জঙ্গলমহলের লোকগল্প
ব্যাঙ ও ষাঁড়
সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস
কথক- বিজয় দাস, গ্ৰাম- যুগীশোল, থানা- নয়াগ্ৰাম, জেলা- ঝাড়গ্ৰাম
অনেকদিন আগে এক সুন্দর পুকুরে একদল ব্যাঙ বাস করত। তারা একসঙ্গে খুব মজা করেই থাকত। একসঙ্গে খেলা করত, একসঙ্গে খেত। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ বিপদে পড়লে তারা একে অপরকে সাহায্যও করত।
কিন্তু সব ব্যাঙগুলো দেখতে একরকম ছিল না। তাদের মধ্যে একটি ব্যাঙ ছিল খুবই রোগা। তাই সে অনেক উঁচু উঁচু পাথরে লাফাতে পারত। আর একটি ব্যাঙ ছিল খুবই চালাক। অন্য কেউ পোকামাকড় ধরে খাওয়ার আগে সে ধরে খেয়ে নিত। এছাড়া কে কোথায় খাবার লুকিয়ে রাখত তাও সে জানত।
আর তাদের মধ্যে আরও একজন ছিল যে আকারে খুবই বড়ো এবং মোটা। তার নাম ছিল বটু। সে সব ব্যাঙেদের থেকে বড়ো ছিল। তাই সব ব্যাঙেরা তাকে ভয় পেত। তারা মনে করত হয়তো এর থেকে বড়ো কোনো জন্তু এ পৃথিবীতে নেই। কারণ তারা বটুর চেয়ে বড়ো কোনো জন্তু কোনোদিনও দেখেনি।
আর এইসব বটুর খুবই ভালো লাগত। সে তার বড়ো শরীর নিয়ে খুবই অহংকার করত। তাই সে মাঝেমধ্যে তার থেকে ছোটো ব্যাঙগুলোকে যা তা বলত। সে বলত-“কুঁয়াক কুঁয়াক কুঁয়াক, এই যে লম্বুদর তুই কী ভাবিস যে তুই লম্বা বলে সব জায়গায় লাফাতে পারবি? হ্যাঁ পারবি হয়তো। কিন্তু আমার মতো এত বড়ো ও এত শক্তিশালী তো হতে পারবি না। আমার চেয়ে বড়ো কোনো জন্তু এ পৃথিবীতে নেই, হা হা হা।”
🍂
এই শুনে সেই লম্বা ব্যাঙটি অন্য আর একটি ব্যাঙকে বলে-“ওই রূপা, তোর কী মনে হয়, সত্যিই কী বটুর চেয়ে শক্তিশালী কোনো জন্তু এ পৃথিবীতে নেই?”
তখন রূপা বলে-“আমি কী করে বলব বল। কারণ বটুর চেয়ে বড়ো কোনো জন্তু তো আমি এর আগে কোনোদিনও দেখেনি।”
আসলে তারা যে সুন্দর পুকুরে বাস করত সেটি ছিল একেবারে জঙ্গলের গভীরে। তাই বেশি কোনো জন্তু-জানোয়ার এই পুকুরে জল খেতে আসত না। আর সেইজন্য তারা সবাই ভাবত যে বটুর মতো বড়ো কোনো জন্তু এ পৃথিবীতে নেই। বটুরও এটা খুব ভালো লাগত।
বটু মনে মনে ভাবত-“কুঁয়াক কুঁয়াক কুঁয়াক, আমার ভাগ্য কত ভালো। আমি সবার থেকে বড়ো। কুঁয়াক কুঁয়াক কুঁয়াক।”
এই বটুর আবার চারটি ছানা ছিল।
একদিন সব বাচ্চারা মিলে পুকুরে খেলা করছিল। তখন তাদের মধ্যে একজন বলে-“এই চল সবাই মিলে ওই গাছটার পিছনে গিয়ে খেলি। ওখানে অনেক বড়ো বড়ো পাথর আছে।”
তখন একটি লাল ব্যাঙ বলে-“না বাবা, আমি বাবা ওদিকে যাব না। মা আমাকে ওদিকে যেতে না বলেছে।”
এই শুনে বটুর এক ছেলে বলে-“আরে শোন, তোরা তো জানিস আমার বাবা এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো জন্তু। তাই তোরা কোনো চিন্তা করিস না। যদি আমরা কোনো বিপদে পড়ি তাহলে আমার বাবা আমাদের ঠিক বাঁচিয়ে নেবে।”
তখন ওই লাল ব্যাঙটি বলে-“আমার খুব ভয় করছে। আমার মা যদি জানতে পায়?”
