জ্বলদর্চি

দূরদেশের লোকগল্প— ২৭০/তানজানিয়া (আফ্রিকা)হরিণের হাতে হয়রানি/চিন্ময় দাশ


দূরদেশের লোকগল্প— ২৭০

তানজানিয়া (আফ্রিকা)

হরিণের হাতে হয়রানি

চিন্ময় দাশ


একটা হরিণ চলেছে গান গাইতে গাইতে। গলায় গান। চোখ দুটো কিন্তু এদিক ওদিক চষে বেড়াচ্ছে। কোন গাছের ফল মিষ্টি। কোন গাছের ছাল বা শেকড় নরম, পরখ করে নিচ্ছে। 

চেহারায় ছোট। কিন্তু হলে কী হবে। বুদ্ধিতে বেশ দড়ই। চারদিকে ওৎ পেতে আছে শিকারীরা। বাঘ, সিংহ, চিতা, হায়না সবাই মুখিয়ে আছে, ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে। সে খেয়ালও রাখতে হয় মাথায়।  

তবে, এটাও ভালো জানে হরিণ, ঝাঁপালেই হোল না। নাগাল পেলে, তবে তো! হরিণের নাগাল পাওয়া সহজ কথা নয়। তাই তো তার গলায় সবসময় গান—

যতই তুমি সবল হও।

আমায় ধরা সহজ নয়।।

এমন সময় হঠাৎই এক বিপদ। চোখ পড়তেই চমকে গেছে হরিণ। সামনে সাক্ষাৎ যম। 

জলজ্যান্ত ইয়াব্বড় একটা বাঘ তার সামনে। দৌড়ে পালাবে, সে উপায় আর নাই। সাথে সাথে হরিণের মন বলল—খুব সাবধান। ঘাবড়ে গেলে চলবে না। বাঁচতে চাইলে,  মাথা খাটাতে হবে।

বাঘ তো আহ্লাদে আটখানা— ধন্যবাদ তোকে, হরিণ। সকালের জলখাবারটা জুটে গেল। লাফালাফি করতে হোল না। খিদেটাও বেশ চাগাড় দিয়ে উঠেছে। 

পাশেই কাদায় ভরা একটা পুকুর। চোখ দুটো পুকুরে আটকে রাখল হরিণ। সেভাবেই জবাব দিল—আপনার খিদে চাগাড় দিল কি দিল না, আমার কিছু যায় আসে না তাতে। আমি এখন রাজামশাইর পুডিং পাহারা দিচ্ছি। আপনার পেটে যাওয়ার কোন উপায় নাই আমার। 

এমন জবাব শুনে, যা হয় আর কী! বাঘ একটু ঘাবড়ে গেল। কোন রকমে বলল—পুডিং? রাজামশায়ের? বলছিসটা কী তুই? কিছুই তো ঢুকছে না মাথায়।

--সে আপনি যাই বলুন, আমার কিছু যায় আসে না। মস্করা করতে লাগল হরিণ—তাছাড়া, মাথা অতো মোটা হলে, কোন কিছু ঢুকবেই বা কী করে সেখানে। 

বাঘ নাজেহাল হয়ে বলল—একটু খুলে বল, বাপু। ব্যাপারখানা কী? 

🍂

চোখ তুলল না হরিণ। পুকুর দেখিয়ে, বলল—দেখছেন না, পুকুর ভর্তি পুডিং বানিয়ে রেখে গিয়েছেন রাজামশাই। দুনিয়ার সেরা পুডিং বানানো হয়েছে। তাঁর আগে কেউ পুডিংয়ে মুখ দেয়, রাজামশাইর পছন্দ নয়। তাই তো আমাকে বসিয়ে গিয়েছেন। 

--তোকে পাহারায় রেখে গেছেন?

--আর বলবেন না, হুজুর। খাওয়া নাই, দাওয়া নেই। সেই ভোর থেকে ঠায় বসে আছি। পেটে খিদে। সামনে এই এত্তো বড় পুকুর ভর্তি পুডিং। কিন্তু মুখটি দেওয়ার উপায় নাই। 

নধর হরিণের সুস্বাদু মাংস মাথায় উঠল। জিভে লালা ঝরছে বাঘের। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে পুকুরের দিকে। হরিণকে বলল— একটুখানি চেখে দেখতে সাধ হচ্ছে রে। নামবো? তুই না করিস না, বাপু। 

