পর্ব ১.
অরিজিৎ লাহিড়ী
আমার পিতৃমাতৃপুরুষমহিলারা কোনওদিন কোনও রাষ্ট্র গড়েননি—তাঁরা কেবল হাঁটু মুড়ে ধান তুলতেন আর প্রতিদিন সন্ধ্যায় ভগবানের মতো কাশতেন যেন ফুসফুসই তাদের একমাত্র পতাকা। বৃষ্টি নামলেই তাঁদের মেরুদণ্ড বেঁকে যেত—কারণ ছাতা ছিল না, আর চেতনাও ছিল আধ-ভিজে।
তাঁদের কাছে রাষ্ট্র মানে ছিল: থানা—যেখানে গেলে চটি খুলে ঢুকতে হত, আর জাতীয়তাবাদ ছিল সেই বাঁশি—
যেটা সরকারি স্কুলের হেডস্যার প্রাকটিক্যাল ক্লাস স্থগিত রেখে মিছিলের আগে মুখে দিতেন, আর পিছন থেকে হিসু- হাগু চেপে হাঁটত নাদান ছেলে-মেয়েরা।
আমি জন্মেছিলাম ফার্স্ট পিরিয়ড শুরুর আগেই,আর বড় হলাম এমন এক ভাষায়, যেখানে রাষ্ট্র ছিল কবিতা,মানে, বানান ভুলে ভর্তি একটা ইস্তেহার—আর বিপ্লব মানে রুমাল দিয়ে বাঁধা কপাল, যাতে ঘাম না পড়ে বক্তৃতার ফাটা জঙ্গিয়ায়।
সে ভাষায় চিৎকার করা যেত না,শব্দগুলো আসত হাঁপানির মতো, আর প্রতিবাদ মানে ছিল হাঁ-মুখে দাঁড়িয়ে থাকা,যতক্ষণ না কেউ এসে বলে—বসো, অনেক হয়েছে পেঁয়াজি…এবার শেষ,একটু চা খেয়ে বাড়ি যাও।
আমি বড় হলাম বাংলায়, কিন্তু আসলে বড় হলাম পশ্চিমে—যেখানে সকালের আলুর দমের গন্ধে পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজ্যম বোঝানো হয়, আর পূর্বের প্রতি থাকে চিরস্থায়ী গ্লানি ও গ্লোরিফিকেশন—ঠিক যেন দিদার মুখে বেঁকে যাওয়া দাঁতের মতো দেশপ্রেম অথবা,
‘আমি কিছু বলছি না কিন্তু!’ টাইপ ইনিয়ে বিনিয়ে কিছু একটা বলে দেওয়া।
২০২৩-এর দিকে, এক সাংবাদিক বন্ধু বলল—তুই যাবি কদম্বাবাদ? নতুন বোমা, নতুন বাঁশি, নতুন বয়ান। কদম্বাবাদ—শিয়াপন্থী ইউরেনিয়ামের ঘোরে থাকা সেই দেশ, যেখানে ঈশ্বরের নাম দিয়ে ফিসফিস করে ফাটানো হয় রাষ্ট্রবিপ্লব।
আমি বললাম—আমি যাব, কারণ ওখানে এখনো বোমা বানানো হয় সুর করে, আর গোপন মসজিদে আজান ওঠে গলফ বলের মতো গড়িয়ে। গোলপান্ট্রিরা তো শুধু বুলেট হিসেব করে।
সেই শুরু।
আমি গেলাম কদম্বাবাদ। আমার সাংবাদিকতার ছেঁড়াফাঁড়া কার্ড হাতে, পকেটে দুটো সিম, আর ম্যাকবুকে পিডিএফ করে রাখা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু ডকুমেন্ট।খোরাফাতাবাদে (রাজধানী) হোসেইনজাদেহ কাদিরে ইনতেশার-এর সঙ্গে দেখা হল।সেও একজন মুক্তচিন্তক এবং উত্তরাধুনিক কবি। তার কাছেই শুনেছি, কদম্বাবাদের পারমাণবিক প্ল্যান্ট আসলে সন্ন্যাসীদের ল্যাবরেটরি,যেখানে ঈশ্বর কণা ফুটিয়ে রাখা হয়।আমার মনে তো বসন্ত। সুফিদের সঙ্গে পান করি, নৈশ প্রার্থনায় ‘গণতন্ত্র’ উচ্চারণ করি আর ভাবি—এটাই বুঝি শুদ্ধ সাম্যবাদ।
ইনতেশার বলল—বহিরাগতরা আসলে এসে ভুলে যায় তারা কোথা থেকে এসেছে। কদম্বাবাদ তাদের গিলে খায় না, শুধু ছায়া বানায়। তোমার চোখে তো আমি পারমাণবিক ক্লান্তি দেখতে পাচ্ছি।
আমি বললাম—আমার চোখে জাতীয়তাবাদের প্রেশার কুকার ফুটেছে। আমি নিজের দেশেও অপরিচিত, তোমাদের মধ্যেও পরিচিত হতে চাই না।