বটুর ছেলে তখন বলে-“আরে তুই কোনো চিন্তা করিস না। তোর মা যদি তোকে কিছু বলে তাহলে আমার বাবাকে তোর মার সঙ্গে কথা বলতে বলব। তাহলে তুই আর বকা খাবি না।”
তখন লাল ব্যাঙটি বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে, চল তবে।”
এই বলে তারা সবাই লাফাতে লাফাতে ওই গাছটার নিচে গেল। আর ওই গাছের নিচে আরও একটি পুকুর দেখে তারা সবাই অবাক হয়ে গেল।
তখন তাদের মধ্যে একজন বলল-“এই দেখ তোরা এখানে আরও একটা পুকুর আছে। আমি তো ভেবেছিলাম আমরা যে পুকুরে থাকি ওই পুকুরটাই সবথেকে সুন্দর। কিন্তু এখানে তো আরও একটা সুন্দর পুকুর আছে।”
তখন আর একজন বলল-“কুঁয়াক কুঁয়াক, না না আমাদের এইরকম ভাবা ঠিক না। এমন অনেক জিনিস আছে যা হয়তো আমরা কোনোদিনও দেখিনি। তাই এইরকম ভাবা ঠিক না।”
আর একটি ব্যাঙ তখন বলে-“তোরা কী শুধু কথা বলবি নাকি ওই পুকুরে যাবি? এখন চল আমরা ওই পুকুরে গিয়ে খেলা করি।”
এই বলে তারা সেখানে খেলা করতে থাকে।
হঠাৎই মাটিটা কেঁপে উঠল। তারা সবাই তখন খুব ভয় পেয়ে গেল।
সবাই বলতে লাগল-“ও বাবা গো, এসব কী হচ্ছে? মাটি কাঁপছে কেন?”
তখন ওই লাল ব্যাঙটি বলে-“আমাদের নিজের পুকুর ছেড়ে আসা ঠিক হয়নি। এখন কী হবে আমাদের, আমরা সবাই কী মরে যাব?”
তখন একটি ব্যাঙ কিছু একটা দেখে বলে-“আরে ওটা আবার কী?”
বাচ্চা ব্যাঙগুলো এক বিশাল জন্তু দেখে অবাক হয়ে যায়। ওই বিশাল জন্তুটা ওই পুকুরের দিকেই আসছিল। জন্তুটা একটি বড়ো পাথরের মতো বিশাল ছিল। সে যখন হাঁটছিল তখন তার পেটটা এদিক ওদিক দুলছিল। আর হাঁটতে হাঁটতে সে জোরে জোরে ডাকছিল। হাম্বা হাম্বা হাম্বা।
এদিকে বাচ্চা ব্যাঙগুলো ওই জন্তুটাকে দেখে ভয়ে পালানোর জন্য এদিক ওদিক লাফাচ্ছিল। ঠিক তখনই ছোটো লাল ব্যাঙটি তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে পা ফসকে পড়ে যায়।
ওই বিশাল জন্তুটা অন্য কিছু ছিল না। ছিল একটি ষাঁড়। এইসব দেখে সে বলে-“এ কী এখানে এত গোলমাল কিসের? তোরা সবাই কে রে? তোদের তো আগে কোনোদিন এখানে দেখিনি?”
