(২৮ পর্ব /নজরুলের কৃষ্ণ কীর্তন)
চিত্রা ভট্টাচার্য্য
''কাব্য এবং সঙ্গীতের মৌলিকত্ব এক হলেও এ দুটি জিনিসকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করাই বোধকরি শ্রেয়। কোনো কবি কাব্য রচনায় পারঙ্গম হলেই যে তিনি সঙ্গীত রচনাতেও সিদ্ধহস্ত হবেন তেমনটি কিন্তু নয়। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তিনি যেমন কাব্য রচনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন কবি হিসেবে, তেমনি গান রচনা করে গীতিকার, গায়ক, সুরকার, সংগীতজ্ঞ হিসেবে অমর হয়ে আছেন সঙ্গীতের রাজ্যে।সঙ্গীতের জগতে কবি নজরুল একটি বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর অসংখ্য কবিতা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে সত্য, কিন্তু কবিতার চেয়ে অনন্য প্রতিভার সাক্ষ্য বহনকারী অনবদ্য সৃষ্টি হচ্ছে তাঁর সঙ্গীত। ( নূরুল ইসলাম বরিন্দী ।)
নজরুলের গানে একদিকে যেমন শাক্ত পদাবলীর 'শ্যামা' বা মা 'কালী'র প্রভাব দেখা যায়, তেমনি অন্যদিকে বৈষ্ণবপদাবলীর রাধা-কৃষ্ণের প্রেমও স্থান পেয়েছে। বাংলা গানে পদাবলী কীর্তনের ঢঙে প্রচুর ভক্তিগীতি ও কীর্তন গান রচনা করেছেন কবি , যা সাধারণ মানুষের কাছে সহজেই বোধগম্য এবং হৃদয়স্পর্শী ছিল, কারণ তিনি মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের প্রাণের সারল্যের ভাষা ব্যবহার করতেন।
বাংলা কীর্তনের সুদীর্ঘ ইতিহাসে যেখানে শ্রীচৈতন্যদেব কীর্তন গানের প্রবর্তক এবং যে গানের বিষয়বস্তুতে রয়েছে সনাতন ধর্ম এবং দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচার তথা রাধাকৃষ্ণ, রামসীতা, লক্ষ্মী-নারায়ণ, চৈতন্যদেব-বিষ্ণুপ্রিয়া- রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনি ও তাঁদের অলৌকিক প্রভাব ও জীবন যাপনের বিবিধ প্রসঙ্গ। কাজী নজরুল রচিত 'কৃষ্ণকীর্তনে 'ও বৈষ্ণবপদাবলীতে রাধাকৃষ্ণের প্রেম ও ভক্তিকে নিজের বিদ্রোহী, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন রূপে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা গতানুগতিক কীর্তনের ধারা থেকে ভিন্ন এবং এতে হিন্দু-মুসলমান উভয় সংস্কৃতির প্রভাব দেখা গিয়েছে। আমার ''ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি ''প্রবন্ধে এই প্রসঙ্গে বিদ্রোহী কবি নজরুলের আকাশছোঁয়া প্রতিভায় উদ্ভাসিত বাংলার নিজস্ব সংগীত কীর্তন গানের অবাধ সৃষ্টির সাগরে ডুব দিয়ে তাঁর রচিত কীর্তন গানের সম্ভারের খোঁজে মন দিয়েছি ।
🍂
কবি নজরুলের সৃষ্টির এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে বৈষ্ণব পদাবলী কীর্তনের শ্রুতিমধুর ধারা।যেখানে রাধা কৃষ্ণের বিরহ ও মিলনের এক অন্যরকম আবেগ অনুভূতি ও আকুতি হৃদয়ে সাড়া জাগায়। যেখানে তিনি নিজের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক চেতনার বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি বৈষ্ণব পদাবলী কীর্তনকে একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প মাধ্যম হিসেবে দেখেননি।