জ্বলদর্চি

জঙ্গলমহলের লোকগল্প /দর্জির চালাক বউ/সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস/ কথক- শম্ভু দাস

জঙ্গলমহলের লোকগল্প 
দর্জির চালাক বউ
সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস 
কথক- শম্ভু দাস, গ্ৰাম- যুগীশোল, থানা- নয়াগ্ৰাম, জেলা- ঝাড়গ্ৰাম 

অনেকদিন আগে এক গ্ৰামে কানাই ও বলাই নামে দুই দর্জি বাস করত। কানাই ছিল খুবই সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ। আর তার বউ ছিল খুবই বুদ্ধিমতী ও পরিশ্রমী। তার বউয়ের বুদ্ধির জোরে কানাই তার ব্যবসায় লাভ করত। কানাই সময়মতো খদ্দেরদের কাজ করে দিত বলে সবাই তাদের জামাকাপড় সেলাই করতে কানাইকে দিত। 

এইজন্য বলাইয়ের অনেক ক্ষতি হত। কারণ তার কাছে কেউ সেলাই করতে আসত না। এমনকি কানাইয়ের মতো ভালো কাজ ও ভালো ব্যবহার বলাইয়ের ছিল না। তাই কেউ বলাইয়ের কাছে সেলাই করতে আসত না।

এইভাবে তাদের দিন কাটত। একদিন কানাই তার বউকে বলে-“কী গো বউ, তোমার হলো? এখনি খদ্দেররা তাদের জামাকাপড় নিতে চলে আসবে যে।”

তার বউ তখন বলে-“এই যে এই যে হয়ে গেছে। দাঁড়াও এখনি এগুলো ভালো করে গুছিয়ে দিচ্ছি।”

তখনই একজন খদ্দের এসে পড়ে। আর সে বলে-“কী রে কানাই, আমার কাজটা হয়েছে?”

কানাই তখন বলে-“হ্যাঁ ভাই, হয়ে গেছে। এই যে তোমার সব জামাকাপড় একেবারে গুছিয়ে রাখা আছে।”

তখন লোকটি বলে-“বেশ বেশ, তোর কথার দাম আছে বলতে হবে। কত কম সময়ে তুই সব কাপড় দিয়ে দিলি। এই নে এই নে তোর টাকা।”

এদিকে কানাইয়ের দোকানের সামনে এত খদ্দের দেখে বলাই বলে-“দূর দূর, জীবনটা একেবারে শেষ হয়ে গেল। যবে থেকে ওই বেটা কানাই আমার দোকানের পাশে দোকান দিয়েছে তবে থেকে না পাচ্ছি খদ্দের আর না পাচ্ছি টাকা। শুধু বসে বসে মাছি তাড়াচ্ছি, দূর দূর।”
🍂

তখনই একজন বউ এসে বলে-“এই যে ভাই শোন।”

বলাই বলে-“হ্যাঁ, হ্যাঁ দিদি বলো বলো।”

বউটি বলে-“আমার এই শাড়িটা না একটু ছিঁড়ে গেছে। তুমি এটা একটু সেলাই করে দেবে?”

তখন বলাই বলে-“হ্যাঁ নিশ্চয়ই, এখনি করে দিচ্ছি।”

বউটি বলে-“এটা সেলাই করতে কত নেবে ভাই?”

তখন বলাই মনে মনে ভাবে-“সকাল থেকে তো একটাও খদ্দের পাইনি, তাই এই একজনের কাছ থেকে পুরোটা আদায় করে নিতে হবে।”

এই ভেবে বলাই বলে-“দিদি তুমি ওই একশো টাকা দেবে।”

এই শুনে বউটি চমকে উঠে আর বলে-“একশো টাকা! এইটুকু সেলাই করতে একশো টাকা। না না এর দাম তো এত হতে পারে না।”

তখন বলাই বলে-“হতে পারে না মানে। দর্জি আমি না তুমি। একশো টাকা বলছি মানে একশো টাকাই দিতে হবে। এর থেকে এক টাকাও কম নেব না।”

বউটি তখন বলে-“না না থাক। তোমাকে করতে হবে না। আমি পাশের দোকান থেকে করিয়ে নিচ্ছি।”


এই বলে বউটি চলে যায়। 

তখন বলাই বলে-“দূর দূর আরও একটা খদ্দের কানাইয়ের জন্য চলে গেল। এখন বাড়ি যাই, আর ভালো লাগছে না।”

এই বলে সে বাড়ি চলে যায়।

বাড়ি পৌঁছাতে তার বউ তাকে বলে-“এই যে এত তাড়াতাড়ি চলে এলে যে। বলি আজ কত টাকা আনলে শুনি?”

