জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক থিসরাস দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে


আন্তর্জাতিক থিসরাস দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১৮ই জানুয়ারি আন্তর্জাতিক থিসরাস দিবস। থিসরাস কি, এর গুরুত্বই বা কি,আসুন এই সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

শব্দের শক্তি ও ভাষার সমৃদ্ধির উৎসব
ভাষা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও জ্ঞান প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। প্রতিদিন আমরা যে অসংখ্য শব্দ ব্যবহার করি, সেগুলোর প্রতিটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভাব প্রকাশের শক্তি, কল্পনার বিস্তার এবং সৃজনশীলতার আলো। ভাষাকে সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক করে তুলতে যে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক গ্রন্থটি যুগ যুগ ধরে মানুষের পাশে থেকেছে, সেটি হলো থিসরাস। শব্দের ভাণ্ডারকে বিস্তৃত করার জন্য থিসরাসের ভূমিকা অপরিসীম। এই কারণেই প্রতিবছর বিশ্বের নানা দেশে ১৮ই জানুয়ারি পালিত হয় আন্তর্জাতিক থিসরাস দিবস (International Thesaurus Day)। 

এই দিনটি শুধু একটি গ্রন্থকে স্মরণ করার দিন নয়, বরং ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি বিশেষ উপলক্ষ।

থিসরাস মূলত একটি বিশেষ ধরনের অভিধান, যেখানে শব্দের অর্থের পাশাপাশি দেওয়া থাকে সমার্থক ও সম্পর্কিত শব্দের তালিকা। সাধারণ অভিধান যেখানে শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করে, থিসরাস সেখানে একটি শব্দের পরিবর্তে ব্যবহারযোগ্য অন্যান্য শব্দের ভাণ্ডার তুলে ধরে। এর ফলে লেখক, কবি, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও গবেষকরা সহজেই তাদের লেখাকে আরও সমৃদ্ধ, প্রাঞ্জল ও বৈচিত্র্যময় করে তুলতে পারেন। গ্রিক ভাষা থেকে আগত “থিসরাস” শব্দের অর্থ হলো “ধনভাণ্ডার” বা “শব্দভাণ্ডার”। থিসরাস হলো, শব্দের এক বিশাল ভাণ্ডার, যেখানে প্রতিটি শব্দের পাশে তার অসংখ্য রূপ ও বিকল্প শব্দ সাজানো থাকে।
🍂

আন্তর্জাতিক থিসরাস দিবস পালিত হয়, বিখ্যাত ইংরেজ ভাষাবিদ ও অভিধান প্রণেতা পিটার মার্ক রোজেটের জন্মদিন উপলক্ষে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮ই জানুয়ারি, ১৭৭৯ সালে। রোজেট ছিলেন একজন চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও ভাষাবিদ। তবে তিনি বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি পরিচিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “Roget’s Thesaurus of English Words and Phrases” এর জন্য।
১৮৫২ সালে প্রকাশিত এই থিসরাস গ্রন্থটি ইংরেজ ভাষায় শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এতে শব্দগুলোকে বর্ণানুক্রমে নয়, বরং ভাব ও অর্থের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল। ফলে লেখকরা সহজেই তাদের ভাব প্রকাশের জন্য উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পেতেন। রোজেটের এই অসাধারণ অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তাঁর জন্মদিনকে আন্তর্জাতিক থিসরাস দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