তার দর্শনে মিশেছে বিরহ ও মিলনের এক অন্যরকম আকুতি। বৈষ্ণব পদাবলীর রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে ঈশ্বরের প্রতি আধ্যাত্মিক আত্মার আকুলতা ও মিলনের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যা কেবল জাগতিক সম্পর্ক নয়, বরং পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলনকে বোঝায়। তিনি মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীর ভক্তি,সহজ-সরল ভাষা এবং ঐতিহ্যের সংস্কৃতি সঙ্গে আধুনিক জীবনবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সমন্বয় ঘটিয়ে হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্য মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে নিজস্ব কীর্তন ও ভক্তিমূলক গান রচনা করেছেন। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার অপরূপ মেলবন্ধনে তিনি প্রাচীন বৈষ্ণব পদাবলীর সুর, তাল ও ভাবকে আধুনিক কথা ও জীবনবোধের সাথে মিশিয়ে নতুন রূপ দিয়েছেন, যা তাঁর গানে বিশেষ বৈচিত্র্য এনেছে।
সেই ছেলেবেলায় লেটোর দলে মিশে গান লিখে গেয়ে ঘুরে বেড়ানোর পর থেকেই নজরুলের মধ্যে সুফি বাউল ও বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয়ের আবেশ ঘটেছিল। তিনি তাই নিজেকে এক আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীর ভক্তির ,সহজ-সরল ভাষায় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক জীবনবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সমন্বয় ঘটিয়ে এক নিজস্ব ধারার কীর্তন ও ভক্তিমূলক গান রচনা করেছেন। শুধু কেবল জাগতিক সম্পর্ক রূপে তিনি রাধাগোবিন্দের প্রেম কে গ্রহণ করেন নি। নজরুলের কাছে সে প্রেম প্রকাশ পেয়েছে পরমাত্মা ও জীবাত্মার মিলন স্বরূপ হয়ে এক অপার্থিব মহিমায়। প্রাচীন বৈষ্ণব পদাবলীর সুর, তাল ও ভাবকে আধুনিক কথা ও জীবনবোধের সাথে মিশিয়ে নতুন রূপ দিয়েছেন, যা তাঁর গানে বিশেষ বৈচিত্র্য এনেছে এক ঐতিহ্য ও আধুনিকতার অপরূপ মেলবন্ধনে।
সনাতন ধর্ম সম্পর্কে নজরুলের অসীম জ্ঞানের পরিধির পরিচয়ের প্রমাণ তার গীতরচনায় যথেষ্ট সুস্পষ্ট। এবং এই ধর্ম কে প্রাধান্য দিয়ে নজরুলের গানের সংখ্যা অজস্র। নজরুলের কীর্তনের শব্দবিন্যাসে রয়েছে রাধাকৃষ্ণের কথোপকথনের প্রত্যক্ষরূপ। বাংলাকীর্তনের যে সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য তা নজরুলের কীর্তনে প্রবল ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। অনেক নজরুল গবেষকেদের ধারণা নজরুলের কীর্তনে কৃষ্ণের চেয়ে রাধার কথা বেশি বলা হয়েছে। কীর্তন ভাবনায় যে-কোনো ধর্মকাহিনীর সঠিক বিন্যাসের সাথে ছিল কবির নিবিড় সম্পৃক্ততা। যার মধ্যে রয়েছে ভজন, কীৰ্ত্তন, শ্যামাসঙ্গীত , ভক্তিগীতি, আগমনী প্রভৃতি। নজরুলের কীর্তনের সাঙ্গীতিক যে বৈশিষ্ট্য তা হলো রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক, রাধাকৃষ্ণের মিলন-বিরহের আবেগ অনুভূতিগুলি সুন্দর ছন্দবন্ধ বাণীর মাধ্যমে প্রচলিত কীর্তনের সুরেই নজরুল উপস্থাপন করেছেন।তাই তাঁর কীর্তনের আবেদনে রয়েছে বহুমুখী প্রতিভার উজ্জ্বল প্রমাণ।
সুন্দরের উপাসক ,উদার এক আলোকিত মনের মানুষ নজরুল মথুরা-বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে কাওয়ালী ঢংয়ে পর্যন্ত গান রচনা করেছিলেন। আমরা পেলাম আশ্চর্য গতিশীল একটি গান ...
