বিজয় চক্রবর্তী
(বিস্তারিত শ্রীশ্রী সরস্বতী পূজা পদ্ধতি সহ)
১ পৌরাণিক আখ্যান
হিন্দু ধর্মের বিশাল ক্যানভাসে দেবী সরস্বতী কেবল একজন দেবী নন, তিনি হলেন চেতনার সেই আদি প্রবাহ যা সৃষ্টিকে মূক ও বধির হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। বেদে যিনি নদী, পুরাণে তিনিই মানবী রূপধারিণী বাগদেবী। ব্রহ্মার মানসপুত্রী থেকে শুরু করে বিষ্ণুর পত্নী, এবং পরবর্তীতে শাপভ্রষ্টা নদী—সরস্বতীর পৌরাণিক বিবর্তন অত্যন্ত বিচিত্র এবং নাটকীয়। বিভিন্ন পুরাণে তাঁর উৎপত্তিলগ্ন এবং মর্ত্যে আগমনের যে কাহিনিগুলো বর্ণিত হয়েছে, তা একাধারে যেমন অলৌকিক, তেমনই গভীর দার্শনিক ইঙ্গিতপূর্ণ।
নিচে প্রধান তিনটি পৌরাণিক আখ্যান বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ: আদিপুরুষের জিহ্বাগ্র থেকে উঁকি
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে, দেবী সরস্বতী সৃষ্টির একেবারে আদি লগ্নে আবির্ভূতা হন। এই মতানুসারে তিনি কেবল ব্রহ্মার শক্তি নন, তিনি পরমব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণের বাঙ্ময়ী শক্তি।
তখনও মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়নি। শুধুই এক অনন্ত শূন্যতা। সেই শূন্যতার মাঝে বিরাজ করছিলেন পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর মনে ইচ্ছা জাগল সৃষ্টির। কিন্তু সৃষ্টি করতে গেলে প্রয়োজন শব্দ বা নাদ-এর। শব্দ ছাড়া ভাব প্রকাশ অসম্ভব, আর জ্ঞান ছাড়া সৃষ্টি অচল। কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ যখন সৃষ্টির সংকল্প করলেন, তখন তাঁর জিহ্বাগ্র (জিভের ডগা) থেকে এক শ্বেতবর্ণা দেবীর আবির্ভাব হলো।
সেই দেবী ছিলেন অপরূপা। তাঁর পরিধানে ছিল শুভ্র বসন, যা সত্ত্বগুণের প্রতীক। হাতে বীণা, যা মহাজাগতিক ছন্দের প্রতীক এবং পুস্তক, যা বেদ বা জ্ঞানের প্রতীক। তিনি আবির্ভূতা হয়েই বীণার ঝঙ্কারে আদিনাদ ‘ওঁ’-এর সৃষ্টি করলেন। এই নাদ বা শব্দই হলো সৃষ্টির প্রাণ। শ্রীকৃষ্ণ তখন দেবীকে বললেন, "হে দেবী, তুমি ব্যতিরেকে আমি মূক। তুমি আমার বাক্শক্তি। তোমাতেই সকল বিদ্যা, সঙ্গীত ও কলার অধিষ্ঠান।"
এই পুরাণে সরস্বতীকে পঞ্চপ্রকৃতির অন্যতম (দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, সাবিত্রী ও রাধা) বলে অভিহিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে শ্রীকৃষ্ণের আদেশে তিনি নারায়ণ বা বিষ্ণুর পত্নী হিসেবে বৈকুণ্ঠে স্থান পান। এই আখ্যানটি আমাদের শেখায় যে, ঈশ্বরের ইচ্ছাশক্তি (কৃষ্ণ) এবং জ্ঞানশক্তি (সরস্বতী) যখন মিলিত হয়, তখনই কেবল মহাবিশ্বের অস্তিত্ব সম্ভব হয়।
🍂
২. মৎস্য পুরাণ: স্রষ্টা ও সৃষ্টির এক জটিল মনস্তত্ত্ব
মৎস্য পুরাণে দেবী সরস্বতীর উৎপত্তির যে কাহিনি বর্ণিত আছে, তা হিন্দু মিথলজির অন্যতম বিতর্কিত এবং কৌতুহলউদ্দীপক অধ্যায়। এখানে দেবীকে ব্রহ্মার দেহজাত বা মানসকণ্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রজাপতি ব্রহ্মা কঠোর তপস্যা করছিলেন। তপস্যার ফলে তাঁর মন ও দেহ থেকে এক জ্যোতির্ময়ী নারীসত্তা নির্গত হলো। যেহেতু এই দেবী নানা রূপ ধারণ করতে পারতেন এবং তাঁর রূপের ছটা শত সূর্যের ন্যায়, তাই তাঁর নাম হলো ‘শতরূপা’। ইনিই সরস্বতী, সাবিত্রী বা গায়ত্রী নামেও পরিচিতা।
নিজ সৃষ্ট এই অপরূপা দেবীর সৌন্দর্যে ব্রহ্মা নিজেই মোহিত হয়ে পড়েন। পুরাণ বলে, শতরূপা ব্রহ্মাকে পিতা জ্ঞান করে তাঁকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করেন। কিন্তু ব্রহ্মা তাঁর রূপদর্শনে এতই মগ্ন ছিলেন যে, শতরূপা যেদিকেই যাচ্ছিলেন, ব্রহ্মার একেকটি মুখ সেদিকেই নির্গত হচ্ছিল। শতরূপা যখন পূর্বে গেলেন, ব্রহ্মার পূর্বমুখী মাথা গজালো। দক্ষিণে, পশ্চিমে এবং উত্তরে—এভাবে ব্রহ্মার চারটি মুখ তৈরি হলো। লজ্জায় শতরূপা যখন আকাশের দিকে উঠলেন, তখন ব্রহ্মার পঞ্চম মুখটি ওপরের দিকে তৈরি হলো। (পরবর্তীতে শিবের ভৈরব রূপ এই পঞ্চম মস্তকটি ছেদন করেছিলেন বলে কথিত আছে)।