--সর্বনাশ! বলছেনটা কী আপনি? রাজামশাই মুণ্ডু ছিঁড়ে নেবেন আমার। হরিণ আঁতকে উঠেছে। 

বাঘ নরম গলা করে বলল—আরে না, না। রাজামশাই টেরটিও পাবেন না। তাছাড়া, আমি তো আর খেতে চাইছি না। শুধু একটু চেখে দেখবার সাধ হয়েছে। 

হরিণ নাচার হওয়ার ভঙ্গী করে বলল—কী আর করা যাবে, এতো করে বলছেন আপনি। তবে, আমি একটু দূরে সরে থাকি। যাতে কেউ না দেখে ফেলে। রাজামশাইকে যদি বলে দেয় যে আমি আপনাকে খেতে অনুমতি দিয়েছি। 

বাঘ তো তখন আনন্দে আঠারোখানা। সে বলে দিল—তাই যা। খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়া বরং। তাতে আমার লাভ হোল। তোরও কোন ক্ষতি হোল না। 

মনের আনন্দে পুকুরে নেমে গেল বাঘ। কিন্তু মুখ দিয়েই, ওয়াক-ওয়াক করে উঠল। কোথায় কী পুডিং। এ তো স্রেফ পাঁক! আমাকে ধাপ্পা দিয়েছিস, হতচ্ছাড়া? দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা।

কিন্তু কে কাকে মজা দেখাবে? হরিণ তখন অনেক অ-নে-ক দূরে। বাঘের নাগালে নাই। পালাচ্ছে, আর বলছে--

যতই তুমি সবল হও।

আমায় ধরা সহজ নয়।।

সেদিনের বেইজ্জতির কথা ভোলেনি। তক্কে তক্কে ছিল, একবার নাগালে পেলে হয় হতভাগাটাকে। পেয়েও গেল একদিন। বনের মধ্যে চরে বেড়াচ্ছিল হরিণ। আচমকা সেখানে বাঘ এসে হাজির। দেখামাত্রই হুঙ্কার দিয়ে উঠল বাঘ—বড্ড ঘোল খাইয়েছিস সেদিন। আজ দেখাচ্ছি মজা। আমার সাথে চালাকি।

হরিণ বুঝে গেছে, আজ আর রেহাই নাই শয়তানটার হাত থেকে। কিন্তু তার মাথা বলল—হাল ছাড়তে নাই। বুদ্ধি খাটিয়ে দ্যাখ। 

বাঘের কথার জবাব দিল না। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে লাগল  হরিণ। তেমন কিছু চখে পড়ে কি না।

বাঘও লক্ষ্য রেখেছে হরিণকে। বলল—পালাবার রাস্তা খুঁজছিস? আজ সেটি হচ্ছে না।

কপাল ভালো বলতে হবে। হরিণ ততক্ষণে যুৎসই একটা জিনিষ পেয়ে গেছে। সে বলল—পালাবার কী আর জো আছে আমার? সে কপাল করে আসিনি, হুজুর। কাজের ভার নিয়ে বসে আছি যে। সেটাই দেখছি তাকিয়ে তাকিয়ে। 

বাঘের গলায় ব্যাঙ্গের হাসি—আজ আবার কী রাজকার্যের ভার তোর ওপর?

--যা বলেছেন হুজুর। রাজকার্যই বটে। রাজামশাইর ঢোলক পাহারা দেওয়ার ভার পড়েছে এবার। তাই তো বসে আছে এখানে। নইলে, আপনাকে দেখেও, সরে পড়িনি কেন? দেখছেন না, ঠায় দাঁড়িয়ে আছি।

হরিণের কথায় বাঘ অবাক। বলল-- রাজামশাইর ঢোলক? সেটাও আবার এই বনের ভিতর? বলছিসটা কী তুই? আবার বোকা বানাচ্ছিস আমাকে? 

--আমি বলব কেন? নিজের চোখে দেখে নিন।

সামনেই একটা ঝোপে ভীমরুলের বাসা দেখা যাচ্ছে। চোখে পড়ে যেতে, সেটাকেই বাঁচবার উপায় করে নিয়েছে হরিণ। 

বাঘ সেদিকে তাকিয়ে, গোল মত একটা জিনিষ চোখে পড়ল বটে। বলল—রাজামশাইর ঢোলক ওটা?