‘এল নন্দের নন্দন নব ঘনশ্যাম
এল যশোদা নয়নমনি নয়নাভিরাম
প্রেম রাধার মন নব বঙ্কিম ঠাম
চির রাখাল গোকূলে এল ..----
কৃষ্ণজী কৃষ্ণজী কৃষ্ণজী কৃষ্ণজী ’ ... এই কোরাসটি গাওয়া হয়েছিল কাওয়ালী গানের ঢংয়ের সুরে। শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গভীর আবেগ ব্যক্ত করেছেন এবং এভাবে রেখে গেছেন অসাম্প্রদায়িক পথে সকলের হাতেহাত মিলিয়ে হাঁটবার ইঙ্গিত .--- নজরুলের কৃষ্ণবাদী এ আবেগ কেবল আরোপিত নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্ত ও সত্য। এক মাত্র কারণ নজরুলের স্পর্শকাতর মন ,চেতনা ও চিন্তাধারা বহু বর্ণিল ভারতীয় ঐতিহ্যে লালিত।হাজার বছর ধরে ভারতীয় সংস্কৃতি মূলত বহুস্রোতে বহমান। জীবনভর তাঁর গানে, তাঁর কবিতায় নজরুল এই বহুমাত্রিক বিচিত্র জীবনধারাকে মেলানোর সাধনা করেছেন। গানেও নজরুল সে প্রমাণই দিয়েছেন। যেমন, কাওয়ালী মূলত মুসলমানী সংগীত রীতির একটি ধারা, সেই কাওয়ালী ঢংয়ে মথুরা-বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে তিনি গান বেঁধেছেন। তাঁর সৃষ্টি এভাবেই মুখরিত হয়ে প্রাণে খুশির তুফান তোলে । শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গভীর আবেগ ব্যক্ত করেছেন।চলার পথে চিহ্ন রেখেছেন অসাম্প্রদায়িক পথে হাঁটবার ইঙ্গিতে---..
কৃষ্ণকীর্তনে রাধার বিরহ ও আকুলতা কেবল জাগতিক নয়, বরং ভগবানের প্রতি অতীন্দ্রিয় টান, যা তাঁর গানে, বিশেষত ভক্তিগীতি ও কীর্তনে ফুটে উঠেছে, যেখানে রাধাকে কখনো রাধা, কখনো যশোদা আবার কখনো শ্যামা রূপে দেখা গিয়েছে , যা তাঁর ধর্ম সমন্বয়বাদ ও নতুন ধারার ভক্তিগীতির পরিচয় বহন করে। রাধা বিষয়ক রচনায় তিনি রাধাকে সাধারণ প্রেমিকা থেকে এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যেখানে রাধার বিরহ ও আকুলতা কেবল জাগতিক নয়, বরং ভগবানের প্রতি অতীন্দ্রিয় টান, যা তাঁর গানে, বিশেষত ভক্তিগীতি ও কীর্তনে ফুটে উঠেছে, যেখানে রাধাকে কখনো রাধা, কখনো যশোদা আবার কখনো শ্যামা রূপে দেখা যায়, যা তাঁর ধর্ম সমন্বয়বাদ ও নতুন ধারার ভক্তিগীতির পরিচয় বহন করে।
''আমি যোগিনী হব,
শ্যাম যে তরুর তলে বসিবে লো ধ্যানে
সেথা অঞ্চল পাতি’ রব,
আমার বঁধুর পথের ধূলি হব
আমায় চলে যেতে দলে যাবে
সেই সুখে লো ধূলি হব।
সখী গো,
আমি আমার সুখের গোধূলি বেলার
রঙে রঙে তারে রাঙাইব,
তার গেরুয়া রাঙা বসন হয়ে
জড়াইয়া রব দিবস যামী।''