সাধারণ দৃষ্টিতে এই কাহিনিকে অজাচার বা পিতা-কন্যার নিষিদ্ধ সম্পর্ক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে 'সৃষ্টিতত্ত্বের রূপক' (Cosmological Allegory)।ব্রহ্মা হলেন 'জড়' বা 'Matter' (সৃষ্টির উপাদান)।সরস্বতী হলেন 'জ্ঞান' বা 'Consciousness' (সৃষ্টির নকশা)। একজন স্থপতি (Architect) যেমন নিজের মনের মধ্যে থাকা নকশা বা আইডিয়াকে ভালোবাসেন এবং তার সাথে মিলিত হয়েই ইমারত তৈরি করেন, তেমনি ব্রহ্মা তাঁর নিজের সৃষ্টি বা জ্ঞানকে ধারণ করেই জগত রচনা করেছেন। জ্ঞান ছাড়া স্রষ্টা অচল। তাই পুরাণকাররা দেখিয়েছেন, স্রষ্টা সর্বদা তাঁর বিদ্যাকে নিজের কাছে রাখতে চান। এই মিলন দৈহিক নয়, এটি হলো জ্ঞান ও কর্মের মিলন।
৩. শাপ ও মর্ত্যে আগমন: গঙ্গা-লক্ষ্মী-সরস্বতীর ত্রিভুজ দ্বন্দ্ব
দেবী সরস্বতী কেন মর্ত্যে নদী হয়ে বইলেন এবং কেন তিনি তুলসী গাছ হলেন—তার পেছনে রয়েছে এক প্রবল পারিবারিক কলহ। দেবীভাগবত পুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে এই কাহিনি সবিস্তারে বর্ণিত আছে।
প্রাচীনকালে সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং গঙ্গা—তিনজনই ছিলেন নারায়ণের (বিষ্ণুর) পত্নী। তাঁরা তিনজন একত্রে বৈকুণ্ঠে বাস করতেন। কিন্তু সমস্যা বাধল একদিন। তিন দেবী ও নারায়ণ একত্রে বসেছিলেন। গঙ্গা বারবার মুগ্ধ নয়নে নারায়ণের দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং নারায়ণও মৃদু হাসছিলেন। এই বিষয়টি দেবী সরস্বতীর নজরে আসে এবং তিনি ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন।
শান্ত স্বভাবা লক্ষ্মী বিষয়টি মিটমাট করার চেষ্টা করলে সরস্বতী তাঁকেই আক্রমণ করে বসেন। সরস্বতী গঙ্গাকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হলে, লক্ষ্মী মাঝখানে বাধা দেন। এতে সরস্বতী আরও ক্রুদ্ধ হয়ে লক্ষ্মীকে অভিশাপ দেন, "তুমি বৃক্ষরূপ ও নদীরূপ ধারণ করে মর্ত্যে জন্মগ্রহণ করো।" (এই অভিশাপের ফলেই লক্ষ্মী মর্ত্যে তুলসী গাছ এবং পদ্মাবতী নদী হিসেবে জন্ম নেন)। লক্ষ্মীকে শাপগ্রস্ত হতে দেখে গঙ্গা আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি সরস্বতীকে পাল্টা অভিশাপ দিলেন, "তুমি যেমন সামান্য কারণে ঈর্ষান্বিত হয়েছ, তাই তোমার স্থান বৈকুণ্ঠে নয়। তুমি পাপী মানুষের স্পর্শধন্য নদী হয়ে মর্ত্যে প্রবাহিত হবে।" সরস্বতীও ছাড়বার পাত্রী নন। তিনিও গঙ্গাকে শাপ দিলেন, "তুমিও মর্ত্যে নদী হয়ে পাপীদের পাপ গ্রহণ করবে।"
এই তুমুল কাণ্ড দেখে নারায়ণ হস্তক্ষেপ করলেন। তিনি দেখলেন, একই ঘরে তিন প্রবল তেজস্বিনী দেবীর সহাবস্থান সম্ভব নয়। তিনি নতুন বিধান দিলেন: ১. লক্ষ্মী: তিনি নারায়ণের বক্ষেই থাকবেন। তবে শাপমোচনের জন্য তাঁর এক অংশ তুলসী রূপে মর্ত্যে পূজিত হবে। ২. গঙ্গা: তিনি দেবাদিদেব মহাদেবের জটায় আশ্রয় নেবেন এবং নদী রূপে মর্ত্যে বইবেন। ৩. সরস্বতী: তিনি ব্রহ্মার পত্নী হিসেবে সত্যলোকে গমন করবেন এবং নদী রূপে মর্ত্যেও থাকবেন।
এই পৌরাণিক ঘটনার ফলেই সরস্বতী ব্রহ্মার সঙ্গিনী হলেন এবং মর্ত্যধামে নদী রূপে প্রবাহিত হলেন।
৪. নদী ও দেবীর দ্বৈত সত্তা: ইতিহাসের যোগসূত্র
পুরাণের এই শাপের কাহিনিটি কেবল গল্প নয়, এটি ভারতের ভৌগোলিক ইতিহাসের এক আশ্চরর্য দলিল। ঋগ্বেদে সরস্বতীকে 'নদীতমা' বা শ্রেষ্ঠ নদী বলা হয়েছে। একসময় এই বিশাল নদী পাঞ্জাব ও হরিয়ানার বুক চিরে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে মিশত। কিন্তু কালক্রমে (ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে) এই নদী শুকিয়ে যায় বা মরুভূমিতে হারিয়ে যায়।
পুরাণের গল্পটি সেই ভৌগোলিক সত্যকেই সমর্থন করে। শাপের কারণে দেবী মর্ত্যে নদী হয়ে এসেছিলেন, আবার শাপমোচনের শেষে তিনি অন্তর্হিতা হন (অন্তঃসলিলা ফাল্গু ধারার মতো)। তাই আজও প্রয়াগে গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গমে সরস্বতীকে 'লুক্কায়িত' নদী বা অন্তঃসলিলা বলা হয়।
মানুষ বিশ্বাস করে, সরস্বতী নদী শুকিয়ে গেলেও তাঁর জ্ঞানময়ী রূপটি আমাদের মনের মধ্যে প্রবহমান। জল যেমন শরীরকে শুদ্ধ করে, জ্ঞান তেমনি আত্মাকে শুদ্ধ করে। তাই নদী শুকিয়ে যাওয়ার পর, ঋষিরা সেই দেবীকে জলের আধার থেকে সরিয়ে এনে মনের আধারে, অর্থাৎ বাগদেবী রূপে প্রতিষ্ঠা করলেন।