থিসরাস কেবল একটি গ্রন্থ নয়,এটি ভাষার শক্তিকে আরও উজ্জ্বল করে তোলার একটি মাধ্যম। এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো,
১.শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি
থিসরাস ব্যবহারের মাধ্যমে একজন মানুষ নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। এতে ভাষার প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং শব্দচর্চার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
২.লেখার মান উন্নয়ন
একই শব্দ বারবার ব্যবহার করলে লেখায় একঘেয়েমি তৈরি হয়। থিসরাস লেখাকে বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
৩.সৃজনশীলতা বিকাশ
কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ বা উপন্যাস লেখার সময় উপযুক্ত শব্দ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থিসরাস সঠিক শব্দ বেছে নিতে সাহায্য করে।
৪.ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি
একটি সুন্দর লেখা শুধু ভাবের গভীরতায় নয়, শব্দের সৌন্দর্যেও সমৃদ্ধ হয়। থিসরাস সেই সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে।
আধুনিক যুগে থিসরাস
এক সময় থিসরাস বলতে বোঝানো হতো কেবল মোটা একটি বই। তবে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন অনলাইন থিসরাস, মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল অভিধান সহজলভ্য হয়েছে। এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই যে কোনো শব্দের সমার্থক শব্দ খুঁজে পাওয়া যায়।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন থিসরাস আজ এক অপরিহার্য সহায়ক। পরীক্ষার উত্তর লেখা থেকে শুরু করে প্রেজেন্টেশন প্রস্তুত করা পর্যন্ত সর্বত্র থিসরাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো,ভাষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানো,শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার গুরুত্ব বোঝানো
পাঠাভ্যাস ও লেখালেখির চর্চা উৎসাহিত করা,
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার দিকে আগ্রহী করে তোলা,
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিনে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শব্দ প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা, শব্দখেলা ও সাহিত্য আলোচনা আয়োজন করা হয়।

বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা। এই ভাষার রয়েছে বিশাল শব্দভাণ্ডার ও দীর্ঘ সাহিত্য ঐতিহ্য। তবে বাংলা ভাষায় এখনো ইংরেজির মতো জনপ্রিয় ও বিস্তৃত থিসরাসের ব্যবহার ততটা দেখা যায় না। যদিও কিছু বাংলা সমার্থক শব্দের অভিধান রয়েছে, তবুও আধুনিক ডিজিটাল থিসরাসের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়ে গেছে।
বাংলা ভাষার জন্য উন্নতমানের থিসরাস তৈরি হলে শিক্ষার্থী ও লেখকদের জন্য তা হবে অত্যন্ত উপকারী। এতে বাংলা ভাষার চর্চা আরও সমৃদ্ধ হবে এবং নতুন প্রজন্ম ভাষার সৌন্দর্যের সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হতে পারবে।

শিক্ষাক্ষেত্রে থিসরাস একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক গ্রন্থ। শিক্ষার্থীরা প্রবন্ধ, রচনা, প্রতিবেদন কিংবা গবেষণাপত্র লেখার সময় উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পেতে থিসরাস ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে তাদের লেখার মান যেমন উন্নত হয়, তেমনি ভাষাগত দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়,বিশেষ করে ইংরেজি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে থিসরাস শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। নতুন শব্দ শেখার পাশাপাশি তারা শব্দের সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কেও ধারণা লাভ করে।

সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের জন্য থিসরাস যেন এক নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। একটি প্রতিবেদনে বা গল্পে সঠিক শব্দের ব্যবহার পাঠকের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। থিসরাস লেখকদের সেই সঠিক শব্দটি খুঁজে পেতে সাহায্য করে। বিশেষ করে কবিতায় শব্দের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি শব্দের সামান্য পরিবর্তন পুরো কবিতার আবহ বদলে দিতে পারে। তাই কবির কাছে থিসরাস একটি অমূল্য সম্পদ।
থিসরাস ও ভাষার ভবিষ্যৎ
ভাষা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন নতুন শব্দ যুক্ত হচ্ছে, পুরোনো শব্দের অর্থ বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের ধারাকে সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করতে থিসরাসের ভূমিকা ভবিষ্যতেও অপরিসীম থাকবে।

আন্তর্জাতিক থিসরাস দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শব্দ কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার প্রতিফলন। থিসরাস হলো, সেই শব্দভাণ্ডারের দরজা, যা আমাদের নতুন নতুন ভাবনার জগতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। এই দিবস আমাদের উৎসাহিত করে ভাষাকে ভালোবাসতে, শব্দকে জানতে এবং লেখালেখির চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করতে। থিসরাসের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভাষাকে আরও সুন্দর, শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক করে তুলতে পারি। শব্দের শক্তিকে সম্মান জানিয়ে, ভাষার সৌন্দর্যকে উদযাপন করে এবং জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার প্রত্যয়ে আন্তর্জাতিক থিসরাস দিবস আমাদের অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

Post a Comment

0 Comments