কাজী নজরুল ইসলামের কীর্তনের ক্ষেত্রে অবদান এক অনন্য শিল্পপ্রতিভার সাক্ষর বহন করে।তিনি দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন রূপে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা গতানুগতিক কীর্তনের ধারা থেকে ভিন্ন এবং এতে হিন্দু-মুসলমান উভয় সংস্কৃতির প্রভাব দেখা যায়।
তাঁর রচিত গানে কখনো অভিমানিনী রাধা, কখনও প্রেমীকা রাধা, আবার কখনও বা ভক্ত রাধিকা শ্রী কৃষ্ণ দর্শনে নিজেকে উজার করে দিয়েছেন। তাইতো কবি রচনা করেছেন
-''নবকিশলয় রাঙা শয্যাপাতিয়া,
বালিকা কুঁড়ির মালিকা গাঁথিয়া
আমি একেলা জাগি রজনী
বঁধু ,এলো না তো কই সৃজনী ,
বিজনে বসিয়া রচিলাম বৃথা
বনফুল দিয়া ব্যজনী। ''
অথবা
বাজে মঞ্জুল মঞ্জির রিনিকি ঝিনিকি ঝিনি
নীর ভরণে চলে রাধা বিনোদিনী
তার চঞ্চল নয়ন টলে টলমল
যেন দু'টি ঝিনুকে ভরা সাগর জল।।
ও সে আঁখি না পাখি গো
রাই ইতি-উতি চায়
কভু তমাল-বনে কভু কদম-তলায়।---
প্রভৃতি আরো কীর্তন। যেখানে রাধাবিরহের করুণ আর্তি বর্নিত আছে। সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ দের মতে ''নজরুলের কীর্তনের রাগের কোনো পরিচয় মেলেনি বটে তবে প্রায় প্রত্যেকটি কীর্তনে ফেরতা তালের প্রয়োগ রয়েছে।''
কবির রচিত কীর্তনগুলোতে বিদ্রোহী চেতনা র সাথে , আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং মানবিকতার এক গভীর সুর মূর্ত হয়েছে। নজরুল কীর্তনে শ্রীকৃষ্ণের ভক্তি , রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা এবং বৈষ্ণব আধ্যাত্মিকতার মিশ্রণে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। তাঁর রচনাগুলো সুরে এবং বক্তব্যে শ্রীকৃষ্ণের মহিমাকে উদযাপন করে। এভাবে তিনি বাংলা সাহিত্যে কীর্তনের ঘরানায় একটি বিপ্লব ঘটান, যা বৈষ্ণবধর্মের গভীরতাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়। তাঁর কবিতায় স্পষ্ট শোষক, পরাধীনতা ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ আবেদন সোচ্চার হয়ে উঠেছে , এছাড়া তাঁর গানে মানবিক ও আধ্যাত্মিক বিদ্রোহের সুর রয়েছে যেমন 'শিকল-পরা ছল' বা 'বাজাও প্রভু বাজাও ঘন'-এর মতো গানে শোষণ ও বন্ধনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আহ্বান ,এবং শিকল-পরা ছল' গানে নজরুল পরাধীনতার শিকলকে ভেঙে ফেলার ডাক দিয়েছেন, যেখানে তিনি বলেছেন, 'এই শিকল প'রেই শিকল তোদের করব রে বিকল'।এ গানে রয়েছে বিদ্রোহী চেতনার উদাত্ত পরিচয়। যা আজও রক্তে ঝাঁকুনি দিয়ে উদ্যম আনে। সুপ্ত নির্বিকার মনে প্রেরণা জাগায়। 'বাজাও প্রভু বাজাও ঘন' গানটি তাঁর সৃষ্টির শুরুতে প্রকাশিত হয় এবং এতেও বিদ্রোহ ও চেতনার সুর লক্ষ্য করা যায়। এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত গানগুলোর মধ্যে অন্যতম।