দেবী সরস্বতীর এই পৌরাণিক আখ্যানগুলো আমাদের শেখায় যে, তিনি কেবল বীণাপাণি নন, তিনি এক মহান শক্তি। ব্রহ্মার মানসকণ্যা হিসেবে তিনি সৃষ্টিকে পথ দেখিয়েছেন, আবার শাপভ্রষ্টা নদী হয়ে তিনি সভ্যতাকে লালন করেছেন। তাঁর জন্মবৃত্তান্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সৃষ্টির মূলে আছে 'শব্দ' বা 'জ্ঞান', আর সেই জ্ঞানের সাধনাতেই মানবজীবনের সার্থকতা। পৌরাণিক যুদ্ধের দামামা বা পারিবারিক কলহের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক শাশ্বত সত্য—বিদ্যার প্রবাহ কখনো থামে না, তা সে নদীরূপেই হোক বা বাণীরূপেই হোক।
২ ইতিহাসে দেবী ও দেবীর আরাধনা
সরস্বতী পূজার ইতিহাস বেশ প্রাচীন।
বৈদিক যুগ: যজ্ঞের সময় সরস্বতীকে আহ্বান করা হতো মূলত নদী ও উর্বরতার দেবী হিসেবে। পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে তিনি 'বাক' (Speech) বা বাগদেবী হয়ে ওঠেন।
বৌদ্ধ ও জৈন যুগ: কেবল হিন্দুরাই নয়, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মেও সরস্বতীর আরাধনা দেখা যায়। বৌদ্ধরা তাঁকে 'মহা সরস্বতী' বা 'বজ্র সরস্বতী' এবং জৈনরা 'শ্রুতদেবতা' বা 'ষোড়শ বিদ্যাদেবী'র প্রধান হিসেবে পূজা করেন। গান্ধার শিল্পকলায় এবং মথুরা শিল্পকলায় খ্রিষ্টপূর্ব সময় থেকেই দেবীর মূর্তি পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এই উপাসনার প্রাচীনত্ব।
ভারতের অন্য রাজ্যে দেবীর পূজা ও বর্তমান অবস্থা
বাঙালির সরস্বতী পূজা বা বসন্ত পঞ্চমী ছাড়াও ভারতের অন্যান্য প্রান্তে দেবী ভিন্ন ভিন্ন রূপে পূজিতা হন।
দক্ষিণ ভারত: এখানে নবরাত্রির শেষ তিন দিন সরস্বতীর আরাধনা হয়। নবমীর দিন হয় 'আয়ুধ পূজা' বা সরস্বতী পূজা। এখানে বই-খাতা এবং বাদ্যযন্ত্র দেবীর সামনে রেখে পূজা করা হয় এবং বিজয়া দশমীতে তা ফেরত নেওয়া হয়।
মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশ: গণেশ চতুর্থীর সময় কোথাও কোথাও সরস্বতীর পূজা হয়। আবার বসন্ত পঞ্চমীতে 'গুল গুলাল' উৎসবেও দেবীর আরাধনা হয়।
কাশ্মীর: একসময় কাশ্মীর ছিল শিক্ষার পীঠস্থান, যাকে বলা হতো 'শারদা পীঠ'। কাশ্মীরি পন্ডিতদের কাছে দেবী সরস্বতী বা শারদা মা অত্যন্ত জাগ্রত দেবী। তাদের কাছে এই পূজা এক গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা।
৩ অন্য দেশের সংস্কৃতিতে দেবী: সমগুণ সম্পন্ন বিদেশী দেবী
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস যেমন পুরনো, জ্ঞানের অন্বেষণও তেমনই প্রাচীন। আদিম মানুষ যখন প্রথম আগুনের ব্যবহার শিখল, যখন প্রথম গুহাচিত্র আঁকল, তখন থেকেই তাদের মনে এক অদৃশ্য শক্তির প্রতি বিশ্বাস জন্মালো—যিনি এই বুদ্ধি বা সৃজনশীলতার উৎস। এই কারণেই কেবল ভারতবর্সে নয়, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রাচীন এবং উন্নত সভ্যতায় আমরা এমন এক দেবীর সাক্ষাৎ পাই, যিনি বিদ্যা, সঙ্গীত, শিল্প এবং যুদ্ধের কৌশলের প্রতীক।
ভারতীয় দর্শনে আমরা যাঁকে 'সরস্বতী' বা 'বাক-দেবী' বলি, গ্রিসে তিনিই 'এথেনা', জাপানে 'বেনজাইতেন' আর কেল্টিক সভ্যতায় 'ব্রিজিড'। নাম ও পোশাক ভিন্ন হলেও, তাঁদের আত্মা এবং গুণাবলী আশ্চর্যজনকভাবে এক। এই অংশে আমরা সেই বিশ্বজনীন দেবীসত্তার তুলনামূলক আলোচনা করব।
ক) জাপান: বেনজাইতেন (Benzaiten) – সরস্বতীর জাপানি যমজ বোন
ভারত থেকে বৌদ্ধধর্ম যখন চীন ও কোরিয়া হয়ে জাপানে পৌঁছায়, তখন তার সাথে সাথে হিন্দু দেবদেবীরাও জাপানি সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেন। জাপানে দেবী সরস্বতী ‘বেনজাইতেন’ (Benzaiten) নামে পরিচিতা। জাপানি ভাষায় 'বেনজাইতেন' শব্দের অর্থ হলো 'বাগ্মী দেবী' বা 'প্রবাহিত ধনের দেবী'—যা হুবহু সরস্বতীর গুণাবলীর সাথে মিলে যায়।
রূপ ও সাদৃশ্য: বেনজাইতেনের মূর্তি দেখলে একজন ভারতীয় সহজেই তাকে চিনতে পারবেন। তাঁর পরনে থাকে জাপানি ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কিন্তু হাতে থাকে 'বিওয়া' (Biwa)—যা জাপানি সংস্করণের বীণা। সরস্বতীর মতো তিনিও শ্বেতপদ্মে বা ড্রাগনের ওপর আসীনা থাকেন।