বলাই বলে-“দূর, দূর কত টাকা আবার, এক টাকাও আজ হয়নি।”

তার বউ বলে-“কী! বলি রোজ রোজ এরকম খালি হাতে ফিরলে আমাদের দুজনের পেট কীভাবে চলবে শুনি?”

বলাই বলে-“কী করব বলো বউ। ওই কানাইয়ের জন্য, ওই কানাইয়ের জন্যই আমার একের পর এক খদ্দের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ওই বেটা দোকান দিয়েই আমার সব মাটি করে দিল।”

তার বউ তখন বলে-“তাহলে ওই কানাইয়ের দোকানটা তুলে দিলেই তো পারো‌।”

বলাই বলে-“তুলে দেব! কিন্তু কী করে?”

তখন তার বউ বলাইকে একটা বুদ্ধি দেয়। সে বলে কানাইয়ের দোকানে আগুন লাগিয়ে দিতে।

এই শুনে বলাই হাসতে হাসতে বলে-“সত্যি, সত্যি বউ তোমার বুদ্ধির জবাব নেই। বেটা কানাই এবার দেখবি কত ধানে কত চাল, হা হা হা।”

এরপর বলাই বউয়ের কথা মতো রাত্রিবেলা কানাইয়ের দোকানে আগুন দিয়ে দেয়। আগুন দেখে সবাই চেঁচামেচি করতে থাকে। এরপর সবাই মিলে কোনোমতে আগুন নেভায়।

এইসব দেখে কানাই কাঁদতে থাকে, আর বলে-“হায় হায় হায়, আমার দোকানটা একেবারে পুড়ে ছাই হয়ে গেল গো। হে ভগবান আমার সাথে এটা তুমি কী করলে, হায় হায় হায়।”

তখন কানাইয়ের বউ কানাইকে বলে-“কেঁদো না, কেঁদো না তুমি। কেঁদে কী কিছু লাভ আছে। এবার ভাব এখন আমরা কী করব?”

কানাই তখন বলে-“কী আর করব আমরা, না খেতে পেয়ে মরব আর কী।”

কানাইয়ের এই অবস্থা দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বলাই মনে মনে হাসতে থাকে আর বলে-“কাঁদ কানাই কাঁদ, তুই যত কাঁদবি ততই আমার লাভ। হা হা হা।”

সেদিন রাত্রিবেলা কানাই বাড়িতে বসে তার বউকে বলে-“এবার কী করব বউ? ওই দোকানের জন্যই তো আমাদের পেট চলত। কী করে যে আগুনটা লাগল কে জানে।”

তার বউ তখন বলে-“আগুন তো আর নিজে থেকে লাগেনি, লাগানো হয়েছে।”

কানাই বলে-“লাগানো হয়েছে মানে?”

তার বউ বলে-“বুঝতে পারছ না। ওই বলাই গো বলাই, ওই বলাই এই কাজটি করেছে। ও তোমাকে হিংসে করে। আমার মনে হয় ওই এই কাজটি করেছে।”

তখন কানাই বলে-“হ্যাঁ হ্যাঁ হতে পারে তাই হতে পারে। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়া আমরা কী করতে পারি বলো? এখন আমাদের সংসার চলবে কীভাবে শুধু এটাই ভাবছি।”

তার বউ বলে-“এত ভেঙে পড় না। দোকান নেই তো কী হয়েছে, আমরা রাস্তায় বসে সেলাই করব। তাতেও আমাদের খদ্দেরের কোনো অভাব হবে না।”

কানাই বলে-“হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ, একদম ঠিক বলেছ। কাল থেকে আমরা আবার নতুনভাবে শুরু করব।”

পরেরদিন বলাইয়ের বউ বলাইকে বলে-“কী… আমার বুদ্ধিতে কানাই কেমন জব্দ হল বলো?”