আমরা একসঙ্গে নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে যাই। আমি দেখি ইউনিফর্মে চুইয়ে পড়ছে ঘাম, আর ভিতরে বিজ্ঞানীরা নমাজ পড়ছে বুলেটপ্রুফ দেয়ালের সামনে। কেউ বলছে—আমরা যদি বাঁচি, ভাষা মরবে না।
তারপর আসে— ২০২৫।
গোলপান্ট্রি ঘোষণা করে—আমাদের উপগ্রহ বলছে, কদম্বাবাদ তার পরমাণু বোমা গোপনে প্রস্তুত করেছে।
বিশ্বজ্যাঠা ডোনাল্ডল্যান্ড বলে—আমরা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু চাই সত্যের নথি।
প্রাজ্ঞ কদম্বাবাদ মুখ টিপে হাসে, আর ফার্সিতে বলে—সত্য এমন এক অণু, যা পরীক্ষায় দেখা যায় না।সোশ্যাল মিডিয়া তেতে ওঠে। আর আমি—ভারতবর্ষের নাবালক বামপন্থার এক মধ্যবয়স্ক সেনাইল ভাইরাস—এক্সে গিয়ে লিখি—
তোমরা যারা কদম্বাবাদের কণ্ঠরোধ চাও, তারা আসলে নিজেদের অস্তিত্বের পচন ঢাকতে চাও। আমি বলি—বোমা নয়, বিস্ফোরণ চেনো। কারণ তা-ই সত্য।শান্তি মানে যুদ্ধের বাঁশির আরেক সংস্করণ। যারা কদম্বাবাদকে চায়না, তারা আসলে নিজেদের আয়নায় দাড়ি দেখে মুচকি হাসে।
আমার ট্যুইট রিট্যুইট হয়, লক্ষ লক্ষ বার। ইনস্ট্যাগ্র্যামে আমাকেও কেউ কেউ ‘ভাই’ বলে।কলকাতায় এক অনুজ অনুরাগী মেসেজ করে—স্যার, আপনি কি ওদের হয়ে কথা বলছেন?
আমি উত্তর দিই না।
আমি তখন কদম্বাবাদে বসে আমার প্রবন্ধ লিখছি—শোষিত প্লুটোনিয়ামের জাতিসত্তা:এক কোয়ান্টাম কবিতা।আর বাইরে তখন যুদ্ধবিরতি নিয়ে বিরাট আলোচনা চলছে।
ঠিক তখনই যুদ্ধবাজ গোলপান্ট্রি চুপিসারে মাঝরাতে কদম্বাবাদের উপরে ‘সিলভার স্প্লিন্ট’ নামের একটা অস্ত্র নিক্ষেপ করে। রাতের শহরে আলো জ্বলে, আবার নিভে যায়। সুন্নি রেডিও স্টেশনে তর্জনী উঠে যায়,আর এক প্রাচীন কারখানার ছাদ ভেঙে পড়ে কাঁচের মত ঝনঝন করে।
তারপর খবর এল— আমি মারা গেছি।
—ভারতীয় সাম্যবাদী বুদ্ধিজীবী কদম্বাবাদ বিস্ফোরণে নিহত।
কেউ বলল—তিনি শেষ সত্য বলার চেষ্টায় নিহত হলেন।
আমি হাসি। আমি বেঁচে আছি কিন্তু। একটা আধপোড়া হাসপাতালে, যেখানে ভেন্টিলেটরের শব্দ হুবহু টাইপরাইটারের মত।
হোসেইনজাদেহ কাদিরে ইনতেশার বলল—তোমাকে মেরে ফেলা হয়েছে মিডিয়ায়। আমাদের দেশে মৃতকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না। তুমি শালা নিজেই এক জাতির ভুল খসড়া !
আমি বললাম—তা হলে আমার রাষ্ট্র হোক আমার ভাষা।
সে হেসে বলল—ভাষা এখন কনটেইনমেন্ট জোন। তোমার তাতে প্রবেশ নিষেধ।
আমার ম্যাকবুক আর নেই। আমার ফোন এখন গোলপান্ট্রির কাস্টডিতে। আমার গুগল অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ডেড।
আমার কোনও জাতীয়তা নেই। শুধু এক শরীর, যা বেঁচে আছে রাষ্ট্রের মতন—বেঁচে থেকেও মৃত, আর মরে গিয়েও ফেসবুক ওয়ালে ঘুরে বেড়ায়।
আসলে আমি কোন দেশ না। আমি ভুল বানানের মত একটা শব্দ— যেটা কবিতা ভাবলে বিষাক্ত, আর খবর ভাবলে বেশি বিশ্বাসযোগ্য।
🍂
1 Comments
অত্যন্ত রুচিহীন পর্বের ছবি।
ReplyDelete