সুতর ও উৎস: 'সুবর্ণপ্রভাস সূত্র' (Sutra of Golden Light) নামক বৌদ্ধ গ্রন্থে সরস্বতীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যা জাপানে এই দেবীর আগমনের প্রধান মাধ্যম ছিল।
জলের সাথে সম্পর্ক: সরস্বতী যেমন মূলত নদী, জাপানেও বেনজাইতেন জলের দেবী। জাপানের বিখ্যাত বেনজাইতেন মন্দিরগুলো সাধারণত দ্বীপ বা সমুদ্রের তীরে অবস্থিত (যেমন—ইনোশিমা দ্বীপ)। সাপের সাথেও তাঁর গভীর যোগসূত্র রয়েছে, যা প্রাচীন ভারতীয় নাগ উপাসনার ইঙ্গিত দেয়।
সপ্তপদী ভাগ্যদেবতা: জাপানি লোককথায় 'শিচিফুকুচিন' (Shichifukujin) বা সাতজন ভাগ্যদেবতার পূজা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সাতজনের মধ্যে বেনজাইতেনই একমাত্র নারী দেবী। এটি প্রমাণ করে জাপানি সমাজে জ্ঞান ও কলার গুরুত্ব কতখানি।
খ) তিব্বত: ইয়াং চেল মা (Yang Chen Ma) – তুষার রাজ্যের বীণাপাণি
হিমালয়ের ওপারে তিব্বতে দেবী সরস্বতী কেবল পরিচিতই নন, অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে পূজিতা। এখানে তিনি 'ইয়াং চেল মা' (Yang Chen Ma) বা 'বজ্র সরস্বতী' নামে পরিচিতা।
বৌদ্ধ তন্ত্রে স্থান: তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে তিনি মঞ্জুশ্রীর (জ্ঞানের দেবতা) সঙ্গিনী। তিব্বতি লামারা বিশ্বাস করেন, ধ্যানের গভীর স্তরে পৌঁছাতে গেলে এবং শাস্ত্রের জটিল তত্ত্ব বুঝতে গেলে ইয়াং চেল মার আশীর্বাদ প্রয়োজন।
রূপকল্প: তিব্বতি থাঙ্কাচিত্রে (Thangka Painting) দেবীকে সাধারণত সাদা পোশাকে এবং হাতে একটি বীণা বা তিব্বতি বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আঁকা হয়। তাঁর রূপ অত্যন্ত শান্ত এবং সৌম্য।
পূজা পদ্ধতি: তিব্বতে সরস্বতীর মন্ত্রপাঠ এবং মণ্ডলা তৈরি করা হয়। বিশেষত যারা সঙ্গীতশিল্পী বা লেখক, তারা প্রতিদিন সকালে এই দেবীর ধ্যান করেন।
গ) গ্রিস: এথেনা (Athena) – জ্ঞানের তলোয়ার ও জলপাই শাখা
পাশ্চাত্য সভ্যতার ধাত্রী গ্রিসে জ্ঞানের দেবী হলেন এথেনা। গ্রিক মিথলজি এবং হিন্দু মিথলজির মধ্যে ইন্দো-ইউরোপীয় যোগসূত্র থাকার কারণে সরস্বতী ও এথেনার মধ্যে অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়, আবার কিছু মৌলিক অমিলও আছে।
জন্মবৃত্তান্তের মিল: পুরাণে যেমন সরস্বতী বা শতরূপা ব্রহ্মার দেহ বা মুখ থেকে সৃষ্টি হয়েছেন, গ্রিক পুরাণেও এথেনার জন্ম হয়েছে দেবরাজ জিউসের (Zeus) মস্তক থেকে। অর্থাৎ, উভয় দেবীই 'মানস-কণ্যা'—মস্তিষ্ক বা বুদ্ধির প্রতীক।
গুণাবলীর তুলনা: সরস্বতী যেমন শান্ত এবং সাত্বিক, এথেনা কিন্তু প্রয়োজনে যোদ্ধা। তিনি যুদ্ধের কৌশলের (Strategy) দেবী। সরস্বতীর হাতে থাকে বীণা (সৃজনশীলতা), আর এথেনার হাতে থাকে বর্শা এবং ঢাল (জ্ঞান দিয়ে সুরক্ষা)। তবে যুদ্ধের দেবী হলেও এথেনা রক্তপাত পছন্দ করেন না, তিনি বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সমস্যা সমাধানের পক্ষপাতী।
প্রতীক ও বাহন: সরস্বতীর বাহন হংস (রাজহাঁস) বা ময়ূর। এথেনার প্রতীক হলো প্যাঁচা (Owl)। গ্রিকরা মনে করত প্যাঁচা অন্ধকারেও দেখতে পায়, ঠিক যেমন জ্ঞান অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে সত্য দেখতে পায়। ভারতেও লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে প্যাঁচার উপস্থিতি আছে, যা জ্ঞানের সাথে সম্পদের যোগসূত্র নির্দেশ করে।
ঘ) রোম: মিনার্ভা (Minerva) – ব্যবহারিক জ্ঞানের দেবী
গ্রিক এথেনাই রোমান সভ্যতায় এসে নাম পরিবর্তন করে হন মিনার্ভা। রোমানরা ব্যবহারিক জীবনে বিশ্বাসী ছিল, তাই মিনার্ভা কেবল বিমূর্ত জ্ঞানের দেবী নন, তিনি ছিলেন চিকিৎসক, কবি, শিক্ষক এবং কারিগরদের দেবী।