বলাই বলে-“তা আর বলতে। বেশ জব্দ হয়েছে। এবার আমি যাই গো। আজ তাড়াতাড়ি গিয়ে দোকানটা খুলি। আমার মনে হচ্ছে আজ ভালোই রোজগার হবে।”

এই বলে বলাই দোকানে চলে গেল।

আর এদিকে কানাই ও তার বউ রাস্তায় বসে সেলাইয়ের কাজ করতে থাকে। 

এই দেখে বলাই অবাক হয়ে যায়। সে বলে-“এ কী এ কী হল, এর দোকান পুড়িয়েও তো একে জব্দ করা গেল না। এরা তো রাস্তায় কাজ করতে বসে গেছে। এ তো যা ভেবেছিলাম তার উল্টোটা হলো। এমনকি আগের থেকে বেশি ভিড় এখন জমেছে মনে হচ্ছে। দূর দূর আর ভালো লাগে না।”

এই কথা বলে সে সেখান থেকে বাড়ি চলে যায়। 

বাড়িতে গিয়ে তার বউকে বলে-“বুঝলে বউ, এভাবে কানাইকে জব্দ করা যাবে না। অন্যভাবে একে জব্দ করতে হবে, করতেই হবে।”

তার বউ বলে-“হ্যাঁ গো, তুমি ঠিক বলেছ। যেভাবে হোক কানাইকে জব্দ করতে হবে, করতেই হবে।”

বলাই তখন বলে-“কিন্তু সেটা কীভাবে করা যায় বলো তো?”

তার বউ বলে-“পাশের গ্ৰামে আমার গুরুর আশ্রম আছে। আমি শুনেছি গুরুবাবা এখন ওখানেই আছে। আমার গুরুবাবা অন্তর্যামী। তাকে সব কথা বললে সে ঠিক এর কিছু একটা উপায় বের করে দেবে।”

ঠিক সেইসময় তারা তাদের ঘরের বাইরে একটা আওয়াজ শোনে। তাদের মনে হয় কেউ তাদের ডাকছে। তখন তারা দুজনেই ঘরের বাইরে আসে। এসে দেখে এক সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে আছে। 

সন্ন্যাসীকে দেখে বলাই ও তার বউ বলে-“তুমি কে?”

সন্ন্যাসী বলে-“আমি, আমি তোর গুরুর শিষ্য। গুরুবাবা আমাকে এখানে পাঠিয়েছে।”

এই শুনে বলাইয়ের বউ বলে-“গুরুবাবা, গুরুবাবা তোমাকে পাঠিয়েছে! জয় জয় গুরুবাবার জয়।”

তখন সেই সন্ন্যাসী বলে-“এখন তোদের খুব খারাপ অবস্থা তাই না?”

বলাইয়ের বউ বলে-“আর বলো না, ওই কানাই…”

তখন সেই সন্ন্যাসী বলে-“জানি জানি আমি সব জানি। তোকে আর বলতে হবে না। তাই তো গুরুবাবা আমায় পাঠিয়েছে, তোদের সব সমস্যা দূর করার জন্য। তোরা কোনো চিন্তা করিস না। আমি সব ঠিক করে দেব। এখন আমি যা বলছি শোন।”

বলাই আর তার বউ বলে-“হ্যাঁ বলো।”

এরপর সন্ন্যাসী বলে-“তোদের ঘাড়ে এখন এক পেত্নী চেপে বসে আছে। ওই পেত্নীকে তোদের ঘাড় থেকে নামিয়ে ওই কানাইয়ের ঘাড়ে চাপাতে হবে।”

বলাইয়ের বউ বলে-“কীভাবে?”

সন্ন্যাসী বলে-“আমার কাছে এই এগারোটি জাদু লেবু আছে। প্রত্যেকটি লেবুতে তোর একটি করে  সোনার গয়না ঢুকিয়ে ওই কানাইয়ের দোকানে ফেলে দিয়ে আসবি। আর তারপর ওই পেত্নী তোদের ঘাড় থেকে নেমে ওই কানাইয়ের ঘাড়ে চেপে বসবে। তখন কানাই আর তোদের থেকে বেশি রোজগার করতে পারবে না। আর হ্যাঁ আজ রাতের মধ্যেই তোদের এই কাজটা করতে হবে। এছাড়া তোরা তোদের গয়না নিয়ে কোনো চিন্তা করিস না। কাল সকাল হলেই তোরা দেখতে পাবি তোদের সব গয়না আবার তোদের কাছে ফিরে এসেছে।”

বলাই বলে-“সত্যি! তুমি সত্যি বলছ?”