হরিণ দেখল, কাজ হয়েছে। সাতকাহন করে ঢোলকের গুণ ব্যাখ্যা করতে লাগল—সে কী মিষ্টি আওয়াজ, হুজুর। নিজের কানে না শুনলে, বিশ্বাস হবে না। কাছে গিয়ে দেখুন। না বাজাতেই কেমন গুনগুনানি শব্দ হতে থাকে। 

শুনে ভারি লোভ হোল বাঘের। বলল—আমি একবার বাজিয়ে দেখব? 

হরিণ ভয়ের গলা করে বলল— সর্বনাশ। মেরে ফেলতে চান না কি আমাকে? রাজামশাইর কানে গেলে, ঘাড়ে মুণ্ডু থাকবে আমার?  

--এই বনের ভেতর শুনছেটা কে, বা দেখছেটাই বা কে? রাজার কানে যাবে কী করে। একটি বার মাত্র বাজাব আমি। তাও খুব আলতো করে। তুই আর আপত্তি করিস না।

হরিণ তো্ এটাই চাইছিল। সরে পড়বার আর অন্য উপায় নাই এখানে। সে বলল—আমি তাহলে ঐ ঝোপটার আড়ালে গিয়ে বসছি। কেউ দেখে ফেলে যদি।

বাঘ ভারি খুশি--হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাই গিয়ে বোস। 

হরিণ গুটি গুটি পায়ে এগোতে লাগল। পিছন ফিরে বলল—একটা কথা বলি, হুজুর। মনের সাধ হয়েছে, বাজাবেন। তাছাড়া,একবারই তো বাজাবেন জীবনে।  তাহলে আর আলতো করে কেন? মনের সাধ মিটিয়ে বাজিয়ে নিন। জানাজানি কিছু হলে, আমি নাহয় সামলে নেব। বাজান আপনি।

কথা শেষ হতেই সরে পড়েছে হরিণ। পালাচ্ছে, আর বলছে-- যতই তুমি সবল হও।

আমায় ধরা সহজ নয়।।

বাঘ করেছে কী, গিয়েই দুম-দুম করে লাগিয়েছে দু’ঘা। কিন্তু সত্যিই তো আর ঢোলক নয় সেটা। ভীমরুলের চাক বলে কথা। চাক ভাঙা ভীমরুলের ঝাঁক। রেগে কাঁই হয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়েছে বাঘের ওপর।

বাঘে তো প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। হাজার হাজার ভীমরুল ঘিরে ধরেছে তাকে। প্রাণ বাঁচাতে দৌড় লাগিয়েছে বাঘ। দৌড় – দৌড় – দৌড়। বাঘ দৌড়োচ্ছে। তার পিছু নিয়ে দৌড়চ্ছে এক ঝাঁক ভীমরুল। কিছুদূর গিয়ে সামনে একটা নদী। বাঘ বেচারা ঝপাং করে ঝাঁপ দিয়েছে নদীতে। সেখানেও কি রেহাই আছে?

কতক্ষণ নাকানি-চোবানি খেয়ে, বাঘ যখন রেহাই পেল, একেবারে আধমরা অবস্থা বেচারার।

বাঘ কিন্তু যন্ত্রণার কথা ভোলেনি। তক্কে তক্কে থাকে, কখন মওকা মত পেয়ে যাবে হরিণটাকে। 

হপ্তাখানেক না যেতে, পেয়েও গেল একদিন। সেদিনও বনের ভিতর চরে বেড়াচ্ছিল হরিণ। বাঘ দেখতে পেয়ে গেছে  হরিণকে।  হরিণও দেখেছে যমকে। 

সাথে সাথেই এদিক ওদিক তাকাতে লেগেছে সে। কপাল ভালোই বলতে হবে। সামান্য দূরে একটা সাপ চোখে পড়ে গেল। কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুম লাগিয়েছে সাপটা। সেদিকে তাকিয়েই দাঁড়িয়ে রইল হরিণ। 

বাঘ বলল—একবার নয়। দু’-দু’বার হয়রান করেছিস আমাকে। আজ সব হয়রানির শেষ। আজ তোর শেষ দিন। মারবো না তোকে। কামড়ে কামড়ে কেটে কেটে খাব একটু একটু করে। আমার সাথে চালাকি করবার মজা টের পাওয়াব তোকে আজ। 

--কী আর করব, হুজুর? আমার কপালে যা আছে, তাই হবে। তবে, তার আগে আমার দায়িত্বটা পালন করে যেতে দিন। 

হরিণকে কথা শেষ করতে দিল না বাঘ— আজ আবার রাজামশাইর দায়িত্ব? এই গভীর বনে কী দায়িত্ব তোর? 