উৎসবের মিল: রোমে মিনার্ভার সম্মানে 'কুইনকুয়াট্রিয়া' (Quinquatria) নামে এক বিশাল উৎসব হতো যা মার্চ মাসে (বসন্তকালে) পালিত হতো। এই সময় ছাত্রছাত্রী এবং শিল্পীরা তাদের গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাত এবং নতুন কাজ শুরু করত। এটি আমাদের বসন্ত পঞ্চমীর সরস্বতী পূজার সাথে হুবহু মিলে যায়। বসন্তকাল, নতুন শিক্ষা এবং গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা—এই তিনটি উপাদান রোম এবং ভারত উভয় স্থানেই এক।
ঙ) প্রাচীন কেল্টিক সভ্যতা: দেবী ব্রিজিড (Brigid)
ইউরোপের আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে খ্রিস্টধর্ম প্রসারের আগে 'ব্রিজিড' নামে এক দেবীর পূজা হতো।
আগুন ও কবিতার দেবী: ব্রিজিড ছিলেন কবিতা, নিরাময় (Healing) এবং কামারশালার (Smithcraft) দেবী। সরস্বতীর সাথে তাঁর মিল হলো 'প্রেরণা' বা Inspiration-এর ক্ষেত্রে।
বসন্তের আগমনী: ১লা ফেব্রুয়ারি কেল্টিকরা 'ইমবল্ক' (Imbolc) উৎসব পালন করত, যা বসন্তের শুরুর দিন। ঠিক এই সময়েই ভারতে সরস্বতী পূজা হয়। ঋতুচক্রের সাথে জ্ঞানদেবীর আরাধনার এই যে মিল, তা কাকতালীয় হতে পারে না। এটি প্রমাণ করে যে প্রাচীন কৃষিজীবী সমাজগুলোতে বসন্তের নতুন প্রাণের সঞ্চারকেই জ্ঞানের জাগরণ হিসেবে দেখা হতো।
চ) মিশর: সেশাত (Seshat) – মহাজাগতিক গণিতবিদ
প্রাচীন মিশরে জ্ঞানের দেবতা 'থথ'-এর স্ত্রী বা নারী সত্তা হলেন সেশাত। তাঁকে বলা হতো 'পবিত্র গ্রন্থাগারের কর্ত্রী'।
হিসাবরক্ষক: সরস্বতী যেমন বেদমাতা, সেশাত তেমনি মহাজাগতিক হিসাব নিকাশ এবং স্থাপত্যের দেবী। ফারাও যখন কোনো মন্দির তৈরি করতেন, তখন 'দড়ি দিয়ে জমি মাপার' অনুষ্ঠানে সেশাতের আবাহন করা হতো। তাঁর মাথায় সাতটি পাপড়ি যুক্ত একটি বিশেষ প্রতীক থাকত, যা জ্ঞানের বিস্তৃতির প্রতীক।
ছ) ইন্দোনেশিয়া: 'হরি রায়া সরস্বতী' (Hari Raya Saraswati)
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়া। কিন্তু তাদের সংস্কৃতির গভীরে হিন্দু ঐতিহ্যের ছাপ আজও স্পষ্ট। বালিতে (যেখানে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ) এবং ইন্দোনেশিয়ার অন্যান্য প্রান্তে 'হরি রায়া সরস্বতী' বা সরস্বতী দিবস পালিত হয়।
পাউকোন ক্যালেন্ডার: আমাদের মতো তিথি মেনে নয়, বালিতে পূজা হয় 'পাউকোন' (Pawukon) ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। প্রতি ২১০ দিন অন্তর সেখানে সরস্বতী পূজা ঘুরে আসে।
ভিন্ন প্রথা: এদিন বালির হিন্দুরা কোনো বই পড়ে না বা লেখে না। তারা বিশ্বাস করে, এদিন বই বা তালপাতার পুঁথি (Lontar) দেবীকে অর্পণ করতে হয়। দেবীর আশীর্বাদ ছাড়া এদিন বিদ্যার ব্যবহার নিষিদ্ধ। পরদিন ভোরে তারা 'বanyu Pinaruh' (পবিত্র জল) স্নান করে নতুন করে পড়ালেখা শুরু করে।
তুলনামূলক সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ (Comparative Analysis)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা তিনটি প্রধান সাদৃশ্য খুঁজে পাই যা প্রমাণ করে যে মানবচেতনার গভীরে এই দেবীর অবস্থান এক ও অভিন্ন:
১. জল ও প্রবাহের ধারণা (Water & Flow): ভারতবর্ষে সরস্বতী মূলত নদী। জাপানে বেনজাইতেন জলের দেবী। গ্রিক এথেনার নামের সাথেও 'সমুদ্রের ফেনা' বা জলের যোগসূত্র পাওয়া যায় অনেক প্রাচীন গল্পে। এর মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো—জ্ঞান নদীর মতো। তা এক জায়গায় জমে থাকলে পচে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। তাকে প্রবাহিত হতে হয়। তাই সব সংস্কৃতিতেই জ্ঞানের দেবী জলের সাথে যুক্ত।
২. বসন্তের সাথে যোগসূত্র (Connection to Spring): রোমের 'কুইনকুয়াট্রিয়া', কেল্টিকদের 'ইমবল্ক' এবং ভারতের 'বসন্ত পঞ্চমী'—সবগুলোই শীতের শেষে বসন্তের শুরুতে পালিত হয়। শীতকাল হলো প্রকৃতির সুপ্ত অবস্থা (অজ্ঞতা), আর বসন্ত হলো জাগরণ (জ্ঞান)। প্রকৃতি যখন নতুন করে সাজে, মানুষের মনও তখন নতুন সৃষ্টির জন্য প্রস্তুত হয়।
৩. শুভ্রতা ও কুমারীত্ব (Whiteness & Virginity): সরস্বতী, এথেনা, মিনার্ভা এবং ব্রিজিড—প্রত্যেকেই স্বাধীন সত্তা। তাঁরা কোনো পুরুষ দেবতার অধীনস্থ নন। এথেনা চিরকুমারী (Parthenos), সরস্বতীও ব্রহ্মার পত্নী হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র। এই 'কুমারীত্ব' শারীরিক নয়, এটি হলো মনের স্বাধীনতা। জ্ঞান অর্জনের জন্য মনকে স্বাধীন ও আসক্তিহীন হতে হয়—এই সত্যটিই বিশ্বের সকল মিথলজিতে এই দেবীদের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