তখন লাল ব্যাঙটি বলে-“দয়া করো বড়ো জন্তু দয়া করো। দয়া করে আমাকে তুমি খেও না।”
এই কথা শুনে ষাঁড় হাসতে থাকে। আর বলে-“কী বলছিস কী তোরা। আমি তোদের খাব, হা হা হা। আমি হঠাৎ ব্যাঙ খেতে যাব কেন। আমি তো শুধু এখানে জল খেতে এসেছি।”
তখন বাকি ব্যাঙগুলো বলে-“ওওওও তাহলে তুমি আমাদের মারবে না তো?”
তখন ষাঁড় বলে-“আরে না না, আমি ব্যাঙ খাই না আর তোদের মারবও না।”
বটুর ছেলে তখন বলে-“তাহলে তুমি কী খাও? কী খেয়ে তুমি এত বড়ো হলে? আমার বাবা তো প্রতিদিন এত এত পোকামাকড় খায় তবুও তো সে তোমার মতো এত বড়ো নয়।”
ষাঁড় তখন হাসতে হাসতে বলে-“তোর বাবা মানে আর একটা ব্যাঙ। হা হা হা। সে কখনোই আমার মতো বড়ো হতে পারবে না। আমি জন্ম থেকেই বড়ো। আর প্রতিটি জন্তুরই নিজ নিজ একটা আকার হয়, হাম্বাআআআ।”
এই শুনে লাল ব্যাঙটি বলল-“তার মানে তোমার থেকে আরও বড়ো জন্তু এ পৃথিবীতে আছে?”
ষাঁড় বলে-“হ্যাঁ আছে।”
বাচ্চা ব্যাঙগুলো ষাঁড়ের এই সব কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। তারা ভাবে ‘আরো জন্তু আছে যারা ষাঁড়ের থেকে বড়ো!’
এরপর তারা সবাই মিলে ষাঁড়ের কাছ থেকে ওইসব বড়ো বড়ো জন্তুর গল্প শোনে। আস্তে আস্তে সন্ধ্যা হয়ে আসে। আর ষাঁড়েরও বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে যায়।
ষাঁড় চলে গেলে বটুর এক ছেলে বাকি বাচ্চা ব্যাঙগুলোকে বলে-“এই এবার তোরা সবাই বাড়ি চল, সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাবা আমাদের না দেখতে পেলে খুব বকবে।”
এরপর তারা সবাই বাড়ি চলে এল। আর ষাঁড় যা যা বলেছিল তা বটু এবং বাকি সব ব্যাঙেদের এসে বলল।
তাদের কথা শুনে বটু হাসতে হাসতে বলল-“কী তোরা বলছিস যে ষাঁড়টি নাকি আমার থেকেও বড়ো। হা হা হা, তোরা কী বোকা। তোরা বুঝতেই পারলি না যে ওই ষাঁড়টি তোদের বোকা বানিয়েছে, হা হা হা।”
তখন বটুর এক ছেলে বলল-“শুধু এটা নয় বাবা। ওই ষাঁড়টি এও বলল যে পৃথিবীতে আরও অনেক জন্তু আছে যারা নাকি ওর থেকেও বড়ো। আর ওই সব জন্তুগুলোও ওই পুকুরে জল খেতে আসে।”
তখন বটুর আর এক ছেলে বলল-“জানো বাবা, ও এও বলেছে যে তুমি নাকি কোনোদিনও ওর মতো বড়ো হতে পারবে না।”
এই শুনে বটু বলল-“কুঁয়াক কুঁয়াক, যতসব আজেবাজে কথা। ও তোদের বোকা বানিয়েছে। ও মিথ্যা কথা বলেছে। আমার থেকে বড়ো কোনো জন্তু এ পৃথিবীতে নেই।”