এই গভীর বনে বলল—দেখছেন না, রাজামশাইর বেল্ট পাহারা দিচ্ছি। 

বাঘ অবাক হয়ে বলল—রাজামশাইর বেল্ট! সেটা আবার কী জিনিষ? কোথায় এখানে সেই বেল্ট? 

--ঠিক বলেছেন আপনি। বেল্ট কী জিনিষ, সেটা আপনার বোঝার কথা নয়। ওটা রাজা-রাজড়াদের ব্যাপার। ঐ যে কোমরে বাঁধা হয়। তাতে চমকাই বাড়ে পোশাকের। বেশ রাজা-রাজা মনে হয় তাতে। 

বাঘ বলল-- তোকে পাহারার ভার দিয়েছেন রাজামশাই?

হরিণ মুখ ব্যাজার করে বলল—তবে আর বলছিটা কী? আপনাকে তো আমি সেই দূর থেকে আসতে দেখেছি। কিন্তু পালাবার তো উপায় নাই। রাজামশাইর কাজের ভার বলে কথা। পালালে আপনার হাত থেকে তো বেঁচে যেতাম। কিন্তু রাজামশাই কি ছাড়তেন আমাকে? হুকুমের চাকর আমি। ছোট্ট জীব। গায়ে গতর নাই যে আপনাদের সাথে লড়াই করে বাঁচব। আপনাদের দয়াতেই তো বেঁচে থাকি।

বাঘ বিরক্ত হয়ে বলল—দোহাই, একটু চুপ কর। তখন থেকে বকর বকর করেই যাচ্ছিস। বলছি কী, বেল্টটা একবার পরে দেখব আমি? 

হরিণ চেঁচিয়ে উঠেছে—খবরদার। অমন কাজটি করতে যাবেন না। আমি তো মারা পড়বই। আপনিও বাঁচবেন, মনে হয় না। রাজার লোক এলো বলে। দেখে ফেললে আর রেহাই নাই কারও। 

বাঘ নাছোড়বান্দা—কিচ্ছু হবে না। কাকপক্ষীতেও টের পাবে না। বেশি সময় নেব না। টুক করে একটি বার কোমরে জড়িয়ে দেখব, কেমন মানায় আমাকে। সাথে সাথে খুলে দেব। তুই আর মানা করিস না। 

হরিণ তো এটা শুনবার অপেক্ষাতেই ছিল। গম্ভীর হয়ে বলল— অবশ্য এতো সুন্দর শরীর আপনার। দারুণ মানাবে আপনাকে। যান তাহলে। আমি আড়ালে থাকছি। রাজার লোক আসতে দেখলে, আমি জানিয়ে দেব আপনাকে। কিছু চিন্তা করবেন না। 

বাঘ খুশি মনে এগোতেই হরিণ সরে পড়েছে সেখান থেকে। সরে পড়ছে, আর বলছে— 

যতই তুমি সবল হও।

আমায় ধরা সহজ নয়।।

আর বাঘ? সে বেচারির কথা না বলাই ভালো। হেলতে দুলতে গিয়ে হাজির হয়েছে বেল্টের সামনে। কী সুন্দর ছোপ ছোপ দাগ বেল্টটাতে। ভারি সুন্দর লাগছে দেখতে। এমন একটা রাজকীয় জিনিষ! পরবার সুযোগ পেতে হলে কপাল করতে হয়। 

এমন হাজারো হাজারো পুলকে দোল খেতে খেতে, চোখ মেলে দেখল একবার জিনিষটাকে। তার পর যেই না তুলে কোমরে জড়াতে গেছে, অমনি হিসসসসস--। ছিটকে উঠেছে কোবরা। বিদ্যুতের মত পেঁচিয়ে ধরেছে বাঘের গলা। তার পর দুজনের সে কী লড়াই। বাঘ গড়াগড়ি খাচ্ছে ধুলোয়। সাপও ছাড়বার পাত্র নয়। বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার করতে লাগল বাঘটা। সেই গভীর বনে আছেই বা কে, যে তাকে বাঁচাতে আসবে। 

হরিণ তখন অনেক অনেক দূরে সরে পড়েছে। গলায় সেই গান—

যতই তুমি সবল হও।

আমায় ধরা সহজ নয়।।

সংগ্রহ করতে পারেন 👇



Post a Comment

1 Comments

  1. দুর্দান্ত লাগলো - এর কোনও টাই আগে আমি পড়ি নি

    ReplyDelete