মানচিত্রের কাঁটাতার দিয়ে দেশ ভাগ করা যায়, কিন্তু সংস্কৃতি ও চেতনাকে ভাগ করা যায় না। জাপানের মন্দিরে যখন বিওয়ার সুর বাজে, কিংবা রোমের ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ যখন মিনার্ভার কথা ভাবে—তখন অজান্তেই তারা সেই শ্বেতবসনা বাগদেবীরই আরাধনা করে। নাম ভিন্ন, ভাষা ভিন্ন, কিন্তু প্রার্থনার ভাষা এক— "তমসো মা জ্যোতির্গময়"। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই দেবীর রূপভেদ আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, জ্ঞান সমগ্র মানবজাতির সম্পদ, কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নয়।
৪ শ্রীশ্রী সরস্বতী পূজা পদ্ধতি: পুরোহিত্য নির্দেশিকা
পূর্ব-প্রস্তুতি:
আসন: পূর্ব বা উত্তরমুখী হয়ে বসুন।
কোশাকুশি: সামনে বাঁদিকে জলপূর্ণ কোশাকুশি রাখুন।
ফুল-বেলপাতা: ডানদিকে হাতের কাছে রাখুন।
নৈবেদ্য: দেবীর সামনে সাজিয়ে রাখুন।
পর্ব ১: আত্মশুদ্ধি ও সাধারণ বিধি
পূজা শুরুর আগে নিজেকে এবং পরিবেশকে পবিত্র করতে হবে।
১. আচমন (জলশুদ্ধি): ডান হাতের তালু গর্ত করে মাষকলাই পরিমাণ জল নিন। বিষ্ণুকে স্মরণ করে পান করুন (৩ বার)।
ওঁ বিষ্ণুঃ, ওঁ বিষ্ণুঃ, ওঁ বিষ্ণুঃ।
এরপর হাত ধুয়ে ফেলুন: ওঁ অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোহপি বা। যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।।
২. আসন শুদ্ধি (আসন স্পর্শ করে):
ওঁ আসনমন্ত্রস্য মেরুপৃষ্ঠ ঋষিঃ সুতলং ছন্দঃ কূর্মো দেবতা আসনোপবেশনে বিনিযোগঃ।
ওঁ পৃথ্বি ত্বয়া ধৃতা লোকা দেবি ত্বং বিষ্ণুনা ধৃতা। ত্বঞ্চ ধারয় মাং নিত্যং পবিত্রং কুরু চাসনম্।। (আসনের কোণে একটু জল দিয়ে একটি ফুল দিন)
৩. পুষ্পশুদ্ধি (ফুলের ওপর জল ছিটিয়ে): ফুলের ডালি স্পর্শ করে বলুন—
ওঁ পুষ্পে পুষ্পে মহাপুষ্পে সুপুষ্পে পুষ্পসম্ভবে। পুষ্পচয়াবকীর্ণে চ হুং ফট্ স্বাহা।
পর্ব ২: সঙ্কল্প (Sankalpa)
সঙ্কল্প হলো পূজার আইনি বা আধ্যাত্মিক চুক্তিপত্র। এটি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে করতে হয়।
পদ্ধতি: কুণ্ডিতে (তামার ছোট পাত্রে) বা ডান হাতের তালুতে একটু জল, আতপ চাল, হরিতকী বা একটি ফুল এবং সামান্য তিল নিন।
মন্ত্র পাঠ: (যজমান যদি আপনি নিজেই হন, তবে 'অহং' বলবেন। অন্য কেউ হলে তার নাম ও গোত্র বলবেন)
ওঁ বিষ্ণুরোম্ তৎসৎ অদ্য মাঘে মাসি শুক্লে পক্ষে পঞ্চম্যাং তিথৌ ভাস্করবারে (বা যে বার হবে) মকররাশিস্থে ভাস্করে...
(গোত্র উল্লেখ করুন): ... ভরদ্বাজ (আপনার গোত্র) গোত্রস্য...
(নাম উল্লেখ করুন): শ্রী অমুক দেবশর্মণঃ (আপনার নাম)...
(উদ্দেশ্য): শ্রীসরস্বতী প্রীতিকামঃ গণপত্যাদি নানাদেবতা পূজা পূর্বক সরস্বতী পূজা কর্মাহং করিষ্যে।
(জলটি উত্তর-পূর্ব কোণে বা তামার পাত্রে ফেলে দিন)
পর্ব ৩: ঘট স্থাপন ও সাধারণ অর্ঘ্য
১. ঘট স্থাপন: মাটির বা তামার ঘটে জল ভরে, আমপল্লব ও শীষওয়ালা ডাব বসিয়ে দেবীর সামনে স্থাপন করুন। ঘটে সিঁদুর দিয়ে পুতুল বা স্বস্তিক চিহ্ন আঁকুন।
ঘট স্পর্শ করে বলুন: ওঁ স্থিরাম ভব, বিদহ্মি ভব।
২. গণেশ পূজা (সংক্ষেপে): যেকোনো পূজার আগে গণেশ পূজা আবশ্যিক। একটি ফুল ও গন্ধ (চন্দন) নিয়ে—
ওঁ গণেশায় নমঃ। এষ গন্ধপুষ্পং ওঁ গণেশায় নমঃ। (গণেশকে অর্পণ করুন)
পর্ব ৪: প্রাণ-প্রতিষ্ঠা ও চক্ষুদান (যদি মৃন্ময়ী মূর্তি হয়)
যদি নতুন মূর্তি হয়, তবে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি বেলপাতা ও ফুল নিয়ে মূর্তির হৃদয়ে (বুকে) স্পর্শ করে বলুন:
ওঁ আং হ্রীং ক্রৌং যঁ রঁ লঁ বঁ শঁ ষঁ সঁ হঁ হংসঃ শ্রীসরস্বতী দেব্যাঃ প্রাণা ইহ প্রাণাঃ। ইহ জীব ইহ স্থিতঃ... অস্যাং মূর্ত্তৌ সুখং চিরং তিষ্ঠন্তু স্বাহা।
চক্ষুদান: কুশের অগ্রভাগে (বা বেলপাতার বোঁটায়) কাজল বা ঘি মাখিয়ে দেবীর চোখে বুলিয়ে দিন (প্রতীকী)।
মন্ত্র: ওঁ চক্ষুদর্লিং সর্বলোকস্য...