তখন বটুর এক বন্ধু বলল-“ও তো সত্যিও বলতে পারে বটু। কারণ আমি সবসময় এই পুকুরে জল খেতে আসা পাখিদের সঙ্গে কথা বলি। আর তাদের থেকেও আমি অনেক জন্তুদের গল্প শুনেছি। তাই নিজেদের শক্তিশালী ভাবাটা আমাদের সবচেয়ে বড়ো ভুল হতে পারে।”
বটু বলে-“ভুলটা আমি না তুই করছিস। আমিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো প্রাণী, আর এটাই সত্যি।”
তখন আর একটি ব্যাঙ বলে-“কাল সকালে আমরা সবাই গিয়ে ওই পুকুরে দেখলেই তো হয় যে কে সত্যি কথা বলছে আর কে মিথ্যা কথা বলেছ। তাই বেশি কথা না বলে আমরা কাল সকাল অবধি অপেক্ষা করি।”
এই শুনে সবাই বলল-“হ্যাঁ, তুই এটা ঠিকই বলেছিস। আমরা সবাই গিয়ে দেখলেই বুঝতে পারব যে কে ঠিক বলছে আর কে ভুল।”
এইসব শুনে বটু খুব রেগে গেল। তার মাথায় একটা জেদ চেপে গেল যে তাকে দেখাতেই হবে সে ঠিক বলছে।
তখন সে বলল-“না না এ হতে পারে না। আমার থেকে বড়ো কোনো জন্তু এই পৃথিবীতে নেই। আমার বাচ্চাদের যে ওই ষাঁড় বোকা বানিয়েছে তা আমি সকলের সামনে প্রমাণ করে দিচ্ছি। কোন সাহসে সে বলল যে আমি তার মতো কখনোই হতে পারব না।”
এই বলে বটু তার পেটটা একটু ফুলিয়ে বাচ্চাদের বলল-“বাচ্চারা বল তো সে কী এইরকম বড়ো ছিল?”
বাচ্চারা বলল-“না না এরচেয়েও বড়ো ছিল।”
তখন বটু তার পেটটা আর একটু ফুলিয়ে বলে-“দেখ তো এইরকম বড়ো ছিল?”
বাচ্চারা বলে-“না না এরচেয়েও বড়ো।”
এরপর বটু তার পেটটা আরও ফুলাতে থাকে। আর বাচ্চাদের বলে-“ও কী সত্যি এরচেয়েও বড়ো ছিল?”
বাচ্চারা বলে-“না না এরচেয়েও বড়ো।”
তখন বটুর বন্ধু বলে-“বটু তুই নিজেকে এত কষ্ট দিচ্ছিস কেন? এবার থাম তুই, এবার থাম।”.
কিন্তু বটু তখন কারোর কথা শুনছিল না। তাকে প্রমাণ করতেই হবে যে সে সবার থেকে বড়ো। তাই সে নিজেকে কষ্ট দিতেও কিছু ভাবছিল না। পেটটা ফুলাতে ফুলাতে এতটাই ফুলিয়ে ছিল যে তার চোখ মুখ একেবারে নীল হয়ে গিয়েছিল। চোখ দুটো দেখে মনে হচ্ছিল এই যেন চোখগুলো বেরিয়ে আসবে।
সে শেষবারের মতো আর একটু পেটটা ফুলিয়ে বলল-“সে কী এরচেয়েও বড়ো ছিল?” এই কথা বলতে না বলতেই তার পেটটা ফেটে গেল।
তখন বাচ্চারা চিৎকার করে বলল-“না বাবা না বাবা।”
এই বলে তারা কাঁদতে লাগল।
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। বটুর পেট ফেটে গিয়েছিল। সে নিজের ক্ষমতার বাইরে নিজের ফুলাতে চেয়েছিল। কিন্তু তাতে এক কে আর হয়ে গেল। সে মারা গেল। তার বাচ্চারা বাবা বাবা বলে কাঁদতে লাগল।
0 Comments