নজরুলের গান শুধু রাজনৈতিক প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল শোষণ, বৈষম্য ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক সার্বিক বিদ্রোহ, যা আজও ছন্দ পরিবর্তনের ফলে গানগুলো সুর বিহারে আরও পরিপূর্ণতা পেয়েছে। নজরুল গবেষকদের মতে ''তাঁর সঙ্গীতে অনেক ক্ষেত্রে অবয়ব নির্বাচন করা কঠিন হয় । তবুও শিল্পীরা লঘুসঙ্গীতের বিভাগগুলো মেনে এ গান পরিবেশন করে থাকেন। নজরুলের কীর্তনের গায়কী একটি মূল বিষয়, পরিপক্ক শিল্পী না হলে এ পর্যায়ের গানের মূল বিষয়টির বাহ্যিক প্রকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। ''
কবির গানে ভক্তি ও প্রেমের মিশ্রণে:বৈষ্ণবীয় প্রেমলীলা যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি তাতে দর্শনের গভীরতার স্পষ্ট প্রকাশ দেখা গেছে । কীর্তনের ঐতিহ্যবাহী সুরের সঙ্গে ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি, লোকগীতি ও তৎকালীন আধুনিক গানের ধারা মিশিয়েছেন, যা তাঁর কৃষ্ণভক্তিগীতিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
জনপ্রিয় কিছু গান: "গগনে কৃষ্ণ মেঘ দোলে", "রাধে, তুই বড়ো ভাগ্যবতী", "কে গো যোগী এলে আজ", "যাও গো সখি, যাও যমুনা-কূলে" ইত্যাদি তাঁর বিখ্যাত কৃষ্ণ-কীর্তন বা ভক্তিগীতি।
:
বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় প্রাচীনতম ঐতিহাসিক নিদর্শন বড়ু চণ্ডীদাসের লেখা একটি মধ্যযুগীয় কাব্য, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন:। নজরুলের কৃষ্ণকীর্তন: আধুনিক কীর্তন-ধারার গান, যেখানে তিনি প্রাচীন পদাবলী ও লোকসংগীত-এর কাঠামো ব্যবহার করে নিজস্ব সুর ও ভাবধারা প্রয়োগ করেছেন।
নজরুলের কৃষ্ণকীর্তন কেবল ভক্তিগীতি নয়, বরং তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার ও সৃজনশীলতার এক অসাধারণ প্রতিফলন, যা বাংলা ভক্তি-সংগীতের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে।
হাজার বছর ধরে ভারতীয় সংস্কৃতি মূলত বহুস্রোতে বহমান। জীবনভর তাঁর গানে, তাঁর কবিতায় নজরুল এই বহুমাত্রিক বিচিত্র জীবনধারাকে মেলানোর সাধনা করেছেন । গানেও নজরুল সে প্রমাণই দিয়েছেন। যেমন, কাওয়ালী মূলত মুসলমানী সংগীত রীতির একটি ধারা, সেই কাওয়ালী ঢংয়ে মথুরা-বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে নজরুল গান বেঁধেছেন: শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গভীর আবেগ ব্যক্ত করেছেন এবং এভাবে রেখে গেছেন অসাম্প্রদায়িক পথে হাঁটবার ইঙ্গিত ...