পর্ব ৫: মূল পূজা (উপচার প্রদান)
এবার দেবীকে একে একে রাজকীয় সম্মান জানাবেন। এটি ১০ বা ১৬ উপচারে করা যায়। এখানে প্রধান ১০টি উপচার দেওয়া হলো।
১. পাদ্য (পা ধোয়ার জল): কোশায় জল নিয়ে— এতৎ পাদ্যং ওঁ সরস্বত্যৈ নমঃ। (জল তাম্রপাত্রে ফেলুন)
২. অর্ঘ্য (দুর্বা, আতপ চাল, গন্ধ, জল মেশানো শঙ্খের জল):
ইদম্ অর্ঘ্যং ওঁ সরস্বত্যৈ নমঃ।
৩. আচমনীয় (পান করার জল):
ইদম্ আচমনীয়ং ওঁ সরস্বত্যৈ নমঃ।
৪. গন্ধ (চন্দন): মধ্যমা আঙুলে চন্দন নিয়ে দেবীর কপালে বা চরণে দিন— এষ গন্ধঃ ওঁ সরস্বত্যৈ নমঃ।
৫. পুষ্প (ফুল):
ইদং সচন্দন পুষ্পং ওঁ সরস্বত্যৈ নমঃ। (পুষ্প চরণে দিন)
ইদং সচন্দন বিল্বপত্রং ওঁ সরস্বত্যৈ নমঃ। (বেলপাতা চরণে দিন)
ইদং সচন্দন পলাশপুষ্পং ওঁ সরস্বত্যৈ নমঃ। (পলাশ ফুল চরণে দিন)
৬. ধূপ ও দীপ: ধূপকাঠি ঘুরিয়ে— এষ ধূপঃ ওঁ সরস্বত্যৈ নমঃ। প্রদীপ ঘুরিয়ে— এষ দীপঃ ওঁ সরস্বত্যৈ নমঃ।
৭. নৈবেদ্য (ফল ও মিষ্টি): নৈবেদ্যের ওপর একটু জল ছিটিয়ে— এতৎ সোপকরণ নৈবেদ্যং ওঁ সরস্বত্যৈ নমঃ।
পর্ব ৬: পুষ্পাঞ্জলি (Pushpanjali)
সবাইকে ফুল দিন। আপনি মন্ত্র বলবেন, সবাই আপনার সাথে বলবে। (৩ বার)
প্রথম মন্ত্র:
ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোহস্তুতে। (ফুল দিন)
দ্বিতীয় মন্ত্র:
জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে। বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমোহস্তুতে। (ফুল দিন)
তৃতীয় মন্ত্র:
ওঁ ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ। বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ। এষ সচন্দন পুষ্পাঞ্জলিঃ ঐং সরস্বত্যৈ নমঃ। (সব ফুল দিন)
প্রণাম মন্ত্র:
ওঁ সরস্বত্যৈ নমো নিত্যং ভদ্রকাল্যৈ নমো নমঃ। বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ। সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোহস্তুতে।।
পর্ব ৭: হোম বা যজ্ঞ (সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি)
সরস্বতী পূজায় সাধারণত 'বৃতি হোম' করা হয়। প্রস্তুতি: বালি দিয়ে ছোট বেদী করে বেলকাঠ সাজান। ঘি, বেলপাতা (২৮টি বা ১০৮টি) রাখুন।
১. অগ্নিস্থাপন: কর্পূর দিয়ে কাঠ জ্বালান। বলুন— ওঁ অগ্নয়ে নমঃ।
২. ঘৃতাহুতি (ঘি দেওয়া): আগুনের দিকে তাকিয়ে— ওঁ প্রজাপতয়ে স্বাহা, ইদং প্রজাপতয়ে ন মম। (ঘি দিন)
৩. প্রকৃত হোম (বেলপাতা আহুতি): একটি করে বেলপাতা ঘিতে ডুবিয়ে আগুনে ফেলুন এবং বলুন: * ওঁ সরস্বত্যৈ স্বাহা। (এভাবে ১০৮ বার বা অন্তত ২৮ বার)।
৪. পূর্ণাহুতি: বাকি সব ঘি, সুপারি, পান এবং শেষ পাতাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে— * ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে... ওঁ সরস্বত্যৈ পূর্ণাহুতিং সমর্পয়ামি স্বাহা। (আগুনে সব ঢেলে দিন)।
পর্ব ৮: হাতেখড়ি (ঐচ্ছিক) ও আরতি
হাতেখড়ি: ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ও আচার (Hatey Khori Tradition)
হাতেখড়ি হলো শিশুর ব্রহ্মচর্য বা ছাত্রজীবনে প্রবেশের প্রথম ধাপ। এর আচার অত্যন্ত স্নেহপূর্ণ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ হতে হয়।
সঠিক সময়: সাধারণত পূজার পরে, পুষ্পাঞ্জলি শেষ হলে। উপকরণ: নতুন স্লেট, খড়িমাটি (সাদা চক), দোয়াত-কলম, মধু এবং একটি স্বর্ণের আংটি বা কাঠি (ঐচ্ছিক)।
পদ্ধতি (Step-by-Step):
১. শিশুর অবস্থান: শিশু স্নান সেরে নতুন জামা পরে পুরোহিত বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ বিদ্বান ব্যক্তির (যিনি হাতেখড়ি দেবেন) কোলে বসবে। শিশু ও গুরু উভয়েই পূর্বমুখী হয়ে বসবেন। ২. স্লেট পূজা: প্রথমে স্লেট ও চক দেবীর চরণে ছুঁইয়ে আশীর্বাদ নিতে হবে। ৩. মন্ত্র পাঠ: গুরুর কোলে বসে শিশু গুরুর সাথে সাথে আউড়াবে—
“ওঁ নমঃ সরস্বত্যৈ নমঃ”
“ওঁ শ্রী গুরবে নমঃ” (গুরুকে প্রণাম) ৪. মধু স্পর্শ: প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী, একটি স্বর্ণের আংটি বা কাঠি মধুতে ডুবিয়ে শিশুর জিভে আলতো করে ছোঁয়ানো হয়।
উদ্দেশ্য: বিশ্বাস করা হয়, এতে শিশুর বাণী বা কথা মধুর হয় এবং সে সত্যভাষী হয়। ৫. লেখন আরম্ভ:
গুরু শিশুর ডান হাত নিজের হাতে ধরে স্লেটের ওপর প্রথমে তিনটি ফোঁটা দেবেন (ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর)।
এরপর লিখবেন— 'ওঁ' (সৃষ্টির আদি শব্দ)।
তারপর লিখবেন— 'ঐং' (সরস্বতীর বীজ মন্ত্র) অথবা 'শ্রী'।
সবশেষে বর্ণমালা— 'অ, আ, ক, খ'। ৬. সমাপ্তি: লেখা শেষ হলে শিশু গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবে।
যদি কোনো শিশুর হাতেখড়ি থাকে, তবে পুষ্পাঞ্জলির পর এবং হোমের আগে তা করবেন (আগের উত্তরে বর্ণিত পদ্ধতি মেনে)।
আরতি: পঞ্চপ্রদীপ, ধূপ, চামর এবং শঙ্খ বাজিয়ে দেবীর আরতি করুন।
পর্ব ৯: বিসর্জন ও শান্তি জল
পূজা শেষে সন্ধ্যায় বা পরের দিন বিসর্জন দিতে হয়।
দর্পণ বিসর্জন (মুকুরে প্রতিবিম্ব দেখে): একটি থালায় জল ও দুধ নিয়ে তাতে প্রতিমার ছায়া দেখুন। মন্ত্র: ওঁ গচ্ছ গচ্ছ পরং স্থানং স্বস্থানং পরমেশ্বরী...
