইরে এল। পেছনে পায়ের আওয়াজ শুনে কস্তুরী ফিরে তাকালো। ইঙ্গিতে বোঝালো 'পা টিপে টিপে এসো'। একটু এগিয়ে বোঝা গেল বেড়ালটা বাচ্চা দিয়েছে। চারটে সাদা তুলোর মতো। কস্তুরী একটু গা বাঁচিয়ে একটা মাটির খুরির মধ্যে দুধটা ঢেলে ব্রজেনকে ইশারা করে বলল, 'চলো'।
খানিকটা এপাশ ওপাশ পায়চারি করতে করতে ব্রজেন বলল, ‘তরী নেড়িটা কোথায় গো? কালকে খেতে আসেনি।’
🍂
– ওই তো ওদিকে বসে ছিল। দ্যাখোনি?
– না।
– ওই তো পুশিটা যেখানে শুয়ে দুধ খাওয়াচ্ছিল বাচ্চাদের, তার থেকে একটু দূরে।
– পাহারা দিচ্ছিল নাকি?
– বোধহয়।
– ভালো কাজ জুটেছে ওর। কিন্তু কাল থেকে খেতে আসছে না তো!
– ওই তো বেড়ালটার কালই বাচ্চা হয়েছে। হয়তো সেসব তদ্বিরে দিন গেছে তার।
– বা বা, পুষিটা তো সেয়ানা। ও এসে দুপুরে ঠিক খেয়ে গেছে।
– বল না পেলে এত ধকল সইবে কেন? ওরা অনেক বুদ্ধিমান ব্রজদা।
– তাও ভালো তরী। এই রকম এক মৃত্যু আবহে অন্তত নতুন জীবন এসেছে এই আবাসনে, এটাই আনন্দের। আজ সবাইকে বলে দিও খবরটা। সবাই প্রাণে আশার আলো পাবে।
– সে বলবো না হয়। কিন্তু আমাদেরও খেয়াল রাখতে হবে বাচ্চাগুলোকে।
– ঠিক আছে। আপাতত ঘরে চলো। চা খাই।
– চলো।
চা টা খেয়ে বাথরুমে গেল ব্রজেন। হঠাৎ কস্তুরী চিৎকার করে উঠলো, 'ব্রজদা, শিগগিরি বাইরে এসো।'
– কী হল?
– বাইরে এসো। একটা হুলো এসেছে। নির্ঘাত বাচ্চা গুলোকে খেয়ে নেবে।
ব্রজেন কোনও রকমে বাইরে যখন এল, তখন দেখলো কস্তুরী একটা লাঠি নিয়ে বাইরের রাস্তায় ছুটছে। হুলোটা একটা বাচ্চা মুখে নিয়ে দৌড় লাগিয়েছে মনীশের বাড়ীর দিকে। ওর চেঁচামেচিতে নেড়িটাও কোথায় ছিল, এসে ধাওয়া করেছে হুলোটাকে। পুষি কোথায় কে জানে! ব্রজেন কিছু না পেয়ে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করল হুলোটাকে। অবশেষে নেড়িটার সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে বিড়ালবাচ্চাটাকে ফেলে পালালো হুলো। কস্তুরী দৌড়ে গিয়ে দেখল ছোট্ট বিড়াল বাচ্চাটা কিঁউ কিঁউ করতে করতে ছটফট করছে। কস্তুরী পরম মমতায় ওকে কোলে তুলে দৌড়ে এল ব্রজেনের বাড়ী। একটা ড্রপার দিয়ে অনেক কষ্ট করে দু এক ফোঁটা গরম দুধ দেওয়ার চেষ্টা করল বাচ্চাটার মুখে। একটু গেল, অনেকটাই গেল না। অনেকক্ষণ কিঁউ কিঁউ করতে করতে বাচ্চাটা মারা গেল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো কস্তুরী। আমরা আর্টিস্ট হতে পারলাম না ব্রজদা।
ব্রজেন ওর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলল, ‘মন খারাপ করো না। এখনও তিনটে আছে।’
– এটাই বা গেল কেন ব্রজদা?
– এটা ভগবানের নিয়ম, তরী। দ্যাখো না, ওদের এত এত বাচ্চা হয়। এটা ভগবানের লস এন্ড প্রফিটের হিসেব। তিনি জানেন কখন কটা বাঁচিয়ে রাখা দরকার। সেভাবেই মৃত্যু লেখেন অন্যদের।
– দিয়ে কেড়ে নেবার দরকার কী ওঁর। দুটো প্রয়োজন, দুটো দিলেই হয়। ওর মাকে কষ্ট দেবার কী দরকার?