তার বউ তখন বলে-“কিন্তু আমরা এত গয়না পাব কোথায়? আমাদের কাছে তো এত গয়না নেই?”

সন্ন্যাসী বলে-“তা আমি জানি না। তোরা যে করে হোক গয়নার ব্যবস্থা কর। তা না হলে তোদের…”

বলাই তখন বলে-“না না, আমি যেভাবে হোক গয়নার ব্যবস্থা করব। তার জন্য যদি আমাকে দোকান ও বাড়ি বিক্রি করতে হয় তাও আমি করব। বলছি এতে কাজ হবে তো?”

সন্ন্যাসী বলে-“কী, তুই গুরুবাবাকে অবিশ্বাস করছিস, জানিস তোদের ভালোর জন্য গুরুবাবাই এই জাদু লেবু আমাকে দিয়ে পাঠিয়েছে।”

বলাইয়ের বউ তখন বলে-“না না অবিশ্বাস করব কেন। এই তুমি যাও না এখনি গিয়ে গয়নার ব্যবস্থা করো।”

এরপর সন্ন্যাসী সেখান থেকে চলে যায়।

আর বলাইও সব বিক্রি করে গয়না নিয়ে আসে। এরপর বলাই ও তার বউ সন্ন্যাসীর কথা মতো সব গয়না লেবুর মধ্যে ঢুকিয়ে কানাইয়ের দোকানে ফেলে দিয়ে আসে। 

পরেরদিন সকালে বলাই হাসতে হাসতে দোকানে যেতে থাকে। আর মনে মনে ভাবতে থাকে-“আজ থেকে এই এলাকার একমাত্র দর্জি হলাম আমি, হা হা হা। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বউ সব গয়না ফেরত পেয়ে গেছে?”

ঠিক দোকানের কাছে পৌঁছাতেই বলাই দেখে কানাইয়ের দোকানঘরটা সারানো হচ্ছে।

এই দেখে বলাই বলে-“এ কী এসব কী হচ্ছে? আজ থেকে তো কানাইয়ের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার না হয়ে এ কী হচ্ছে?”

এই ভেবে সে কানাইয়ের দোকানের কাছে যায়। আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লোককে বলে-“ও ভাই বলি এসব কী হচ্ছে গো? কানাই আবার তার দোকান সারাচ্ছে, বলি এত টাকা সে পেল কোথায়?”

তখন সেই লোকটি বলে-“কী জানি ভাই। বলছে তো সকালে দোকানে এসে দেখে কয়েকটা লেবু দোকানে পড়ে আছে। আর সব লেবুর ভেতরে নাকি একটি করে সোনার গয়না ছিল। সেই গয়না বিক্রি করে সে নাকি তার দোকানটা সারাচ্ছে। যাকগে যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। ভালো লোকের সঙ্গে ভগবান ভালোই করেছে।”

এই শুনে বলাই বলে-“লেবু, গয়না কিন্তু গয়না তো আমার পাওয়ার কথা।”

ঠিক সেইসময় বলাইয়ের বউও সেখানে চলে আসে। আর এসে সে বলে-“বলি হ্যাঁ গো শুনছ, গয়না তো এখনো ফেরত এল না। আর আমি খবর নিয়ে জানলাম গুরুবাবা নাকি তার কোনো শিষ্যকে আমাদের কাছে পাঠাইনি।”

বলাই বলে-“এ্যাঁ, এসব কী বলছ, তুমি এসব কী বলছ?”

তার বউ বলে-“এবার কী হবে, এবার আমাদের কী হবে গোওওও।”

এই বলে তারা দুজনে কাঁদতে থাকে। 

ঠিক তখনই কানাইয়ের বউ সেখানে এসে বলে-“কাঁদ তোরা কাঁদ। যেমন কর্ম তার তেমন ফল। আমি জানতাম তোর বউয়ের এক গুরু আছে। তাই ওই গুরুর নাম করে তার শিষ্য সেজে আমিই তোদের বাড়ি গিয়েছিলাম। আর তোদের সব পাপের শাস্তি আমিই দিয়েছি‌। যেমন কর্ম করেছিস এবার তেমনই ফল ভোগ কর, হা হা হা হা।”

Post a Comment

0 Comments