শান্তি জল: ঘটের জল আমপাতা দিয়ে সবার মাথায় ছিটিয়ে দিন। মন্ত্র: ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ।
মনে রাখার বিষয়
১. আত্মবিশ্বাস: মন্ত্র পড়ার সময় গলার স্বর নামাবেন না। স্পষ্ট স্বরে মন্ত্র পাঠ করলে পূজার পরিবেশ তৈরি হয়।
২. সময়জ্ঞান: পুষ্পাঞ্জলির সময় খেয়াল রাখবেন যেন সবাই মন্ত্র শেষ হওয়ার পরেই ফুল ছোঁড়ে, আগে নয়।
৩. পলাশ ফুল: মনে রাখবেন, সরস্বতী পূজায় পলাশ ফুল আবশ্যক, কিন্তু তুলসী পাতা নিষিদ্ধ (তবে নৈবেদ্যে বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে তুলসী দেওয়া যায়)।
৫ হাতেখড়ি: ইতিহাস ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা
বাঙালির জীবনে 'হাতেখড়ি' হলো শিক্ষার প্রথম ধাপ। সাধারণত সরস্বতী পূজার দিন ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের এই অনুষ্ঠান হয়।
পদ্ধতি: পুরোহিত মহাশয় বা পরিবারের কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ বিদ্বান ব্যক্তি শিশুর হাত ধরে স্লেটে চক বা খড়ি দিয়ে প্রথম বর্ণ (অ, আ, ক, খ) লেখান। সাধারণত প্রথমে 'ওঁ' বা 'শ্রী' এবং পরে বর্ণমালা লেখা হয়।
পৌরাণিক ব্যাখ্যা ও ইতিহাস: মনে করা হয়, বিক্রমাদিত্যের সময়কাল বা তারও আগে থেকে এই প্রথা চলে আসছে। পুরাণে আছে, স্বয়ং ব্রহ্মা যখন সৃষ্টি রচনা করছিলেন, তখন তিনি প্রথম অক্ষরজ্ঞান দান করেছিলেন। হাতেখড়ি হলো সেই আদি জ্ঞানের হস্তান্তর। এটি কেবল লেখা শেখা নয়, এটি হলো 'ব্রহ্মজ্ঞান' বা চেতনার উন্মেষ ঘটানোর প্রতীকী শুরু। চক বা খড়ি হলো জ্ঞানের শুভ্রতার প্রতীক, আর স্লেট হলো মনের কালো অন্ধকার যা জ্ঞান দিয়ে দূর করা হয়।
৬ পূজায় ব্যবহৃত উপকরণ এবং ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য
প্রতিটি উপকরণের পেছনে একটি দার্শনিক বা ব্যবহারিক কারণ রয়েছে:
শ্বেত বস্ত্র ও শ্বেত পদ্ম: সাদা রঙ সত্ত্বগুণের প্রতীক। বিদ্যা অর্জনের জন্য মনের পবিত্রতা ও শান্তি প্রয়োজন, যা সাদা রঙ নির্দেশ করে।
বীণা: বীণা হলো সুর ও ছন্দের প্রতীক। বিদ্যা কেবল মুখস্থ করা নয়, জীবনের ছন্দ বজায় রাখা।
পুস্তক: বেদের প্রতীক। সঞ্চিত জ্ঞানের আধার।
পলাশ ফুল: পলাশের লাল রঙ আগুনের প্রতীক—জ্ঞানের আগুন যা অজ্ঞানতা পুড়িয়ে দেয়। আবার বসন্তের আগমনী বার্তাও।
দোয়াত ও লেখনী: আগে খাগের কলম ও মাটির দোয়াত ব্যবহার হতো। এটি সৃজনশীলতা ও লিপিবিদ্যার সম্মান প্রদর্শন।
হংস (রাজহাঁস): দেবীর বাহন। হংসের গুণ হলো সে জলমিশ্রিত দুধ থেকে কেবল দুধটুকু গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থীকে সংসার থেকে কেবল ভালোটুকু (সারটুকু) গ্রহণ করতে হবে।
৭ সাংস্কৃতিক পরম্পরা এবং বর্তমান সমাজে গুরুত্ব
বর্তমান যুগে সরস্বতী পূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালির 'ভ্যালেন্টাইনস ডে' বা প্রেমের অঘোষিত উৎসব হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। বাসন্তী রঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে সেজে তরুণ-তরুণীরা এদিন রাস্তায় বেরোয়।
কিন্তু এর গভীর গুরুত্ব অন্যত্র। আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে তথ্য (Information) সহজলভ্য কিন্তু জ্ঞান (Wisdom) বিরল, সেখানে সরস্বতীর আরাধনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিদ্যার উদ্দেশ্য কেবল চাকরি পাওয়া নয়, বরং অন্তরের বিকাশ। বাঙালির পাড়ায় পাড়ায় মণ্ডপ সজ্জা, স্কুল-কলেজের মিলনমেলা, এবং ছোটদের হাতেখড়ি—এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটি সমাজ তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজের সংস্কৃতি ও শিক্ষার গুরুত্ব পৌঁছে দেয়।
0 Comments