– ওদের মায়ের কষ্টও ওভাবেই মাপা, তরী। ওর মায়ের কষ্ট হবে, হয়তো সেটা জেনুইনও। কিন্তু খানিক বাদে দেখবে, ও সব কিছু ভুলে বর্তমানেই ফিরে আসবে। বিগত বিষয় নিয়ে ওদের বেশীক্ষণ আদিখ্যেতা করার সময় নেই। তুমি দেখো। নাও ওঠো এবার। চোখগুলো ধুয়ে এসো।
– ও ঠিক আছে। এই বাচ্চাটাকে কী করবে?
– দেখি দারোয়ানকে দিয়ে আসি। জমাদার এলে ফেলে দেবে।
– ব্রজদা, হরিদার বাড়ীর সামনে কিছুক্ষণ রেখে এলে হতো না? ওর মা এসে দেখতো।
– কী বলছ তরী? তোমার এখন মাথার ঠিক নেই। অন্য সময় হলে তুমি নিজেই এর বিপরীত কথা বলতে।
– ঠিক বলেছ ব্রজদা। একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে নিয়ে যাও।
মিনিট কুড়ি পরে যখন ব্রজেন বাড়ী ফিরল, তখন এক দৌড়ে এসে ওর বুকে মুখ রাখলো কস্তুরী। খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ব্রজেন বলল, ‘কী হলো তরী? আবার কোনও খারাপ খবর? এবার কে?’
– না না, এবার কেউ নয়। জানো, এখন আমার কেমন যেন নারী হিসাবে লজ্জা হচ্ছে।
– কেন?
– জানো তো, তুমি বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরে পুষি বেড়ালটা এখানে এলো। আমি ভাবলাম গন্ধ পেয়ে খুঁজতে এসেছে বোধহয়। একটুক্ষণ ম্যাঁও ম্যাঁও করল। আমি একটু দুধ দিলাম।
– খেল?
– একটুক্ষণ শুঁকলো। আমি মনে মনে ঈশ্বরকে প্রার্থনা করলাম, না খায় যেন। ও বাবা, দিব্যি চুক চুক করে পুরো দুধ সাবাড় করে দিল।
– তারপর?
– তারপর হরিদার বাড়ীতে গিয়ে বাচ্চা তিনটেকে জিভ দিয়ে চেটে চেটে সাফ করলো অনেকক্ষণ। একটু আগে গিয়ে দেখে এলাম তিনি ঘুমোচ্ছেন, বাচ্চা গুলো শুয়ে শুয়ে দুধ খাচ্ছে ওর।
– আর নেড়িটা?
– ও আরো বড় দার্শনিক। এদের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছে সে। এত বড় একটা ঘটনা ঘটলো, সে নিজেও সেই ঘটনার এক বড় সৈনিক, অথচ কোনও তাপ উত্তাপ নেই। যেন এ ঘটনা আর নতুন কী?
– তা তুমি এ ঘটনা থেকে কী দর্শন লাভ করলে তরী?
– দ্যাখো, এদের বিবেক নেই– একথা বলতে পারবো না ব্রজদা। তবে বিবেকের লোক দেখানি নেই, মানে যাকে বলে শো অফ, সেটা পরিষ্কার।
– ঠিক বলেছ। তবে আর নারী হওয়ার লজ্জা পাচ্ছিলে কেন?
– আসলে হিসেবটা মিলছিলো না যে।
– জীবনের হিসেবে যত তাড়াতাড়ি লেজার মেলানো যায়, ততই মঙ্গল। আমরা আর মৃত্যু নিয়ে ভাববো না তরী। ওটা হল ঈশ্বরের তৈরি একটা খুড়োর কল। জীবনটাই আসল গো। চল ওটাই বেঁচে নি।
কস্তুরী ওর হাতের বেড় থেকে ব্রজেনকে মুক্ত করে চলে আসতে গেল চেয়ারের দিকে। ব্রজেন কৌতুক করে ওর একটা হাত ধরে বলল, ‘একটু বেঁচে নেওয়ার কথা বললাম, আর তুমি দূরে চলে যেতে চাইছো?’
0 Comments