কৃষ্ণ কীর্তনে কৃষ্ণর গাত্রবর্ণ মহাকালের রং ঘোর কালো (কৃষ্ণ)।
আলোচ্য গানটির কথা:
তিমির-বিদারী অলখ-বিহারী
কৃষ্ণ মুরারী আগত ঐ
টুটিল আগল, নিখিল পাগল
সর্বসহা আজি সর্বজয়ী।
প্রথমেই কৃষ্ণর সংজ্ঞা নির্ধারন করেছেন। কৃষ্ণকে নজরুল বলেছেন, কালো রাখাল। কৃষ্ণ, যিনি অন্ধকার দূর করেন, অদৃশ্যে বিচরণ করেন সেই ‘কৃষ্ণ-মুরারী’ আসছেন। তবে তাঁর হাতে একটি বাঁশী রয়েছে। তিনি এলে, অর্গল টুটে যাবে। সেই বংশী ধারি কৃষ্ণ অর্থাৎ র অরিন্দমের আসার অপেক্ষায় পাগল হয়ে রয়েছে নিখিল’ বিশ্ব।সর্বসহা আজি সর্বজয়ী। যারা সহ্য করে তারা সর্বজয়ী হবে।
''কৃষ্ণর পালক-মাতা যশোদা। যশোদা শব্দের আগে ‘বসুধা’ শব্দটির প্রয়োগ লক্ষনীয়। বসুধা মানে পৃথিবী। কবি কি যশোদাকে পৃথিবী বলছেন? মাতৃস্নেহে কৃষ্ণকে লালন করেছিলেন বলে? তাহলে কৃষ্ণ =মানবতা বা মানবকূল। সেই মা-পৃথিবী গোপাল (বালক কৃষ্ণ) কে লালন করেছেন। সেই চরণটি স্মরণ করি: ‘সর্বসহা আজি সর্বজয়ী।’ সর্বসহা মা-পৃথিবী যশোদা বালক কৃষ্ণ কে লালন করে সর্বজয়ী হয়েছেন। কিংবা আমাদের প্রতি এটি নজরুলের উপদেশ। যারা সহ্য করে তারা সর্বজয়ী হবে।''
যমুনাপাড়ের গোকুলে বালক কৃষ্ণ গোপাল গরু নিয়ে দিনভর নেচে গেয়ে মাঠে খেলে বেড়ায় । সেই অভূতপূর্ব দৃশ্যের বর্ননায় নজরুল লিখেছেন একটি মনোরম চরণ:
কাল্-রাখাল নাচে থৈ-তা-থৈ।।
স্নেহভরে কৃষ্ণকে কালো রাখাল বলায় কৃষ্ণ যেন তাঁর আরও কাছের প্রাণের মানুষ। তিনি গানে লিখেছেন:
বিশ্ব ভরি’ ওঠে স্তব নমো নমঃ
অরির পুরী-মাঝে এলো অরিন্দম।
এমন বিরাটের আগমনে বিশ্ব ভরে উঠছে স্তবে, বন্দনায়।
অরির পুরী-মাঝে এলো অরিন্দম। ...
কবি যেন ভয়ার্ত জনমানসের প্রাণে অভয়ের আশ্বাস দিয়ে -গানের ভাষায় মনে করালেন কৃষ্ণ জন্মের সেই করুণ কাহিনি । স্বৈরাচারী মথুরারাজ কংসের কারাগারে কৃষ্ণের মাতা-পিতা দেবকী-বসুদেবকে বন্দি করে রেখেছিল।--
''অন্ধকার রাজ্যে এক সুন্দর আলোকিত মানুষ এসেছেন যেন .''
- সে প্রসঙ্গে নজরুল লিখেছেন---:
ঘিরিয়া দ্বার বৃথা জাগে প্রহরী জন
কারার মাঝে এলো বন্ধ-বিমোচন,
ধরি’ অজানা রূপ আসিল অনাগত
জাগিয়া ব্যথাহত ডাকে, মাভৈঃ।।
কৃষ্ণ আসলে মুক্তির প্রতীক। মানবতার প্রতীক। এবং মানবতার মুক্তি অনিবার্য। নজরুলের এই কৃষ্ণবাদী গানে সে কথার ই বারে বারে অনুরণন। মানবতার সেই অনিবার্য মুক্তি অর্জনের পথে নজরুল যেন একটি যাদুবাক্য। : ‘সর্বসহা আজি সর্বজয়ী ...
তথ্য সূত্র :---১)নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
২)নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য
৩)নজরুল-চরিতমানস, ডঃ সুশীলকুমার গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং (২০১৫)।
৪) নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি (২০০৭)।
৫)- নজরুল জীবনী, /অরুণকুমার বসু,( আনন্দ পাবলিশার্স।)
0 Comments